উপ সম্পাদকীয়

সাম্প্রতিক কথকতা

ব্রজেন্দ্র কুমার দাস প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৫-২০১৯ ইং ০০:১৪:৫৪ | সংবাদটি ১৫৯ বার পঠিত

আমার বটেশ্বর এলাকার পত্রিকা বিক্রেতা ভাইটির সাথে আমার দেখা হলেই বলেন, “দাদা ‘দেশ রূপান্তর পত্রিকাটি নেন, দাম কম কিন্তু ভালো ভালো খবর আছে।” তার কথা অমান্য করিনি। পত্রিকাটি কিনলাম। ভালো ভালো খবরের মধ্যে পেলাম এস.এস.সি পরীক্ষার ফল প্রকাশ এবং নুসরাতের ভাইয়ের চাকুরীতে যোগদান। তবে খবর দু’টি কিন্তু শুধু ‘দেশ রূপান্তর’ পত্রিকারই নয় দেশের সব জাতীয় এবং স্থানীয় পত্রিকায়ই প্রকাশিত হয়েছে। দু’টি খবরই বিশেষ করে গুরুত্ব বহন করে এবং নানা আলোচনার দাবি রাখে।
(এক) এস.এস.সি পরীক্ষার ফল প্রকাশের সচিত্র প্রতিবেদনটি প্রথম পাতায় পত্রিকাটি প্রকাশ করে। নীচে লিখা-‘এস.এস.সি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ভিকারুননিসা নুন স্কুল এন্ড কলেজের উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের উল্লাস”। কে না জানে ভিকারুননিসা নুন স্কুল এন্ড কলেজের কথা! দেশের ছাত্রী আর তার পিতামাতার ভাগ্যে জুটে এ প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করা বা পড়াশুনা করানোর! ছবি দেখলেই ধারণা করতে অসুবিধে হয় না যে, এই ভাগ্যবতী মেয়েরা কোন পরিবারের মেয়ে। অবশ্যই অভিজাত পরিবারের। এই স্কুল এন্ড কলেজের মেধাবী মেয়েরা এই সমাজ এই দেশের গর্ব। বলতে গেলে সমাজ-দেশের ভবিষ্যও বটে। তবে এটাও সত্যি যে, দেশের লাখো লাখো সুবিধা বঞ্চিত মেয়েদের মধ্যে ওরা যে সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ওই স্কুলের সবাই জিপিএ-৫ বা গোল্ডেন-৫ পেয়েছে। এজন্যে সারাদেশের মানুষ তাদেরকে সাধুবাদ জানায়। কিন্তু এই ‘দেশ রূপান্তর’ পত্রিকাটিরই শেষের পাতার শেষের পৃষ্ঠায় প্রকাশিত সচিত্র খবরটি কি সকলের জন্য আরো আরো গর্বের নয়? নয় কি শ্রদ্ধা-ভালোবাসা-আদরের! সচিত্র খবরের শিরোনামটি হলো-‘পায়ে লিখে জিপিএ-৫ তামান্নার’ কোন কোন পত্রিকায় শিরোনাম লিখে ‘তাক লাগাল তামান্না-পা দিয়ে লিখে জিপিএ-৫।’ কে এই তামান্না? যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া ইউনিয়নের আলিপুর গ্রামের রওশন আলীর মেয়ে তামান্না নুরা। দু’টি হাত ও একটি পা বিহীন অবস্থায় তামান্নার জন্ম। অন্য শিক্ষার্থীদের মতো সে হেঁটে-চলে বেড়াতে পারে না। হুইল চেয়ার, মা-বাবার সহায়তা বা তার সহপাঠীদের সহায়তা ছাড়া সে চলতে পারে না। তার মা খাদিজা পারভিন শিল্পী। মায়ের কাছে প্রথমে অক্ষরজ্ঞান নিতে থাকে তামান্না। খাদিজা প্রথমে চেষ্টা করেন মেয়েকে মুখ দিয়ে লেখা শেখাতে। দু’টি হাতছাড়া জন্ম নেয়া সন্তানকে প্রথমে চেষ্টা করেন মুখ দিয়ে লেখা শেখাতে। কিন্তু পেন্সিলের খোঁচায় মুখ রক্তাক্ত হলে মা তাকে তার একমাত্র পা দিয়ে লেখা শেখানোর চেষ্টা করে তিনি সফল হন। তারপরের ইতিহাস তো সবারই জানা। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় তামান্না জিপিএ-৫ পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
তামান্নার বাবা খুবই গরীব মানুষ। একটি নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিনা বেতনে তিনি চাকরী করেন এবং টিউশনীর টাকায় সংসারের সব খরচ চালান। পরীক্ষার ফল সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তামান্না নুরা বলেন, “শুধু বাংলায় এ গ্রেড পাইনি বলেই গোল্ডেন হয়নি। আর বাংলা পরীক্ষা পা দিয়ে লিখে শেষ করতে পারিনি। এ কারণেই হয়তো খারাপ হয়েছে।” এরপর কি আমরা ধরে নিতে পারিনি যে দেশের সব নামীদামী অভিজাত স্কুলের ধনী-মানী-গুণী শিক্ষিত অভিভাবকগণের সন্তানদের মতোই তামান্না নুরাও একজন গোল্ডেনধারী! কিন্তু তামান্নার পরিবার, পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথে কী কারো তুলনা হয়? হয়না। হতে পারে না। হতে পারে তামান্না শারীরিক প্রতিবন্ধী। কিন্তু তার আছে আত্মপ্রত্যয়ী সাহসী জীবন। তাকে কি আমরা কেউ মানসিক প্রতিবন্ধী বলতে পারি? নাকি বলা উচিত? সমাজ-দেশের কোন মেধাবী মেয়েটির পাশে তামান্না বেমানান! অন্তত চিন্তা-চেতনায়-মেধায়? কিন্তু তাকে স্কুলে ভর্তি করাতে গিয়ে নানা বাঁধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয় তামান্নার গর্বিতা মা শিল্পীকে।
সরকারি স্কুলের শিক্ষকরা তাকে ভর্তি নেননি। তাদের প্রশ্ন ছিল দুই হাত ছাড়া জন্ম নেওয়া শিশুটি কী করে লিখবে? তারপর মায়ের আকুতি দেখে বাড়ির পাশের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আজমাইন এডাস স্কুলের কর্তৃপক্ষ তাকে ভর্তি করে নেয় নার্সারি শ্রেণীতে। অন্তরের অন্তস্থল থেকে ধন্যবাদ জানাতে হয় আজমাইন এডাস স্কুলের কর্তৃপক্ষকে। কিন্তু যে সরকারি স্কুলের শিক্ষক মহোদয়গণ তামান্নার ভর্তি নেননি তারা এখন কি বলবেন! উনাদেরকে কি বলা যায় উনারাই বলুন। উনাদের উদ্দেশ্যে শুধু এটুকুই বলবো, দয়া করে উদার মন নিয়ে তামান্নার সাথে দেখা করে তার ভবিষ্যত জীবনের জন্য একটু আশীর্বাদ করে আসুন। আসলে সত্যি কথা বলতে কি তামান্না তো আপনাদের স্কুলের ছাত্রী হওয়ারই কথা ছিল! আর আমাদের মতো দু’কলম লিখনেওয়ালারা তামান্নার জন্য কি-ই বা করতে পারি! যেটুকু পারি তাতে শুধুই মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী (নারী) এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মহান হৃদয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারি মাত্র।
(দুই) “চাকরিতে যোগ দিলেন নুসরাতের ভাই।” খবরে বলা হয় ফেনীর সোনাগাজীতে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার শিকার নুসরাত জাহান রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ঢাকার এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ট্রেইনি এ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (ক্যাশ) পদে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজে যোগদান করেছেন। আর এসবই হয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সংবেদনশীল মহৎ হৃদয়ের কারণে। যোগদান করে নোমান দেশ রূপান্তর’ এর মাধ্যমে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিজাম চৌধুরীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। উনারা আমার বোন নুসরাতের ওপর নৃশংসা ঘটনার পর আমাদের পরিবারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী আমার বোন হত্যার বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। শুধু আমার পরিবার নয়, দেশবাসীও নুসরাত হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চায়।”
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ যুগান্তকারী সিদ্ধান্তকে অবশ্যই স্বাগত জানাবেন দেশের মানুষ। দেশবাসী আশ্বস্তও হয়তো হয়েছিলেন এই ভেবে যে এবার ধর্ষণকারীদের বিচার হবে। ঐসব কুলাঙ্গাররা বুঝি এবার সংযত হবে। দেশের নারী সমাজের মন থেকে ধর্ষণের ভয় দূর হবে। নিশ্চিন্তে মেয়েরা চলতে পারবে মাঠে-ঘাটে-বাসে। কিন্তু না। দেখে শুনে মনে হয় ভয়ঙ্কর চিত্রটা মোটেও পাল্টায়নি। একই পত্রিকায় শিরোনাম দেখতে হলো-‘গৃহবধু শিশুসহ ধর্ষণের শিকার-৭। ৭.৫.২০১৯ তারিখের দৈনিক ভোরের কাগজে খবরের শিরোনাম আসে-“আরো এক ছাত্রীর শ্লীলতাহানি করেন অধ্যক্ষ সিরাজ’, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি রোধে কমিটি গঠনে অনীহা! হাইকোর্টের নির্দেশ উপেক্ষিত’, ‘৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণ, চা বিক্রেতা রিমান্ডে’, ‘একই পরিবারের তিন ভক্তকে ধর্ষণের দায়ে ভন্ডপীর গ্রেপ্তার’, ‘৩ ছাত্রীকে যৌন হয়রানির হোতা মাদ্রাসা শিক্ষককে রক্ষার চেষ্টা’, ‘স্কুল ছাত্রী আত্মহননের প্ররোচনা, জামিনে এসে বাদীকে হুমকির অভিযোগ’, কিশোরগঞ্জে চলন্ত বাসে নার্সকে ধর্ষণের পর হত্যা চালক-হেলপারসহ আটক ৫ (ভোরের কাগজ ৮.৫.২০১৯)।
তাহলে উপায়? প্রধানমন্ত্রীর সক্রিয় হস্তক্ষেপের পরও দেশে ধর্ষকদের তান্ডব কিছুতেই থামছে না বলে কি ঐসব পশুদের কাছে হার মানবো? আমাদের সাহসী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রশাসন-আইন-বিচার বিভাগ সহ সমাজের সুস্থ চিন্তার সকল মানুষের সক্রিয় সহযোগিতায় ঐ পাশবিক শক্তিকে আমরা রুখে দেবো। ওদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবেই। ধর্ষকদের ধর্মের বাণী শুনিয়ে কোন ফল মিলবে না। ওদের জন্য শুধুই শাস্তি, শাস্তি এবং শাস্তিই।
প্রয়োজনে ধর্ষকদের জন্য বিশেষ আদালতে দ্রুত বিচারকার্য চালানো যায় কি-না সেটা সংশ্লিষ্ট সবাইকে বোধহয় ভেবে দেখার সময় এসেছে। ঐসব কুলাঙ্গাররা তো বার বার ধৈর্য-সহ্যের সীমা লঙ্ঘন করছে। গুটিকয় ধর্ষকের কাছে পরাজয়তো জাতি-দেশ-সমাজের লজ্জা! সাহিত্যিক আর্নেষ্ট হেমিংওয়ে যথার্থই বলেছেন, ‘মানুষ পরাজয়ের জন্য সৃষ্টি হয়নি। তাকে ধ্বংস করা যায়, কিন্তু হারানো যায় না। ওরা তো অমানুষ। আমরা মানুষ। পরাজয়ের জন্য আমাদের সৃষ্টি হয়নি একথাটিই সবাইকে মনে রাখতে হবে। আমরা হয়তো সব ব্যাপারে সফলতা অর্জন করতে পারিনি কিন্তু তারপরও হতাশায় কোন সমাধান আসতে পারেনা! এ প্রসঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার স্মরণীয় একটি উক্তি বিবেচনায় আনা যেতে পারে। তিনি বলেছেন, ‘আমার সফলতার ভিত্তিতে আমাকে বিচার করোনা, আমাকে বিচার করো আমার ব্যর্থতা এবং ব্যর্থতার পর ঘুর দাঁড়ানোর ভিত্তিতে।’ মানুষরূপী পশুদের প্রতিহত করতে আমাদের নুসরাতদের আত্মত্যাগ কখনো বৃথা যেতে পারে না। সমাজের নুসরাতরা আবারো ঘুরে দাঁড়াবে। পালাবে অমানুষ পশুর দল। হাটে-ঘাটে-মাঠে-বাসে-অফিস-আদালতে নিরাপদ হবে নারী সমাজ। নারীরা ভাবতে শিখবে নিজেদেরকে শুধুই নারী নয়, মানুষ হিসেবেও। সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলী দাস এর সাহসী উচ্চারণ-‘নিজেকে নারী না ভেবে মানুষ ভাবতে হবে’ অবশ্যই সাহসী করে তুলবে আমাদের সকল মা-বোন-প্রেমিকা-গৃহবধূ-দাদী-নানী-মাসি-পিসী সবাইকে।
পরিশেষে আসুন আমরা সবাই বিশ্বাস করি শেক্সপিয়ারের সেই অমর উক্তি-‘ভীরুরা মরার আগে বার বার মরে। সাহসীরা মৃত্যুর স্বাদ একবারই গ্রহণ করে।” নুসরাত সে শিক্ষাই দিয়ে গেলো!
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট, সাবেক ব্যাংকার।

 

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মিতব্যয়িতা
  • হংকং : কেন গণআন্দোলন
  • যানজট মুক্ত মহানগরী : কিছু প্রস্তাব
  • পানি নিয়ে ভাবনা
  • ভেজাল-দূষণ দূর করা কি খুবই কঠিন?
  • সৈয়দ মহসীন আলী : ক্ষণজন্মা রাজনীতিক
  • শিশুদের বিজ্ঞান মনস্ক করে গড়ে তোলার গুরুত্ব
  • রোহিঙ্গাঁ সমস্যা : প্রয়োজন আশু সমাধান
  • মজলিশী মুজতবা আলী
  • জলবায়ু ও পৃথিবীর বিপর্যয়
  • আমরা বই পড়া কি ভুলেই গেলাম
  • সফল হওয়ার সহজ উপায়
  • ঝুঁকিপূর্ণ রেল যোগাযোগ : প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা
  • আজকের দিন আজকের দিকে তাকাও
  • বিয়ে ব্যবস্থায় পরিবর্তন
  • কারবালার ঘটনা ও কয়েকজন সাহাবীর স্বপ্ন
  • আশুরায় সিলেটে হাদা মিয়া-মাদা মিয়ার বিদ্রোহ
  • গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শিক্ষা শহীদে কারবালা
  • যাকে দেখতে নারী তার চলন বাঁকা
  • ‘শতভাগ সাক্ষরতা’ কতদূর
  • Developed by: Sparkle IT