সাহিত্য

ক্ষয়

আনোয়ার হোসেন মিছবাহ্ প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০৫-২০১৯ ইং ০০:৩৩:০৩ | সংবাদটি ১৮৫ বার পঠিত

তোমার মৃত্যু ফাঁসিতেই হবে! গলার তিলকটি ছুঁয়ে বলেছিলো দীপা। আট বছর তিন মাসের সম্পর্ক তাদের। এ রকম কথা এই প্রথম শোনা জয়ের। চমকে ওঠে জিজ্ঞেস করে সে।
-তিলক ফোঁটার জন্য ফাঁসিতে মরতে হয় না কি? কথাটি শোনামাত্রই সমান্তরাল দাঁতে ঝলক হাসিটাই চালান করতে থাকে দীপা। অবাক হয়ে জয় ঝলক হাসি পর্যবেক্ষণে নামে। তার কাছে মনে হয় এ যেন অনেক দিনের পরিচর্যার কাজ বৈ কিছু নয়। কোন একটি বেদনার কাতুকুতুর হাসি এটি। দীর্ঘদিনের সম্পর্কের মাঝেও এ হাসি দেখেনি জয়। আজ দীপার জন্যই দীপার হাসি দেখতে পারছে জয়।
অফিস থেকে জোর করে এমসি কলেজে এসেছে দীপা। এটি দীপার বিবাহউত্তর প্রথম সাক্ষাত। এই তো বছর হলো বিয়ে হয়েছে দীপার। স্বামী আমেরিকার প্রবাসী। স্বামী পারিবারিক চোখে মানানসই। স্মার্ট, কথা বলায় জুৎসই। কিন্তু ও সব পারিবারিকভাবে পছন্দনীয় লোকটিই দীপার বড়ো অসহ্য। বিয়ের পর থেকেই লোকটিকে রোবটের মতোই মনে হচ্ছে দীপার। অযাচিত কখন এবং অসামান্য চলাফেরা অস্বাভাবিক ঠেকে তার কাছে। বউয়ের সাথে স্বাভাবিক আচরণও করে না লোকটি। যতোদিন যাচ্ছে রকমটির আয়তনও বেড়ে যাচ্ছে স্বামীর। রাত গাঢ় হলেই বারান্দার টান আসে তার। এন্ড্রোয়েড ফোন নিয়ে বারান্দায় ফিস ফিসানি প্রতিদিন কানে আসলেও পাত্তা দিতো না দীপা। কিন্তু ফিসফিসানির যদি সীমার গলা শোনা যায়, তখন পাত্তা দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না তার। বিয়ের পর থেকেই সীমাকে নিয়ে বের হতেন স্বামী প্রবর। হোটেল হিলটাউনের গেইটের আলো নিভলেই ফিরে আসতেন দু’জন।
বিয়ের আগে কথাগুলো শুনলেও পরিবারকে প্রাধান্য দিতেই এই অবস্থা তার। ব্যাপারটা শোনা অবধি থাকলেই ভালো হতো, যদি না হাতে নাতে ধরা পড়তো দু’জন। বান্ধবী নাজুর বিয়ে পার্টি থেকে ফিরতে একটু রাত হয়ে যাওয়াতেই হিলটাউনের গেটেই দেখা মেলে দু’জনের। পরে জানতে পারে এ রকম ঘটনা আজকের নয় লম্বা দিনের।
আজ রাজন-দীপার বিবাহ বার্ষিকী। সেই যে সকালেই সীমাকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো, ফেরার নাম গন্ধ নেই। হয়তো গতদিনের মতো প্রেমিকার গায়ে ভর দিয়ে আজও ফেরা হবে তার। এ দৃশ্যটি বছরের মাথায় আর যেনো দেখতে না হয় সে ব্যবস্থাটি করতে হবে তার। তাই জয়কে ফোন করে সীমা।
-জয়, তুমি কোথায়? একটু সময় হবে তোমার?
-কেনো, কোন সমস্যা?
না দেখা হলেই বলবো।
-ফোনেই তো বলতে পারো।
-আমি আর পারছি না জয়। সিনিয়রটা আজও সীমাকে নিয়ে বেরিয়ে গেছে।
-কে, সীমা?
-রাজনের পুরাতন প্রেমিকা। হয়তো একটু পরেই টল টলায়মান হয়ে ফিরবে বাসায়। আমি এর মুখ দেখতে চাই না আর। আমি কী করবো জয়? তুমি একটা কিছু কর। আমাকে বাঁচাও। এমন আকুতি দীপার কন্ঠ থেকে বের হওয়া মাত্রই জয়ের মন টর্নেডোর মতো সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যেতো। কিন্তু আজ তার মন নিশুতিরাতে আলোহীন আকাশের মতোই। বেদনার রক্ত¯্রােত শরীরের শোণিতে শোণিতে নিরবে হেঁটে চলেছে। বাঁচানোর মতো শক্তি বা সামর্থ্য তার নেই। কেননা দুই ভুবনে দুই বাসিন্দা বন্ধু চিরকাল হলেও রেললাইন সমান্তরাল নয়। দীপা জয়কে পাশের বাড়ির হলেও মন থেকে বহুপথ দূরে। ০১৭১০-০০০৯৩৫ নম্বরের কোন কলটি কেটে দেয় সে। আবার কল আসে। আবার.... এবার মোবাইলের সুইচটি অফ করে দেয় জয়।
এদিকে দীপা ঢাকা গ-১৩২ নম্বরের কারটি নিজেই ড্রাইভ করে জয়ের অফিসে হানা দেয়। রোমে ঢুকেই টেবিলে রাখা মোবাইলের দিকে এক পলক চাহনি দিয়েই জয়ের দিকে মুখ ফেরার দীপা। দেখে টেবিলে মাথা রেখে জয় কেমন জানি ঢুকরে ঢুকরে উঠছে। আজকের দিনটা যদি মার্চ মাসের ৩ তারিখ হতো তাহলে জয়ের অপমানটুকু কড়ায় গন্ডায় শোধ নিতো। কিন্তু আজ ইচ্ছে থাকলেও কিসের যেনো বাঁধা থমকে দিয়েছে তাকে। অবশ করে দিয়েছে হৃদয় চেতন। এবার দীপা জয়ের মাথায় আস্তে করে হাত রাখে। মাথা তোলে জয়। দীপা শাড়ির আঁচলে মুছে দেয় ছল ছল দুচোখ। যেনো চেনা অথচ কতো অচেনা সময়ের বাসিন্দা দুজন। আর পারে না জয়- চেয়ারের পেছনে রাখা স্যুটটি হাতের তুলে বেরিয়ে আসে। অন্যদিন হলে বলতো; চলো চাং মাই চাইনিজে। দুপুরের লাঞ্চ সেরে ফিরবো বাসায়। কিন্তু আজ দীপার সিদ্ধান্তটিকেই ভরসা করে বললো;
-কোথায় যাবে সীমা?
কোন উত্তর নেই তার। নিজে গাড়িটি ড্রাইভ করে ব্যস্ততম রাস্তায়ও ৮০ কিলোমিটার বেগে গাড়ি চালাচ্ছে সে। একটি নোহা গাড়িকে প্রায় ধাক্কা দিতে দিতে এমসি কলেজে এসে ঢুকলো দুজন।
গেইটের ভেতরে গাড়ি পার্ক করে বিবাহউত্তর স্থানটিকেই বেছে নেয় তারা। বসে বসেই পুরাতন কত কথায় মিহিয়ে যায় তাদের পিছু সময়ের কথা। কিন্তু আজকের মিছি কথা জয়ের কাছে বোধহীন কঠিন বলেই মনে হয়। এ রকম বোধহীন রসিকথায় তো পটু ছিলো না দীপা- তবু আজকে এমন করছে কেনো। কথার সাথে হাসির ছলক কেনো জানি আলগা পাগলামোই মনে হচ্ছে জয়ের। এর মধ্যে তিলক দেখে তোমার ফাঁসিতে মৃত্যু হবে- বলারই বা কী কারণ?
এবার হাসি থামিয়ে হঠাৎ করে জয়কে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে দীপা।
-আমি আর বাঁচবো না জয়। তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারি না আমি। আমাকে তুমি গ্রহণ করো, নতুবা নিজ হাতে গলা টিপে মেরে ফেলো। আমি তোমাকে চাই। জীবনভর তোমাকে চাইবো। তোমাকে চাই। জীবনভর তোমাকে চাইবো। তোমাকে চাই জয়। তোমাকে চাই।
আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও। বলো: ক্ষমা করেছো কি না? বলে টাই ধরে টানতে থাকে। জয়েরও মন চায় মরে যাই। দীপা ছাড়া কেনোইবা জীবন তার। মন ভারি হয়ে ওঠে জয়ের। কী দিয়ে শান্ত¦না দেবে তার অন্তরতম প্রেয়সিকে? শান্ত¦নার ভাষাটিও উবে গেছে। বুক থেকে দীপাকে ছাড়িয়ে দিয়ে বলে;
-চলো, তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিই।
রাজি- হয় না দীপা।
-না, আজ আর বাসায় ফিরবো না। এখানেই থাকবো বলে অভিমান করে বসে থাকে বাঁকহীন অপলক।
ঘড়ির কাঁটা যখন রাত এগারোটার ঘরে। হঠাৎ করে একটি চার্জার টর্চের আলো দুজনের সমান্তরাল চোখে পড়ে। জয়ের বুকের ওপর মুখ দেখে অপ্রস্তুত শাসনি সুর হাঁকায় দীপার স্বামী রাজন। একটু জোর। একটু শাসন করে দীপাকে বাসায় নিয়ে যায়।
রাতের ঘটনায় ফজর অবধি ঘুম হয়নি জয়ের। মনের দরোজায় বারবার কড়া নাড়ছে দীপার আঁকুতি ভরা মুখ। মোয়াজ্জিনের আজান শুনতে শুনতে হয়তো এক সময় হয়তো ঘুমিয়ে পড়ে জয়। হঠাৎ ও বাড়ির উঠোনে সুরগুল শুনে ঘুম ভাঙ্গে তার। কেউ বলছে- হায়রে প্রেম! এই প্রেমের জন্যই জীবন দিলো এলাকার সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটি। মৃত্যুর জন্য একমাত্র দায়ী অপাত্রে কন্যা দান শুধু নয় আমেরিকা, লন্ডনমুখিতা।
কথাগুলো শুনতে শুনতে ছ্যাৎ করে উঠছে জয়ের বুক। ধড়মড় করে বিছানা ছেড়ে বাইরে আসে জয়। দেখে রাজনের বাসায় এক পাল পুলিশি পোশাক। এর মধ্যে সুরত হাল রিপোর্ট তৈরিতে ব্যস্ত ইন্সপেক্টর জয়িতা। পাশে প্রিন্টের চাদরে মোড়া একটি পরিচিত লাশ।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT