পাঁচ মিশালী গ্রন্থালোচনা

‘ইতিহাস-ঐতিহ্যে জৈন্তিয়া’

মোঃ ফয়জুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৫-২০১৯ ইং ০০:২৩:৪০ | সংবাদটি ২৪২ বার পঠিত

ইতিহাস-ঐতিহ্যে জৈন্তিয়া শিরোনামে মাস কয়েক আগে একখানা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থটির লেখক মো. কলিম উল্লাহ। যিনি জৈন্তার ধারাবাহিক ইতিহাস রচনার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে ইতোমধ্যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। জৈন্তা অঞ্চলের অনেক অজানা উপাত্ত সংযোজনের মাধ্যমে অনন্যতা তৈরি করে পাদ-প্রদীপে চলে এসেছেন। ইতোপূর্বে লেখকের দুটি বই ‘গোয়াইনঘাট খন্ড’ এবং ‘জৈন্তাপুর খন্ড’ প্রকাশিত হয়েছে। উপর্যুক্ত শিরোনামে জৈন্তাপুর খন্ডটি পাঠ করে আমার যা অনুভূতি তৈরি হয়েছে, তার অবতারণা এ নিবন্ধে।
গ্রন্থটিতে লেখক চারটি অধ্যায় ও একটি পরিশিষ্ট সহযোগে সংকলন তৈরি করেছেন। গ্রন্থটির ৩য় অধ্যায়ের ২৭৩ পৃষ্ঠার আর্টিক্যাল ‘গোলকুন্ডার কুহিনুর এবং জৈন্তিয়ার ঐতিহ্য’ শিরোনামে এক চমকপ্রদ অবতারণা করেছেন। বলা বাহুল্য, পাঠান্তে মনে হয়েছে ঘটনার প্রবাহ পরিস্থিতি গ্রন্থটির এমনকি পুরো সিরিজের মধ্যে এটি হবে চুম্বক অংশ বা আর্টিক্যাল। আর এ কারণে এটি কালজয়ী গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
লেখকের লিপি প্রবণতায় দেখা যায়, সাবেক জৈন্তা রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চল অরণ্যকুল পর্যন্ত (১২৮৫-১৩২৪ সাল) বিস্তৃত ছিল। আর এর রাজধানী ছিলো তেলেঙ্গানা। রাজা জয়ন্ত রায়ের জামাতা লদ্ধর দেব মতান্তরে লন্ডবর এটি শাসন করেন। উল্লেখ্য, তেলেঙ্গানার গোয়ালিয়র দুর্গের সন্নিকটেই ঐতিহাসিক গোলকুন্ডা। আর এ গোলকুন্ডার হিরক খনিতে পাওয়া গিয়েছিল আচানক কারুকার্যময় সৌন্দর্য্যরে উৎকর্ষ হিরের টুকরো ‘কুহিনুর’ জৈন্তা রাজ্যের ভান্ডার রক্ষক মালিক কাফুর খাজা যিনি উকিলদের (বাজার নিয়ন্ত্রক) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। একদা মালিক কাফুর এর নিকট থেকে নুসরাত খান কোনোভাবে ‘কুহিনুর’ ছিনিয়ে নিয়ে দিল্লীর সুলতান আলাউদ্দিন খিলজিকে দান করে সুলতানের আনুগত্য লাভ করেন। আর সেই থেকেই জগৎদ্বিখ্যাত ‘কুহিনুর’ জৈন্তার হাত ছাড়া হয়। জোর যার মুল্লুক তার- সময়কার কুহিনুর আধিপত্যবাদী রাজাধিরাজগণ হাতিয়ে নিয়ে পরমানন্দ ও গর্ব অনুভব করতেন। এর পরের ইতিহাস কেবল হাত বদলের ইতিহাস যা সর্বজনবিদিত। অবশ্য ‘কুহিনুর’ এর সর্বশেষ মালিকানা বর্তমানে বৃটিশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে।
প্রসঙ্গত যে, যেহেতু রাজনৈতিক পথ পরিক্রমায় সাবেক জৈন্তা রাজ্য বাংলাদেশে মিশে গেছে সেহেতু কুহিনুরের যৌক্তিক দাবীদার এখন বাংলাদেশ। যদিও বৃটিশ সরকার এটি কোনো দেশকে ফিরিয়ে দিতে চায় না। যা হোক, গ্রন্থটির পাঠ অভিজ্ঞতা থেকে বলবো- কোন পাঠক যদি নিবিষ্টি মনে এ আর্টিক্যালটি পড়েন তবে উপলব্ধি করতে বোধ করি সক্ষম হবেন যে, লেখক কলিম উল্লাহ কতোটা অতল কৃষ্ণগহ্বর থেকে তথ্যাদি বের করে এনেছেন। অন্তত এ কারণে তার জৈন্তাপুর খন্ডটি ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে।
লেখক বইটির যতো না ইতিহাসের পরিস্থিতি বা ঘটনা প্রবাহ নিয়ে লেখনী চালিয়েছেন। তার চেয়ে উপাত্ত এবং এর ধারা তৈরিতে সচেষ্ট। সহজিকরণে বলা যায়, এটি যতো না তথ্যভিত্তিক, তার চেয়ে বরং উপাত্ত কেন্দ্রিক। কার্যত লেখক সযতেœ উপাত্ত বের করে দিয়ে স্বতঃসিদ্ধ বা বিস্তৃত ভাবনার পরিমন্ডলকে প্রসারিত করতে পাঠকের দিকেই বল ছুড়ে দিয়েছেন।
লেখকের মাঝে নৈর্ব্যক্তিক চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন রয়েছে মনে করি। গ্রন্থটিতে আরো দেখা যায়, একটি আর্টিক্যাল পাঠান্তে অন্য আরেকটি আর্টিক্যালের বিষয়বস্তু ভিন্ন হলেও একই কথামালার পুনরাবৃত্তি দৃষ্টিগোচর হয়। কিন্তু প্রাসঙ্গিকতার তাগিদে পাঠক বিরক্ত বা বিব্রত হবেন- এমনটা ভাবা যায় না। আবার দেখা যায়, অঞ্চলগত ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে লেখক প্রাসঙ্গিক কারণে ভারতবর্ষ ছাড়িয়ে সুদূর গণচীন পর্যন্ত কবিদের ন্যায় মানস লোকে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন।
ঘটনা প্রবাহে বিভিন্ন রাজাধিরাজের নাম, পৌরাণিক গ্রন্থের নাম, বংশলতা এবং খন্ডরাজ্যের বাহারী নাম পাঠক সমাজের অনেককে মুগ্ধ, অভিভুত ও ভাবিত করবে বইকি! এতে জৈন্তাপুর এক আদি রাজবংশের নাম হলো কাকতীয় রাজবংশ মতান্তরে শকো বা শক রাজবংশ। এদের কথিত রাজবংশ কাক না কি শকো/শক তার চমৎকার বিশ্লেষণধর্মী অবতারণা করেছেন লেখক। নাম বিভ্রাটি ইংরেজি বানানগত কারণে লেখা আছে-Caka, Saka-এতে কেউ পড়েছেন কাক/কাকা আবার কেউবা পড়েছেন শক/শকো। আসলে প্রনানশিয়েশন জনিত কারণে ঐতিহাসিকগণ যে যার মতো করে লিখেছেন। অবশ্য লেখক কলিম উল্লাহ তাঁর উল্লেখযোগ্য আর্টিক্যালটিতে অর্থাৎ ‘গোলকুন্ডার কুহিনুর ও জৈন্তিয়ার ঐতিহ্য’ অংশে কাকতীয় রাজবংশ হিসাবে অভিহিত করেন।
কলিম উল্লাহ জৈন্তা রাজ্যের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ ও বিকাশ সাধন করেছেন। এতে ইতিহাসের কালানুক্রমিক (Chronological Trend) ধারা সূচিত করতে সক্ষম হয়েছেন। কেননা ইতোপূর্বে বলা হতো জৈন্তার ইতিহাস কিংবদন্তী নির্ভর, উপাখ্যান বিশেষ এবং অস্পষ্টতার বেড়াজালে আবদ্ধ ইত্যাদি। বলা বাহুল্য, ইতিহাস-ঐতিহ্যে, জৈন্তিয়া গ্রন্থসমূহ দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা উপর্যুক্ত অপবাদ এবং নেতিবাচক ধারণা থেকে দায়মুক্তি দিবে বলে আমার বিশ্বাস। অধিকন্তু, জৈন্তা রাজ্য এতো বিশাল ও ব্যাপক একটি রাজ্য ছিলো- সেটিও তাঁর লেখায় উঠে এসেছে।
পরিশেষে বলবো, ইতিহাসের নিরিখে ইতিহাস-ঐতিহ্যে, জৈন্তিয়া-এর জৈন্তাপুর খন্ড একটি আকর গ্রন্থ যা এ অঞ্চলের একটি প্রামাণ্য দলিল। জানা যায়, বইটির কাটতি বেশি হওয়ায় এটির দ্বিতীয় সংস্করণের কাজ চলছে। তাতে স্বাগত ও সাধুবাদ জানাই। লেখক কলিম উল্লাহ ইতিহাস চর্চার এক প্রাণান্তকর পরিব্রাজক বটে। আর এ পরিব্রাজককে চ্যালেঞ্জিং কাজ করায় ধন্যবাদ জানাই। যুগপৎ পাঠক সমাজ তথা ঐতিহ্য প্রেমীদের বিনয়ের সাথে বলব-গ্রন্থটি সংগ্রহে রাখার মতো মূল্যবান একটি দলিল। লেখক ও গ্রন্থটির উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি। সর্বোপরি, বইটি পাঠক মহলে সমাদৃত হোক-এ প্রত্যাশা রইলো।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT