উপ সম্পাদকীয়

ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিÑঅব্যক্ত যন্ত্রণা

ফারহানা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৫-২০১৯ ইং ০৪:৪৬:০৭ | সংবাদটি ৭৩ বার পঠিত

দীর্ঘ আঠারো বছর ভূমধ্যসাগরের তীরে থেকে এসেছি লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলীতে। সে সাগরের নীল পানি দেখে মুগ্ধ হয়েছি বার বার। তীরে দাঁড়িয়ে সুদূর বাংলাদেশে রেখে আসা স্বজনদের কথা ভেবেছি, দেশের কথা ভেবেছি। নীল জলের গভীরতায় ভুলে থেকেছি ফেলে আসা প্রিয়জনদের কথা। আজ সেই পানিতে ডুবে মারা গেছে আমাদের অনেকগুলো তাজা তরুণ প্রাণ-এ দুঃখ রাখব কোথায়? প্রতিদিন একেকটা খবর পড়ছি, সেই অবর্ণনীয় দুঃখের শিকার পরিবারের মা-বাবা, ভাই-বোনের কাছ থেকে শেষ বিদায়ের কথা শুনছি-বুকটা ফেটে যাচ্ছে হাহাকার আর মর্মবেদনায়।
আমরা যখন ত্রিপোলিতে ছিলাম (১৯৮১-১৯৯৯ইং) সে সময় আমাদের পরিচিত অনেক ব্যাচেলর যুবক এসে হাসিমুখে বিদায় নিয়ে যেত ‘ইতালি যাচ্ছি দোয়া করবেন।’ পরে শুনতাম কেউ পত্রিকা বেচে, কেউ ফুল বিক্রি করে, কেউবা গাড়ি ধুয়ে জীবিকা অর্জন করে। কিন্তু এভাবে দালালের মাধ্যমে ৮/৯ লাখ টাকা দিয়ে বাড়ি-ঘর বিক্রি করে, ধার দেনা করে সুখের আশায় যে ছেলে বাড়ি থেকে গেল চোখে অনেক স্বপ্ন নিয়ে সে ছেলে আর ফিরল না। ভূমধ্যসাগরের নীল জল হল তার শেষ ঠিকানা। কারা এসব দালাল চক্র যারা অসহায় মানুষকে জিম্মি করে-মায়ের ¯েœহের তরতাজা যুবককে নিয়ে ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর অন্ধকূপে? এদের কি ভাই নেই? ছেলে নেই? টাকা কি এতই মায়াবিনী যে অন্ধ করে দেয় মানুষের বিবেক আর অন্তরকে? সুন্দর স্বপ্ন চোখে মুখে নিয়ে যে ছেলে মা-বাবাকে সালাম করে বের হয়েছিলো ঘর থেকে, সে কি জানতো মৃত্যু তাকে টেনে নিচ্ছে?
পত্রিকায় দেখছি সবাই রওয়ানা হবার আগে বাড়িতে ফোন করে দোয়া চেয়েছে। কোন একজন পিতা বলেছেন ‘কষ্ট করে ইতালি যেতে হবে না, দেশে ফিরে এসো, দরকার হলে না খেয়ে থাকব।’ আরেকজন মা কাঁদতে কাঁদতে বলেছেন ‘বড়লোক হওয়ার নেশায় ছেলেকে হারালাম’ এসব পড়তে পড়তে যখন দুঃখে ভারাক্রান্ত তখন আমার ছেলে বলল ‘আম্মা, জানো একভাই আরেক ভাইর হাত ধরে দীর্ঘ ৮ ঘন্টা সাগরে সাঁতার কেটেছে তারপর আর পারে নাই। বলেছে ‘ভাই আমার হাত ঠান্ডায় অবশ হয়ে আসছে, আমাকে আর বাঁচাতে পারবে না, আমার হাত ছেড়ে দিয়ে তুমি বাঁচার চেষ্টা কর।’ কী মর্মষ্পর্শী ঘটনা। আমি আর ঠিকভাবে ইফতার করতে পারলাম না-চোখে ভেসে উঠল সাগরের নীল জলে হাত ধরে দুই ভাই সাঁতার কাটছে, এক সময় নিস্তেজ হয়ে আসা এক ভাই বিদায় চাইছে আরেক ভাইয়ের কাছে। আমি আমার ছেলেকে বললাম ‘হাত ছেড়ে দেয়ার সময় কী বলেছিল ওরা’? নিশ্চয় ‘আল্লাহ হাফিজ’ জীবনের জন্য চিরবিদায়। এত টাকা খরচ করে কেন এই মর্মান্তিক মৃত্যু? কেন এই মিথ্যে মরীচিকা আলেয়ার আলো দেখে আগুনে ঝাঁপ দেয়া? কারা উসকে দেয় এই কোমলমতি তরুণদেরকে? টাকার জন্য কারা খালি করে মা-বাবার বুক? তাদের কী শাস্তি হবে ইহকালে এবং পরকালে?
যারা মারা গেছেন তাদের সবার জন্য অনেক দোয়া, আল্লাহ যেন জান্নাতবাসী করেন। তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি রইল গভীর সহানুভূতি। দোয়া করি আল্লাহ যেন আপনাদের মনে শান্তি দেন।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি
  • বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা
  • ভারতের জাতীয় উন্নয়ন ও ভারত মহাসাগর
  • জীবনে শৃঙ্খলাবোধের প্রয়োজনীয়তা
  • চলুক গাড়ি বিআরটিসি
  • জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবেলায় আমাদের করণীয়
  • নির্ধারিত রিক্সাভাড়া কার্যকর হোক
  • নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা
  • খাদ্যে ভেজাল রোধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে
  • মুর্তাজা তুমি জেগে রও!
  • সন্তানের জীবনে বাবার অবদান
  • এবার কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভংগ হোক
  • বন উন্নয়নে মনোযোগ বাড়ুক
  • একজন অধ্যক্ষের কিছু অবিস্মরণীয় প্রসঙ্গ
  • গ্রামাঞ্চলে বৃক্ষ রোপণ
  • শান্তির জন্য চাই মনুষ্যত্বের জাগরণ
  • উন্নয়ন ও জনপ্রত্যাশা পূরণের বাজেট চাই
  • মোদীর বিজয় : আমাদের ভাবনা
  • অধিক ফসলের স্বার্থে
  • টেকসই উন্নয়ন ও অভিবাসন সমস্যা ও সমাধানে করণীয়
  • Developed by: Sparkle IT