ধর্ম ও জীবন

রমজান মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত

সৈয়দ মবনু প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৫-২০১৯ ইং ০১:২৩:২৪ | সংবাদটি ৭০ বার পঠিত

রমজান আরবি বারো মাসের নবম মাস। রমজান মাসের গুরুত্ব-ফজিলত বাকি সব মাস থেকে পৃথক এবং বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। এই মাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য আর ফজিলত হলো কুরআন অবতরণ। মহান আল্লাহ রমজান মাসের পরিচয় দিতে গিয়ে এই বৈশিষ্ট্যের কথা ঘোষণা করেছেন ‘শাহরু রামাজানাল্লাযী উনযিলা ফীহিল কুরআন’ অর্থাৎ রমজান হলো এই মাস যে মাসে আমি কুরআন অবতির্ণ করেছি। (সুরা বাকারা-৮৫)। আবার সাথে সাথে এই আয়াতে মহান আল্লাহ পাক কুরআনের পরিচয় দিচ্ছেন ‘হুদাল্লীন নাস’ বলে, যার অর্থ হলো ‘মানুষের জন্য হিদায়ত’। অর্থাৎ রমজান হলো সেই মাস যে মাসে মহান আল্লাহ পাক কুরআন অবতির্ণ করেছেন মানুষের হিদায়তের জন্য।
এখন প্রশ্ন হলো হিদায়ত কি? স্বয়ং আল্লাহ পাক-ই পরবর্তীতে বলে দিয়েছেন-‘ওয়া বাইয়েনাত’ অর্থাৎ সৎ পথের স্পষ্ট নিদর্শন। এই আয়াতের শেষে ‘ফুরকান’ শব্দ দিয়ে মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনের আরেক পরিচয় দিয়েছেন-সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী। পবিত্র কুরআনের এই আয়াতের সারকথা হলো-রমজান হলো সেই মাস যে মাসে মানুষের হিদায়তের জন্য, মানুষের সামনে সত্য মিথ্যার ব্যবধান স্পষ্ট করতে, সৎ পথের স্পষ্ট নিদর্শন হিসাবে পবিত্র কুরআন অবতির্ণ করা হয়েছে। রমজানের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এই মাসে মহান আল্লাহ পাক আমাদের প্রিয় নবী রাহমাতাল্লিল আলামীন হযরত মোহাম্মদ (সা.)-কে সাইয়েদুল মুরসালীন, খাতামুন নাবীয়ীন হিসেবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেন অর্থাৎ এই মাসে তিনি নবুওয়াত প্রাপ্ত হন এবং তিনির কাছে ওহী আসতে শুরু হয়। এটা উম্মতে মোহাম্মদীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই মাসে উম্মতে মোহাম্মদীর জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে যা অন্য কোন নবীর ভাগ্যে জোটেনি। সেটা হলো কদরের রাত। কদরের ফজিলত সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহর ঘোষণা হলোÑ ‘লাইলাতুল কাদরে খাইরুম মীন আলফী শাহরিন’ অর্থাৎ শবে কদরের এক রাত হাজার মাস থেকে শ্রেষ্ঠ।
রমজানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফজিলত হলো-সমস্ত মাস রোজা রাখা ফরজ। প্রতিটি রোজায় মহান আল্লাহ পাক অসংখ্য মানুষকে ক্ষমা করেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাতের তালিকাভুক্ত করেন। তাই এ মাসকে বরকত-রহমত- মাগফেরাতের মাস বলা হয়।
এই মাসের উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক ঘটনা হলো বদর যুদ্ধ। ফুরকান শব্দ দিয়ে মহান আল্লাহ পাক সত্য-মিথ্যার পার্থক্যের যে ঘোষণা দিয়েছেন তা সামাজিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে প্রমাণার্থে বদর যুদ্ধের ভূমিকা ইসলামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। মিথ্যা যখন সত্যকে গ্রাস করতে উম্মাদ হয়ে উঠে তখনই আল্লাহ পাক জিহাদের অনুমতি দিয়ে সত্য পন্থীদেরকে বুক টান করে দাঁড়াতে নির্দেশ করেন। এই নির্দেশের প্রথম প্রতিফলন বদর যুদ্ধ। তাই রমজানকে সত্য প্রতিষ্ঠার এবং মিথ্যার বিরুদ্ধে জিহাদের মাসও বলা হয়।
বিশ্বের অনেক দেশে আজো বদর যুদ্ধের স্মৃতিকে হৃদয়ে লালন করে প্রতি বছর রমজানের ১৭ তারিখে ‘জিহাদ দিবস’ পালন করে থাকেন। বদরের ময়দানে আবু জেহেলদের পরাজয় গোটা জাহিলিয়াতের শরীরে দিয়েছিলো প্রচন্ড আঘাত। তাই আজো বিশ্বব্যাপী মুসলমানরা সত্যের পক্ষে, মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে বদর যুদ্ধের ইতিহাস থেকে প্রেরণা নিতে শ্লোগান দেন বদরের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার।
মোট কথা রমজান হলো বরকত, রহমত, মাগফেরাত হিদায়ত ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্য সৃষ্টিকারী কুরআন, এবং জিহাদের মাস। এই মাস ত্যাগের, আধ্য্ত্মা সাধনার এবং ইবাদতের। এই মাসের একটি নফল ইবাদ অন্য মাসের ফরজ ইবাদতের সমতুল্য পূণ্যের। এই মাস শিক্ষা গ্রহণের, চরিত্র সংশোধনের। এত মোবারক মাস পেয়েও যদি আমরা কিছু অর্জনে ব্যর্থ হই, তবে সেটা অবশ্যই আমাদরে দুর্ভাগ্য। আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে সঠিক ভাবে তাঁর ইবাদত-গোলামীর যেনো তৌফিক দান করেন। সঠিক ইবাদত আদায়ের জন্য ইবাদতের নিয়ম পদ্ধতি সঠিকভাবে জানা অত্যন্ত জরুরী, সেই জরুরীয়াতকে সামনে নিয়েই আমাদের স্মরণ রাখতে হবে রোজা শুধু পানাহার কিংবা সহবাস ত্যাগের নাম নয়।
রোজা হলো মানসিক, ব্যক্তিগত সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাকিত দৈনন্দিন কাজ-কর্মে সৃষ্ট পাপাচার এবং সুদ, ঘুষ, ব্যবিচার, মদ্যপান, মদের ব্যবসা, মিথ্যাচার ইত্যাদি ত্যাগের নাম । যতটুকু নিজেদের আয়ত্বে ততটুকু অবশ্যই সাথে সাথে ত্যাগ করে তাওবাহ করতে হবে। শপথ নিতে হবে আগামীতে না করার। কাকুতি করে সত্য পথে চলার সাহায্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে হবে। অবশ্য যা নিজের আয়ত্বের বাইরে, তার জন্য আল্লাহ ক্ষমাশীল, তবে চেষ্টা করতে হবে সামাজিক-রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক পাপাচার বন্ধের। যদি সাধ্যমতো চেষ্টাও না করা হয় তবে দায়ী থাকতে হবে। মহানবী (সা.) বলেছেন-যে রোজাদার রোজা রেখে মিথ্যা কথা এবং অন্যায় পাপাচার থেকে বিরত থাকে না তবে এমন রোজাদারের আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। (বোখারী শরিফ)

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT