মহিলা সমাজ

মাতৃত্বের মহিমায়

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৫-২০১৯ ইং ০২:৪৩:১৮ | সংবাদটি ৩১ বার পঠিত

মা, মাটি, দেশ-এই তিন বিষয়ের মূল্য অথবা গুরুত্ব আমাদের জীবনে খুবই অপরিহার্য। ‘মা’ শব্দটিই যেন এক শ্রদ্ধার বুনন, কারুকার্য। মায়ের কোনো বিকল্প নেই, মায়ের কোনো তুলনা নেই। ‘মা’-খুব ছোট্ট একটি শব্দ, কিন্তু এর ব্যাপ্তি বিশাল। এই শব্দটির মধ্যে যেন লুকিয়ে আছে এক আজব মধুময়তার ব্যাপার! মনে-প্রাণে ‘মা’ শব্দটি এক ধরনের প্রেরণা জাগায়, শক্তি জোগায়। খেয়াল করে দেখবেন, যে কোনো শিশুর দু’চোখ বেশিরভাগ সময় তাঁর মাকে অনুসরণ করে থাকে। তাই প্রায় প্রতিটা মানসিকভাবে সুস্থ্য মায়ের কাছে সন্তান যেন তাঁর সম্পূর্ণ আলাদা এক পৃথিবীর। মায়ের সে-ই এক পৃথিবী ভালোবাসা নিয়ে সন্তান একদিন শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে বড় হয়। কেউ বা শারীরিক দিক থেকে বড় হলেও মানসিক দিকটায় শিশুই রয়ে যায়। যাঁরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ফিট বড় হওয়ার পর তাঁদের বিয়ে হয়। তবে দুঃখের বিষয় অনেক মায়ের পুত্র সন্তান বিয়ের পর আর মাকে তেমন একটা দেখভাল করেন না। বউয়ের কথা মতো চলেন। মায়ের বিরুদ্ধে বউয়ের কথায় ক্ষেপে যান, মাকে অনেকে শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে আঘাত করেন। তেমনি এক মায়ের কিছু কথা বলে মা দিবসের লেখাটি টেনে নিয়ে যাচ্ছি সমাপ্তির কিছু পূর্বে। মাঝখান হয়তো অন্য কিছু বলবো। তাহলে বলছি সে দুঃখবিলাসী মায়ের কথা-
গত ১৬ মার্চ শনিবার, সন্ধ্যার পর মাগরিবের নামাজ শেষে আমি মাথার চুলগুলো ছেড়ে আমাদের রুমে খাঁটের (পালংকের) উপর একটু রিলাক্স মুডে বসেছিলাম। হঠাৎ আমার মোবাইল ফোনে একটি অচেনা নাম্বারে কল এলো। কলটি আমি রিসিভ করলাম। হ্যালো! বলতেই ওপাশ থেকে একজন ভদ্র মহিলা বললেন, আপনি লেখক ঝরনা! আমি বললাম, হ্যাঁ, কিন্তু কেন? তিনি বললেন, আমি আপনার সাথে কিছু কথা বলতে চাই, আপনি শুনবেন তো? আমি বললাম অবশ্যই শুনবো আপনি বলেন। তিনি বললেন, অনেক কষ্টে আমি আপনার নাম্বার সংগ্রহ করেছি এক আইনজীবী মহিলার কাছ থেকে। আমি ‘সিলেটের ডাক’ পত্রিকা নিয়মিত পড়ি এবং আপনার কলাম পড়তে আমার ভালো লাগে। আপনি খুব শান্ত মেয়ে। ঠিক এ রকম একটা মেয়ে আমার ছেলেকে বিয়ে করাতে চেয়েছিলাম। সে শুনলো না, তাঁর পছন্দের মেয়েকেই সে বিয়ে করলো। আমার দুই ছেলে, এক মেয়ে। বড় ছেলে দেশের বাইরে থাকে। সে সব সময় আমার খোঁজ খবর নেয়। টাকা-পয়সা পাঠায়। কিন্তু ছোট ছেলে বউয়ের কথায় চলে। আমার কথা-বার্তা তেমন একটা শুনেনা। আমাকে খুব আঘাত দেয়। আমি বললাম, আপনার ছেলের নাম কী, সে কি করে? তখন তিনি তার ছেলের নাম ও পদবী বললেন। আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম, আরে আমি তো আপনার ছেলেকে চিনি, সে তো আমাদের সোসাইটির লোক! তিনি বললেন, কোট-টাই পরলে কি হবে, ও খুব দুষ্ট ছেলে। মাকে সে শ্রদ্ধা করেনা। বউয়ের পক্ষ নিয়ে অনেক সময় আঘাত করে-বলে তাঁর গলাটা ভারি হয়ে আসলো। তিনি আর কথা না বাড়িয়ে বিদায়ের আগে বললেন, তোমার কাছে মনের কষ্টগুলো বলে খুব হালকা লাগলো। আমার খুব ভালো লাগলো তোমার সাথে কথা বলে। আমার এসব কথা কারো কাছে বলার সময় দয়া করে আমার ছেলের নামটা বলবেন না। ভালো থাকবেন-বলে লাইনটা কেটে দিলেন। তারপর সারাটা রাত আমার মুড় অফ ছিল। ভোরের দিকে আমি সেই মায়ের ‘আঘাত করে’-কথাটি মনে করে খুব কাঁদলাম। নীরবে চোখের জল ফেললাম। এজন্য কাঁদলাম যে, এই মায়ের কোনো কিছুর অভাব নেই। তবু তাঁর মনে শান্তি মেলে না। অফ মুডে থাকেন তিনি অনেক সময়। কিন্তু কেন? গর্ভে ধারণ করা ছেলে যে তাঁকে বিষন্ন রাখে। অথচ এই সন্তানকে বুকে আগলে রেখে তিনি বড় করেছেন।
মা চিরন্তন একটি আশ্রয়ের নাম। ‘মা’ শব্দটি মনে করিয়ে দেয় নিঃস্বার্থ গভীর মমতার কথা। পৃথিবীর কোনো প্রান্তে মায়ের কোলের নিবিড় প্রশান্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাইতো বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘মা’ কবিতায় মায়ের চিরায়ত রূপ তুলে ধরেছেন এভাবে-যেখানেতে দেখি যাহা/মায়ের মতন আহা/একটি কথায় এত সুধা মেশা নাই/মায়ের মতন এত/আদর সোহাগ সে তো/আর কোনখানে কেহ পাইবে ভাই ....।
আপনি যেখানে যে অবস্থাতেই, যে পদবীতেই থাকেন না কেন। বিবাহিত পুুরুষদের মধ্যে যারা বউকে শ্রেষ্ঠ ধন মনে করে মাকে অবহেলা করেন, কেবল তাদের উদ্দেশ্যেই বলছি-আপনার মা মেন্টালি আনফিট হতে পারেন, আনস্মার্ট হতে পারেন, আপনার বউয়ের সাথে সুন্দর ব্যবহার নাও করতে পারেন, আপনার কী উচিত মায়ের সাথে রাগ করে কথা বলা? আপনার কী উচিত মাকে ফিজিক্যালি ও মেন্টাল আঘাত করা? এই মা-ই তো দীর্ঘ সময় অনেক কষ্ট সহ্য করে আপনাকে পেটে রেখেছে। একবার ভাবুন তা একদম শিশু অবস্থায় যখন পৃথিবীর কোনো কিছু আপনার খেতে ভালো লাগতো না, তখন এই মা তাঁর বুকের দুধ খাওয়াতো। এই দুধটুকু খেয়ে আপনি নিশ্চিন্তে মায়ের কোলে ঘুমোতেন। একটু যখন বড় হলেন, কথা বলা সামান্য শিখলেন, তখন মল ত্যাগের সময় অনেক দিন স্বাস্থ্যবান একটা কৃমি আপনার মলদ্বার দিয়ে বেরোতো, আর কাউকে না ডেকে তখন আপনি ও আম্মা! ও আম্মা! বলে মাকে ডাকতেন। শত কাজ ফেলে এসে মা নিজ হাতে কৃমিটা বের করে আনতেন। আপনি আরাম পেতেন। তাহলে আজ কেন সে-ই মাকে অবহেলা করেন? মা কেন মুড় অফ করে থাকেন? কেন? বউ-ই কী সব? গর্ভধারিণী মা কিছু না? আর কাউকে দুঃখ দেন আর নাই দেন, অন্তত মাকে দুঃখ দিবেন না। মাকে কাঁদাবেন না। মা আপনার বিপক্ষে চলে গেলেও নীরবে তা সহ্য করবেন, মাকে কিছু বলবেন না।
মা মারা গিয়ে থাকলে কাজের ব্যস্ততা শেষে যখনই রিলাক্স মুড়ে বসবেন তখন মায়ের মুখটা মনে করে নীরবে চোখের জল ফেলবেন। আর যদি মা বেঁচে থাকে, তাহলে অবশ্যই মায়ের দেখাশোনা করবেন। আপনার উপার্জন করা টাকা থেকে কিছু টাকা প্রতি সপ্তাহে মায়ের হাতে দিবেন। মাকে কষ্ট দিবেন না। আঘাত করবেন না। আমার মা সহ, বিশ্বের সকল মায়ের প্রতি বিন¤্র শ্রদ্ধা এবং প্রাণঢালা ভালোবাসা জানিয়ে বিদায় নিচ্ছি। মনে থাকবে তো মায়ের কথা? জন্ম-জন্মান্তরে ‘মা’! তাহলে চিৎকার করে বলুন-মধুর আমার মায়ের হাসি/চাঁদের মতো ঝরে/মাকে মনে পড়ে/আমার মাকে মনে পড়ে ....
লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT