ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৫-২০১৯ ইং ০১:২২:৪৪ | সংবাদটি ১৯০ বার পঠিত

সূরা : বাক্বারাহ
[পূর্ব প্রকাশের পর]
জ্ঞাতব্য : আল্লাহর সাধারণ রহমত পৃথিবীতে বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী, মুমিন-কাফের নির্বিশেষে সবার জন্যই ব্যাপক। তারই প্রভাব হল পার্থিব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও শারীরিক সুস্থতা। তবে বিশেষ রহমতের বিকাশ ঘটবে আখেরাতে, যার ফলে মুক্তি ও আল্লাহর নৈকট্যলাভ সম্ভব হবে।
বাহ্যিক দৃষ্টিত আয়াতের ৬৪ শেষাংশের লক্ষ্য হলো সে সমস্ত ইহুদী, যারা মহানবী (সা.) এর সময়ে উপস্থিত ছিলো। হুযুরে আকরাম (সা.) এর উপর ঈমান না আনাও যেহেতু উল্লেখিত প্রতিজ্ঞা ভঙ্গেরই অন্তর্ভুক্ত, সেহেতু তাদেরকে পূর্বোক্ত প্রতিজ্ঞা ভঙ্গকারীদের আওতাভুক্ত করে উদাহরণ স্বরূপ বলা হয়েছে যে, ‘এতদসত্ত্বেও আমি দুনিয়াতে তোমাদের উপর তেমন কোনো আযাব অবতীর্ণ করিনি, যেমনটি পূর্বকালে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গকারীদের উপর অবতীর্ণ হয়ে থাকত। এটা একান্তই আল্লাহর রহমত।
আর হাদিসের বর্ণনার ভিত্তিতে আযাব অবতীর্ণ না হওয়াটা যেহেতু মহানবী (সা.) এরই বরকত, কাজেই কোনো কোনো তাফসীরকার মহানবী (সা.) এর আবির্ভাবকেই আল্লাহর রহমত ও করুণা বলে বিশ্লেষণ করেছেন।
এ বিষয়টির সমর্থনকম্পে বিগত বেঈমানদের একটি ঘটনা পরবর্তী আয়াতে বিবৃত হচ্ছে : ৬৫ আয়াতে বর্ণিত এ ঘটনাটিও হযরত দাউদ (আ.) এর আমলেই সংঘটিত হয়। বনী-ইসরাঈলের জন্যে শনিবার ছিলো পবিত্র এবং সাপ্তাহিক উপাসনার জন্য নির্ধারিত দিন। এ দিন মৎস্য শিকার নিষিদ্ধ ছিলো। তারা সমুদ্রোপকূলের অধিবাসী ছিলো বলে মৎস্য শিকার ছিলো তাদের প্রিয় কাজ। ফলে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই তারা মৎস্য শিকার করে। এতে আল্লাহ তা’আলার পক্ষে ‘মসখ’ তথা বিকৃতি বা রূপান্তরের শাস্তি নেমে আসে। তিন দিন পর এদের সবাই মৃত্যুমুখে পতিত হয়।
এ ঘটনার দর্শক ও শ্রোতা দুই শ্রেণিতে বিভক্ত। অবাধ্য শ্রেণি ও অনুগত শ্রেণি। অবাধ্যদের জন্যে এ ঘটনাটি ছিলো অবাধ্যতা থেকে তওবা করার উপকরণ। এ কারণে একে ‘শিক্ষাপ্রদ দৃষ্টান্ত’ বলা হয়েছে। অপরদিকে অনুগতদের জন্যে এটা ছিলো আনুগত্যে অটল থাকার কারণ। এজন্যে একে ‘উপদেশপ্রদ’ ঘটনা বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
আকৃতি রূপান্তরের ঘটনা : তাফসিরে কুরতুবীতে বলা হয়েছে, ইহুদীরা প্রথম প্রথম কলা-কৌশলের অন্তরালে এবং পরে সাধারণ পদ্ধতিতে ব্যাপকভাবে মৎস্য শিকার করতে থাকে। এতে তারা দুই দলে বিভক্ত হয়ে যায়। একদল ছিলো সৎ ও বিজ্ঞ লোকদের। তারা এ অপকর্মে বাধা দিলেন। কিন্তু প্রতিপক্ষ বিরত হলো না। অবশেষে তারা এদের সাথে যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করে পৃথক হয়ে গেলেন। এমনকি বাসস্থানও দুই ভাগে ভাগ করে নিলেন। একভাগে অবাধ্যরা বসবাস করত আর অপর ভাগে সৎ ও বিজ্ঞ জনেরা বাস করতেন। একদিন তারা অবাধ্যদের বস্তিতে অস্বাভাবিক নীরবতা লক্ষ্য করলেন। অতঃপর সেখানে পৌঁছে দেখলেন যে, সবাই বিকৃত হয়ে বানরে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। হযরত কাতাদাহ্ (রা.) বলেন, তাদের যুবকরা বানরে এবং বৃদ্ধরা শূকরে পরিণত হয়ে গিয়েছিলো। রূপান্তরিত বানররা নিজ নিজ আত্মীয়-স্বজনকে চিনত এবং তাদের কাছে এসে অঝোরে অশ্রু বিসর্জন করত।
রূপান্তরিত সম্প্রদায়ের বিলুপ্তি : সহীহ্ মুসলিমে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, কয়েকজন সাহাবী একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেনÑ হুযুর! আমাদের যুগের বানর ও শূকরগুলো কি সেই রূপান্তরিত ইহুদী সম্প্রদায়? তিনি বললেন, আল্লাহ তা’আলা যখন কোন সম্প্রদায়ের উপর আকৃতি রূপান্তরের আযাব নাযিল করেন, তখন তারা ধরাপৃষ্ঠ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। তিনি আরও বললেন, বানর ও শূকর পৃথিবীতে পূর্বেও ছিলো, ভবিষ্যতেও থাকবে। এদের সাথে রূপান্তরিত বানর ও শূকরদের কোনো সম্পর্ক নেই।
জ্ঞাতব্য : ঘটনার বিবরণ এই যে, বনী-ইসরাঈলদের মধ্যে একটি হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছিলো। মিশকাতের টীকা গ্রন্থ মিরকাতের বর্ণনা অনুযায়ী এর কারণ ছিলো বিবাহ জনিত। জৈনিক ব্যক্তি নিহত ব্যক্তির কন্যার পাণিগ্রহণ করার প্রস্তাব করে প্রত্যাখ্যাত হয় এবং এই পাণিপ্রার্থী কন্যার পিতাকে হত্যা করে গা ঢাকা দেয়। ফলে হত্যাকারী কে? তা জানা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
মাআলী (রহ.) কালবী (রা.) এর বর্ণনার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, তখন পর্যন্তও তওরাতে হত্যা সম্পর্কে কোনো আইন বিদ্যমান ছিলো না। এতে বোঝা যায়, ঘটনাটি তওরাত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বেকার।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT