ধর্ম ও জীবন

কুরআন নাজিলের মাসে আমাদের করণীয়

ইমদাদুল হক যুবায়ের প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৫-২০১৯ ইং ০৪:৫৫:৩৯ | সংবাদটি ৩১৯ বার পঠিত

মুমিনের সর্বশ্রেষ্ঠ যিক্র হলো কুরআন তিলাওয়াত। কুরআন কারীমের একটি আয়াত শিক্ষা করা ১০০ রাক‘আত নফল সালাতের চেয়েও উত্তম বলে হাদিসে বলা হয়েছে। যদিও সারা বৎসরই তিলাওয়াত করা উচিত। তদুপরি রমজান মাসে বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর বিশেষ সুন্নাত, যাতে রয়েছে অতিরিক্ত সাওয়াব ও বরকত।
কুরআন সাধারণভাবে দিনরাত সব সময়ে পাঠ করা যায়। তবে মুমিনের কুরআন পাঠের বিশেষ সময় হলো তাহাজ্জুদের মধ্যে কুরআন তিলাওয়াত করা। তারাবিহে এক বা একাধিকবার পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াত বা শ্রবণ করাও গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। এরূপ রাতের তিলাওয়াতের কথাই রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন এভাবে-‘সাওম ও কুরআন বান্দার জন্য শাফা’আত করবে। সাওম বলবে : হে রব, আমি সাওম পালনকারীকে দিনের বেলায় খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত রেখেছি, কাজেই তার পক্ষে আমার শাফা’আত কবুল করুন। কুরআন বলবে : হে রব, আমি রাতের বেলায় তাকে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, কাজেই তার পক্ষে আমার শাফা’আত কবুল করুন। তখন তাদের উভয়ের শাফা’আত কবুল করা হবে।’ (মাজমাউয যাওয়াইদ, খন্ড-১০, পৃ. ৩৮১)
কুরআনুল কারীম তিলাওয়াতের ন্যায় তা শোনাও একইরূপ সাওয়াব। এজন্য তারাবিহের সালাতে পরিপূর্ণ আদবের সাথে মনোযোগ দিয়ে কুরআন শুনতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমরা খুবই অবহেলা করে থাকি। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নাত হলো ধীরে ধীরে ও টেনে টেনে তিলাওয়াত করা এবং প্রত্যেক আয়াতের শেষে থামা। এভাবে তিলাওয়াত করলেই তিলাওয়াতের সাওয়াব পাওয়া যাবে এবং এরূপ তিলাওয়াত শুনলেও তিলাওয়াতের মতই সাওয়াব পাওয়া যাবে। তাড়াহুড়ো করে কুরআন পড়তে হাদিসে কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু আমরা তারাবিহের সালাতে হাফেযদেরকে দ্রুত পড়তে বাধ্য করি। ফলে কুরআনের সাথে বেয়াদবী হয়। এছাড়া এরূপ পাঠে কুরআনের অনেক শব্দই হাফেজদের মুখের মধ্যে থেকে যায়, ফলে মুক্তাদিরা সুস্পষ্টভাবে পুরো কুরআন শুনতে পান না। এতে কোনোভাবেই খতমের সাওয়াব পাওয়া যায় না। সুন্নাত পদ্ধতিতে তিলাওয়াত করলে হয়ত এক ঘন্টা লাগে। আর এরূপ দ্রুততার সাথে পড়লে হয়ত ৪০ বা ৪৫ মিনিট লাগবে। মাত্র ১৫ বা ২০ মিনিটের জন্য আমরা অগণিত সাওয়াব থেকে বঞ্চিত হই, উপরন্তু দ্রুত পড়ার কারণে গোনাহ হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। আমাদের উদ্দেশ্য রাকাত গণনা বা খতম করেছি দাবি করা নয়, আমাদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সাওয়াব অর্জন করা। আর সাওয়াব পেতে হলে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নির্দেশ মতই তারাবিহের সময় কুরআন তিলাওয়াত ও শ্রবণ করতে হবে।
তিলাওয়াত ও শ্রবণ উভয় ক্ষেত্রেই কুরআনের অর্থ বুঝলেই শুধু পরিপূর্ণ সাওয়াবের আশা করা যায়। অধিকাংশ মুসলিমই না বুঝে কুরআন পড়েই অভ্যস্ত। তবে আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ বারবার বলেছেন যে, কুরআন নাজিলের উদ্দেশ্য হলো-যেন মানুষেরা তা বুঝে, চিন্তা করে এবং উপদেশ গ্রহণ করে। যেমন-আল্লাহ তায়ালা বলেছেন : ‘এক বরকতময় কল্যাণময় গ্রন্থ আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি যেন তারা এর আয়াতসমূহ অনুধাবন করে এবং বোধশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তিগণ উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সূরা সাদ, আয়াত : ২৯)
আল্লাহর কিতাব পাঠ করাকে কুরআন কারীমে ‘তিলাওয়াত’ বলা হয়েছে, কারণ তিলাওয়াত এর শাব্দিক অর্থ পিছে চলা বা অনুসরণ করা। শুধুমাত্র না বুঝে পাঠ করলে তিলাওয়াত হয় না। তিলাওয়াত মানে পাঠের সময় পাঠকের মন পঠিত বিষয়ের পিছনে চলবে, এরপর জীবনটাও তার পিছনে চলবে। আল্লাহ বলেনÑ‘যাদেরকে আমি কিতাব প্রদান করেছি তারা তা হকভাবে তেলাওয়াত করে, তারাই এই কিতাবের উপর ঈমান এনেছে।’ (সূরা আল বাকারা, আয়াত : ১২১)
আল্লাহ বলেছেন-‘নিশ্চয় আমি কুরআনকে বুঝার ও উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছি, কে আছে উপদেশ গ্রহণ করার?’ (সূরা কামার, আয়াত : ১৭, ২২, ৩২, ৪০)
আপনি যদি আরবী একটি শব্দ বা বাক্যও না বুঝেন, কিন্তু কুরআনের একটি অর্থানুবাদ নিয়ে আরবী আয়াত ও বাংলা অর্থ পাশাপাশি পড়ে যান, তবে আপনি দেখবেন যে, অলৌকিকভাবে অর্থটি হৃদয়ে গেঁথে যাচ্ছে। এভাবে দুএকটি খতম পড়ার পরে আপনি যখন সালাতে দাঁড়াবেন এবং ইমামের তিলাওয়াত শুনবেন, তখন দেখবেন যে, আরবী শব্দের অর্থ না জানলেও আয়াতের অর্থটি আপনার হৃদয়ে জাগরুক হচ্ছে।
রমজানে যতটুকু আমরা কুরআন চর্চা করছি, ততটুকুও যদি বুঝে করতাম তাহলে অনেক বেশি তাকওয়া অর্জন করতে পারতাম। আমরা দিনে তিলাওয়াতে এবং তারাবিহে, ইশা, ফজরে বা মাগরিবে ইমামের মুখে কুরআনের ভাষায় পিতামাতা, এতিম, প্রতিবেশী, দরিদ্র ও অন্যদের অধিকারের কথা, হক কথা ও ইনসাফের নির্দেশ, জুলুম, মিথ্যা, ওজনে কম দেওয়া, ফাঁকি দেওয়া, গীবত করা, উপহাস করা, অহঙ্কার করা ও অন্যান্য পাপের ভয়াবহতা ইত্যাদি সবই শুনছি, কিন্তু কিছুই বুঝাতে পারছিনা বা না বুঝতে তা বুঝে পড়ার চেষ্টা করছি না। বর্তমানে বাংলা ভাষায় গ্রহণযোগ্য অনেক তাফসীরুল কুরআন গ্রন্থ বা শাব্দিক অর্থসহ বঙ্গানুবাদ কুরআন অহরহ বিভিন্ন লাইব্রেরীতে পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া কুরআন ও হাদীসের অনেক এপস আমরা মোবাইলে ব্যবহারের মাধ্যমে সহজে কুরআন-হাদীস অধ্যায়ন করতে পারি। শুধু প্রয়োজন আমাদের ইচ্ছা ও পরিকল্পনার। তাই আসুন, আমরা সকলেই রমজান উপলক্ষে আল-কুরআনের ছাত্র হয়ে যাই। কুরআনের বিশুদ্ধ তিলাওয়াত শিক্ষা করি এবং কুরআনের অর্থ বুঝার চেষ্টা করি। তাহলে আমরা কুরআন তিলাওয়াতের পরিপূর্ণ সাওয়াব ও বরকত লাভ করতে পারব। রমজান মাসে আমরা তারাবিহে অন্তত এক খতম কুরআন শুনি। এ সময়ে যদি কিছুটা হলেও অর্থ বুঝতে পারি তাহলে আমাদের ঈমান বৃদ্ধি পাবে এবং আমরা সত্যিকার আল্লাহ-ভীরু মুত্তাকীদের গুণাবলী অর্জন করতে পারব।

শেয়ার করুন
ধর্ম ও জীবন এর আরো সংবাদ
  •   সুস্থতা আল্লাহ তা’আলার মহান নেয়ামত
  • মুমিনের মেরাজ
  • যে আমলে মিলবে জান্নাতের ফল লাভ
  • তাফসিরুল কুরআন
  • মুসলমানদের পারস্পরিক সর্ম্পক ভ্রাতৃত্বের
  • মসনবি শরিফের একটি ঘটনা
  • ইসলামে বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব
  • বাইতুল্লাহর সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর বন্ধন
  • তাফসিরুল কুরআন
  • আরাফাহের খুতবা : মুসলিম জাহানের অনবদ্য দিকনির্দেশনা
  • কোরবানি ও প্রাসঙ্গিক মাসাইল
  • পবিত্র মদিনা মুনাওয়ারার মর্যাদা
  • তাফসিরুল কুরআন
  • সাবাহি মক্তবের আধুনিক সংস্করণ
  • মুসলিম উম্মাহর একতার নিদর্শন হজ্ব
  • তাফসিরুল কুরআন
  • ন্যায়বিচার একটি ইবাদত
  • সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় : স্নেহ-ভালবাসা
  • মধুর ডাক
  • তাফসিরুল কুরআন
  • Developed by: Sparkle IT