শিশু মেলা

ভাবনার দুয়ার

মুন্সি আব্দুল কাদির প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৫-২০১৯ ইং ০০:৩৪:০৯ | সংবাদটি ২২৮ বার পঠিত

আবির ক্লাসের পড়া নিয়ে ব্যস্ত। সামনেই তার পরীক্ষা। কিছুদিন শরীরও ভাল ছিল না। পড়ায় সে পিছিয়ে পড়েছে। শরীর এখনও দুর্বল। তারপরও তাকে যে পড়তে হবে। সন্ধা হয় হয় অবস্থা। খেলা থেকে পাশের বাড়ির রাফি বাসায় ফিরছে। আবিরকে দেখে সে বলে কি আবির কেমন আছ? অনেকদিন তো খেলায় যাও না। শরীরতো অনেকটা ভাল হয়েছে। আগামীকাল থেকে খেলতে যেয়ো।
আবিরও ভাবছে প্রতিদিন বিকালে খেলতে যাওয়া দরকার। অনেকদিন হল খেলতে যাওয়া হয় না। খেলতে গেলে বিকালে গ্রামের অন্য ছেলেদের সাথে দেখা হবে, কথা হবে, নিজের একগেয়েমিটাও কেটে যাবে।
আবির রাতে পড়তে বসে। ক্লাসের পড়া শেষ করে তার মনটা ভাল লাগছে না। কী করা যায় ভাবছে। আবিরের যখন মন খারাপ হয়ে যায় তখন হয় সে ফুল বাগানে গাছের পরিচর্যা করে নতুবা বই পড়ায় মন দেয়। এমন সময় সে তার পাশে রাখা একটি বই টেনে নেয়। গত সপ্তাহে সে বইটির নাম দেখেই কিনেছে। সময়ের অভাবে পড়া হয়নি। বইটির নামও আশ্চর্য ধরণের ‘পুস্তক সম্রাট’। বই এর নাম এমন হওয়ার পিছনে অবশ্যই কোন কারণ থাকতে পারে। বইটির কলেবর খুব বড় নয়। এ নামে নামকরণ বেশ খটকা লাগছে। আবির বইয়ের ভূমিকাটি পড়ে নেয়। প্রথমেই লেখা রয়েছে এটি লেখকের প্রথম বই। আবার নাম দিয়েছে পুস্তক সম্রাট। কী আশ্চর্য !
আবির বইটি পড়তে শুরু করে। কী আশ্চর্য যতই পড়ছে এক একটি পৃষ্ঠা এক একটি দিগন্ত খুলে দিচ্ছে। এই ছোট্ট বইটি যেন চিন্তার অনেকগুলো দরজা। যার প্রত্যেকটি দরজা দিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে ঐ ঘরের সব বস্তু সম্পর্কে জানা অনেক সময়ের ব্যাপার। সবচেয়ে ভাবিয়ে তুলে মুসলমানদের আবিষ্কার অধ্যায়টি।
আজকাল মুসলমানরা সবচেয়ে হিনমন্যতায় ভোগে যে, আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানে মুসলমানদের কোন অবদান নেই। আবিরও এটাই ভাবত। কিন্তু এই বইটি তার ধারনা পাল্টে দেয়। পাশ্চাত্য সভ্যতা মুসলমানদের অসচেতনতায় তাদের সম্পদ চুরি করে তাদের নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছে। বর্তমান মুসলমানগণ তাদের সম্পদ পাশ্চাত্যের নিকট থেকে অন্য মোড়কে আমদানী করে মনে করছে এটা পাশ্চাত্যের সম্পদ।
আবির এই চি›তা নিয়ে একটু সামনে অগ্রসর হয়। এদিকে রাতও বয়ে যাচ্ছে। ঐ দিকে তার কোন খেয়ালই নেই। সে ডুবে আছে এই বইটিতে। গল্প উপন্যাসের মত তাড়াতাড়ি পড়াও যাচ্ছে না। খুব ধীর গতিতে সে অগ্রসর হচ্ছে। এর মধ্যে তার খটকা লাগে পশ্চিমারা মুসলমান জ্ঞানী বিজ্ঞানীদের নামগুলো পরিবর্তন করে ফেলেছে-তা কি করে হয়? আবির ইন্টারনেটে সার্চ দেয়। প্রথমেই চলে আসে নবী (আ.) গণের কথা। আমরা জানি কোন মানুষের নাম যে কোন ভাষারই হোক না কেন, কোন পরিবর্তন হয় না। কিন্তু পশ্চিমারা নবী (আ.) গণের নামেরও অনেক পরিবর্তন করে ফেলেছে। মানব জাতির আদি পিতা আদম (আ.) এর নাম এ্যাডাম ইদ্রিস (আ.) এর নাম ইনখ নুহ (আ.) এর নাম নোয়া, ঈসা (আ.) এর নাম যিশু, ইয়াকুব (আ.) এর নাম জেকব, ইসহাক (আ.) এর নাম আইজেক, ইব্রাহিম (আ.) এর নাম আব্রাহাম, দাউদ (আ.) এর নাম ডেভিড করে ফেলেছে। আবির ভাবে যেখানে নবী (আ.) গণের নাম ওরা পাল্টিয়ে ফেলেছে সেখানে অন্যদের নাম পাল্টানোতো সাধারণ ব্যাপার।
আমরা ছোটকালে ভাস্কোদাগামার ভারত আবিষ্কার সম্পর্কে পড়তে গিয়ে জিব্রাল্টা প্রণালীর নাম পড়েছি কিন্তু তার নামতো এখন জানি জাবাল আল তারিক। স্পেন বিজয়ী তারিক বিন যিয়াদের নামে এই প্রণালীটি। অবশ্যই এটাই আমাদের দৈন্যতা। আমরা জ্ঞান বিজ্ঞান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে এমনভাবে ঘুমিয়ে পড়েছি যে, আমাদের উপার্জিত সম্পদের পাহারা পর্যন্ত দিতে ভুলে গেছি। এখন চোরেরা আমাদের সম্পদকে তাদের সম্পদ বলে চালিয়ে দিচ্ছে, আমরাও তা তৃপ্তির সঙ্গে গলদকরণ করছি। যে জাতি তার ইতিহাস জানে না, সে জাতি আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে না।
আবির ভাবতে থাকে আল কোরআন যেখানে বিজ্ঞানময় সেখানে মুসলমানগণ জ্ঞানে বিজ্ঞানে পিছিয়ে থাকবে, তা কি করে সম্ভব! যে কোরআনের প্রথম কালাম হল ইকরা বা পড়। সে জাতি কি জ্ঞান বিজ্ঞান ছেড়ে অলস বসে থাকবে? তা কি করে হয়? আজ আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হল, আমরা আমাদের অতীত জানি না বা জানানো হয় না। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও মুসলমানদের সত্যিকারের ইতিহাস পড়ানো হয় না। ইতিহাসের সত্যটি আমরা জানি না। আমরা পশ্চিমাদের লেখা ইতিহাস পড়ে ইসলামের ইতিহাস বা মুসলমানদের অতীত জানার চেষ্টা করি। এভাবেই অনেক রাত পেরিয়ে যায় কিন্তু আবিরের ভাবনার যেন শেষ হয় না।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT