পাঁচ মিশালী

ঘুরে দেখা ব্যাংকক

নামব্রম শংকর প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৫-২০১৯ ইং ০০:২১:৫৭ | সংবাদটি ১৪৩ বার পঠিত

রোদেলা সকাল। সুনীল আকাশ থেকে বর্ষার ফলার মতো রোদ আঘাত করছে সুদৃশ্য ফ্লাইওভারের গায়ে। মনে পড়ে গেলো সুরমাপারের কবি দিলওয়ারের কীনব্রীজের উপর আঘাত হানা সকালের রোদের কথা। সূর্য ভোরে তার মাথা তুলে দাড়ায়, সকালে রোদের ঝলমলে আলো ছড়ায় দিকবিদিক। হোক তা সুরমাপারে, হোক টেমস তীরে, কিংবা চির গ্রীষ্মের দেশ ব্যাংককে। জানাগেলো ব্যাংককে ডিসেম্বর জানুয়ারিতে কিছুদিনের জন্য শীতকাল আসে ১৮-২০ ডিগ্রী সে.। অতি স্বল্প আয়ুর এ শীত ঋতুর পর কেবলই বসন্ত আর গ্রীষ্ম।
ফেব্রুয়ারীর প্রথম সপ্তাহে আমাদের এক সপ্তাহের ব্যাংকক সফর। সিলেট থেকে রাতের উপবন আমাদের নিয়ে ভোর সাড়ে চারটায় পৌঁছে দিয়ে গেছে এয়ারপোর্ট স্টেশনে। রাত ভোর হলো। ভোর হলো সকাল। কনকনে শীত না হলেও শীতের সকাল, জ্যাকেট গায়ে ধীরে ধীরে হযরত শাহজালাল (র:) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে সকাল ১১টায় ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স আমাদের উড়িয়ে নিয়ে এলো ব্যাংকক সুবর্ণভূমি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে। এয়ারপোর্টের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা শেষে আমাদের নির্ধারিত হোটেলে যাওয়ার জন্য এয়ারপোর্ট থেকে বের হলাম বিকেল সাড়ে ৩টায়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই শীত রয়ে গেলো এয়ারপোর্ট-এর কাঁচের দেয়ালের ভেতর। বাইরের তাপমাত্রা আমাদের বুঝিয়ে দিল আমরা ব্যাংকক পৌঁছে গেছি, এবার জ্যাকেট খুলতে হবে। জ্যাকেট খুলে হ্যান্ড ব্যাগে নিলাম আর একটি ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। লোকজনের সাথে বেশীর ভাগ সময়ই কথোপকথোন হয়েছে ইংরেজীতে আর প্রাচীনতম ভাষা ইঙ্গিতে।
এয়াপোর্ট থেকে ব্যাংকক শহরে যাওয়ার পথে দেখলাম চার লেন চার লেন আট লেনের সুদৃশ্য রাস্তা। রাস্তার দু’পাশে, মাঝখানে সাজানো হয়েছে বিভিন্ন ধরনের রং বেরঙের ফুলে আর কেটে ছেটে সাজানো হয়েছে পাতাবাহার। এই ফুলের বাহার শুধু রাস্তায় নয়, দেখেছি পুরো ব্যাংকক জুড়ে। ধবধবে ফর্সা, মাঝারি গড়নের পরিপাটি ব্যাংককের লোকজনদের হেল্পফুল এবং ভালোমানুষ বলেই মনে হয়েছে এ ক’দিনের সফরে। প্রতিটি রাস্তার মোড়ে কিছু দূর পর পর রয়েছে পরিচ্ছন্নকর্মী। গাছের পাতা, আবর্জনা কিছু পড়লেই সাথে সাথে তুলে নিয়ে নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে রাখছে।
বান হোস্টেলের মালিক ভদ্রমহিলা Prinda  Poka একটি কার্ড হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন গেষ্ট হাউজ উপর তলায়। কোন চাবি নেই, একটু ইতস্তত করলাম। রুমের দরজার ক্ষেত্রেও একই। রুমে কোনো তালা নেই, ভেতরে- বাইরে কোনো ছিটকারিও নেই। রিমোর্ট টিপে রুমকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত করল বড়ছেলে আহেন নামব্রম। মেজো ছেলে আথৈ নামব্রম ওয়াশরুমে যাবে, রুমের লাইট জালানোর জন্য পীড়াপীড়ি করছে। তাদের মা অপর্না বলে উঠল, সুইচগুলোতো সব অন করা, বাল্বগুলো ভালো কিনা? আসলে সব বাল্বগুলো ভালো ছিল, জ¦লে উঠলো সুইচগুলো উল্টো দিকে টিপতেই।
ব্যাংককে প্রথম দিন আর দূরে কোথাও বেড়ানোর চিন্তা করলামনা। দুপুরের খাবার খেয়ে বিকেলটা হোটেলের কাছেই থাইল্যান্ডের চক্রি রাজবংশের ১৫০তম বার্ষিকী স্মরণে ১৯৩২ সালে নির্মিত একটি সুদৃশ্য গোলচত্বর পার্ক Wongwian Yai দেখে সময় কাটালাম। ঘাস, ফুলগাছ দিয়ে সাজানো পার্কের মাঝখানে রয়েছে রাজা টাকসিন এর বিশাল ভাষ্কর্য। লক্ষ করলাম পার্কের পাশ দিয়ে যাওয়া ব্যাংককবাসী প্রায় সকলেই রাজার ভাষ্কর্যের দিকে তাকিয়ে মাথা নুয়ে শ্রদ্ধা জানাতে ভুল করেনা। সন্ধ্যার পর হোটেলে এসে কথা হলো ছোট ছেলে আঙাম এর সাথে। ছেলের জন্য কেঁদে মা দু’চোখ লাল করে ফেলল মুহূর্তে।
পরদিন খুব সকালে আমার ঘুম ভেঙে গেল। তারা তিনজনেই ঘুমোচ্ছে। রুমের এসি বন্ধ করে জানালা খুলে দিতেই আমি অবাক হয়ে গেলাম। রাস্তায় রীতিমত ট্রাফিক জ্যাম। সবাইকে ঘুম থেকে ডেকে তুললাম। সকাল ৬টার আগে থেকেই রাস্তায় শুধু গাড়ি আর গাড়ি। এতো গাড়ি কিন্তু হর্ণের শব্দ খুব একটা শুনা গেলনা, গাড়ির ইঞ্জিনের গোঙানি ছাড়া। আমরা এখানে অপ্রয়োজনেও শুধু হর্ণ বাজাই, শব্দ দূষণ করি অকারণে।
সকালের খাবার খেয়ে আমরা চলে গেলাম The Grand Palace of Bangkok. ১৭৮২ সালে নির্মিত এই রাজপ্রাসাদের ভেতরে প্রবেশের জন্য আমাদের চারজনকে চারটি টিকেট সংগ্রহ করতে হলো দু’হাজার থাই বাথ দিয়ে। প্রবেশ ফি বৈদেশিক পর্যটকদের জন্য একটু বেশী মনে হলেও রাজপ্রাসাদের ভেতরের কারুকার্য, ঐতিহাসিক শিল্পকর্ম, মূল্যবান প্রতœতাত্তিক বস্তু, দেয়ালের নকশা, চারুশিল্প ইত্যাদি দেখার পরে প্রবেশ ফি একটুও বেশী মনে হয়নি। গ্র্যান্ড প্যালেস ঘুরে দেখতে দেখতে কখন বিকেল গড়িয়ে গেছে খেয়ালই করিনি। দুপুরের কাঠফাটা রোদে ঘুরে ক্লান্ত আমরা সবাই। তবুও অজানাকে জানা, অদেখাকে দেখতে পেয়ে অন্যরকম আনন্দিত, উদ্বেলিত। পরদিনের জন্য বরাদ্দ শুধু শপিং আর শপিং। বিশাল শপিং মল এমবিকে সেন্টার, প্লাটিনাম ফ্যাশন, প্রাটুনাম হোলসেল মার্কেট, চাতুচাক বিভিন্ন শপিং মলে সারাদিন নিজেদের জন্য, আত্মীয়স্বজনদের জন্য নানান কিছু কিনে ঘোরাঘুরি শেষে ফিরলাম আকাশ পথে। ব্যাংককে ১৯৯৯ সাল থেকে শুরু হওয়া বিটিএস স্কাইট্রেইনে যাতায়াত অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন এবং যানজটবিহীন।
তার পর দিন পাতায়া সিটি যাওয়ার জন্য আমরা প্রস্তুত হচ্ছি। হোটেলের নিচে নেমে আমরা অবাক। জিন্স হাফ প্যান্ট, সাদা-কালো চেক হাফ সার্ট পরা এক ভদ্রমহিলা চমৎকার একটি গাড়ি নিয়ে আমাদের অপেক্ষা করছে। তিনিই গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাবেন প্রায় আড়াই ঘন্টার যাত্রাপথ পাতায়া। বয়স পঁয়তাল্লিশের কম নয়। ভদ্রমহিলার গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা আমাদের সবাইকে অভিভূত করেছে।
পাতায়া যাওয়ার পথে আরো কয়েকটি দর্শনীয় স্থান দেখলাম। ব্যাংকক থেকে ৯৭ কি:মি: দূরে অবস্থিত SRIRACHA TIGER ZOO, সেখানে দেখলাম রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সার্কাস, বাঘের বাচ্চাকে কোলে করে ফিডিং করানো, কুমির ভর্তি পুকুর, বৃশ্চিক মহিলার সারা গায়ে বৃশ্চিক ইত্যাদি। সবচেয়ে সুন্দর লেগেছে ফুল। বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন আকারে, নানান ধরনে সাজিয়ে রাখা ফুলের বাগান। সেখানের প্রবেশমূল্য প্রাপ্ত বয়স্কদের ৪৫০ থাই বাথ এবং অপ্রাপ্ত বয়স্কদের ২৫০ থাই বাথ। Under Water Park. সামুদ্রিক সকল ধরনের মাছ, জেলী ফিস, সার্ক, ¯œ্যাক ফিস, কাকড়া, সীহর্স, সীল, স্টারফিস ইত্যাদি দিয়ে বিশাল একুরিয়াম তৈরী করে রাখা হয়েছে। মনে হবে মাছগুলো দেখে দেখে সাগরের ভেতর যাচ্ছি। টানেলের পর টানেল। অসাধারণ লেগেছে। নির্দিষ্ট বয়স ও উচ্চতার শিশুদের প্রবেশ ফি ২০০ থাই বাথ, এছাড়া সকলের প্রবেশ ফি ৫০০ থাই বাথ।
তারপর সোজা চলে গেলাম পাতায়া বিচ। বিচে সাগরের ঢেউ ছেলে দুটোকে আর সৈকতের বালুতে আটকিয়ে রাখা যায়নি। দৌঁড়ে নেমে গেছে সাগরের জলে এবং হাটু পানিতে উপুড় হয়ে শুয়ে সাঁতার কাটতে থাকে। ছোট ছোট ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরে। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত আমাদের কক্সবাজারের উত্তাল ঢেউয়ের কথা মনে করিয়ে দিল। ভারতের ওড়িষ্যার পুরী সমুদ্র সৈকতের ঢেউয়ের গতি আবার এখান থেকে অনেক বেশী। পাতায়া সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারের তুলনায় অনেক অনেক ছোট। শুধু সাজিয়ে গুছিয়ে রাখে বলে সুন্দর দেখায়। আমাদের বিশ^খ্যাত সমুদ্র সৈকতকে যদি তাদের মতো করে পরিস্কারভাবে সাজানো যেত! থাইল্যান্ডের অর্থনীতির অন্যতম অনুষঙ্গ হলো পর্যটন শিল্প। বিশেষজ্ঞদের মত অনুযায়ী আমাদের দেশের রয়েছে পর্যটন শিল্পের বিশাল সম্ভাবনা। চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সম্ভাবনাময় এসব স্পটকে আরো ঢেলে সাজিয়ে বিরাট অংকের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা কঠিন নয়। ব্যাংকক থেকে দেড়’শ কি:মি: দূরত্বের পাতায়া সমুদ্র সৈকতসহ দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে আসতে সারাদিনের জন্য গাড়ি ভাড়া গুনতে হয়েছে ৩০০০ থাই বাথ। বাস বা ট্রেনের মাধ্যমে গেলে খরচ কম পড়বে। তবে রাস্তায় থেমে থেমে দেখা আর তিন চার জনের জন্য এরকম প্রাইভেট ট্যাক্সি ভাড়া করায় সুবিধা হবে। ব্যাংকক শহরে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট হিসেবে চলে মিটারে চলা ট্যাক্সি ক্যাব, Grab, টুক টুক, টাউন বাস, বিটিএস স্কাইট্রেইন। এগুলোর মধ্যে Grab ভালো লেগেছে, সেইফ, সাশ্রয়ী এবং আরামদায়কও বটে। Grab ব্যবহারের জন্য ইন্টারনেট অবশ্যই প্রয়োজন। সেজন্য ব্যাংকক এয়ারপোর্ট থেকেই ইন্টারনেট সংযোগসহ উপযোগী একটি প্যাকেজ নিয়ে থাই সিম কিনেছিলাম। ২০১২ সাল থেকে দক্ষিণ এশিয়ার সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনস, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার এবং কম্বোডিয়ায় Grab তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
দেশে ফিরে আসার আগের দিন সকালে আবারো কিছু শপিং সেরে নিয়ে বিকেলে গেলাম সদ্য নির্মিত একটি অত্যাধুনিক শপিং মল আইকনশিয়াম। শুধু শপিং মল বললে ভুল হবে। সেখানে রয়েছে থাই সংস্কৃতি ফুটে উঠে এমনভাবে সাজানো দোকান। শপিং মলের ভেতর নদী লেইক বানিয়ে ফ্লোটিং মার্কেটের আদলে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। দেখে বুঝার উপায় নেই যে বহুতল ভবনে আছি নাকি নদীতে নৌকা করে ফ্লোটিং মার্কেটে কেনাকাটা করছি। সেখানে যাবতীয় সব ব্যান্ডের শোরুম রয়েছে। সাত তলার উপর রয়েছে গাড়ীর শোরুম। সেখানে বিএমডব্লিউ, জন কুপার, মার্সিডিজ বেঞ্জসহ দামি দামি গাড়ি বিক্রি হচ্ছে। মিউজিক্যাল ওয়াটার ডান্স, আলোকসজ্জা দেখে চোখ ফেরানো কঠিন।
আমাদের চারজনেরই ব্যাংকক ঘুরে দেখার অপূর্ণতা রেখেই প্রিয় স্বদেশে ফেরার প্রস্তুতি নিলাম। এরকম সাজানো গোছানো সুন্দর শহর দেখার জন্য এক সপ্তাহ খুবই কম। গাড়ি করে এয়ারপোর্ট আসার পথে ভাবতে লাগলাম আমাদের প্রিয় বাংলাদেশও নিশ্চয় এরকম সাজানো শহরে পরিণত হবে। সেদিন খুব বেশী দূরে নয়। আমরা শুধু সাজানো গোছানো শহর, দেশ নয়। শহরের অধিবাসী আমরাও যেন আরোও সাজানো গোছানো সুন্দর মনের মানুষ হয়ে উঠতে পারি। ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে দেশপ্রেমিক, মানবিক মূল্যবোধের অধিকারী আমরা সবাই একসাথে থাকলে বিশ^বাসী অনেকেরও স্বপ্নপুরীর দেশ হবে আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT