সাহিত্য গ্রন্থালোচনা

দেয়ালে টাঙানো পোস্টারের নাম ‘শোন মানুষ’

মামুন সুলতান প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০৫-২০১৯ ইং ০০:৩২:৩৬ | সংবাদটি ২৫৮ বার পঠিত

‘শোন মানুষ’ একটি ছড়াগ্রন্থ। লেখক মোহাম্মদ খছরুজ্জামান। তিনি প্রধানত ছড়াকার। প্রবন্ধে-অনুবাদে এবং সঙ্গীতেও তিনি কাজ করেন। পেশাগতভাবে তিনি শিক্ষক। মাদরাসায় পড়ান। প্রশাসনিক দায়িত্ব তাঁর। যাপিত জীবনের দৌড়-ঝাঁপ, সংসার-সামাজিক দায়বোধ অতঃপর সাহিত্য। নাকি তার বিপরীত কর্মযজ্ঞ। এ রকম পরিসংখ্যান আপাতত ইতি টানাই ভালো। আজকে আমাদের চলার মহাসড়ক ‘শোন মানুষ’।
ছড়ার সমালোচনা করা মোটেও দুরূহ কোন কাজ নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে ছড়াকে সাহিত্যের গূঢ়ার্থে নিতে নারাজ। সৃজনশীল ব্যারোমিটারে তাপমাত্রা ওঠানামা করলেও একজন ছড়াকারকে ছড়া বিষয়ক কিছু নির্ধারিত ব্যাকরণ জানা থাকলেই ছড়ার মাঠে তিনি অনেক বড় খেলোয়াড় হতে পারেন। শব্দকে জোড়া দিয়ে তিনি সাহিত্যের মাঠে ঘোড়া দৌঁড়াতে পারেন। ভাবনায় আগত বিষয়কে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে জনতার হৃদয় গহীনে জাগরণ আনতে পারেন। অন্তর ¯্রােতে তুলতে পারেন আনন্দের ঢেউ। ভাবনার দেয়ালে গেঁথে দিতে পারেন জেগে ওঠার পোস্টার। দেয়ালে টাঙানো সেই পোস্টারের নাম ‘শোন মানুষ’।
‘শোন মানুষ’- শিরোনামে একটি ছড়া আছে। এ গ্রন্থে সাতচল্লিশটি ছড়ার সর্বশেষ ছড়া। ছড়াকার কী শোনাতে চান? তিনি বলতে চান- জ্ঞান-বিজ্ঞানে এই পৃথিবীর মানুষ অনেক উচ্চতায় পৌঁছে গেছে কিন্তু ‘মানবীয় শ্রেষ্ঠতায়’ এখনো পৌঁছেনি মানুষ। তাই-
‘বিশ্ব দেশের দৃশ্য দেখে/ লজ্জিত আজ প্রকৃতি/ শোন মানুষ গ্রহণ করি/ নৈতিকতার প্রস্তুতি।’
সাহিত্য মানেই নৈতিকতার চাষাবাদ। অন্যায় অনাচার, পাপাচার-পাপবোধ থেকে সাহিত্য মানুষকে আহ্বান জানায়। ছড়াকার মোহাম্মদ খছরুজ্জামান সেই নৈতিক দায়িত্বই পালন করেছেন।
ছড়ার শিল্পগুণে নয় বিষয় মাহাত্মে গ্রন্থের প্রথম লেখাটি ‘দয়াল আল্লাহ’ আলোচনা করা যেতে পারে। এখানে লেখক অবহেলায় সোনার জীবন নষ্ট করে, ভবের মায়া সাঙ্গ করে ব্যস্ত মানুষজন। আল্লাহ নবীর নাম না জপে দুনিয়াদারির কাজে ব্যস্ত থাকায় কবির অনুশোচনাÑ
‘আল্লাহর নাম নবীর নাম / যথাযথ না লইলাম / দুনিয়ার জালে আটকা পড়ি / রইলাম গাফিল হইয়া।’
এটাকে ছড়া না বলে গান বলতে হবে। সম্ভবত ছড়াকার এটাকে গান হিসেবেই লিখেছেন। স্বরবৃত্ত ছন্দে গান লেখা যায়। তবে এটি গ্রন্থের প্রথম লেখা সাব্যস্ত না করলে ভালো হতো। ‘শোন মানুষ’ গ্রন্থ আমরা ছড়াগ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চাই। এতে নিখুঁত প্রশ্নে কোথাও যেন একটু ভাটা পড়ে যায়। এসব বিষয়ে সব সময় একজন সিরিয়াস লেখক হিসেবে ভাবনায় রাখা দরকার। তবে ছড়াকার পিয়ার মাহমুদ গ্রন্থের ফ্ল্যাপে লিখেছেন-“শোন মানুষ- ছড়া কবিতা গান সঙ্গীতের ঐক্যবদ্ধ রকমারি শ্লোগান।” এইভাবে একই গ্রন্থে নানান সাহিত্য উপাদান থাকলে লেখককে আবিষ্কার করতে আমাদের সংশয় তৈরি।
তবু দ্বিধাহীন চিত্তে বলা যায়, মোহাম্মদ খছরুজ্জামান একজন ছড়া কারিগর। ‘বিজয় তুমি’ ছড়াটি পাঠ করলেই আর কোন সন্দেহ থাকে না। একজন জাত শিল্পী হিসেবে আমাদের সামনে সূর্যের দীপ্তি নিয়ে হাজির হন। বিজয় মানে স্বাধীনতা, বিজয় মানে দেশের বিজয়। সেই বিজয় পেতে ভাইয়ের খুণ ঝরলো, বাবা হারালেন খুলি, বোন হারালেন ইজ্জত। পুরো ছড়াটাই নতুন স্টাইলে নতুন ভাবনা, নতুন আঙ্গিক তৈরি করেছে। এমনকি ছড়ার শেষে ছড়াকার নিজের নামের ভণিতা ব্যবহার করে ছড়ার ভেতরে লেখক সরাসরি প্রবেশ করেছেন। এখানে ‘বিজয় তুমি’ ছড়ার শেষ স্তবকটি তুলে ধরা হলো-
‘বিজয় তুমি/ আমার মায়ের/ আঁখি ঝরা/ অশ্রু/ বিজয় তোমার/ প্রেমিক বেশি/ একটা প্রেমিক/ খছরু।’
এখানে জনাব ‘খছরু’ কতো আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে একমাত্র প্রেমিক হয়ে বিজয়ের প্রেমে আসক্ত হয়ে দেশের প্রতি অগাধ ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন।
রাজনীতি নিয়ে আছে দীর্ঘ একটি ছড়া। এ ছড়ায় আছে কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য। অনুপ্রাসের ব্যবহারে আছে মুনশিয়ানা। আছে গতি সঞ্চারমান। উপমার উজ্জ্বল ব্যবহার। ¯্রােতের মতো গতিশীল। প্রগত প্রবহমান ছড়া। বিশেষ করে লেখকের আন্তরিক চেষ্টা পুরো ছড়াতেই দৃশ্যমান। তিনি কতো বাস্তব চিন্তা করেছেন- এ চরণগুলো পড়লেই বুঝা যাবে-
‘রাজনীতি/ ইসি নিয়ে/ রাজনীতি/ ভিসি নিয়ে/ রাজনীতি/ গুম নিয়ে/ রাজনীতি/ রুম নিয়ে।’
ইসি আর ভিসি কতো বাস্তব হয়ে ধরা দিয়েছে, আমরা বাংলাদেশের সমসাময়িক বিষয়ের দিকে একটু সচেতন দৃষ্টি রাখলেই বুঝতে পারবো। এভাবেই কবিরা ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন আর তা সব সময় বর্তমান হয়ে সমাজের বাস্তবে মিশে যায়। কবির স্বপ্ন সমাজের বাস্তবতা।
‘আমি!’- শিরোনামে ছড়াটি আরেকটি বিস্ফোরণ। আমার ভেতরে আরেক আমি বাস করে। সেই আমিকে ব্যঙ্গ রসে শব্দরূপ দিয়ে সমাজের চিহ্নিত কিছু মানুষের মুখোশ খুলে দিয়েছেন। এই মুখোশ উন্মোচনই ছড়ার আসল কাজ। মোহাম্মদ খছরুজ্জামান অত্যন্ত সচেতনভাবে আন্তরিকতায় মগ্ন হয়ে খুনি আর গুণী হাতে অস্ত্র নিয়ে দিনে দুপুরে বোনের গায়ের বস্ত্র ছিঁড়তে পারে, মানব জীবনের এমন দ্বি-চারিত চরিত্রকে সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। এটাই মুখোশ। ভালো মানুষের অভিনয় করে একটা মন্দ মানুষ সমাজে বাস করতে পারে এই ছড়া তারই উদাহরণ। লিডার এবং ক্যাডার নিয়ে ছড়াকার বলেন-
‘লিডার আমি ক্যাডার আমি/ ক্যাম্পাস আমার হাতে/ যখন তখন হামলা করি/ চামচা থাকে সাথে।’
যিনি হামলা করতে পারেন, যার আছে চামচা, সন্ত্রাসীদের দ্বারা যিনি নেতা হন, তার হাতেই থাকে ক্যাম্পাস, তার হাতেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সেই নেতা। অথচ এই নেতার কাজ হচ্ছে-
‘পাতি নেতা শীর্ষ নেতা/ সকল নেতার মন/ খোশ করেছি অস্ত্র দিয়ে/ আমি ওদের ধন।’
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের একজন নেতার বাস্তব জীবন এভাবে লেখক মোহাম্মদ খছরুজ্জামান পাঠকের সামনে তুলে এনেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে।
‘শোন মানুষ’ গ্রন্থের সাতচল্লিশটি ছড়া-কবিতা পাঠ খুব বেশি সময় পাঠকের ব্যয় হবে না। উচ্ছ্বাসমাখা মনে, বিহবল চিত্তে, ছন্দ আর টানটান উত্তেজনায় পাঠ করলে পাঠক খুব মজা পাবেন বলে আমার বিশ্বাস। তাতে শিক্ষার বহর বেড়ে যাবে। আনন্দের সাথে সাথে নতুন বিষয় সম্পর্কে জানতে পারবেন। পাঠক আনন্দিত হলে অথবা গ্রন্থটি পাঠক নন্দিত হলে লেখক সার্থক হবেন, উৎসাহিত হবেন। আরো নতুন নতুন ছড়া লেখার জন্য প্রাণবন্ত হবেন। শেষ প্রত্যাশা, লেখক লিখতে থাকুন বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধির জন্য।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT