উপ সম্পাদকীয়

তাকওয়া অর্জনের মাস রমজান

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৫-২০১৯ ইং ০০:৪৪:০০ | সংবাদটি ১৭০ বার পঠিত

রহমত, বরকত, আত্মশুদ্ধি ও দোযখ থেকে মুক্তিলাভের মাস মাহে রমজান। সবর, ধৈর্য্য, সাধনা ও পাপমুক্ত হয়ে পবিত্র হওয়ার মাস মোবারক মাহে রমজান। মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে মুসলিম মিল্লাতের জন্য এক অনুপম রহমত, বরকত ও মুক্তির পয়গাম নিয়ে আবির্ভূত হয় পবিত্র মাহে রমজান। সকল প্রকার অন্যায় থেকে মুক্ত হয়ে তাকওয়া অর্জন করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার মাস পবিত্র মাহে রমজান। এই মোবারক মাসে রোজা পালনের নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার’ (সূরা বাকারা ঃ আয়াত-১৮৩)। উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ পাক রোজা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন এবং রোজা পালন করলে কি উপকার হবে তা পরিষ্কার ভাষায় বলে দিয়েছেন। আল্লাহ পাক বলেছেন ‘রোজা পালন করলে তাকওয়া অর্জন হবে।’ তাকওয়া মানে আল্লাহর ভয়। যার মনে আল্লাহর ভয় আছে সে কোন পাপ কাজ করতে পারে না, অন্যের ক্ষতি করতে পারেনা।
যার মনে আল্লাহর ভয় আছে সে সন্ত্রাস করতে পারে না, চুরি-ডাকাতি করতে পারেনা, পরনিন্দা করতে পারেনা, হিংসা-বিদ্বেষও তার মধ্যে থাকতে পারেনা। আমাদের সমাজে অশান্তির মূল কারণ হচ্ছে আমাদের সমাজের অধিকাংশ লোকদের মধ্যে তাকওয়া নেই। তাকওয়া না থাকার কারণেই আমাদের সমাজে চুরি-ডাকাতি-সন্ত্রাসী, পরনিন্দা ও হিংসা-বিদ্বেষ ইত্যাদি মহামারী আকারে রূপ নিয়েছে। ফলে অশান্তির অগ্নিশিখা দাউ দাউ করে জ্বলছে। এই অশান্তি দূর করতে হলে তাকওয়ার প্রয়োজন। অন্তরে তাকওয়া সৃষ্টিতে রোজার গুরুত্ব অপরিসীম। একমাত্র আল্লাহকে ভয় করেই বান্দা দিনের বেলা রোজা রাখে, আল্লাহকে ভয় করেই বান্দা রমজান মাসে দিনের বেলা কোনকিছু আহার করেনা। এ রূপ আল্লাহ ভীতি বান্দাকে যে কোন অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখতে সাহায্য করে। যারা আল্লাহকে ভয় করে অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকে, যারা আল্লাহকে ভয় করে অন্যায় কাজ ছেড়ে দেয় তাদেরকে শুভ সংবাদ দিয়ে মহান আল্লাহপাক ইরশাদ করেন ‘যে স্বীয় প্রতিপালকের সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং প্রবৃত্তি হতে (অন্যায় কাজ থেকে) নিজকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস’ (সুরা নাযিআত আয়াত-৪০-৪১)। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে, তাঁর জন্য রয়েছে দু’টি জান্নাত (সুরা রহমান ঃ আয়াত-৪৬)। আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হয়ে একদিন অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে এই ভয়েই বান্দাগণ রোজা রাখেন। তাই রোজাদার বান্দাদের জন্যও জান্নাত অবধারিত।
পবিত্র মাহে রমজান এমন একটি মর্যাদাপূর্ণ মাস যাতে বিশ্ব মানবতার জীবন বিধান মহাগ্রন্থ আল কোরআন নাজিল হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে ‘রমজান মাস এমন একটি মাস যে, এ মাসেই নাজিল হয়েছে পবিত্র আল কোরআন।’ (সুরা বাকারা ঃ আয়াত-১৮৫)। এই পবিত্র মাসে কেবলমাত্র কোরআনই নাজিল হয়নি; বরং বহু আসমানী কিতাবও এই মাসে নাজিল হয়েছিল। করুণাময় আল্লাহপাক রমজান মাসকে অশেষ রহমত ও বরকত দ্বারা মহিমান্বিত করেছেন। এই পবিত্র মাসে বেহেশতের দরজা খোলে দেয়া হয় এবং দোযখের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। এ সম্পর্কে বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, যখন রমজান মাস উপস্থিত হয় তখন আকাশের দরজা সমূহ খোলে দেয়া হয়, অন্য বর্ণনায় আছে জান্নাতের দরজা সমূহ খোলে দেয়া হয়, দোযখের দরজা সমূহ বন্ধ করে দেয়া হয় এবং বিতাড়িত শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়। আর অন্য বর্ণনায় আছে রহমতের দরজা খোলে দেয়া হয় (বুখারী ও মুসলিম)।
অন্য একখানা হাদীসে রাসূল (সাঃ) বলেছেন বনি আদমের প্রতিটি নেক কাজের ফলাফল দশগুণ থেকে সাতশত গুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করে দেয়া হয় কিন্তু রমজানে এর ব্যতিক্রম হবে। কেননা আল্লাহপাক স্বয়ং বলেছেন-বান্দা আমার সন্তুষ্টির জন্যই রোজা রেখেছে এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব (বুখারী ও মুসলিম)। রোজাদারগণ অতি উচ্চ মর্যাদার অধিকারী যে, রোজাদারের নিদ্রা ইবাদতের মধ্যে শামিল, তাঁর নিশ্চুপ থাকা তাছবিহ পাঠের মধ্যে পরিগণিত এবং তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুরকৃত। রমজান মাস এমন এক মাস যে, এর প্রথম দশদিন রহমত ও বরকতের বারিধারায় পরিপূর্ণ। দ্বিতীয় দশদিন ক্ষমা ও মার্জনার জন্য নির্ধারিত এবং শেষ দশদিন জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের উপায় হিসেবে চিহ্নিত। মোট কথা, মাহে রমজান ও রোজাদারের গৌরব ও মর্যাদা বর্ণনা করে শেষ করা অসম্ভব।
অপরদিকে যারা মাহে রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করেনা, যারা মাহে রমজানে রোজা পালন করেনা তাদের পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ, তাদের উপর রাসূলে মকবুল (সাঃ) ও জিব্রাইলে আমিনের বদদোয়া অবধারিত। যারা রোজা পালন করেনা তাদের করুণ পরিণাম সম্পর্কে বিশিষ্ট সাহাবী হযরত কাব বিন উজরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ) একদা বললেন-তোমরা মিম্বরের নিকটবর্তী হও। তখন আমরা হাজির হলাম। রাসূলে পাক (সাঃ) যখন মিম্বরের প্রথম সিঁড়িতে কদম মোবারক রাখলেন, তখন বলে উঠলেন ‘আমিন’। অতঃপর যখন মিম্বরের দ্বিতীয় সিঁড়িতে কদম মোবারক রাখলেন, তখন আবার বললেন ‘আমিন’। অতঃপর যখন মিম্বরের তৃতীয় সিঁড়িতে আরোহন করলেন, তখন আবার বলে উঠলেন ‘আমিন’। আমরা তখন আরজ করলাম হে আল্লাহর রাসূল! আজ আমরা আপনার নিকট থেকে এমন কিছু শুনলাম যা ইতিপূর্বে কোন দিন শুনিনি। রাসূল (সাঃ) তখনই ইরশাদ করলেন, আমার নিকট হযরত জিব্রাইল (আঃ) এসেছিলেন। (আমি যখন মিম্বরের প্রথম সিঁড়িতে পা রাখলাম) তখন তিনি বললেন সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক যে ব্যক্তি রমজান মাস পাওয়ার পরও (রোজা পালন করে) তার গুনাহ সমূহ মাফ করাতে পারেনি। তখন আমি ‘আমিন’ বললাম। আমি দ্বিতীয় সিঁড়িতে থাকাবস্থায় হযরত জিব্রাইল এই দোয়া করলেন-ধ্বংস হোক সে ব্যক্তি যার সম্মুখে আপনার নাম মোবারক (আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর নাম মোবারক উচ্চারণ করা হল অথচ সে আপনার উপর দুরূদ শরীফ পাঠ করল না। তখন আমি বললাম ‘আমিন’। অতঃপর আমি যখন মিম্বরের তৃতীয় সিঁড়িতে তখন জিব্রাইল বললেন-সেই ব্যক্তির ধ্বংস হোক যে তার মাতা-পিতা উভয়কে অথবা একজনকে বৃদ্ধাবস্থায় পেলো অথচ তাদের খেদমত করে জান্নাতবাসী হতে পারল না। আমি বললাম ‘আমিন’ (হাকীম বুখারী)। উপরোক্ত হাদীস দ্বারা এ কথাই প্রমাণ হলো যে, যারা রমজান মাসে রোজা পালন করে না তাদের উপর রাসূলে মকবুল (সাঃ) ও জিব্রাইলে আমিনের বদদোয়া অবধারিত। আর যাদের উপর রাসূলে মকবুল ও জিব্রাইলে আমিনের বদদোয়া পতিত হবে দুনিয়া ও আখেরাতে ধ্বংসের জন্য এর চেয়ে ক্ষতিকর পরিণাম আর কি হতে পারে?
কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে আত্মরক্ষার প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে রোজা। রোজা পালন করলে মানুষ পরস্পর সহানুভূতিশীল হয়। ধনীরা গরিবের অর্ধাহারে অনাহারে জীবন যাপনের কষ্ট অনুধাবন করতে পারে। ফলে তারা দান খয়রাতে উৎসাহিত হয়। সর্বোপরি সমাজে শান্তি স্থাপনে, আল্লাহর নৈকট্য লাভে এবং তাকওয়া অর্জনে রোজার গুরুত্ব অপরিসীম।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • কোটি মানুষের মুখপত্র
  • ৩৬ বছরে সিলেটের ডাক
  • প্রত্যয়ে দীপ্ত ‘সিলেটের ডাক’
  • পাঠকের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি
  • এরশাদ : এক আলোচিত পুরুষের প্রস্থান
  • প্রাসঙ্গিক ভাবনায় ২০১৯-২০ অর্থ বছরের বাজেট
  • মেঘালয়ের মেঘমালা
  • পরিবেশ সংরক্ষণে সামষ্টিক উদ্যোগ
  • বর্ষা মানেই কি জলাবদ্ধতা?
  • শিষ্টাচার ও সৌজন্যবোধ
  • রেলের প্রতি জনগণের আস্থা বিনষ্ট করা যাবে না
  • প্রকৃতির দায় শোধে বৃক্ষ রোপণ
  • ঋণ দেয়া-নেয়ায় প্রাসঙ্গিক ভাবনা
  • কান্ডারী হুঁশিয়ার!
  • প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও বায়োমেট্রিক হাজিরা
  • আমরা কোন যুগে বসবাস করছি?
  • দুঃসময়েও সুদিনের স্বপ্ন দেখি
  • অসীম সম্ভাবনার আরেক নাম হাওর
  • মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন
  • পরিবেশ রক্ষা
  • Developed by: Sparkle IT