মহিলা সমাজ

শ্বশুর বাড়ির ইফতারকে না বলুন

জুঁই ইসলাম প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৫-২০১৯ ইং ০২:৪৫:৫২ | সংবাদটি ৬৭ বার পঠিত

চলছে পবিত্র রমজান মাস। চলুন সকল মুসলিম এক হয়ে এ মাসের পবিত্রতা রক্ষা করি এবং আল্লাহর সান্নিধ্য কামনা করি। মাসটা হলো পুণ্য অর্জনের এক মহান মাস। রমজানের সাথে ইফতার আয়োজনটা আমাদের সংস্কৃতিতে বেশ জমকালো ব্যপার। সারাদিনের রোজা ভঙ্গ করা হয় ইফতারের মাধ্যমে যার যার সামর্থ অনুযায়ী। কেউ বিশাল আকার টেবিল সাজিয়ে রাখেন ইফতারের আগ মুহূর্তে আবার কেউবা সামান্য একটা খেজুর ও পানি দিয়েই ইফতার সারেন। যার যার সামর্থ অনুযায়ী রোজাদারদের ইফতার করা ধর্মীয় দৃষ্টিতে অবশ্যই কর্তব্য ও সওয়াবের কাজ।
রোজার সাথে ইফতারের সম্পর্ক অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। এ মাসের একটি এবাদতের মূল্য অন্য মাসের সত্তরটি এবাদতের মূল্যের সমান। অর্থাৎ এ মাসে একটি এবাদত করলে এর সওয়াব সত্তরটি মাসের সওয়াবের সমান। এছাড়া পবিত্র কুরআন শরীফ এ মাসেই অবতীর্ণ হয়েছে। আর পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, রোজা হলো আল্লাহর পরম সান্নিধ্য লাভের প্রধান উপায়। মুসলমানদের আচার ব্যবহার, সংযত কথাবার্তা, দান খয়রাত ইত্যাদি রমজান মাসে একটা আলাদা শান্তিময় পরিবেশের সৃষ্টি করে। এত কথা বলার কারণ হলোÑ বর্তমানের ইফতার প্রথা। ইফতার রোজার একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। রোজাদারকে ইফতার করানো সুন্নত ও অনেক পুণ্যের কাজ। রমজানে মুসলমান আত্মীয়স্বজনরা তথা গরিবদের ইফতার প্রধান করেন। এতে একদিকে যেমন সুসম্পর্ক বজায় থাকে, অন্যদিকে একটা শান্তিপূর্ণ সৌহার্দ্যময় পরিবেশেরও সৃষ্টি হয়। সামর্থ অনুযায়ী প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজ খুশি মতে ইফতার করাতে পারেন। এর কোনও ধরা বাঁধা নিয়ম নেই।
কিন্তু বর্তমানে মেয়ের শ্বশুর বাড়ি ইফতার দেওয়াটা গ্যাসট্রিক আলসারের মত একধরনের ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। আর তা বিশেষ করে সিলেটে প্রচলন খুব বেশি। যা হয়তো অন্য জেলাগুলোতে কম। বিশেষ করে মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে ইফতার পাঠানো যেন একটা প্রতিযোগিতার বহর দেখা যায় রমজান মাস এলে। প্রয়োজনের চেয়ে অধিক খাদ্যসামগ্রী পাঠানো যেন একটা গর্বের বা সম্মানের ব্যাপার। এমনটাই মনে করেন অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তিরা আর নতুন বিয়ে হলে তো কথাই নেই, দু’তিনবার ইফতার সামগ্রী পাঠানো যেন একটা রেওয়াজে পরিণত হয়ে গেছে। যে বাবার অনেক আছে তিনি মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে ২/৩ বার ইফতার পাঠিয়ে যেমন বেয়াইর বাড়িতে তার মুখ উজ্জ্বল করেন। ঠিক তেমনি মেয়ের জামাইও মহাখুশীতে থাকেন তার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনকে আপ্যায়ন করিয়ে। সামাজিক স্ট্যাটাস বাড়ান বন্ধু বা আত্মীয় মহলে। কিন্তু যে বাবা গরিব, অসহায়, কিংবা মধ্যবিত্ত তার জন্য রমজান মাসটি বেশ কষ্টের, হতাশার মাস, আফসোসের মাস, নিরবে চোখের পানি ফেলার মাস। কিন্তু কেন?
আমরা তো জানি এ মাস রহমতের মাস, শান্তিপূর্ণ মাস। তবে কেন আমাদের সমাজে এই পবিত্র মাসে মুসলমানে মুসলমানে বৈষম্যমূলক ব্যবহার? কিছু সমাজপতি, শিল্পপতি, ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গের গড়ে তোলা সামাজিক নিয়ম কানুনে অসহায় গরিব পিতারা আজ বলি হচ্ছেন এই কুসংস্কারের নিয়ম কানুনে। কতো অসহায় পিতা ঋণ করে কিংবা বড়লোক আত্মীয়ের কাছে হাত পেতে টাকা জোগাড় করে মেয়ের বাড়িতে ইফতার পাঠান। একবার এই বাবা-মায়ের কথা বিবেক দিয়ে ভাবুন তো, এটা তাদের উপর কী জুলুম নয়?
শুধু কি ইফতার? ইফতারের সাথে থাকতে হয় নতুন কাপড়ও যদি মেয়েটার নতুন বিয়ে হয়ে থাকে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গরিব কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা-মাতারা। এমনিতেই বাজারে দ্রব্যমূল্যের চড়া দাম। ফলে হয়তো কোনও গরিব পিতা-মাতাকে মেয়ের বাড়িতে অনেক কষ্টে টাকা সংগ্রহ করে ইফতার পাঠাতে হয়। ভালোভাবে ইফতার পাঠাতে না পারলে যদি মেয়েকে শ্বশুর বাড়ির লোকের লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সইতে হয়, এই ভয়ে বাধ্য হয়েই ইফতার পাঠাতে হয় পিতাকে। ভালোভাবে ইফতার সামগ্রী পাঠাতে না পারলে যদি সমাজের কাছে নববধূকে বা তার পরিবারের লোকদের হেয়প্রতিপন্ন হতে হয়। যা এতদঞ্চলে অহরহ ঘটছে।
এদিকে ইফতার পাঠাতে গিয়ে হয়তো সেই পরিবারের সদস্যদের বা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ঈদের জামা-কাপড় বা খাদ্য সামগ্রী জোটানোও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে অনেক ক্ষেত্রে। ফলে ঈদের আনন্দ ম্লান হচ্ছে সেসব পরিবারের। আর অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, এর ফলে সত্যিকার অর্থে আমরা ইফতারের প্রকৃত তাৎপর্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছি দিন দিন।
আমার প্রশ্ন হলোÑ কে এই নিয়মগুলো বের করেছে? কেউ কি জানেন? হয়তো বা বলবেন ইতিহাস। কিন্তু বর্তমানে যারা খুব নিয়ম করে মেয়ের বাড়ি থেকে এসব ইফতার সামগ্রী আদায় করেন, এগুলোর পক্ষ নিয়ে কথা বলেন, তাদের কাছে আমার খুব জানতে ইচ্ছা করেÑ আপনারা তো বলেন এগুলো সমাজের সৌন্দর্য, সমাজে সুন্দরভাবে বসবাস করতে হলে সামাজিক নিয়ম কানুন মেনে চলতে হয়। ভালো কথা, খুবই ভালো কথা। কিন্তু সমাজের সৌন্দর্য রক্ষার জন্য শুধু মেয়ের বাবা-মাকে কেন ভোগান্তির কিংবা কষ্টের স্বীকার হতে হবে? ছেলের বাড়ি থেকে কেন আদান-প্রদান হয় না? মেয়ের বাড়ির বাবা-মা যদি ছেলের বাড়ির গুষ্ঠিকে ইফতার খাওয়াতে পারেন তবে ছেলের বাড়িরও উচিত মেয়ের বাড়ির গুষ্ঠিকেও ইফতার খাওয়ানো। এক পক্ষ শুধু গাড়ি বোঝাই করে ইফতার পাঠাবেন আর অন্য পক্ষ আরামে আরামে খাবেন তা কি করে হয়? দু’পক্ষ সমানভাবে ইফতার আদান-প্রদান করেন তবেই না সমানে সমান হবে, সমাজ সুন্দর হবে।
হযরত মোহাম্মদ (সা.) আরফার ময়দানে বিদায়ী হজের শেষ বক্তব্যে তাঁর উম্মতদের উদ্দেশে বলেছেন, সেটা হলো কোনও মুসলমানের কাছেই কোনও মুসলমানের দেওয়া জিনিষ ততোসময় পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য হবে না, যতসময় পর্যন্ত সে নিজ ইচ্ছায়, স্ব-ইচ্ছায় বা মুক্তমনে তা দিচ্ছে। জোর করে কেউ কারও উপর কোনও কিছু চাপিয়ে দিতে বা আদায় করতে পারবে না। ইসলামে জোরাজুরি, জবরদস্তির কোনও বিধান নেই। তাই ইফতার নিয়েও আমাদের এরূপ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। এ বিষয়ে প্রত্যেক শুভবুদ্ধিসম্পন্ন, সচেতন নাগরিক তথা এতদঞ্চলের এগিয়ে আসতে হবে। ইফতার প্রথাটা যাতে বাধ্যতামূলক না হয়, সে-বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। সুখের কথা হলো, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয় বিভিন্ন সংগঠন তথা শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন সচেতন নাগরিকেরা এ প্রথা রোধ করতে অনেকটাই সমর্থ হয়েছেন। আর জনসাধারণেরও এতে মেলে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন। বলতে দ্বিধা নেই, একমাত্র বাঙালি মুসলিম সমাজেই ইফতারি প্রথাটা বাধ্যতামূলক বা নিয়মে পর্যবসিত হয়েছে।
তাই ইফতারি প্রথা রোধ করাটা অবিলম্বে প্রয়োজন। আমার কথায় হয়তো কেউ কষ্ট পেতেও পারেন, কিন্তু আমার কথাগুলো একবার বিবেক জাগ্রত করে ভাবুন। আমি চাই আমাদের সামাজিক বন্ধনটা সু-সম্পর্কে বজায় থাকুক প্রতিটি ক্ষেত্রে। আমরা কেউ কাউকে ছোট করে না ভাবি, কেউ যেন কাউকে মনোকষ্ট দিয়ে কিছু স্বার্থ আদায় না করি। ধনীরা এই ইফতার প্রথা মেনে চলেন বলেই গরিবদের ভোগান্তি হয়। যারা সামর্থবান তারা যদি পদক্ষেপ নেন, এই অনিয়মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান, তাহলে অবশ্যই সম্ভব এই ইফতার প্রথাকে না বলা। বিবেককে জাগিয়ে তুলুন। অসহায়, দরিদ্র্য পরিবারের কথা একটিবার ভাবুন। শ্বশুর বাড়ির ইফতারকে না বলুন।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT