পাঁচ মিশালী

পথের ধারে যাদের জীবন

সৈয়দ মুস্তাফিজুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৫-২০১৯ ইং ০০:১৭:০২ | সংবাদটি ২০৮ বার পঠিত

শিশুরা দেশ ও জাতির অগ্রদূত। নবীন সেনা। শিশুরা যেভাবে বেড়ে উঠবে সেভাবেই সে দেশকে গড়বে। আজকের কোমলমতি শিশুরা যদি সঠিক অধিকার ও সুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠে, তাতে লাভ হবে আমাদের অনাগত দিনগুলোর। ছোট ছোট শিশুরা একদিন বড় হবে। অনেকেই অনেক জায়গায় দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে।
বর্তমানে বাংলাদেশে শিশুর অধিকার নিয়ে অতীতের চেয়ে বৃহদহারে কাজ হচ্ছে। সংবাদ মাধ্যম, টিভি চ্যানেল, রেডিও, বিভিন্ন সাময়িকীসহ শিশুদের নিয়ে কার্যক্রম চালু আছে। আশার মাঝেও লুকিয়ে আছে অনেক কষ্টের গল্প। শিশু অধিকার এখনো ঠিকঠাক মত পালন করা হয়না। পথের ধারে যেসব শিশু বেড়ে উঠছে, তাদের পথশিশু ও শ্রমজীবি শিশু বলা হয়। এই শিশুরা আজো তাদের অধিকার পায়নি। যে বয়সে নিজেকে গড়ার সময়, সেই বয়সে নিজেকে যুক্ত করে শ্রমে।
আজকের কোমলমতি শিশু, আগামীর স্বপ্ন সম্ভাবনাময় আলোকিত স্বপ্নীল ভবিষ্যৎ। সূর্যালোকের আলো হয়ে রাঙিয়ে দিবে পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ। যে আলোর পরশে জেগে উঠবে শিশুর ঘুমন্ত মস্তিষ্ক, চিন্তার জগৎ। আজকে যদি তারা সঠিক অধিকার পায় ও জীবনের প্রতি জীবনের সম্মান, ভালোবাসা, মমত্ববোধ, মানবতা জাগ্রত হয় তাহলে তাদের আলোয় আলোকিত হবে সকল দেশের রাণী আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, আগামীতে আরো এগিয়ে যাবেই। ধূসর পৃথিবীর আকাশে জমাট কালো মেঘমালা একসময় বৃষ্টি হয়ে ঝড়ে। সেই বৃষ্টি কখনো প্রশান্তির কখনো অশান্তির। আজকের শিশুরা শৈশবে মেঘমালার মতো জমাট বাঁধে। আমরা চাই শিশুর আকাশে জমাট বাধা কালো মেঘমালা যেন প্রশান্তির বৃষ্টি হয়ে ঝরে। প্রশান্তির বৃষ্টিতে মিশে একাকার হয়ে যাবে তাদের কষ্ট, গ্লানির বিষাদময় গল্প। নগরীর বিভিন্ন জায়গা একদল শিশু কিশোরদের দেখতে পাওয়া যায় রাস্তায় থাকছে, খাচ্ছে এবং ঘুমাচ্ছে। জীবনের আনন্দ উল্লাস, সুখ দু:খের গল্প, জীবনের শিক্ষা, হারানোর গল্প, প্রাপ্তির হাসিখুশি, অপ্রাপ্তির লম্বা হিসেব সবই খুঁজে নেয় পথের ধারে। বাবা মায়ের আর্থিক দূরাবস্থা, কারো বাবা নেই, কারো মা নেই, অথবা উভয়েই ইহলীলা সাঙ্গ করে পাড়ি জমিয়েছেন ঐ পারে। আর এপারে রেখে গিয়েছেন অসহায় শিশু সন্তান। যাদের অনেকেই নিরুপায় হয়ে ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় ক্ষুধার যন্ত্রনায় পথের ধারে বসে থাকে কিছু পাওয়ার আশায়। মানুষও সহানুভূতিশীল হয়ে সাহায্য করে যে যার মত করে কিন্তু এই সাহায্য সাময়িক কিন্তু কী আছে তাদের ভবিষ্যতে? এর সঠিক উত্তর কে জানে?
আমি, আপনি, সবাই মিলেই আমাদের লাল সবুজের বাংলাদেশ। আমরা এক মহান জাতি। ৪৭’র দেশভাগ, ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফা, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ৭০’র নির্বাচন এবং সর্বশেষ ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী এক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রচিত হয় রক্তে লেখা লাল সবুজের অপরূপ বাংলাদেশ। মুক্তি সংগ্রামে পূর্ণতা পেয়েছে আমাদের স্বদেশ। সবাই যদি নিজ নিজ জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে পারতাম হয়ত পথশিশু সমস্যা কিছুটা হলেও হ্রাস পেত। আমাদের বৃত্ত ভাঙার সুরতাল বাজানোর সময় এসেছে। সব প্রথা, সব সংকীর্ণ বৃত্ত ভেঙে দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে পথশিশুর কল্যাণে। আমরা অনেক সময়ই শিশুদের জন্য কাজ করতে আগ্রহী হই কিন্তু জীবনের বিভিন্ন স্তরে পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে পিছু থমকে যেতে হয় আমাদের। আমাদের থমকে যাওয়াতেই ইতি ঘটে যত মহৎ উদ্যোগ। এই তো শীতের রাতে দেখলাম একটি ছোট্ট ছেলে তারচেয়ে বয়সে কম আরেকটি ছোট্ট ছেলেকে কোলে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে রাস্তায়। মানুষ চলাচল করছে প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে, গাড়ির বিরক্তিকর আওয়াজ, শীতের প্রকোপ সবকিছুর পরও দুটি শিশু ঘুমিয়ে আছে পথের ধারে। বড় শিশুটি আগলে রেখেছে ছোট শিশুটিকে পরম মমতায় উঞ্চতায় চাদরে, ¯েœহপূর্ণ আদরে। শত ব্যস্ততা,আনন্দ উল্লাস ,জীবনের জয়যাত্রা, সাফল্যের গল্প কিংবা ব্যর্থতার চিহ্ন সকল কিছু এদের পাশ দিয়ে চলে যায় কিন্তু পথের ধারেই কাটে ঐ দুটি শিশুর দিনরাত্রির অসমাপ্ত গল্প। ঐ দুটি শিশুর মতো সকল অসহায় শিশুদের পথেই রাত কাটে, দিন কাটে। আমরাও থমকে যাই বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক যাতাকলে নিষ্পেষিত হয়ে নিরবে কিংবা জীবনের হৈ চৈ আনন্দ উল্লাসে ভুলে যাই ওদের কথা। যার হারায় সেই বুঝে হারানোর বেদনা।
এইসব পথশিশুরা বাধ্য হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি, ফুটপাতে অহেতুক ঘোরাঘুরি, নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করে থাকে। এরাই শ্রমজীবী, পথশিশু, পথফুল। পথেই ফুটে, পথেই থাকে, পথেই ঝরে অবহেলায় ,অযতেœ,অনাদরে, দু:খ কষ্টে, হতাশার নীল দিগন্তে। ব্রাজিলে শিশু শ্রম বিষয়ক ৩য় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়-২০১২ পর্যন্ত বিশ্বে এখনও শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ১৬ কোটি ৮০ লাখ। আমাদের দেশেও শিশু শ্রমিকের সংখ্যা নেহাত কম নয়। বাংলাদেশে ২০ লাখ গৃহ শ্রমিকের মধ্যে ৯৩ শতাংশই হচ্ছে অর্থ্যাৎ ১৮ লাখ ৬০ হাজার শিশুই গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছে। এসব গৃহশ্রমিকরা মানসিক, শারিরীক, মৌখিক, যৌন নির্যাতন ও আর্থিক শোষণের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বাংলাদেশে প্রায় ৩০০ ধরণের কাজ করে থাকে শিশুরা। এসবের মধ্যে ৪৫ টির বেশি কাজই হচ্ছে অধিক ঝুকিপূর্ণ। শিশু শ্রমিকের মধ্যে ৩২ ভাগ শিশু যৌনকর্মে যুক্ত। শ্রমিকের বৃহৎ একটা অংশ হচ্ছে পথ শিশু। বেঁচে থাকার তাগিদে এরা নিজের শ্রম বিভিন্নভাবে বিক্রি করে থাকে। পথ শিশুদের বৃহৎ অংশ বিভিন্ন অপরাধ কর্মে জড়িত হয়ে যায়। শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা অনেক বেশি। শহরে কাজ করে থাকে ১৫ লাখ ও গ্রামে ৬৪ লাখ শিশু শ্রমিক রয়েছে। এসব শিশু শ্রমিকের মধ্যে ৪৫ লাখ শিশু ঝুকিপূর্ণ পেশায় যুক্ত।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুারো ও আইএলও’র জরিপ মতে কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ রয়েছে ৪৫ ধরণের। আর এর মধ্যে ৪১ টি কাজে অংশগ্রহণ করে শিশুরা। শিশু শ্রমিকের মধ্যে ৭৩ দশমিক ৫০ ভাগ শিশু হচ্ছে পুরুষ আর ২৬ দশমিক ৫০ ভাগ নারী। ৬ দশমিক ৭০ ভাগ আনুষ্ঠানিক খাতে আর ৯৩ দশমিক ৭০ ভাগ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ( বিবিএস) ২০০৮ সালের জরিপ অনুসারে দেশে শূণ্য থেকে ১৭ বছর পর্যন্ত শিশুর সংখ্যা ৬ কোটি ৭৭ লাখের বেশি। এদের মধ্যে প্রায় ৩৫ লাখ শিশু নানা কাজের সাথে জড়িত। ‘শৈশব বাংলাদেশ’ নামে এক সংগঠনের জরিপ অনুযায়ী রাজধানীতে প্রায় তিন লাখ শিশু গৃহ পরিচালিকার কাজ করছে যাদের বয়স ১৬ বছরের নিচে।
ইউনিসেফের তথ্য অনুসারে গৃহপরিচালিকার ৮৬ শতাংশ মেয়ে। ৩০ শতাংশের বয়স ৬ থেকে ১১ বছর আর বাকিদের বয়স ১২ থেকে ১৬ পর্যন্ত। এরা প্রতিদিন ১৪-১৬ ঘন্টা কাজ করে থাকে। শিশু শ্রম বন্ধের জন্য মূলত প্রয়োজন দারিদ্র মুক্ত সমাজ গড়ে তোলা। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা ২০১১ সালের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ আঝে যেসব শিশু রাস্তায় দিনাতিপাত করে, রাস্তায় কাজ করে, রাস্তায় ঘুমায়। যাদের নির্দিষ্ট কোন আবাসস্থল নেই, প্রতিদিনের জীবনযাপন রাস্তাকে কেন্দ্র করে এবং আঠারো বছরের নিচে তারাই পথশিশু। জাতিসংঘের তথ্য বলে- বিশ্বে পথশিশু রয়েছে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন।
১৯৫৯ সালের ২০ নভেম্বর শিশু অধিকার সুরক্ষার জন্য সনদ ঘোষণা করে জাতিসংঘ। সনদে উল্লেখ করা হয় শিশুদের থাকবে জন্মসূত্রে নাম জাতীয়তার অধিকার, বড়দের থেকে ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার, সুস্বাস্থ্য ও পুষ্টি লাভের অধিকার। দুর্যোগের সময় সুরক্ষার অধিকার, খেলাধুলা বিনোদন অধিকার , শারিরিক, মানসিক, নৈতিক অধিকার, কষ্টকর শ্রমে যুক্ত না করার অধিকার, বিশ্ব ভ্রাতৃত্বে বেড়ে ওঠার অধিকার এবং জাতি বর্ণ ধর্ম নির্বিশেষে মৌলিক অধিকার । বিভিন্ন তথ্য মতে আমাদের দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৪৫% শিশু। সবুজ শ্যামল এই অপরূপ দেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৭৯ লাখ। বেলা যায় বেড়ে। জাতীয় শিশু নীতি ২০১১ এর ৮ এর ৮.৯ বলা হয় যে সকল প্রতিষ্ঠানে শিশুরা নিয়োজিত আছে , সেখানে শিশুরা যেন কোনরূপ শারিরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের কার্যক্রম মূল্যায়ন করতে হবে। বাস্তবে এর চিত্র ভিন্ন। পাড়া মহল্লায় বিভিন্ন বাড়ীতে যারা কিশোরীদেরকে নিজেদের তত্ত্বাবধানে রেখে কাজ করান আসলে কতটুকু মেনে চলেন জাতীয় শিশু নীতি। নিজের সন্তানকেই দেখেন আদরপূর্ণ দৃষ্টিতে আর কাজের মেয়েটির প্রতি যতœ নেয়া তো দূরের কথা বরং অধিকাংশরাই বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে থাকেন। কেউ দৈহিক নির্যাতন আর কেউ মানসিক কিংবা যৌন নির্যাতন। কাজের মেয়েটি নীরবে সহ্য করে থাকে কারণ সে অপারগ। অনেক সময় রাগে ক্ষোভে অভিমানে আত্মহত্যা করে থাকে। মেয়েটি মরে যায় কিন্তু এসব ভদ্রতার বেশে লুকিয়ে থাকা সমাজের অপরাধীরা শরীরে বসন্তের হাওয়া লাগিয়ে বেড়ায়। সিলেটের কাজিরবাজার মাছ বাজারের চিত্র ভয়াবহ। এখানকার অধিকাংশ শ্রমিকই শিশু শ্রমিকের আওতাভুক্ত। কারো বয়স সাত কিংবা কারো সতেরো বছর। স্বল্প টাকায় এরা মাছ বাজারে ক্রেতাদের মাছের ব্যাগ বহন করে থাকে। শেফেউল নামে এক ৭ বছর বয়সী নগরীর একটি দোকানে কাজ করে। সকাল ১০টা থেকে শুরু আর শেষ হয় রাত ১০টায়। দোকানের কাজের পাশাপাশি মালিকের অন্যান্য কাজ করে দিতে হয় তাকে। পরিশ্রম অনুযায়ী সে ন্যায্য শ্রম মূল্য পায়না। ক্রমেই বাড়ছে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা, পথশিশুর সংখ্যা।
পথশিশু সমস্যা দূর করণে বর্তমান সময়ে যারা কাজ করছেন বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া তরুণেরা গড়ে তুলছেন স্বপ্নময় বাংলাদেশ। তাদের প্রচেষ্টার ফলে কিছুটা হলেও লাঘব হচ্ছে পথশিশুর কষ্ট। যেখানে আশার প্রদীপ জালাচ্ছেন তরুণেরা ঠিক তেমনি আবার কেউ কেউ সেই প্রদীপে আলো জ্বালাতে গিয়েও পারছেনা কোনক্রমেই বিভিন্ন পারিপার্শি¦কতায়। মৌসুমি কার্যক্রম নয় বরং সরকারি হস্তক্ষেপে সকল প্রাণের উদ্দ্যম কর্মে হ্রাস পাবে পথশিশুর সংখ্য। পথশিশুর সংখ্যা হ্রাস পেলে সকল দিকেই সফলতার দখিনা হাওয়া বয়ে যাবে আমাদের জাতীয় জীবনের জানালায়। সেই দখিনা হাওয়ায় ভেসে যাবে সকল দুঃখ শোকের বেদনার লাল নীল কষ্টের গল্প। শিশুরা কোমল, পবিত্র। শিশুদের কথা মনে হলেই ভেসে উঠবে হাসিমাখা নিষ্পাপ সতেজ মুখাবয়ব কিন্তু আমাদের সকল দেশের রাণী বাংলাদেশ ভূখন্ডে ঘটে যাচ্ছে শিশু বিরোধী কর্মকান্ড। বাংলাদেশ আমাদের প্রাণের দেশ। সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা এই সবুজের দেশ এগিয়ে যাবে যদি আজকে যারা শিশু তাদেরকে সঠিকভাবে গড়ে তোলা যায়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT