উপ সম্পাদকীয়

নারীর নিরাপত্তার দায়িত্ব কার?

সামসুজ্জামান প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৫-২০১৯ ইং ০০:৩৫:২৯ | সংবাদটি ৩১ বার পঠিত

পৃথিবী সৃষ্টির লগ্ন থেকেই মানব-মানবীর যাত্রা শুরু। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তা প্রথমে হযরত আদম (আ.) এবং পরে বিবি হাওয়া (আ.) সৃষ্টি করেন। তাদের বেহেস্তের বাদশা এবং রানীকে রাখাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু শয়তানের ধোকায় পড়ে মাকাল ফল ভক্ষণই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল। বেহেস্তের পরিবর্তে মাটির পৃথিবী হলো তাদের আবাসস্থল। এক সময় গোটা পৃথিবী আইয়্যামে জাহেলিয়াতে পরিণত হলো। মানব-মানবী জ্ঞানশূন্য হয়ে গেল। বাবা মেয়ের সঙ্গে, ছেলে মায়ের সঙ্গে, বোনের সঙ্গে মিলিত হতে লাগল। জারজ সন্তানে পরিপূর্ণ হয়ে গেল গোটা পৃথিবী। সৃষ্টিকর্তা এ অবস্থার অবসান করতে হযরত নূহ (আ.) দিলেন এক বিশাল আকার তরী এবং নির্দেশ দিলেন ওই তরীতে পশু-পাখিসহ সমস্ত জীবকে জোড়ায় জোড়ায় তুলবার জন্য। যার অর্থ ভবিষ্যতে বংশধর সৃষ্টি এবং তাদের সৃ-শৃঙ্খলভাবে সামাজিক অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করা।
গত ৭ মে ঢাকার ইবনে সিনা হসপিটালের নার্স কিশোরগঞ্জের কোটিয়াদি উপজেলার নোহাজুরী ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের গিয়াস উদ্দীনের মেয়ে শাহীনুর আক্তার তানিয়া বাড়ি যাবার উদ্দেশ্যে ইয়ারপোর্টের পাশে স্বর্ণলতা বাস কাউন্টার থেকে টিকিট কাটে। ওই টিকিটটি তার জীবনের কাল হয়ে গেল। বাসটি ভৈরব-কিশোরগঞ্জ এলাকার জামতলী নামক স্থানে পৌঁছালে বাসের সমস্ত যাত্রী নেমে যায়। কিন্তু ৪/৫ জন যুবক ওঠে বাসটিতে। শাহীনুর বাসে বসে তার ভাইকে মোবাইলে জানায় ৫/৭ মিনিটের মধ্যে সে পৌঁছে যাবে। বোনের চাকরির সুবাদে ভাইয়ের দাবি একটি দামি মোবাইল। মোবাইল ছাড়াও ১৯ ইঞ্চি একটি এলইডি সঙ্গে ছিল তানিয়ার। কিন্তু আজরাইল যে তার জন্য অপেক্ষা করছে ঘুর্ণাক্ষরেও সে তা বুঝতে পারেনি। জামতলী থেকে গাড়ি ছাড়ার পরপরই যাত্রীবেসী যুবকরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ড্রাইভার, কন্টাকটারও চালায় তার ওপর যৌন নিপীড়ন। তারপর অনেক কাকুতি-মিনতি করেও রেহাই পায়নি তানিয়া। তারই ওড়না গলাই প্যাঁচিয়ে শ্বাসরোধ হত্যা করে তাকে। ধর্ষণকারীরা রাত ১১টার দিকে কোটিয়াদি হাসপাতালে এনে দুর্ঘটনার কথা বলে তানিয়াকে ফেলে রেখে চলে যায়। মিডিয়ায় প্রচারের পর শাহিনুরের পোস্টমর্টেম রিপোর্টে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। তার সঙ্গে থাকা এলইডি এবং ফোনের সন্ধান মেলেনি এখনও। পুলিশ ধর্ষণকারীদের আটক করেছে। এর পর কোন অদৃশ্য খেলা হবে জানি না। ইতিপূর্বে কুমিল্লার তনু, যশোরের তৃষা, সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি এবং সর্বশেষ ফেনির সোনাগাজী মাদরাসার মেধাবী ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির বিচার চলছে তো চলছেই। দেশে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর পদচারণা বেড়েছে। কিন্তু বাড়েনি নারীর পথচলার প্রশস্ততা। বাড়েনি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কিন্তু চলার পথে পথ যদি নিরাপদ না হয় তাহলে পদযাত্রা পঙ্গু হয়ে পড়বে নিঃসন্দেহে। নানা প্রয়োজনে নারীকে সংসারের বাইরের কাজ করতে বেরোতে হয়। সে ক্ষেত্রে গণপরিবহনই একমাত্র মাধ্যম। অথচ সেই গণপরিবহনেই হচ্ছে তারা যৌন হয়রানির শিকার। হেনেস্তা ও যৌন হয়রানির জন্য পুরুষ যাত্রী তো আছেনই তার ওই পরিবহনের নিরাপত্তা বিধানে যাদের কর্তব্য সেই ড্রাইভার কন্ডাকটর সুযোগ বুঝে হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ছে নারীদের ওপর। রাফির ক্ষত এখনও শুকায়নি। প্রতিদিন বিভিন্ন স্থানে মিছিল, মিটিং এবং মানববন্ধনের মতো কর্মসূচি চলছে রাফির মৃত্যুর দ্রুত বিচার এবং নারীদের নিরাপত্তার দাবিতেই। এর মধ্যেই একই ঘটনাই পুনরাবৃত্তি। তানিয়ার মৃত্যু এবং গণধর্ষণের দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে দেশ আবার ফুসে উঠেছে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী গত ১৩ মাসে ২১ জন নারী পরিবহনে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। গত বছর মে মাসে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভায় গণপরিবহনে নারী নির্যাতন বন্ধে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়। কমিটির সভাপতি রেবেকা মোমিনের সভাপতিত্বে সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত সভায় এ সুপারিশ করা হয়। সভায় গণপরিবহনে সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং তা মনিটরিং করা চালক ও তার সহযোগিদের ইউনিফর্ম বাধ্যতামূলক করার পরামর্শ গৃহীত হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের রাষ্ট্রীয় অনেক জরুরি বিষয় শুধু এমন সভার মধ্যেই সীমিত থাকে। আলোর মুখ দেখে না কোনদিন।
এই নিরাপত্তা হীনতার অবসান কীভাবে হবে এ প্রশ্নের উত্তর কেউ জানে না। রাজনৈতিক স্লোগানে বাংলাদেশে নারীর জীবন অনেকাংশে নিশ্চিত হলেও বাস্তবচিত্র ভিন্ন। এখানে ভিন্নমতের প্রতীকে ভোট দিলে নারী গণধর্ষণের শিকার হয়। সামান্য কারণে হিংসার শিকারত আছেই। প্রতিনিয়ত দেশে নারী সহিংসতার সংখ্যা বাড়ছে। সম্প্রতি আইন ও সালিশ কেন্দ্র প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০১৮ সালে দেশে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৩২ জন, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার শিকার হয়েছেন ৬৩ জন আর অপমানে আত্মহত্যা করেছেন ৭ জন। সিনেমার পর্দায় বিয়োগান্তক বা ট্র্যাজেডির ছবি দেখলে মনটা ক্ষণিকের জন্যে খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু এ সমাজে প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তের ঘটনাগুলো আমাদের আন্দোলিত করে না।
স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও নারীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারেনি রাষ্ট্র। অথচ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭-এ বলা হয়েছে ‘সব নাগরিক আইনের চোখে সমান এবং আইনের সমান লাভের অধিকারী।’ পশ্চাৎপদ নারীকে গোষ্ঠীকে এগিয়ে নেবার জন্যে সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদে ১, ২, ৩ এবং ৪ ধারায় নারীর অধিকারকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একজন নারী। মায়ের মমত্ববোধ তার মধ্যে বিদ্যমান। আশা রাখি তিনি নিজের সন্তান মনে করে বিষয়গুলো দেখবেন।
নারীদের নিরাপদ যাত্রার একটি সুপারিশ আমরা করতেই পারি। এ ধরনের মামলায় আদালতকে সর্বোচ্চ ৬০ দিন ধার্য্য করে দেওয়া এবং মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামিদের জেল অভ্যন্তরে নয় প্রকাশ্যে মাইকিং করে হাজার হাজার মানুষের সামনে ফাঁসি দিতে হবে। এক্ষেত্রে অবশ্যই আইনের সংশোধনী প্রয়োজন। তাহলে এ ভাইরাস সমাজ থেকে বহুলাংশে কমে যাবে আশা রাখি।
রাষ্ট্র ও নারী-পুরুষ সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এটাই কাম্য। কিন্তু রাষ্ট্র এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। প্রযুক্তি, সভ্যতা বিকাশের পাশাপাশি আমরা কি তাহলে সেই আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে পিছিয়ে যাচ্ছি?
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • দুধেও ক্ষতিকর রাসায়নিক!
  • ইরান-আমেরিকা সম্পর্ক : যুদ্ধ কি অনিবার্য
  • নগরীর দৃশ্যমান সমস্যা ও প্রতিকার প্রসঙ্গে
  • যুদ্ধে যেতে হবে ভেজালের বিরুদ্ধে
  • চিকিৎসা অবহেলায় আইনি সুরক্ষা
  • তরুণরা কেন বিদেশে পাড়ি জমায়
  • ভেজালের বিরুদ্ধে চাই আইনি যুদ্ধ
  • আত্মিক শুদ্ধির দ্বার খুলে দেয় এতেকাফ
  • শিশুর অপরাধ প্রবণতা
  • ধানচাষির বঞ্চনা ও খাদ্য নিরাপত্তা
  • নদীমাতৃক বাংলাদেশ
  • আমার পরানও যাহা চায়
  • যে দূষণ নিয়ে কেউ ভাবেন না
  • সাম্প্রতিক কথকতা
  • ভেজাল নির্মূলে যা প্রয়োজন
  • ফিরে দেখা ১৭ মে
  • বদলে যাচ্ছে নিউজিল্যান্ড
  • ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিÑঅব্যক্ত যন্ত্রণা
  • নারীর নিরাপত্তার দায়িত্ব কার?
  • সুবীর নন্দী
  • Developed by: Sparkle IT