সাহিত্য

ইফতারি

জীম হামযাহ প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০৫-২০১৯ ইং ০০:৩২:৫৯ | সংবাদটি ৩৯৪ বার পঠিত

এই বিকেলেও যখন মজিদ মিয়া মেয়ের বাড়ি ইফতারি নিয়ে আসছিলেন, তার মন ছিলো ফুরফুরে। খুব বড়মুখ করে এসেছিলেন তিনি। সেই মজিদ মিয়ার মুখ এখন ছাই বর্ণের মেঘে ঢেকে গেছে। কোন বাক্য নেই তার মুখে। বসে আছেন ঝিম মেরে। এমনও নয় যে রোজার কারণে। উপবাস মজিদ মিয়াকে কাবু করার মতো নয়। দেখতে যদিও খুব গাট্টাগোট্টা শক্তিমান মনে হয় না, তবে তার শরীরটা সহনীয়। অভাব দারিদ্রের ভার সইতে সইতে শরীর হয়েছে মহাশয়। চাষা-ভূষা এই দেহে মাঠের কতো রোদ-বৃষ্টি, ঝড়-তুফান যায় সামান্য সর্দিও হয় না। দু’কাঁধে দু’মন ভার দিলেও অনায়াসে বয়ে নিয়ে যেতে পারেন। অথচ সামান্য কয়টি কথার ভার মজিদ মিয়াকে কোঁকড়ে দিলো! শরীরে বসার মতো শক্তি না থাকলেও নিজেকে কোনমতে ধরে রেখেছেন। নীচের দিকে তাকিয়ে থাকলেও তার দু’চোখের আলো কুয়াশা ঢাকা শীতের রাস্তায় জ¦লা বৈদ্যুতিক বাতির মতো করুণ আর ঝাঁপসা। ঘড়ির কাটা টিকটিক করছে কিন্তু সময়টা হামাগুড়ি দিয়েও এগোচ্ছে না। ইফতারি সামনে থাকলেও সেদিকে তার নজর নেই। তিনি জানেন এগুলো মুখে দিলেও গলা দিয়ে নামবে না। কাটার মতো আটকে যাবে। তবুও এই কাটা মুখে দেবার জন্য বসে আছেন, কখন আজান হয়। আজানটা হলে কোনোমতে রক্ষা পান তিনি।
বসতে দম বন্ধ হয়ে আসলেও উঠার মতো শক্তি তার নাই। গরীব মানুষ, ঝাল দেখানো তার জন্য সাজে না! তিনি মেয়ের বাপ। তাও গরীব হতভাগা। এমন বাপের ইগো থাকতে নেই! তিনি এখানে কোন পাপ করলে সেটার বোঝা গিয়ে পড়বে মেয়ের ওপর। এই জায়গাটা তার সবচেয়ে দুর্বল জায়গা। কথার যখম সবচেয়ে বড় যখম। সেই যখমে আহত কাতর হয়েও বসে বসে ভদ্রতা বজায় রাখছেন মজিদ মিয়া। পবিত্র রমজানের পয়লা দিনে খুব খুশ মেজাজে এসেছিলেন মেয়েকে দেখতে। আর আসার সময় খুশি মনে অনানুষ্ঠানিক কিছু ইফতারি নিয়ে এসেছিলেন। তাতে যে তার এতো বড় গলদ হয়ে যাবে, তা তিনি বুঝতে পারেননি।
তড়িঘড়ি করে মাগরিবের নামাজ পড়ে সালাম ফিরিয়ে উঠে দাঁড়ান। মেয়ে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আকুলি-বিকুলি করছে। মজিদ মিয়া কথা না বাড়িয়ে বললেন, তোর শ্বশুড়-শাশুড়িকে বল জিকাইয়া যাই।
শাশুড়ি নামাজ শেষ হলেও তসবিহ পড়ার ভানে বসে আছেন। একবার শুধু বলেন, যাইতে চাইলে আটকাইয়া কী লাভ? আবার তিনি আঙ্গুলের কর গুনতে থাকেন।
মেয়ে বারবার এদিক সেদিকে তাকায়। তিনি বুঝেন, মেয়ে কিছু বলতে চায়। কিন্তু এখন প্রশ্রয়ের সময় নয়। পাষাণ হতে হবে তাকে। মেয়ের চোখে চোখ রাখলে নিজেকে সামলাতে পারবেন না। আর তার চোখে এক ফোটা পানি আসা মানে মেয়ের উন্মুখ বুকটাকে ফাটিয়ে দেয়া। মেয়েকে হুকুম করেন-‘যা মা তুই গিয়া থালা-বাসন পরিস্কার করে গুছিয়ে নে...। ভালো থাকিছ রে মা!’ শেষের কথা কইতে যেয়ে তার গলা জড়িয়ে আসে। বারান্দায় বেয়াই কাঁশছেন। চটজলদি বের হয়ে আসেন সেখানে।
‘চলি যাই বেয়াই সাহেব, আমার বড্ড তাড়া। একা মানুষ বুঝেনই তো।’
‘তা ঠিক চলি গেলে আগেভাগে যাওয়াই ভাল। আর বেয়াই, যা নিয়া আইছিলেন সাথে করি নিয়া যান। এখানে কেউ খাইবো না। এটুকুতে আমাদের ইৎপিৎ কিছুই হইবো না। না পারমু কারো কাছে জবাব দিতে। আমাদের একটা মান ইজ্জত আছে।’
‘আমার ভুল অইগেছে বেয়াই সাব, পয়লা তো এতোটা খেয়াল করি নাই।’
‘মেয়ের বাপ হইছেন, এসব আজকাল কেউ কাউরে শিখাইয়া দেয় না। দুনিয়ার রুসুমাত সারা দুনিয়া জানে। আমরাও মেয়ে বিয়া দিছি। পয়লা মেয়ের বাড়ি তিনবার ইফতারি দিতে হয়। আমরাও দিছি। আপনি তিনবার না পারেন দেয়ার মতো একবারই দেন যাতে সবাইরে পোষানো যায়। এতটুকু নিয়া আমাদের মান ইজ্জত মারতে আসবেন না। আমরা সমাজ নিয়া চলতে হয়।’
‘বুঝছি বেয়াই সাব বুঝছি, আর এমন ভুল হইবো না। বেয়াইন সাব মনে হয় নামাজে আছেন, কইবেন চলি গেছি। বউ পুত্রাদেরও কইবেন জিকাইছি।’
‘যান। আর ইফতারের আগে কিছু কথাবার্তা হইছে রাগ করবেন না। বেয়াইন একটু গরম তো!’
‘না বিয়াই সাহেব কীযে কন।’ মজিদ মিয়া হাসার ভান করলেও ঠিক মতো হাসতে পারলেন না। পায়ের পর পা ফেলে হাঁটেন। পিছনে তাকান না।
এতোটুকু জায়গা পেরোতে গিয়ে মজিদ মিয়া ঘেমে যান। সেখানে যেন তার অক্সিজেন ফুরিয়ে আসছিলো। রাস্তায় উঠে ভাল করে দম নেন। দম ছাড়েন। নিজেকে একটু হালকা করে পরক্ষণে আবার মনে হয় নিজে হাফ ছেড়েছেন কিন্তু মেয়ের কী হবে? অসমাপ্ত কথার ঝড়-ঝাপটা তো মেয়ের ওপর দিয়েই যাবে! আবার ঘাড় ঘুরে তাকান যেখানে তার মেয়ে থাকে সেদিকে। তার সে দৃষ্টি নিতান্ত গরীব আর করুণ!
বাইরে ওরা কতো ফিটফাট আর ভেতরে এমন অমানুষ বাস করে। ভুলটা তিনি নিজেই করেছেন। মানুষের ছল্লায় পড়ে মেয়ের সর্বনাশ করেছেন।
‘বারবার মানা করছিলাম, নিষেধ মানো নি। দালান দেখিয়া উতালা হই গেছিলা। আগেই কইছি এদের সাথে আমরার কুটুমিতা সাজবে না। মানো নাই। এখন নিজের তো রস বাহির করছে করছে আমার মেয়েটারও হালত বলতে কিছু নাই। কী মেয়ে আমার কী হইছে...!’
‘এতো কিছু কি আগে বুঝচ্ছিলাম।’
‘বুড়া হইগেছো এখনও মানুষ চিনো না। টাকাওয়ালাদের খাছলতই এমন। গরীবরে তারা মানুষ মনে করে না। ঠেলা ভরি আম কাঁঠালি দিয়া তুষ্ট করতে পারছিলা? মেয়ের সামনে জামাই সেদিন কী কথাবার্তা কইলো! আর আজ আহ্লাদ দেখাইয়া গেছ ইফতারি নিয়া। নিজে তো একঘন্টাও টিকতে পারো নাই আর আমার মেয়ে আছে দিনের পর দিন। ইফতারির লাগি এখন কতো কথা শুনতে হবে। পারলে এখন ইফতারি দিয়া মুখ সামলাও। এসব নাকি রুসুমাত। গরিব মারার রুসুমাত...।’
মজিদ মিয়ার মুখে কোন কথা নেই। নিজেই নিজের কাছে আহাম্মক। এভাবে কি ভেবেছিলেন? মাইনষে কইতো গরিবের ঘরে আসমানের চাঁন্দ। সেই চাঁন্দের ভাগ্য এমন হবে, কে জানতো। অথচ সবাই প্ররোচনা দিছিলো- ‘মজিদ মিয়া কোনদিকে না চাইয়া চোখ বন্ধ করি দিয়া দেন। এমন ঘর আর পাইবা না। তুমি কই আর তারা কই? আকাশ-পাতাল। মেয়ের সুন্দর দেখিয়া খায়েশ লাগছে বিধায় তোমার নসীব, না হয় এমন বড় ঘর তোমার কপালে আছিল না।’
মেয়েটাও দেখতে দেখতে লাউয়ের ডগার মতো বড় হয়ে গেলো। এখান ওখান থেকে কতো আলাপ আসে। মজিদ মিয়ার সাহসে কুলায় না খাড়া হয়ে দাঁড়াতে। ঘটক আছমত মিয়া নাছোড় হয়ে লাগলো, পিছু ছাড়ে না। ‘গাছে বরই থাকলে সবাই উঁকি দিবো এটা স্বাভাবিক! তবে এমন ঘর শ’তে একটা। হাতছাড়া হইলে পস্তাইবা। মেয়ে খাইতে বিলাইতে অভাব করবো না। সুখে থাকবো মজিদ মিয়া ভেবে দেখো কইলাম।’ মজিদ মিয়া স্ত্রীকে রাজি করাতে পারেন না।
‘এতো ফাল মারিও না। মেয়ে আমার ঘর ভাঙ্গি চলি যাচ্ছে না। লেখাপড়ায় আছে লেখাপড়া করুক। বিয়ার সময় উড়াল দিচ্ছে না।’ ঘটক আছমত আলি কয়- ‘মেয়ে লেখাপাড়া করলে করবো। তারা খরছ করি পড়াইবো। নিজে কেন কষ্ট করবা। আর মেয়ে তো আজ না কাল এক জায়গায় দিতে হইবো। একলা একজনের কামাইর উপরে ভর দিয়া কী ভরসা। জাগা-জমিও নাই। দিন থাকি দিন কতো কঠিন আইতাছে। কয়েক লাখ খরচ করতে পারবা না ভাল ঘরও পাইবা না। আর তারা তোমার কাছে মালপত্র কিছুই চাচ্ছে না। মেয়ে দেখে পছন্দ হইছে শুধু মেয়েটারেই নিবার চায়।’
অভাব ঘরে থাকলে গরীবের আর শত্রুর প্রয়োজন হয় না। অভাব সবচেয়ে বড় শত্রু। অভাব আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয় দেখিয়ে কন্যাদায়গ্রস্ত বাবা-মাকে সহজে কাবু করা যায়। মজিদ মিয়ার স্ত্রী মুখে আর কোন কথা বলেন না। স্বামীকে বলেন- ‘তোমার যা ভালো মনে হয় করো, আমারে জিকাইও না।’
সবাই কয়- ‘চাইলে কি মজিদ মিয়া দিয়া দে।’
মজিদ মিয়া ইতিউতি করে পা বাড়ান। পা বাড়িয়ে কিছুদূর গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। আবার পেছনেও ফিরতে পারেন না। হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে থাকেন। কয়দিন পর ঘটক আছমত আলি এসে কয়-‘মালপত্র না চাইলে কী হইবো, নিজেরতো একটা বিবেক আছে। একেবারে লিল্লাহর জাহাজ মক্কায় নিয়া তুলে দিবা সেটা কেমন কেমন লাগে। আজকাল ফকির হইলেও তাওফিক ওজনে কিছু দিতে হয়। এগুলো দুনিয়ার নিয়ম। দিলেতো নিজের মেয়েরই থাকবো, কেউতো নিয়া যাইতো না।’ যুক্তির কাছে মজিদ মিয়ার ‘রা’ থাকে না। তারপর মাইনষে কয়- ‘দিচ্ছো যখন ভাল দেখি দেও, যাতে সবাই কয় গরিব হইলেও বেচারার মন গরিব না।’
সমাজের কাছে নিজের বিবেক, মুখ আর মন দেখাইতে গিয়ে প্রথম ধাক্কায় নিজের একখ- জমি ছিলো, উড়ে গেলো। মজিদ মিয়া বুঝেন ভালই ফান্দে পড়েছেন তবে এখন আর করার কিছুই নেই। সমাজে মুখ দেখাতে পারবেন না। মেয়ের সুখ ভেবে নিজেরে শান্তনা দেন। ঘটক আছমত আলি আবার আসি কয়-‘ এইসব সমাজের নিয়ম। গরিবানা সুরতে হইলে রক্ষা করতে হয়। বেয়াইরা বড় সমাজে চলনেওয়ালা লোক। তারা না কইলেও শ মানুষ আসবে। মালপত্র তারা কিছুই চেয়ে নেয় নি। তুমার খুশি মনে যা দিছো নিছে। মানুষ তো দিনদিন খাইতে আসে না। বিয়ের এই একদিনই আসে। গরীবানা হালতে হইলেও তো শ লোকের খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করতে হয়...!’
বিয়ে নয় মস্ত বড় একটা ধকল যায় মজিদ মিয়ার উপর দিয়ে। সেই ধকলে তিনি কাত হয়ে গেছেন। দায় দেনাতো বেড়েছে সেই সাথে ব্যাংকের লোন। প্রতিমাসে এসে কিস্তির টাকার জন্য বসে থাকে। পড়িমরি হলেও টাকা দিয়ে বিদেয় করতে হয়। তারপরও মজিদ মিয়ার রেহাই নাই। দোয়া ইউনুছ পড়তে পড়তে মাছের পেট থেকে উদ্ধার হয়ে এখন যেন কুমিরের মুখে পড়েছেন! চোখে আন্ধার দেখেন। বাড়িতে গাছগাছালি যা ছিলো বিয়ের করাতে ময়দান হয়ে গেছে। পুরনো একটা জামগাছ টিকেছিলো। সেদিন জামাইর বন্ধু-বান্ধব একপাল নিয়া আসবে। গরু, খাসি থেকে নিয়ে নানা পদের অর্ডার দিছে, যোগাড় রাখতে হইবো। মজিদ মিয়ার কাছে নাই টাকা। গাছটা বিক্রি করে কোনমতে মুখ রক্ষা করছেন। কিছু টাকা বাঁচিয়ে আরো কিছু যোগাড় করে বেয়াইর বাড়ি আম-কাঁঠালী দিয়েছিলেন। এখন আর কোন চারা নেই। চোখে কোন পথ খোঁজে পাচ্ছেন না। ইফতারি না দিয়া উপায় নেই! চারদিকে দু’চোখ বিচরান। বিচরাইয়া হালের বলদ দুটা ছাড়া আর কিছুই দেখেন না। স্ত্রী নিষেধ করেন- ‘সাবধান! এইদিকে নজর দিবা না। এই দুইটা হারাইলে বর্গাদাররা কেউ তোমার কাছে জমি রাখবো না। ক্ষেত না করলে না খাইয়া মরতে হইবো।’
মজিদ মিয়া লা-জবাব। চোখে ভাসে শুধু মেয়ের করুণ প্রতিচ্ছবি। গায়ে ফুটে কথার হুল। তার দু’চোখ জুড়ে আন্ধার নেমে আসে। এদিক সেদিক দৌড়েও কিনারা করতে পারেন না। ফিরে আসেন হতাশ হয়ে। যেন তিনি শয়তানের চক্করে পড়েছেন। ঘুরে ফিরে এসে দেখেন সেই একই জায়গা যেখানে তার হালের বলদ। বলদ ছাড়া বিচরাইয়া আর কিছুই পান না। দুনিয়া ঘুরে ফের এখানে চলে আসতে হচ্ছে তাকে...।
রাতে মাথা ঘুরেছে। বমিও হয়েছে। সকালে স্ত্রী রোজা রাখতে মানা করেন। ‘রাতে কিছু খাওনি, শরীর দূর্বল পরে ক্বাযা রাখবানে।’ মজিদ মিয়া কন- ‘আরে কও কী, রোজা ভাঙ্গিলাইমু! বুঝ হবার পর থিকা ভাঙ্গি নাই।’ আজ অনেক কাজ তার। একা সামলাইতে হইবো। ছেলেটা একটু বড় হলে না হয় কিছু করানো যেত। তাকে এক কাজে পাঠালে তিন কাজ বাড়িয়ে আসে। সব নিজেকে একলা সামাল দিতে হয়। পুবপাড়ার জব্বার মিয়া টাকাওয়ালা মানুষ। বড়জাতের সাথে চলাফেরা তার। মজিদ মিয়া তাদের বাড়িতে যান। ইফতারির আইটেম কি কি দিবেন পরামর্শ করে লিস্ট করেছেন। গাড়িও বলে রেখেছেন। বেলা থাকতে আগেভাগে নিয়ে যেতে হবে। না হলে পরে কথা শুনতে হবে। গড়িমসি না করে তাড়াতাড়ি বের হন। স্ত্রী আবারও বলেন- খিয়ালে যাইও আর টাকাগুলো সাবধানে রাখিও। মজিদ মিয়া আবার পকেটে হাত দিয়ে টাকাগুলো আন্দাজ করে পা বাড়ান।
পখর রোদ আর গরমে চারদিক তাতিয়ে দিচ্ছে। বাজারে কয়েক চক্কর দিয়েই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। জিরান নিয়ে আবার উঠেন। অনেক কিছু কিনতে হবে। এমনিতেই আজ সেহরী না খেয়ে রোজা রাখছেন। কারো সাথে ঠিক মতো কথাও বলতে পারছেন না। জিহ্বা, ঠোঁট আটালো হয়ে আটকে যায়। কথা জড়িয়ে যায়। এ গলি ও গলি ঘুরতে ঘুরতে আরও হাঁপিয়ে ওঠেন। সুইটমিটের দোকানে গিয়ে তার ভেতর গুলিয়ে আসে। কোনমতে দাঁড়িয়ে আছেন সেখানে। কর্মচারীরা খুব ব্যস্ত। তিনি তাগাদা দেন- তাড়াতাড়ি করো রে বাবা আমার অনেক কাজ।
দিচ্ছি চাচা দিচ্ছি। তারা বক্সে তুলে একে একে ওজন করে বক্সের পর বক্স সাজিয়ে রাখে। বাঁধা শেষ হলে ম্যানেজার বিল ধরিয়ে দেয় মজিদ মিয়ার। মজিদ মিয়া বিল হাতে নিয়ে পকেটে হাত দেন। প্রথমে ডান পকেটে তারপর বাম পকেটে। আবার একইভাবে ডান বাম করেন। ঘাড় এদিক ওদিক ঘুরান।
দোকানের কর্মচারীরা একে অন্যের মুখের দিকে চায় আর ঠোঁট উল্টায়।
ম্যানেজার আবার বলে- আপনার শেষ চাচা, টাকা দেন।
মজিদ মিয়া শুধু পকেট হাতড়ান। টাকাইতো খুঁজছি টাকা গেলো কোথায়...!
কি বলেন চাচা, টাকা বাহির করেন।
মজিদ মিয়া আবার মাথা তুলে ম্যানেজার লোকটার মুখের দিকে তাকান। লোকটাকে যেন ঠিক চিনতে পারছেন না। বুঝতে পারছেন না তিনি ঠিক কোথায় আছেন। দেখেন সবকিছু কেমন ঘোলাটে আর ঝাঁপসা হয়ে আসছে। মানুষগুলো আবছা আবছা লাগছে। তারা কি সব বলছে কিছুই বুঝতে পারছেন না। আওয়াজ খুব নিচু হয়ে কানে পাশ দিয়ে চলে যায়। কেমন স্থবির হয়ে আসছে সব। তার পায়ের নিচে যেন কোন ভর নেই। তিনি ডুবে যাচ্ছেন, তলিয়ে যাচ্ছেন...।
ম্যানেজার হাঁক দেয়- দেখিছ কিরে চাচারে ধর!
দু’জন কর্মচারী এগিয়ে আসে ধরার জন্য। তারা ধরতে পারে না। ধরার আগেই মজিদ মিয়া ফ্লোরে লুটিয়ে পড়েন!

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT