ধর্ম ও জীবন

দারিদ্র বিমোচনে যাকাতের ভূমিকা

মাজহারুল ইসলাম জয়নাল প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৫-২০১৯ ইং ০৪:৫৪:০৬ | সংবাদটি ১৫৫ বার পঠিত

যাকাত আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ পবিত্র করা, বিশুদ্ধ করা, উৎকর্ষ সাধন করা বা বৃদ্ধি পাওয়া ইত্যাদি। শরীয়তের পরিভাষায় কোন মুক্ত বা স্বাধীন মুসলমান ব্যক্তি তার সারা বছরের খরচাদি নির্বাহের পর যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হয় এবং তা পরবর্তী পূর্ণ এক বছর (চান্দ্র মাসের হিসাবে) তার সঞ্চিত থাকে। তবে তার চল্লিশ ভাগের এক ভাগ আল্লাহ নির্দেশিত খাতে পরিশোধ করাকে যাকাত বলে।
ব্যাপকার্থে বলা যায়, পরিবারের বাৎসরিক খরচ মেটানোর পর কোনো মুসলিম ব্যক্তির নিকট যদি সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা ও সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ, ব্যবসায়ের পণ্য এবং বাড়ি ঘরের ব্যবসায় যদি পুরো এক বছর অতিবাহিত হয় তাহলে উক্ত পণ্যের চল্লিশ ভাগের একভাগ অর্থাৎ শতকরা হিসাবে ২.৫% হারে শরীয়তের বিধান অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট খাতে বণ্টন করার মহৎ কাজকে যাকাত বলে।
ইসলামের পাঁচটি রোকনের অন্যতম একটি বিধান যাকাত। পবিত্র কোরআনে বারবার নামাজ কায়েমের পাশাপাশি যাকাত আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল কোরআনে বলা হয়েছেÑ‘তোমরা সালাত কায়েম কর এবং যাকাত প্রদান কর।’ (সুরা : বাকারা, আয়াক : ৪৩)
মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের সম্পদের যাকাত পরিশোধ কর।’ (তিরমিযী)
যাকাতের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোরআনে বলা হয়েছেÑতাদের অর্থ সম্পদ থেকে যাকাত আদায় কর যা তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে।’ (আল কোরআন-৯ : ১০৩৬) আরও বলা হয়েছে-‘মুসলিম ধনীর সম্পদে গরিব ও বঞ্চিতের হক রয়েছে।’ (আল কোরআন-৭০ : ২৪)
এজন্য যার উপর যাকাত ফরজ সে যদি যাকাত আদায় না করে তাহলে অপরকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার কারণে তার পুরো সম্পদ অপবিত্র হয়ে যায়। যাকাত আদায়ের মাধ্যমে ধনী ব্যক্তির মন ও তার সম্পদ পবিত্র হয়। এজন্য যাকাত ধনীর পক্ষ থেকে কোন গরিবকে দয়া বা করুণা নয়, বরং ধনীদের সম্পদে গরিবের ন্যায্য অধিকার। মহানবী (সা.) এরশাদ করেন-‘ফিরিশতারা দোয়া করেন হে আল্লাহ! তুমি কৃপণ ব্যক্তির সম্পদ কমিয়ে দাও এবং দানশীল ব্যক্তির সম্পদ বাড়িয়ে দাও।’
ধনীর সম্পদে গরিবের অধিকার আছে। এজন্য মুসলমান যাকাত আদায় করলেই একমাত্র গরিবের হক নিশ্চিত হয়। এজন্য কোরআন এবং সুন্নাহ হতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধনবান মুসলমানকে যাকাত আদায়ের জন্য বারবার তাগিদ দেয়া হয়েছে। যারা গরিবের অধিকার যাকাত প্রদান করে না তাদের উদ্দেশ্যে হাশরের দিন প্রশ্ন করা হবে, কোন কারণে তোমরা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হচ্ছো? উত্তরে তারা বলবে, ‘আমরা সালাত আদায়কারী ছিলাম না এবং এতিমদের খাদ্য প্রদানকারীর অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না।’ (সূরা : মুদ্দাসির-৪২)
দারিদ্র বিমোচনে যাকাতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দারিদ্র মানবতার জন্য একটি অভিশাপ। কখনও তা কুফরি পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। দারিদ্রতার কারণে সমাজে হাতাশা, চুরি, ডাকাতি, অবৈধ ব্যবসা, দুর্নীতি ও বঞ্চনার অনুভূতি সৃষ্টি হয়। পরিণামে দেখা দেয় মারাত্মক সামাজিক সংঘাত। অধিকাংশ সামাজিক অপরাধ ঘটে দারিদ্র্যের কারণে। এ সমস্যার সমাধান করার জন্য যাকাত ব্যবস্থা রয়েছে ইসলামের সেই সোনালি যুগ থেকেই। যাকাতের অর্থ সম্পদ প্রাপ্তির ফলে দরিদ্রের পার্থক্য সৃষ্টি হতে পারে না। ইসলামের যাকাত ব্যবস্থা, দুঃখ-বেদনা, মোচনের ক্ষেত্রে সুনিশ্চিত পন্থা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাধনে যে কোনো কালে যে কোনো সমাজে যে কোনো ধরনের কলাকৌশল অবলম্বিত হোক না কেন তা সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য সমস্যার সমাধানে কখনও সফল হতে পারেনি এবং পারবেও না। পুঁজিবাদী বা সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক আদর্শ অনুসরণ করে মুসলমান জনগণের দারিদ্র্য বিমোচনের কোনো সমাধান আজ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। দারিদ্র্য সমস্যার সর্বোত্তম সমাধান হল যাকাত। ইসলাম মানবতার ধর্ম, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ইসলাম পছন্দ করে না।
সমাজের এক শ্রেণির লোক সম্পদের পাহাড় গড়বে, আর অপর শ্রেণির লোক অভাবের কারণে আত্মহত্যা করবে, তা ইসলাম কখনও মেনে নিতে পারেনি। আর আল্লাহ ধন দিয়ে প্রকৃত পক্ষে মানুষের মন পরীক্ষা করেন। ইসলামী অর্থনীতির দৃষ্টিতে সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহ। ব্যক্তি সামান্য সময়ের জন্য শুধু তা উপভোগ করে থাকে মাত্র। আর এই সামান্য সময়ের জন্য সম্পদ দিয়ে আল্লাহ মানুষের ঈমানের পরীক্ষা করে থাকেন। যাকাত উত্তোলন ও বন্টনের কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রাষ্ট্র বা সমাজের উপর দায়িত্ব ন্যস্ত করেছেন। কোরআনে বলা হয়েছেÑ‘হে নবী (সা.) তাদের ধনীর সম্পদ হতে যাকাত আদায় করে তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করুন’। আল্লাহ তা’আলার নির্দেশে মহানবী (সা.) যাকাত আদায়ের বিধান জারি করেছেন এবং যাকাত আদায় ও বন্টনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। রাসূল (সা.) বলেছেনÑ তোমাদের বিত্তবানদের নিকট থেকে যাকাত আদায় করে তোমাদের দরিদ্রদের মধ্যে তা বন্টন করার জন্য আল্লাহ আমাদের প্রেরণ করেছেন। (বুখারি, মুসলিম)
যাকাত শুধু একাকি নয় বরং সামাজিকভাবে আদায় ও বন্টন করতে হবে। এজন্য রাসূল (সা.) রাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় যাকাত আদায় ও সরকারের পক্ষে নিয়মানুযায়ী বন্টনের জন্য লোক নিয়োগ করেন। খোলাফায়ে রাশেদীনের সময় এ নিয়ম অনুসরণ করা হয়। যাকাতের মূল উদ্দেশ্য হল যাকাত গ্রহীতাকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলার মাধ্যমে গ্রহীতার স্তর থেকে দাতার পর্যায়ে নিয়ে আসা। কিন্তু বর্তমানে রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত বন্টনের ব্যবস্থা না থাকায় প্রচলিত পদ্ধতিতে যাকাত দানের ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠির দারিদ্র্য বিমোচন তথা ভাগ্যের কোন পরিবর্তনতো হচ্ছেই না বরং এর মাধ্যমে দরিদ্র শ্রেণিকে ভিক্ষুকের কাতারে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তাছাড়া যাকাত যে সামাজিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি তারও সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। সে কারণে রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত সংগ্রহ ও বন্টনের ব্যবস্থা চালু করা অত্যন্ত প্রয়োজন। যতোদিন পর্যন্ত না এ ব্যবস্থা চালু হবে, ততোদিন মুসলমানদেরকে সম্মিলিতভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার মাধ্যমে অথবা মসজিদ কেন্দ্রীক যাকাত সংগ্রহ ও বন্টনের ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
হারাম সম্পদের যাকাত হয় না :
যাকাত ফরজ হওয়ার জন্যে মালিকানা শর্ত বিধায় ঘুষ বা হারাম কোন উপায়ে অর্জিত সম্পদ বা সম্পত্তিতে যাকাত ফরজ হতে পারে না। চুরি, মিথ্যা বা প্রতারণা; সুদ, মজুদকরণ, ধোকাবাজি বা ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদও এ পর্যায়ে গণ্য। কেননা এগুলো বাতিল পন্থায় অর্জিত লোকদের মাল। অত্যাচারী রাজা-বাদশা, জালিম সরকারি কর্মকর্তা বা রাজন্যবর্গের ধনসম্পদের ক্ষেত্রেও একই কথা। কেননা তারা এ সব সম্পদের প্রকৃত মালিক নন। তারা যদি তাদের হালাল মালকে তার সাথে মিশ্রিত করে এবং তা আলাদা করা সম্ভব না হয়, তাহলেও যাকাত হবে না। ইসলামী বিশ্লেষকগণ বলেছেন, খারাপ, (হারাম) মাল নিসাব পরিমাণের হলেও তার উপর যাকাত ধার্য্য হবে না। কেননা তার প্রকৃত মালিকের সন্ধান পাওয়া গেলে তার বা তার উত্তরাধিকারীর কাছে তা ফেরত দেয়াই কর্তব্য। আর তার সন্ধান পাওয়া না গেলে তা দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করে দিতে হবে। সারকথা হচ্ছে হারাম মালের মালিক শরীয়তের দৃষ্টিতে ধনী প্রমাণিত নয়। সেজন্য অবৈধ পন্থায় সম্পদ উপার্জনকারীর জন্য যেমন যাকাত ফরজ নয়; তেমনি এমন লোকদের কাছ হতে যাকাত সংগ্রহ বা উত্তেলান করাও বৈধ নয়। ইদানিং আমাদের সমাজে যা পরিলক্ষিত হচ্ছে তা হলো যারা যাকাত প্রদান করে তারা অনেক ক্ষেত্রে যাকাত, সাদাকাহ, ফিতরা, মান্নত ইত্যাদির সংজ্ঞা না জানার কারণে সবকিছুকে এক সাথে গুলিয়ে ফেলছে। সে জন্যে যাকাত দাতাকে যাকাত প্রদানের খাত এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত হওয়া তথা এ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা একান্ত জরুরি বিষয়। রাসুল (সা.) এর যাকাত প্রদানের পদ্ধতি ছিল যাকে একবার যাকাত প্রদান করা হতো পরবর্তীতে সে নিজেই যাকাত দাতার তালিকায় চলে যেত। অর্থাৎ সাবলম্বী হয়ে যেত। কিন্তু আমরা যাকে যাকাত প্রদান করি সে নিজে সাবলম্বী তো হচ্ছেই না বরং প্রতিবছরই তাকে যাকাত গ্রহণ করতে হয়। কেননা তার দারিদ্রতা দূর হচ্ছে না। সে জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে টার্গেট করে যাকাত প্রদান করা প্রয়োজন যাতে দরিদ্র লোকের দারিদ্রতা দূর হয়। তাহলেই যাকাত প্রদানের মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচন সম্ভব হবে। এক কথায়, পরিকল্পিত উপায়ে যাকাত সংগ্রহ ও বন্টনের ব্যবস্থা করতে পারলে যে কোন দেশে দারিদ্র্য বিমোচন ও দুস্থ মানবতার কল্যাণে যেকোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT