সাহিত্য গ্রন্থ আলোচনা

‘লাল সবুজের হাসি, দেশকে ভালোবাসি’

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০৫-২০১৯ ইং ০০:৩৩:৩১ | সংবাদটি ৪২ বার পঠিত

সত্তরের দশকে সিলেটের প্রগতিশীল সাহিত্যে আন্দোলনের যে ধারা প্রবাহিত হয়েছিল, সেদিনের তরুণ তুর্কি লেখকদের মাঝে, তাদেরই অন্যতম হলেন ছড়াকার মিলু কাশেম।
১৯৭৩ সালে সৈয়দ আবুল কাশেম মিলু নামে সাহিত্যের ভুবনে যাত্রা। গত শতকের সাতের দশকের ব্যস্ত এই লেখকের প্রচুর ছড়া, কিশোর কবিতা ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও সংকলনে। ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক বাংলা পত্রিকার জনপ্রিয় ছোটদের পাতা ‘সাত ভাই চম্পা’র মাধ্যমে মিলু কাশেম নামে পরিচিতি লাভ করেন।
আটের দশকের শুরুতে পাড়ি জমান বিদেশে। প্রায় এক যুগ কাটিয়েছেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। বিদেশে চলে যাওয়ায় ছেদ পড়ে তার লেখালেখিতে। হারিয়ে যায় তার প্রকাশিত অপ্রকাশিত লেখার পান্ডুলিপি। দীর্ঘদিন পর ফেস বুকের মাধ্যমে আবারও লেখালেখিতে সরব হোন মিলু কাশেম।
ভ্রমণ লেখক হিসেবে তার রয়েছে পরিচিতি। ভ্রামণিক চিত্ততার এই লেখক ভ্রমণ করেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও নগর। এসব নগর নিয়ে লিখেছেন কবিতা ও ছড়া। সিলেটের দর্শনীয় স্থান ও পাহাড়ী নদী নিয়েও আছে তার সুন্দর সুন্দর লেখা। সাংবাদিক হিসেবেও তার রয়েছে আলাদা পরিচিত। কাজ করেছেন বিভিন্ন জাতীয়, স্থানীয় পত্র-পত্রিকা ও আন্তর্জাতিক সংবাদ এবং বিনোদন মাধ্যমে। বাংলাদেশের ছড়াকারদের পরিচিতিমূলক প্রথম গ্রন্থ বাংলাদেশের ছড়া ও ছড়াকার ও ছড়া বিষয়ক প্রথম সংবাদপত্র ছড়া ‘সন্দেশ’ এর অন্যতম সম্পাদক এবং সিলেট থেকে প্রকাশিত প্রথম ছোটদের রঙিন কাগজ ‘ঝিঙে ফুলের’ সম্পাদক ছিলেন তিনি। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত শিশু-কিশোর উপযোগী ছড়া-কবিতা নিয়ে তার এই গ্রন্থ ‘লাল সবুজের হাসি দেশকে ভালোবাসি এবারের একুশে বই মেলা ২০১৯ এ প্রকাশিত হয়। মোট ৯৬টি ছড়া ও কবিতা দিয়ে সাজানো হয়েছে গ্রন্থটি। এই বই ছাড়াও মিলু কাশেম এর আরও পাঁচটি বই প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলি হলো দূরের দেশ কাছের দেশ (ভ্রমণ কাহিনী ২০১০), সংগোপনে স্বপ্নে (কবিতা-২০১৪), পদ্ম পাতায় প্রীতির নাম (শিশুতোষ ছড়া-কবিতা (০১৬), চলো যাই গ্রামে ফিরে (কাব্য-২০১৭) এবং ইউরোপ থেকে বাংলাদেশ (ভ্রমণ কাহিনী ২০১৮)
‘লাল সবুজের হাসি দেশকে ভালোবাসি’ গ্রন্থটির নামকরণের মাঝেই ফুটে ওঠে লেখকের স্বদেশ প্রেমের প্রতি হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা। এই গ্রন্থের প্রতিটি ছড়া- কবিতায় খুঁজে পাওয়া যায় এই দেশের সবুজ শ্যামল প্রকৃতি, মহান মুক্তিযুদ্ধের চিত্র এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার শ্রদ্ধা-অনুরাগ যা তিনি কলমের কালির অক্ষরে মনের সমস্ত অনুভূতি দিয়ে প্রকাশ করেছেন এই গ্রন্থের প্রতিটি ছড়া-কবিতায়। এই গ্রন্থের লেখাগুলি পড়লেই পাঠক খুঁজে পাবেন একজন সৃজনশীল ও শক্তিশালী লেখক মিলু কাশেমের পরিচয়। তার প্রতিটি ছড়া-কবিতা সহজ সরল সাবলীল ভাষায় ছন্দের গাঁথুনিতে লিখেছেন যা পড়লে পাঠকের মন আনন্দে দোলে উঠবে।
আমি ‘লাল সবুজের হাসি, দেশকে ভালোবাসি’ গ্রন্থ থেকে কিছু লেখা পাঠকের সামনে তুলে ধরছি। দেশের প্রতি লেখকের গভীর ভালোবাসার কথা ফুটে উঠেছে গ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘প্রিয় বাংলাদেশটা’ কবিতায় কবি এখানে বলছেন- ‘সুখে-দুখে তাই ভালোবেসে যাই/ দেখে যেতে চাই শেষটা-/ ঘুরে ফিরে তাই বারবার দেখি/ প্রিয় বাংলাদেশটা।’ কবি যেখানেই যান, যতই দূরে থাকেন না কেন? তাতে কি? কবির হৃদয়- মন যে পড়ে আছে প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশটায়। দেশের প্রতি ভালোবাসার কথা সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে এই কবিতায়। দেশ ও মানুষ ভালো থাকুক। দূর হোক সব অন্ধকার-কবির এই প্রত্যাশা ফুটে উঠেছে ‘লাল সবুজের হাসি’ কবিতায়, কবি বলছেন- দেশটা থাকুক ভালো/ ছড়িয়ে নতুন আলো/ মানুষ থাকুক ভালো/ দূর করে সব আলো/ লাল সবুজের হাসি/ দেশকে ভালোবাসি। চমৎকার ছন্দের এই লেখাটি বাংলাদেশকে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন কবি এই কবিতায়।
বাঙালি জাতি স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে, মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে একাত্তরে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। ‘লাল সবুজের ঝান্ডা’ কবিতায় কবি তাই বলছেন- মুক্তির জন্য মিছিল করেছি/ লড়াই করেছি মাঠে/ গেরিলার সাজে ঘুরে বেরিয়েছি/ গ্রাম-গঞ্জের হাটে।
বাংলাদেশ ও স্বাধীনতা এ দুটি নাম এলেই মানুষের চোখে ভেসে উঠে একটি ছবি, একটি নাম, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নাম। কবি ‘শেখ মুজিবের নাম’ কবিতায়, বঙ্গবন্ধুকে তুলে ধরেছেন কবিতার ছন্দে যেমন- বাংলার শহর, নদী, সাগর, সবুজ শ্যামল গ্রাম/ মাঠ বনানী আলো বাতাসে শেখ মুজিবের নাম/ সোনালী ফসল মাঠে মাঠে কৃষকের মুখে হাসি/সুখে দুখে মুজিব তোমায় ভালোবাসি। অপূর্ব সুন্দর এই কবিতা।
বাংলার রূপ বৈচিত্র্যে বারোটি মাসের ছয়টি ঋতু নিয়ে আমাদের এই সোনার বাংলাদেশ। বিধাতা আমাদের দেশকে আমাদের প্রকৃতিকে ঢেলে সাজিয়েছেন। নদী, খাল, বিল, হাওর, পাহাড়, সাগর, সবুজ বন বনানী, সবুজে টিলা ঘেরা চায়ের বাগান, নানা জাতের নানা বর্ণের পাখ-পাখালি ফল-ফুলে ভরা আমাদের এই দেশ। কবি জীবনানন্দের ভাষায় ‘রূপসী বাংলা’। ‘হেমন্ত’ বাংলার প্রকৃতিতে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। কবি হেমন্তকে তুলে ধরেছেন, ‘আহা কি রঙিন’ কবিতায় এইভাবে- হেমন্তের ভোর খুলে দেখি দোর/ অপরূপ শোভা কি যে মনোলোভা/ দূরে চেয়ে থাকি কত ছবি আঁকি/ কুয়াশার আলো দেখে লাগে ভালো। হেমন্তের এই রূপ কবিকে মুগ্ধ করেছে। এই কবিতা পাঠককেও মুগ্ধ করবে। দুটি পাতা এটি কুঁড়ির দেশ রূপসী কন্যা আমাদের এই সিলেট। প্রকৃতি কন্যা জাফলং স্বচ্ছ পানিতে পাথুরে পিয়াইন নদী, দূরে মেঘালয় পাহাড়, দূর পাহাড়ে ঝরণার ছুটে চলা, ছোট বড় নানা আকৃতির নানা বর্ণের পাথর, পানের বরজ, খাসিয়াদের বসবাস, কমলালেবু সব মিলিয়ে অপরূপা জাফলং। কবি তাই ‘জাফলং’ কবিতায় বলছেন- জাফলং আমার নয়ন জুড়ায়/ দূরের পাহাড় ডাকে/ ভ্রমণ প্রিয় মনটা হারায়/ পিয়াইন নদীর বাঁকে/ জাফলং তাই ভালোবাসি/ বারেবারে তাই আসি। সত্যিই যে একবার জাফলং দেখেছে সে বারবার জাফলং দেখতে চাইবে। কবি সুন্দরভাবে জাফলংয়ের রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন ‘জাফলং’ কবিতায়।
কবি তার জন্মস্থান সিলেট নিয়েও লিখেছেন সুন্দর কবিতা। যেমন- ‘সিলেট আমার মন কেড়ে নেয়’ কবিতায় কবি লিখেছেন- সিলেট আমার মন কেড়ে নেয় পাহাড় টিলা ডাকে/ ভ্রমণ প্রিয় মন ছুটে যায় চা বাগানের বাঁকে/ সিলেট আমায় হাতছানি দেয় পীর আউলিয়ার মাজার/ শাহজালাল-শাহপরান ভক্ত হাজার হাজার। কবির ভ্রমণ প্রিয় মন ছুটে যায় সিলেটের দর্শনীয় স্থান দেখার জন্য। তার এই আকুলতা ফুটে উঠেছে এই কবিতায়।
‘লাল সবুজের হাসি দেশকে ভালোবাসি’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে পাঠকের কাছে সমাদৃত হয়েছে। আমি গ্রন্থটির বহুল পাঠকের কাছে সমাদৃত হোক এই প্রত্যাশা করি। গ্রন্থটির প্রকাশক- দিয়া প্রকাশ, রাজা ম্যানশন, জিন্দাবাজার সিলেট। গ্রন্থস্বত্ব- সৈয়দা নাজমিন আক্তার রোজী। মুদ্রণে প্যারাডাইস অফসেট প্রেস, সিলেট। দৃষ্টি নন্দন প্রচ্ছদ এঁকেছেন তৌহিন হাসান, বইটি পাওয়া যাচ্ছে অভিজাত লাইব্রেরী বইপত্র এবং রকমারীতে। গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন ‘ছড়ার রাজা’ লুৎফর রহমান রিটনকে। কবির জন্ম ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৫৮, সুনামগঞ্জ- বাবার নাম- সৈয়দ রাজ উদ্দিন আহমদ, মা- সৈয়দা দয়া বেগম, পৈতৃক নিবাস সৈয়দপুর, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ। ব্যক্তিগত জীবনে মিলু কাশেম একজন সুন্দর মনের মানুষ। আমি তার সুস্থ সুন্দর দীর্ঘ জীবন কামনা করি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT