শিশু মেলা

ইমনের রোযা

এম আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৫-২০১৯ ইং ০০:৩৪:৪০ | সংবাদটি ২০০ বার পঠিত

গভীর রাতে ঘুম ভাঙলো ইমনের। ঘুট ঘুটে অন্ধকার। ডানে বামে হাতড়ালো সে। বাবা মা কেউ নেই। কোথায় গেল ওরা। বাবা ডানে আর মা বায়ে নিয়ে সব সময়ইতো ঘুমায় সে। কিন্তু এখনতো কারো হদিস পাচ্ছে না। ডিম লাইটও জ্বলছে না। অন্ধকারে সে কিছুই দেখছে না। খাট থেকে নামতে গিয়ে পড়ে গেল ইমন। আর অমনিতে ভ্যা করে কান্না জুড়ে দিল।
খাদিজা ইমনের কান্না শুনে দৌড়ে এলেন। লাইট জ্বালিয়ে দেখেন ইমন খাটের নিচে।
-বাবা কি হয়েছে? ইমন..... ও ইমন কী হলো বাবা।
-তোমরা আমাকে অন্ধকারে রেখে কোথায় গিয়েছ? ফুফিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল ইমন।
-এই তো রান্না ঘরে বাবা। কাল রোডা রাখতে হবে না? তাই সাহরি রান্না করছি।
-কিন্তু বাবা কোথায়?
-উনি ওয়াশ রুমে।
-কেন? ওয়াশ রুমে কেন? আমাকে একা ফেলে তোমরা সবাই চলে গেছ। আমি... ভয় পেয়েছি।
-না বাবা। আর এমন হবে না। তোমাকে একা ফেলে কোত্থায়ও যাব না। এবার শান্ত হও। কান্না থামাও।
ইতোমধ্যে সরওয়ার সাহেব ওয়াশ রুম থেকে বের হয়েছেন।
কী হয়েছে ইমন? কাঁদছ কেন বাবা। এদিকে এসো, বাবার কাছে এসো।
খাদিজা ইমনকে কোল থেকে নামাতে নামাতে বললেন যাও বাবা.... বাবার কাছে যাও। এত বড় ছেলেকে কোল থেকে নামিয়ে বাঁচলেন তিনি। ইমন চোখ মুছতে মুছতে বাবার কাছে গেল। বাবা তোয়ালে দিয়ে হাত মুছতে মুছতে বললেন- দাঁড়াও ইমন হাত-মুখটা মুছে নেই। এইতো এসো আমার কোলে এসো। হ্যাঁ.... আর কাঁদে না বাবা একটু পরেই আমরা সাহরি খাব।
-সাহরি কী বাবা? চোখের অবশিষ্ট পানি হাত দিয়ে মুছতে মুছতে প্রশ্ন করে ইমন। ও একটা নতুন কিছু শুনলেই প্রশ্ন করাটা তার অভ্যাস। আদুরে ছেলে তো-তাই মা বাবার এটা গা সহা হয়েছে। সরওয়ার সাহেব বললেন-আগামীকাল থেকে রমজান মাস শুরু হচ্ছে। মুসলমানরা সুবহে সাদিক অর্থাৎ খুব ভোর হতে মাগরিবের আযানের আগ পর্যন্ত খানাপিনা বন্ধ করে রাখবে। কোন কিছুই খাবে না। এইভাবে না খেয়ে থাকার নাম রোযা। অবশ্য মাগরিবের আযানের সাথে সাথে খানাপিনা শুরু করা যায় এবং সুবহে সাদিকের পূর্ব পর্যন্ত খানাপিনা করা যায়।
-কিন্তু সাহরি কী এটাতো বললে না। বিজ্ঞের মত প্রশ্ন করে ইমন।
-ও আচ্ছা। বলছি বাবা। রোযা রাখার নিয়তে গভীর রাতে কিছু পানাহার করার নাম সাহরি। বুঝতে পারছ?
-বাবা আমি সাহরি খাব। মা আমি সাহরি খাব বলে দৌড়ে গেল মায়ের কাছে। এই সুযোগে তাহাজ্জুদ নামায পড়তে শুরু করলেন সরওয়ার সাহেব।
ঘড়িতে রাত তিনটা। খাদিজা ভাত তরকারি বেড়ে ডাইনিং টেবিলে সাজালেন। ইমন এসে প্লেট নিয়ে তাদের সাথে বসল। খাদিজা বললেন- আমি খাইয়ে দিই?
-না মা আমার হাত দিয়ে খাবো। তুমি খাবার রেডি করে দাও।
খেতে বসে ইমন প্রশ্ন করে বাবা রোযা এলো কেন? আর আমরা কেনই বা রোযা রাখব?
-এটা আল্লাহর হুকুম। বছরে এক মাস রোযা রাখতে হয়। মহান আল্লাহ তা’য়ালা মুমিনদের উপর ফরয করেছেন।
-ফরয কী বাবা? খেতে খেতে প্রশ্ন করে ইমন।
-ফরয মানে অবশ্যই করতে হবে। না করলে গুনাহ হবে।
-তাহলে আমিও রোযা রাখব।
-না বাবা। তুমি রোযা রেখো না। তোমার বয়স মাত্র আট বছর। বার বছর হলে-রোযা রাখতে হয়।
-তুমি না বললে আল্লাহ গুনাহ দিবেন?
-এটা তোমাদের জন্য নয়। তোমাদের মত বয়সীরা রোযা না রাখলে গুনাহ হবে না।
-কিন্তু আমি রোযা রাখব বাবা। মা বাবাকে বল না। আমি রোযা রাখব। বলে ইমন ওর পা দুটো মাটিতে মারতে লাগলো।
-আচ্ছা বাবা আচ্ছা। ঠিক আছে। তুমি রোযা রেখো। এখন ভালো করে সাহরি খাও।
সেদিন মসজিদে ইমাম সাহেবকে ওয়াজ করতে শুনেছে ইমন। তিনি বলছেন-যদি ছোট বাচ্চারাও রোযা রাখে তাতেও সওয়াব আছে। এ সওয়াব বাচ্চার মা-বাবা পাবেন। বাবার সাথে জুমা বারে মসজিদে গিয়েছিল ইমন। ইমাম সাহেব যখন ওয়াজ করেন- সবকিছু বুঝেনি সে। তবে ঐ কথাগুলো সে মনে রেখেছে।
পরদিন অনেক বেলা করে ঘুম থেকে উঠল ইমন। দিনটি ছিল শুক্রবার। সবারই স্কুল বন্ধ। ওর বাবা স্কুল শিক্ষক। তিনিও স্কুলে যাননি। মা স্বাস্থ্যবিভাগে চাকরি করেন। শুক্রবার বিধায় তিনিও লম্বা ঘুম দিচ্ছেন। ইমন হাতমুখ ধুয়ে মাকে ডাকতে যাবে নাস্তা দেয়ার জন্য। ঠিক তখনই ওর মনে পড়লো সে রোযা রেখেছে। পানাহার করা যাবে না। সে আর কাউকে জাগালো না। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখলো আশে পাশের বন্ধুরা জড়ো হয়ে রাফিদের বাসায় যাচ্ছে। সেও ওদের সাথে গেল। তাদের স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীতে পড়–য়া রাফি, সামী, আপেল ও মুকুল ক্যারাম খেলছে। বৈশাখ মাস। ভ্যাপসা গরম পড়েছে। ওরা একটা আম গাছের নিচটা ঝাড়– দিয়ে পরিষ্কার করে এর ছায়ায় ক্যারাম বোর্ড স্থাপন করেছে। মাঝারি আম গাছটায় প্রচুর আম এসেছে। অথচ কিছুদিন আগেও ইমন রাফিদের বাসায় এসেছিল। তখন সে আম দেখেনি। কিন্তু দেখেছিল মুকুল। কী সুন্দর থোকা থোকা মুকুল। আম গাছটা যেন ফুল হাতে সবাইকে স্বাগত জানায়। আমের মুকুলে অনেক মধু পোকা উড়ছিল। ইমন প্রাণ ভরে সে দৃশ্য দেখেছিল। আজ এই বৈশাখের দিনে সেই থোকা থোকা মুকুল একটিও নেই। সেখান থেকে লম্বা লতায় ছোট ছোট আম ধরেছে। ইমন ভাবে ‘আমাদের বাসায় যদি ওরকম একটা আম গাছ থাকত-কি মজাই না হতো। বৈশাখি এই দুপুরে গাছের নিচে বসে একটু বিশ্রাম নেয়া যেতো।
ইমনকে দেখে রাফি বলল-‘কিরে ইমন তোর চোখ দুটো ফোলা ফোলা কেন? অনেক ঘুমিয়েছিস মনে হয়? ইমন- থু থু ফেলে বলল- জানো রাফি ভাইয়া আমি রোযা রেখেছি।
...ও- হো... রোযা রেখেছিস? এই জন্যই তো তুই থুথু ফেলছিস? সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
-জানিস ইমন- আমরা কেউ রোযা রাখিনি।
-ইমন বলল- আল্লাহ তোমাদের গুনাহ দিবেন।
-দূর বোকা। রোযা রাখাার বয়স আমাদের হয়ইনি। আর এত লম্বা দিন। তার উপর ভ্যাপসা গরম। একটু পরেই দেখবে পিপাসায় বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছে। তখন দেখবে দৌড়ে গিয়ে পানি খাবে।
-হ্যাঁ হ্যাঁ দৌড়ে গিয়ে বোতল উপুর করে পানি খাবে। সবাই এক বাক্যে বলল।
ইমন আবার থু থু ফেলে বলল-আমি রোযা থাকবো। দেখো-যতই পিপাসা পাক-আমি কিন্তু পানি খাবো না।
-আচ্ছা! এখন ক’টা বাজে? নিজের ছোট্ট মোবাইলে দেখল ১০.৩০। ঠিক বারটায় দেখবে মজা......
-সবাই ওকে সায় দিল।
ইমন বলল, রাফি ভাইয়া আমাকে খেলতে দাও।
-তুই খেলতে চাস? আচ্ছা- আমাদের গেম শেষ হউক। তারপর তোমরা চারজনে খেলতে পারবে।
ইমন জোহরের আযান শুনে চমকে উঠল। এত বেলা হয়ে গেছে? মা বাবা হয়ত আমাকে খুঁজছে। তড়িঘড়ি বাসার দিকে ছুটল ইমন। এদিকে সরওয়ার সাহেব ও খাদিজা ছেলের চিন্তায় অস্থির। কোথায় গেল সে? ওর সাথে মোবাইলও নেই। এদিক ওদিক খুঁজতে খুঁজতে যখন অস্থির, ঠিক তখনই ইমন বাসায় ঢুকল। সরওয়ার সাহেব ইমনকে দেখেই প্রশ্ন করলেন-কোথায় ছিলে ইমন?
-বাবা রাফি ভাইয়াদের বাসায়।
-কিন্তু বলে যাবে তো। আমরা তো তোর চিন্তায় অস্থির।
-বাবা ভুল হয়ে গেছে। আমি যখন গেলাম তখন তোমরা ঘুমুচ্ছিলে। তাই ডাকিনি।
জানো বাবা, রাফি ভাইয়াদের বাসায় খেলেছি।
-কী খেলেছ?
-ক্যারাম বোর্ড।
-তুমি না রোযা রেখেছ?
-হ্যাঁ বাবা, আমি রোযাই তো।
-কিন্তু রোযা রেখে খেলতে নেই?
-কেন বাবা?
-কারণ খেলতে খেলতে নেশা ধরে। এ রকম নেশা করে খেলা ঠিক নয়।
-আচ্ছা বাবা আর হবে না।
ইমন- এখনও রোযা আছিস?
-হ্যাঁ, বাবা।
-তুই তো ছোট্ট মানুষ। রোযা একটা হয়েই গেছে।
বড়রা সারা দিনব্যাপী রোযা রাখে। কিন্তু ছোটরা দিনে দুইটা রোযা রাখতে পারে। ওর রোযা ভাঙানোর জন্য সরওয়ার সাহেব বানিয়ে বানিয়ে বললেন।
-কিন্তু বাবা তুমি না বললে সুবহে সাদিক হতে সূর্যাস্ত পর্যস্ত কোনকিছু পানাহার করা যাবে না।
-সেটা তো ঠিক। কিন্তু....
-বাবা আমি রোযা ভাঙবো না।
সরওয়ার সাহেব ছেলের ডিটারমিনেশন দেখে আর কথা বাড়ালেন না। ওর মা খাদিজাও অনেক অনুরোধ করলেন কিন্তু সে রোযা ভাঙতে রাজি হলো না।
জোহরের নামায মসজিদে আদায় করে বাসায় এসে ঘুমিয়ে পড়ল ইমন।
যখন ঘুম থেকে উঠল তখন বিকাল ৪টা। ছোট্ট শরীরটা দুর্বল হয়ে পড়েছে ওর। পেট ক্ষিধায় ছুঁ ছুঁ করছে। পিপাসায় বুকের ছাতি শুকিয়ে গেছে। মনে হলো- ইমনের এখনই পানি খায়। কিন্তু পরক্ষণে আল্লাহর কথা স্মরণ করল। কেউ খেতে না দেখলেও আল্লাহ দেখবেন। আল্লাহ গুনাহ দেবেন। তাই আল্লাহর ভয়ে সে কিছুই খেল না।
ইতোমধ্যে আসরের আযান হলে ইমন মসজিদে গেল। সারাদিন থু থু ফেলতে ফেলতে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। অযু করার সময় ইমাম সাহেব ইমনকে থু থু ফেলতে দেখলেন। ইমাম সাহেব ইমনকে খুব ভালোবাসেন। তিনি কাছে ডেকে বললেন ইমন তুমি কি রোযা রেখেছ?
-জ্বী হুজুর। খুব ভালো করেছ বাবা।
-তবে রোজ রোজ রেখ না। বাচ্চাদের রোজ রোজ রোযা রাখতে নেই। আর সব সময় থু থু ফেল না। থু থু গিলে ফেললে রোযা ভঙ্গ হয় না।
-জ্বী আচ্ছা।
নামাজ পড়ে ইমন বন্ধুদের সাথে গল্প করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে এলো। এখনই সূর্য অস্ত যাবে। ইফতার করতে হবে। ইমন বাসায় এসে দেখে- মা অনেক ইফতার তৈরি করেছেন। বাবা বাজার থেকে তরমুজ, আপেল, মালটা, আঙ্গুর ইত্যাদি এনেছেন। ছোলা, পিঁয়াজু, পোলাও, রোস্ট, ডাবের পানি, লেবুর শরবত ইত্যাদিতে টেবিল সাজানো। মসজিদে আযান হতেই ইমন লেবুর শরবত পান করল। এ যেন বেহেস্তী খানা তার জন্য তৈরি করা হয়েছে। ইফতার করে যে শান্তি পেল- খাবার খেয়ে এমন প্রশান্তি আর কোন দিনও পায়নি।
ইফতার শেষে মসজিদের দিকে পা বাড়াল ইমন...

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT