ধর্ম ও জীবন

ওজনে কম দেয়ার পরিণতি

মোহাম্মদ এহসান উদ্দিন প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৫-২০১৯ ইং ০৪:৫৪:৪৯ | সংবাদটি ৩৮০ বার পঠিত

মানবজাতির শান্তি সুখ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইসলাম হালাল ও হারামের সীমানা নির্ধারণ করেছে। হালাল সবকিছুই মানুষের জন্য কল্যাণকর ও উপকারী। আর হারাম সবকিছুই মানুষের জন্য অকল্যাণকর ও অনুপকারী। তারপরও মানুষ প্রবৃত্তির তাড়নায়, শয়তানের চোখ ধাঁধাঁনো প্রলোভনে পা দিয়ে হারামের প্রতি ধাবিত হয়ে দুনিয়া ও আখিরাত বরবাদ করে ফেলে। আল কোরআনে আছে ‘আল্লাহ যা কিছু তোমাদের জন্যে হারাম করেছেন তা তিনি নিজেই স্পষ্ট ও ভিন্ন ভিন্ন করে তোমাদের জন্য বলে দিয়েছেন’ (আল-আনআম-১১৯)।
মহান আল্লাহ যা কিছু মানুষের জন্য হারাম ঘোষণা করেছেন তার ক্ষতি শুধু ব্যক্তির সীমার মধ্যে নয় বরং কোনটির সীমা ব্যক্তির, সমাজ ও রাষ্ট্রের সীমাছাড়িয়ে যায়। দুনিয়া ও আখিরাতে এর অপরিসীম সর্বনাশ ডেকে আনে। ওজনে বা মাপে কম দেয়া তন্মধ্যে অন্যতম একটি মানবতা বিধ্বংসী কর্ম। সমাজিক শান্তি বিনষ্টকারী, ভ্রাতৃত্ববোধ ধ্বংসকারী, বিপর্যয় সৃষ্টিকারী এ কাজটি এখন মহামারির আকার ধারণ করেছে। এ সর্বনাশা কাজটিতে লিপ্ত থাকার কারণে পূর্বেকার জাতি সমূহের অনেককে আল্লাহ তায়ালা ধ্বংস করেছেন। মুছে দিয়েছেন পৃথিবী থেকে তাদের ইতিহাস। এ পাপ কাজটির ভয়াবহতা ও নিন্দা উল্লেখ করে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘সর্বনাশা পরিণতি তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়, যারা লোকের নিকট হতে মেপে নেয়ার সময় পূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করে। এবং যখন তাদের জন্য মেপে অথবা ওজন করে দেয় তখন কম দেয়। তারা কি চিন্তা করেনা যে, তারা পুনরুত্থিত হবে, সেই মহান দিবসে; যে দিন সমস্ত মানুষ দাঁড়াবে জগৎ সমূহের প্রতিপালকের সামনে।’ (সূরা মুতাফ ফিফীন-১-৬)।
অন্যত্র বলেছেন ‘মেপে দেয়ার সময় পূর্ণমাপে দিবে এবং ওজন করবে সঠিক দাঁড়ি পাল্লায়, এটাই উত্তম ও পরিনামে উৎকৃষ্ট। (সূরা ইসরা ১৬ : ৩৫)। আর এক জায়গায় বলেন : আর আদান-প্রদান, পরিমাণ-ওজন সঠিকভাবে করবে, আমি কারও উপর তার সাধ্যাতীত বোঝা (দায়িত্ব/কর্তব্য) অর্পন করিনা। (আনআম ৬ : ১৫২)। তিনি আরো বলেন ‘ওজনে ন্যায্য মান প্রতিষ্ঠিত করো এবং মাপে কম করোনা। (আর রাহমান ৫৫ : ৯)। অপর এক স্থানে আল্লাহ তায়ালা বলেন ‘তোমরা পরিমাণ পূর্ণ কর এবং লোকদের পক্ষে ক্ষতিকারক হয়োনা। আর সুদৃঢ় পাল্লায় ওজন কর ও লোকদের দ্রব্যাদি কম দিও না এবং পৃথিবীতে সীমালঙ্গন করে বিপর্যয়কারী হয়োনা।’ (শুয়ারা ১৮১-১৮৩)। ওজনে বা মাপে কম দেয়া একটি বড় অপরাধ। মানবতা ও সামাজিক শান্তি বিনষ্টকারী কাজ।
ইসলাম সকল অপরাধীদের বিরুদ্ধে লড়াই ঘোষণা করেছে। অপরাধীদের সংকীর্ণ পরিধির মধ্যে পরিবেষ্টিত করে দিয়েছে। আজকের মুসলিম সমাজে ওজনে কর্ম দেয়া সঠিকভাবে তুলাদন্ড বা মাপ না দেয়ার বিষয়টি অনেক ব্যবসায়ীর কাছে একেবারে হালকা মনে হয়। অথচ এ কাজের ভয়াবহ পরিণতি অনেকেই জানেনা, আবার কেউ কেউ জেনেও লোভের কাছে পরাজিত হয়ে অতি মোনাফা লাভের আশায় এহেন গর্হিত কাজ করে যাচ্ছে। আর বরবাদ করছে দুনিয়া ও আখিরাত।
মানবতার শ্রেষ্ঠ দরদী বন্ধু হযরত মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন ‘পাঁচটি বস্তু অপর পাঁচটি বস্তুকে অবশ্যম্ভাবী করে দেয়। জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। কি সে পাঁচটি যা অপর পাঁচটি বস্তুকে অবশ্যম্ভাবী করে। তিনি বলেন : যে জাতি তাদের ওয়াদা ভঙ্গ করবে আল্লাহ তাদের উপর দুশমন পাঠিয়ে দিবেন। যারা আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাবের বিপরীত বিচার ফায়সালা করবে তাদের মধ্যে দারিদ্র প্রসারিত করে দেন। যাদের মধ্যে যিনা ব্যভিচার ও বেহায়াপনা ব্যাপক হয়ে পড়বে আল্লাহ তাদের উপর প্লেগ জাতিয় মহামারী পাঠিয়ে দেন। যারা মাপে বা ওজনে কম করে তাদের শস্য উৎপাদন হ্রাস করে দেন। যারা যাকাত দেয়া বন্ধ করে দেয় তাদের বৃষ্টি বন্ধ করে দেন। (তাবরানী)
অপর একটি হাদীসে এসেছে রাসূল (সা.) বলেছেন ‘তোমরা এমন কাজের তত্ত্বাবধানকারী বা অধিকারী হয়েছ যে কাজের কারণে আগেকার উম্মতগণ বা জাতিগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। (তিরমিযি)।
হযরত নাফে (রহ.) বলেন, ইবনে উমর (রা.) দোকানদার ও বিক্রেতাদের নিকট দিয়ে যাতায়াতের সময় বলতেন, আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিকভাবে পরিমাপ করো। কেননা যারা মাপে বা ওজনে কম দেবে তারা কিয়ামতের ময়দানে দাঁড়িয়ে থাকবে যে পর্যন্ত না তাদের শরীরের ঘাম কানের অর্ধেক পর্যন্ত হয়। (কিতাবুল কাবায়ির) ইমাম বোখারী (রহ.) এ হাদীসটি মালিক (রহ.) এবং আব্দুল্লাহ ইবনে আউন (রহ.) মারফত নাফী হতে বর্ণনা করেছেন। ইমাম মুসলিম (রহ.) ও দুটি ভিন্ন ধারা থেকে এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। (ফাতহুলবারী ৮/৫৬৫, মুসলিম ৪/২১৯৫-২১৯৬)
ওজনে কম দেওয়ায় শুয়াইব (আ.) এর জাতিকে ধ্বংস করা হয়। হযরত শুয়াইব (আ.) প্রেরিত হয়েছিলেন মাদিয়ান সম্প্রদায়ের প্রতি। হযরত শুয়াইব (আ.) ছিলেন হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর তৃতীয় স্ত্রীর কাতুরার ঘরের পুত্র মাদিয়ানের বংশধর কোন কোন বর্ণনা মতে হযরত শুয়াইব (আ.) হযরত সালেহ (আ.) এর বংশধর ছিলেন। ধারণা করা হয় বর্তমান সিরিয়ার ‘মুয়ান’ নামক স্থানে কউমে শুয়াইবের বাসস্থান ছিল। মাদইয়ান বাসীদের মূল এলাকাটি হেজাযের উত্তর পশ্চিমে এবং ফিলিস্তিনের দক্ষিণে লোহিত সাগর ও আকাবা উপসাগরের উপকুলে অবস্থিত ছিল। মাদয়ানের বর্তমান নাম আলবিদা, এ এলাকাটি একটি প্রসিদ্ধ জনপদ। সৌদি আরবের শেষ প্রান্তে মিশরের সীমান্ত এলাকায় এখনো শুআইব (আ.) জাতির বিভিন্ন চিহ্ন রয়ে গেছে। মাদয়ানবাসী পার্থিব লোভ লালসায় মত্ত হয়ে পারষ্পরিক লেনদেনের সময় ওজনে কম দিয়ে মানুষের হক অত্মসাৎ করত। মহান আল্লাহ তায়ালার সাথে শরীক স্থাপন করত। তারা গাছপালা, মুর্তিপূজায় লিপ্ত থাকত। দুর্নীতি, রাহাজানি, ছিনতাই ও মজুদদারির মত জঘন্য অপরাধ কাজ তাদের সমাজের মধ্যে বিষবাস্পের মত ছড়িয়ে পড়ে। এগুলোকে তারা পাপ মনে করত না। বরং তারা গর্ববোধ করত। শুয়াইব (আ.) তাদেরকে তাওহিদের দাওয়াত দিয়ে ওজনে কম দেয়ার মত জঘন্য মানসিকতা পরিহার করার উপদেশ দেন। পবিত্র কোরআনে তাদের কথা আলোচনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন; ‘আর মাদয়ান বাসীদের নিকট তাদের ভাই শুয়াইবকে পাটিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই, তোমাদের রবের কাছ থেকে তোমাদের নিকট স্পষ্ট প্রমাণ এসেছে। কাজেই তোমরা মাপ ও ওজন ঠিকভাবে দেবে। লোকদেরকে তাদের বস্তু কম দেবে না, এবং দুনিয়ায় শান্তি স্থাপনের পর বিপর্যয় ঘটাবেনা। তোমরা মুমিন হলে তোমাদের জন্য এটাই কল্যাণকর। (আরাফ-৮৫) এ গর্হিত ও সমাজ বিরোধী কাজের জন্য আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করেন ভূমিকম্প দ্বারা। ফলে তারা নিজ নিজ ঘরে উপুড় হয়ে মরে পড়ে থাকে। প্রথমে কয়েকদিন তাদের বস্তিতে ভীষণ গরম পড়ে, ফলে গোটা জাতি ছটফট করতে থাকে। অতঃপর নিকটস্থ একটি গভীর জঙ্গলের উপর গাঢ় মেঘমলো দেখা দেয়। ফলে জঙ্গলে ছায়া পড়ে এবং শীতল বাতাস প্রবাহিত হয়। এ দৃশ্য দেখে বস্তির সবাই জঙ্গলে জমায়েত হয়। এভাবে অপরাধীরা কোন রূপ গ্রেফতারী পরওয়ানা ও সিপাহি মন্ত্রীর প্রহরা ছাড়াই নিজ নিজ পায়ে হেটে বধ্যভূমিতে গিয়ে পৌঁছে। যখন সবাই সেখানে একত্রিত হয়, তখন মেঘমালা থেকে অগ্নি বৃষ্টি বর্ষিত হয় এবং নীচের দিক থেকে শুরু হয় ভূমিকম্প। ফলে সবাই নাস্তানাবুদ হয়ে যায়। ওজনে কম দেয়া, ধোকাবাজী করা, অন্যের হক নষ্ট করা, কোন মুমিন নারী বা পুরুষকে কষ্ট দেয়া হারাম।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘প্রতারণার কুফল প্রতারণাকারীকেই ভোগ করতে হবে’ (ফাতির : ৪৩) নবীজি বলেছেন প্রতারক ও ধোকাবাজ জাহান্নামে যাবে।
নবীজি আরো বলেছেন, প্রতারক, কৃপন এবং উপকার করে যে খোঁটা দেয়, তারা কেউই জান্নাতে যেতে পারবেনা। আল্লাহ আমাদের সকলকে ইসলামের সকল অনুশাসন মেনে চলার তাওফিক দিন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT