উপ সম্পাদকীয় স্মরণ

সুবীর নন্দী

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৫-২০১৯ ইং ০০:৩৩:৩৭ | সংবাদটি ১০৮ বার পঠিত

বাংলা আধুনিক গানের মুকুটহীন স¤্রাট, লক্ষ-কোটি মানুষের মনের কাছে প্রশ্ন রেখে না ফেরার দেশে চলে গেলেন কিংবদন্তী বরেণ্য সংগীত শিল্পী সুবীর নন্দী। গত ৭ই মে ভোরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, গত ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখে সিলেট থেকে ঢাকায় যাওয়ার পথে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি হন। এবং তাঁকে লাইভ সাপোর্টে রাখা হয়। অবশেষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে ভর্তি ও তার চিকিৎসা চলতে থাকে। কিন্তু সব চিকিৎসা সেবা ফাঁকি দিয়ে চলে গেলেন আকাশ গঙ্গার ধারে হংস বলাকা হয়ে খুঁজে নিতে অমৃতের স্বাদ।’
বাংলা গানের জগতে সুবীর নন্দীর আবির্ভাব হয় ধুমকেতুর মতো। দীর্ঘ চার দশক চলচ্চিত্র ও শুদ্ধ-আধুনিক বৈচিত্রময় কাব্য কথার গান গেয়ে মাতিয়ে রেখেছিলেন সারা বাংলাদেশ সহ সারাবিশ্বে বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে। তিনিই একমাত্র শিল্পী, যিনি বাংলাদেশের প্রখ্যাত ও স্বনামধন্য গীতিকার ও কবিদের লেখা গানে কণ্ঠ দান করেন। তিনি এত কাব্যময় কঠিন-কঠিন সুরের গান গেয়েছেন যা কেউ এর আগে আর গাননি। তার সব থেকে বড় গুণ ছিল গানের প্রতি তাঁর আজন্ম শ্রদ্ধা, ভক্তি আর ভালোবাসা। সুবীর নন্দীর ছিল ঈশ্বর প্রদত্ত যাদুকরী গানের গলা। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তিনি ছিলেন পারদর্শী তাই তার আধুনিক প্রতিটি গানই ছিল রাগ প্রধান কঠিন সুরের। কিন্তু সেইসব কঠিন সুরের গানই তিনি গেয়েছেন একান্ত নিজস্ব সুর ও সাবলিল কণ্ঠ মাধুর্যে।
এপার বাংলা-ওপার বাংলা দুই বাংলায় শ্রোতা ও শিল্পীদের কাছে সুবীর নন্দী ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত ও জনপ্রিয় সংগীত তারকা। তার ভরাট কণ্ঠে যে কোনো ধরনের গান গাইতে পারতেন অতি স্বাচ্ছন্দে। তিনি রোমান্টিক মেলোডি গান যেমন গেয়েছেন, আবার ফোক, প্রেম-বিরহ-দুঃখ-বেদনার গানও সমান তালে গেয়েছেন। তিনি একাধারে আধুনিক গান, রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল গীতি, কীর্তন এবং সিলেটের লোক সংগীত-আঞ্চলিক গানেও ছিলেন সমান পারদর্শী।
তিনি বাংলাদেশের শীর্ষ সংগীত তারকা-রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, আবিদা সুলতানা, শাম্মী আখতার, কনকচাঁপা, সামিনা চৌধুরী, ফাহমিদা নবী, ভারতের হৈমন্তী শুক্লা সহ বহু গুণী শিল্পীদের সাথে ‘ডুয়েট’ গান গেয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের প্রখ্যাত শীর্ষ সংগীত পরিচালকদের সুরে গান গেয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন, সুরকার সত্য সাহা, খান আতাউর রহমান, আলম খান, খন্দকার নুরুল আলম, শেখ সাদী খান, আলী হোসেন, মোঃ রফিক, সমর দাস, অনুপ ভট্টাচার্য প্রমুখ। তিনি যেসব বিশিষ্ট গীতিকার ও কবিদের লেখা গান গেয়েছেন তারা হলেন, খান আতাউর রহমান, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, মোঃ রফিকুজ্জামান, নজরুল ইসলাম বাবু, আব্দুর রাজ্জাক, কবি জাহিদ হায়দার সহ আরও অনেকে।
যে দু’টি গান সুবীর নন্দীকে সারা বাংলাদেশে পরিচিত করে তোলে, সেই গান দু’টি হলো গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবুর লেখা গান ও শেখ সাদী খানের সুরে ‘হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে’ এবং মোঃ রফিকুজ্জামানের লেখা ও সত্য সাহার সুরে-‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার’। এই দু’টি গান প্রচারিত হওয়ার সাথে সাথে লক্ষ লক্ষ সংগীতপ্রিয় শ্রোতার মন জয় করে নেন। যা মৃত্যুর দিন পর্যন্ত অটুট ছিল। এই দু’টি গান তাকে এত জনপ্রিয়তা দিয়েছিল যে তাকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। যতদিন গেছে ততই তিনি বাংলা গানের ভুবনে নিজেকে একজন অপরিহার্য শিল্পী হিসেবে তোলে ধরেন।
সুবীর নন্দী জন্মগ্রহণ করেন হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং নন্দীপাড়ার এক সম্ভ্রান্ত সংগীত পরিবারে ১৯৫৩ সালের ১৯ নভেম্বর। শিল্পীর বাবার নাম সুধাংশু নন্দী, তিনি চিকিৎসক ছিলেন। তার মায়ের নাম ছিল পুতুল রানী, তিনি ছিলেন একজন সংগীত শিল্পী। পারিবারিক উৎসাহেই গান লেখা ও চর্চা শুরু করেন। গানের হাতেখড়ি হয় মায়ের কাছে। পরবর্তীতে ওস্তাদ বাবর আলী খানের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নেন। এবং লোকগানে তালিম নেন প্রখ্যাত লোক সঙ্গীত শিল্পী বিদিত লাল দাশ (পটল বাবুর) কাছে। ১৯৬৭ সালে তিনি প্রথম গান করেন, সিলেট বেতারে। এরপর ১৯৭০ সালে ঢাকা রেডিওতে নজরুল সংগীত গেয়ে অডিশন পাশ করেন। সুবীর নন্দীর প্রথম রেকর্ড করা গানটি হলো-‘যদি কেউ ধূপ জ্বেলে দেয়’। গানটি রেকর্ড করা হয় ১৯৭২ সালে।
চলচ্চিত্রে প্রথম প্লেব্যাক করেন ১৯৭৪ সালে আব্দুস সামাদ পরিচালিত ‘সূর্য গ্রহণ’ ছবিতে। গানটির সুরকার ছিলেন রাজা-শ্যাম। বাংলা গানে তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি পেয়েছেন ‘একুশে পদক’। পাঁচবার পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, চারবার পেয়েছেন বাচসাস চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অগণিত পুরস্কার। দীর্ঘ সংগীত জীবনে সুবীর নন্দী গান গেয়েছেন প্রায় আড়াই হাজারেরও বেশি। তার গাওয়া বিখ্যাত জনপ্রিয় কিছু গান হলো-দিন যায় কথা থাকে, হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে, বন্ধু হতে চেয়ে তোমার, আমার এ দু’টি চোখ, বধূয়ার মান ভাঙ্গাতে আমি, আমি বৃষ্টির কাছ থেকে, বন্ধু তোর বরাত নিয়া, তুমি এত যে জাল পেতেছ, কতো যে তোমাকে বেসেছি ভালো, একটা ছিল সোনার কইন্যা এবং ও আমার উড়াল পঙ্খিরে।
বাংলা গান যতদিন থাকবে ততদিন শাস্ত্রীয় শুদ্ধ সংগীতের শুদ্ধতম শিল্পী, চলচ্চিত্র ও আধুনিক গানের এই অমর শিল্পী অনির্বাণ শিখা হয়ে সংগীতপ্রিয় বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। তাঁকে স্মরণ করি গভীর শ্রদ্ধা আর বুকভরা ভালোবাসায়।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ছাত্রজীবনে ব্যর্থতা নিয়ে কথা
  • ফেসবুকের অপব্যবহার : আইন ও নৈতিকতা
  • এ বিবাদ মেটাতেই হবে
  • গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি ও গরিবের সরল গণিত
  • বন্যার্তদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে
  • দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও চীন-আমেরিকার রাজনীতি
  • সম্ভাবনার ক্ষেত্র এবং নতুন প্রযুক্তি
  • গণমানুষের মুখপত্র
  • জাহালম কি আরো আছে!
  • নারী নির্যাতন ও আমাদের বাস্তবতা
  • সিলেটের ডাক : কিছু স্মৃতি কিছু কথা
  • বর্ষাঋতুতে শিশুদের যত্ম
  • কোটি মানুষের মুখপত্র
  • ৩৬ বছরে সিলেটের ডাক
  • প্রত্যয়ে দীপ্ত ‘সিলেটের ডাক’
  • পাঠকের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি
  • এরশাদ : এক আলোচিত পুরুষের প্রস্থান
  • প্রাসঙ্গিক ভাবনায় ২০১৯-২০ অর্থ বছরের বাজেট
  • মেঘালয়ের মেঘমালা
  • পরিবেশ সংরক্ষণে সামষ্টিক উদ্যোগ
  • Developed by: Sparkle IT