পাঁচ মিশালী

একজন নিভৃতচারী

মোঃ শওকত আলী প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৫-২০১৯ ইং ০০:১৬:৪৩ | সংবাদটি ১৮০ বার পঠিত



একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, রাজনীতিক ও শিক্ষানুরাগী রফিকুর রহমান লজু ১৯৪৫ সালের ২২ মার্চ সিলেট শহরের রায়নগর সোনার পাড়ায় এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মোহাম্মদ ইব্রাহিম এবং মাতা জোবেদা খাতুন। লজু নামেই তিনি সমধিক পরিচিত। তাঁর বাসার নাম ‘শিলকেতন’।
ছোটবেলা থেকেই তিনি লেখাপড়ার প্রতি খুব আগ্রহী ছিলেন। ১৯৬০ সালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করার পর সিলেট এমসি কলেজে ভর্তি হন। আইএ পাস করে তিনি ঐ কলেজেই বিএ ক্লাসে ভর্তি হন এবং অসাম্প্রদায়িক ও সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নে যোগদান করেন। আশির দশক পর্যন্ত তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। কলেজ জীবনে তিনি অত্যন্ত ন¤্র, ভদ্র ও দায়িত্বশীল কর্মী হিসেবে ছাত্র মহলে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। অতি অল্প সময়েই তিনি জেলা পর্যায়ের নেতৃত্বে উন্নীত হন।
এমসি কলেজে অধ্যয়নকালে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তিনি বেআইনী গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন এবং ১৯৬৬ সালে পাটির সদস্যপদ লাভ করেন। এ বছরেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশন করেন। গোপন পার্টির দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘদিন পার্টির গোপন ছাত্র শাখা ও ছাত্র আন্দোলন দেখভাল করেন। সিলেটের সক্রিয় রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত তিনি এমনভাবে জড়িয়ে পড়েন যে, কোনো অবস্থাতেই আর তা থেকে মুক্ত হতে পারেননি। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ঐসব আন্দোলনের সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন।
পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন গঠনের পূর্বে সিলেটে ‘সিলেট জেলা ছাত্র ইউনিয়ন’ গঠিত হয় এবং এটা ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক ছাত্র সংগঠন। এ সংগঠনটির সঙ্গে পরবর্তীতে জড়িত হয়ে তিনি অত্যন্ত বু্িদ্ধমত্তার সঙ্গে স্বীয় কর্তব্য পালনে উদ্যোগী হন। ১৯৬২ সালের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, শিক্ষা-সংকোচন নীতিবিরোধী আন্দোলন, মিস্ ফাতেমা জিন্নাহর নির্বাচন, সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনসহ এ যাবৎ কালের সবক’টি আন্দোলন সংগ্রামে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৬ সালে সিলেটে আইয়ুব খানকে পাদুকা প্রদর্শন এবং তাঁর জনসভা পন্ড করতে তিনি নেতৃত্ব দেন।
রফিকুর রহমান লজু ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলএলবি ক্লাসে ভর্তি হলেও সক্রিয় রাজনীতির কারণে আর ডিগ্রী নেয়া সম্ভব হয়নি। ছাত্রজীবন থেকে বেরিয়েই তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগদান করেন। তবে তাঁর মূল পার্টি ছিল কমিউনিস্ট পার্টি এবং এ পার্টির সঙ্গেই তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। ন্যাপের ভাঙ্গন ও দ্বিধা বিভক্তির পর সিলেটে ন্যাপ (মোজাফ্ফর আহমদ) এর রাজনীতি ও সংগঠনকে ধরে রাখতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং প্রয়াত মানিক মিয়াকে নিয়ে একক অবদান রাখেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের একজন দায়িত্বশীল সংগঠক হিসেবেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ভারতের করিমগঞ্জে স্থাপিত ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ ক্যাম্প পরিচালনার দায়িত্ব ছাড়াও তিনি যৌথ গেরিলা বাহিনী গঠনে বিশেষ অবদান রাখেন। দেশ স্বাধীন হবার পর একদিকে পার্টির (সিপিবি) দ্বিতীয় কংগ্রেসে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং অন্যদিকে জেলা কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত হন।
রফিকুর রহমান লজু যত দিন রাজনীতি করেছেন, সততা, দক্ষতা এবং নিষ্ঠার সঙ্গেই করেছেন। নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। জিয়া সরকারের আমলে ১৯৮২ সালে তিনি আড়াই মাস কারা বরণ করেন। সিলেটের জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সংগঠন যথা মফস্বল সাংবাদিকদের সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক সমিতি (ইপজা), উদীচী, মহিলা পরিষদ, বাংলাদেশ সোভিয়েট মৈত্রী সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের শাখা প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। উল্লেখ্য যে, তিনি ‘ইপজা’ সিলেট জেলা শাখার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদকও ছিলেন। ১৯৬৫ সালের ১৩ জুলাই প্রতিষ্ঠিত সিলেট প্রেসক্লাব গঠনে তিনি ছিলেন অন্যতম উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। উক্ত কমিটির সভাপতি ছিলেন আমিনুর রশীদ চৌধুরী আর সহ-সভাপতি ছিলেন নিকুঞ্জ বিহারী গোস্বামী ও মুহাম্মদ নুরুল হক। ১৯৭৪ সালের সম্মেলনেও তিনি সিলেট প্রেসক্লাবের কার্যকরী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।
রফিকুর রহমান লজু জননেতা আব্দুল হামিদ স্মৃতি সংসদ ও পীর হবিবুর রহমান স্মৃতি সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। পীর হবিবুর রহমান স্মারক গ্রন্থ এবং জননেতা আব্দুল হামিদ স্মারক গ্রন্থ (যৌথভাবে), তারা মিয়া স্মরণে ‘মনের মণিকোঠায়’ এবং প্রফেসর আবুল বশর সম্মাননা গ্রন্থেরও সম্পাদক। প্রফেসর আব্দুল আজিজ ও অন্যান্য সম্পাদিত বৃহত্তর সিলেটের ইতিহাস (দ্বিতীয় খ-) এর সম্পাদক পর্ষদের অন্যতম সদস্য ও মৃত্যুঞ্জয়ী হিমাংশু শেখর ধর স্মারক গ্রন্থেরও (যৌথভাবে) সম্পাদক। সে সঙ্গে তিনি বখতিয়ার বিবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সম্পাদক ছিলেন পর পর দু’বার। তিনি কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ এবং রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সিলেট ইউনিটের আজীবন সদস্য। পাকিস্তান আমলে তিনি এক দশকেরও বেশি সময় ঢাকার জাতীয় দৈনিক সংবাদের সিলেটস্থ নিজস্ব সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাছাড়াও দৈনিক গণবাংলা, দৈনিক আজাদ, দৈনিক বাংলার বাণী, চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত জাতীয় দৈনিক পূর্বকোণ, মাসিক ঝিনুক এর সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
রফিকুর রহমান লজুর পরিশ্রমলব্ধ লেখা ‘সিলেটের ছাত্র রাজনীতি ও ছাত্র আন্দোলন’ (১৯৪৭-১৯৭০) এবং ‘একটি অসাম্প্রদায়িক ছাত্র-সংগঠনের জন্মকথা’ শীর্ষক বই দু’টি পান্ডুলিপি প্রকাশের অপেক্ষায় আছে। তাছাড়াও তিনি শতাধিক বরেণ্য ব্যক্তিত্ব, রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক, কবি, সাহিত্যিক এবং সাংবাদিকবৃন্দের কর্মময় জীবন কাহিনীর রচয়িতা। এ লেখাগুলো জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক ও বিভিন্ন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। গুণীজনদের জীবনীমূলক তাঁর প্রায় পাঁচশতাধিক লেখা রয়েছে। সবগুলো লেখাই ঢাকার দৈনিক গণবাংলা। চট্টগ্রামের দৈনিক পূর্বকোণ এবং সিলেটের দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং ম্যাগাজিনগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়াও তিনি দীর্ঘদিন ‘ঈশান’ নামে একটি অনিয়মিত সাহিত্য সাময়িকী এবং পরে ‘বাঙালি’ নামে আরো একটি সাহিত্য সাময়িকী সম্পাদনা করেন। ২০১৬-২০১৭ সালে রফিকুর রহমান লজু বেশ কিছুদিন লেখালেখি থেকে দূরে ছিলেন। একসময় সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত তাঁর সিলেটের রাজনীতি ও ছাত্র আন্দোলন’ এবং ‘একটি অসাম্প্রদায়িক ছাত্র সংগঠনের জন্মকথা’ নামক দু’টি পুস্তক প্রকাশের উদ্যোগ নিয়ে এর ভূমিকাও লিখেছিলেন। বইয়ে প্রকাশের জন্য প্রফেসর আব্দুল আজিজও একটি লেখা দিয়েছিলেন।
সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লেখকের প্রচুর লেখা ছাপা হচ্ছে। বিশেষ করে সিলেটের সর্বাধিক জনপ্রিয় দৈনিক সিলেটের ডাকে তার কলাম নিয়মিত ছাপা হচ্ছে। তাঁর লেখার প্রধান বিষয় হচ্ছে ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রাম।
রফিকুর রহমান লজু ভারত, সোভিয়েট ইউনিয়ন, সৌদি আরব এবং যুক্তরাজ্য সফর করেছেন। তিনি নিঃসন্দেহে সিলেটের একজন অসাধারণ কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT