উপ সম্পাদকীয়

ভেজাল নির্মূলে যা প্রয়োজন

মোহাম্মদ আব্দুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৫-২০১৯ ইং ০০:১৪:১৪ | সংবাদটি ৮৩ বার পঠিত

বার বার জরিমানা বার বার ভেজাল। কিন্তু এভাবে হবেনা। বার বার দেশের মানুষ প্রতারক ব্যবসায়ীদের প্রতারণার শিকার হয়ে ভেজাল খাদ্য কিনে খায়। এতে শরীর অসুস্থ হয় এবং টাকার হয় অপচয়। এ দেশ স্বাধীন করতে ত্রিশ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছিলো এবং প্রায় দুই লাখ বাঙালি নারী তাঁদের সম্ভ্রম হারিয়েছিলো। তারপরও আশায় বুক বেঁধে এই জাতি বেঁচে রয় শুধু নামে একখন্ড স্বাধীন দেশ পাবার জন্য নয়। আশা করেছিলো অন্তত তিনবেলা পেট ভরে ভালো খেয়ে শান্তিতে সুস্থ শরীরে বেঁচে জীবন কাটাবে। আর ধীরে ধীরে দেশটি এগিয়ে যাবে সমৃদ্ধির পথে। স্বাধীনতার আটচল্লিশ বছর পর দেশে অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে চোখে পড়ার মতো। কিন্তু মানুষের প্রথম মৌলিক অধিকার নিয়ে এ দেশের মানুষ প্রতিদিন থাকে আশঙ্কায়। যা-ই খাচ্ছি কি খাচ্ছি? পত্রিকার পাতায় নিত্য খবর আসে বাজার সয়লাব ভেজাল খাদ্য পণ্যে। আমরা বাংলাদেশের মানুষ এমনিতেই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নানান রকম স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছি। এর মধ্যে বর্তমানে প্রধানতম এক সমস্যা হলো অসাধু মানুষ কর্তৃক ভেজাল খাদ্য পণ্যের ব্যবসা। ভেজাল খাদ্য বাজারজাত করে প্রতারক চক্র সহজ সরল মানুষকে প্রতিনিয়ত ঠকিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য অতি সম্প্রতি ৫২টি মানহীন পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এর পরও কি ভেজাল থেকে মুক্ত হবে বাজার?
কোন ব্যবসায় নেই ভেজাল। দেশের মাংসের দোকান, মিষ্টির দোকান, রেস্টুরেন্ট, ফাস্টফুডের দোকান থেকে শুরু করে চমৎকার নামের দেশের বড় বড় শহরের সুপার সপগুলোতে মাঝে মাঝেই অভিযান চলে পণ্যের দাম ও মান ঠিক কিনা তা দেখার জন্যে। এসব অভিযান পরিচালনা করেন সরকারের নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন বা বিএসটিআই দেশের মান নিয়ন্ত্রণকারী একমাত্র স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও রয়েছে নিয়মিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। আমরা খবর পাই প্রায় প্রতিবারেই একই দোকান কিংবা একই কোম্পানির ভিন্ন ভিন্ন শাখায় ত্রুটি ধরা পড়ে এবং অভিযান পরিচালনাকারী দল ভেজাল পণ্য জব্দ করার পাশাপাশি ১০ হাজার, ৩০ হাজার, ১ লাখ, দুই লাখ ইত্যাদি পরিমাণের টাকা জরিমানা করে থাকেন। কিন্তু পরবর্তীতে ওরা শুদ্ধ হচ্ছে না। ওই সব দোকান বার বার একই রকম ভেজাল ব্যবসা করে এবং বার বার জরিমানা মাথা পেতে লয়। ওদের অসৎ চরিত্র বদলায়না কিছুতেই। কারণ তারা ঠিকই জানে, যে পরিমাণ টাকা জরিমানা তারা একবারে দিয়ে থাকে তারচেয়ে আরো অনেকগুণ বেশি লাভবান হয় শুধু ভেজাল ও মেয়াদ উত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি করে। এতে করে টাকা জরিমানা জাতীয় শাস্তি তাদের কাছে অতি নগণ্য ব্যাপার এবং একটি হালকা মেজাজের সমঝোতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এতে এদের অনৈতিক চরিত্রের উপর কোনো প্রভাব পড়েনা, এরা বদলায় না। কাজেই এভাবে শুদ্ধি অভিযান সফল হবেনা মনে করি। এ নিয়ে সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরো কঠোর হতে হবে জনস্বাস্থ্য রক্ষার স্বার্থে।
আমি এখানে একটি উদাহরণ দিয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ করছি। আমরা ফুটবল মাঠে দেখেছি একজন ফুটবল খেলোয়াড় বার বার একই রকম ফাউল করার সুযোগ পাননা। সেখানে হলুদ কার্ড একবার, দুইবার এবং পরবর্তী অপরাধের শাস্তি হিসেবে লালকার্ড দেখিয়ে খেলার মাঠ থেকে বের করে দেয়া হয়। ব্যবসায়িক অঙ্গনকে সেভাবে দেখতে হবে। আমাদের ব্যবসার মাঠকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হলে এ ধরণের পদক্ষেপ নিতে হবে। এ খুব কঠিন হবে বলে মনে হয় না। এর জন্য লোকবল বাড়ানোরও প্রয়োজন পড়বে না। শুধু প্রয়োজন সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল মনোভাব এবং ধর্মীয় ও নৈতিক কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাজের প্রতি শ্রদ্ধা। ভেজালের বিরুদ্ধে সফল অভিযান পরিচালনা করার জন্য আমি তিনটি প্রস্তাব এখানে উত্থাপন করতে চাই। এই প্রস্তাবনা হলো নি¤œরূপ- আমি মনে করি, যখন কোনো মাংসের দোকান বা কোনো বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে হাতেনাতে ধরে ফেলবেন, তখনই নির্দিষ্ট অভিযান পরিচালনাকারী উক্ত ব্যবসায়িকে অপরাধ ও দোকানের ধরনের উপর ভিত্তি করে প্রথমবার নির্দিষ্ট অংকের আর্থিক জরিমানা এবং হলুদ কার্ড দেখিয়ে সতর্ক করে দিবেন। অবশ্যই এই দোকান পরবর্তী সময়ে ঘন ঘন অভিযানের লক্ষ্যে থাকবে। যদি এই একই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরের বার অর্থাৎ দ্বিতীয়বার ভেজালে ধরা পড়ে তাহলে পূর্বের চেয়ে পাঁচগুণ বেশি জরিমানা করা হবে এবং দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখিয়ে কঠোর হুশিয়ারী দিয়ে আসবেন। আর এভাবে যদি একই দোকান কিংবা প্রতিষ্ঠান তৃতীয় ও চূড়ান্ত অভিযান পর্বে ভেজাল পণ্য ব্যবসায় জড়িত প্রমাণিত হয় তবে অবশ্যই ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক ও ম্যানেজারের বিরুদ্ধে অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে জরিমানা ও জেল দেয়ার পাশাপাশি লাল কার্ড দেখিয়ে সম্পূর্ণ দোকান মালামাল সহ তাৎক্ষণিক জব্দ এবং ব্যবসার লাইসেন্স বাতিল করে দিতে হবে।
আমরা জানি সরকার প্রধান দেশে ভেজাল খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছেন এবং এ জন্যই যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রতি নিয়মিত বাজার তদারকি বা মনিটরিং এর নির্দেশনা দিয়েছেন। এমন কি পত্রিকায় খবর পেয়ে আমাদের মাননীয় আদালত মাঝে মাঝেই স্ব-প্রণোদিত হয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়ে থাকেন। এখন কথা হলো যাদেরকে নিয়ে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা হবে তাদের মধ্যে যদি শুদ্ধস্বর ও শুদ্ধ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দেখা না মিলে তবে হবে না। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষকে সদাচারী হতে হবে সর্বাগ্রে। নিশ্চয়ই আমরা এতোটা দুর্ভাগা হইনি যে আমাদের আশা ভরসার জায়গায় একেবারেই সৎলোক পাবোনা। আমরা সাধারণ মানুষ আশায় থাকি আমাদের পণ্যের মান, দাম ও মেয়াদ ঠিক আছে কি-না তা বি.এস.টি.আইয়ের সঠিক তত্ত্বাবধানে থাকবে। একই সাথে আমাদের ভ্রাম্যমাণ অভিযানের দ্বারা ভেজালের অবসান ঘটবে। তাহলে আমরা এভাবেই ভেজালমুক্ত খাদ্য খেয়ে সুস্থ থাকতে পারবো। আমাদের সকলের নৈতিক চরিত্র ঠিক থাকুক এবং সকলের বোধোদয় ঘটুক।
লেখক : কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি
  • বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা
  • ভারতের জাতীয় উন্নয়ন ও ভারত মহাসাগর
  • জীবনে শৃঙ্খলাবোধের প্রয়োজনীয়তা
  • চলুক গাড়ি বিআরটিসি
  • জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবেলায় আমাদের করণীয়
  • নির্ধারিত রিক্সাভাড়া কার্যকর হোক
  • নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা
  • খাদ্যে ভেজাল রোধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে
  • মুর্তাজা তুমি জেগে রও!
  • সন্তানের জীবনে বাবার অবদান
  • এবার কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভংগ হোক
  • বন উন্নয়নে মনোযোগ বাড়ুক
  • একজন অধ্যক্ষের কিছু অবিস্মরণীয় প্রসঙ্গ
  • গ্রামাঞ্চলে বৃক্ষ রোপণ
  • শান্তির জন্য চাই মনুষ্যত্বের জাগরণ
  • উন্নয়ন ও জনপ্রত্যাশা পূরণের বাজেট চাই
  • মোদীর বিজয় : আমাদের ভাবনা
  • অধিক ফসলের স্বার্থে
  • টেকসই উন্নয়ন ও অভিবাসন সমস্যা ও সমাধানে করণীয়
  • Developed by: Sparkle IT