সাহিত্য

কবি, দার্শনিক এবং কেরাণী

প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০৫-২০১৯ ইং ০০:৩৩:৩৯ | সংবাদটি ২৬১ বার পঠিত

কৃষণ চন্দর
ভাষান্তর : আবদুল হামিদ মানিক


সৌন্দর্য! সৌন্দর্য কী বিস্ময়কর এক অনুভূতি। এ শুধু অনুভবের কোঠাতেই আবদ্ধ। এর বর্ণনায় কবির বাকচাতুর্য স্তব্ধ। শব্দের ভা-ার শুন্য। উত্তম কবিতাও ঘোলাটে আয়নার মত। নিজের মুখটুকুও পরিষ্কার দেখা যায়না। সৌন্দর্যের কারিগরি তো দূরের কথা।
এই চিত্তাকর্ষক মুচকি হাসি, ফুটন্ত উৎফুল্প ফুল, কাঁদো কাঁদো কলি, সাদা কবুতরের বাকবাকুম সুর তুলে উড়ে যাওয়া, পানিতে সাঁতার কাটা হাঁস, সবই সুন্দর। কিন্তু সত্যি বলছি, সৌন্দর্য এমনি যে, তা শব্দ দিয়ে বুঝানো যায়না। আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোও তা পুরোপুরি অনুভব করতে পারেনা। এ পর্যন্ত কোনো রমণীকেই তার স্বরূপে দেখিনি। কই সেই মনোহর হাঁস, কোথায় সেই হরিণ-নয়না কিছুক্ষণ যা সব কিছু ভুলিয়ে দিতে পারে। আমার বিশ্বাস সৌন্দর্যের স্বরূপ এখনও দেখিনি। হয়তো দেখবেন। কোনো দিন। কখনো কিঞ্চিৎ দেখে থাকলেও তা রেশমী পর্দার আড়ালে ছুটন্ত ছায়ার মত ক্ষণিক দৃশ্য মাত্র। ব্যস। শুধু, এ টুকুই। তার পর সেই অর্থে অন্ধকার। কীটে ভরা মাটির কুটির, হা-হুতাশ, রুটি-রুজি বেকারত্ব, শোরগোল সমাবেশ.......
কবি উপরের দিকে হাত তুলে বলে যাচ্ছিলেন এক টানা। বাঁধা দিলেন দার্শনিক। -বকত্তয়াস বন্ধ করতো এবার। সবই আছে তোমাদের। নেই কেবল বুদ্ধি, প্রজ্ঞা। ভেসে যাও। অন্ধ আবেগের ¯্রােতে তোমরা ভেসে যাও খড়ের মত। জানো, এই বয়ে চলা ¯্রােত আটকাতে পারলেই বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়ে যায়। চিন্তা কর, বুঝতে চেষ্টা কর, সৌন্দর্যটা কি। নারী, ফুল, হাঁসগুলোর সৌন্দর্যে তোমরা দিশেহারা। আসলে ওসব কিছুই নয়। শুধু তোমাদের লাগামহীন আবেগের বাড়াবাড়ি। সৌন্দর্য ইন্দ্রিয় জাত একটা ব্যাপার। অনেকটা পাশবিক প্রবৃত্তির পাশাপাশি। হায়! এখনো ডেকার্টে পড়ে নিলে মস্তিষ্কটা হয়তো তোমাদের স্বচ্ছ হয়ে যেত। সৌন্দর্য কবিসুলভ অন্ধত্ব নয়। এ হচ্ছে জ্যামিতির স্বতঃসিদ্ধ নিয়মের উপর স্থাপিত। সামান্য ক'জন নিরাশাবাদী ছাড়া বিখ্যাত সব দার্শনিক সৌন্দর্যের জ্যামিতিক সূত্রকেই মেনে নিয়েছেন। স্বয়ং পিথাগোরাস ও...........।
বেচারী কেরাণী জটিল এ আলোচনা বিমূঢ়ের মত শুনছিলেন এতক্ষণ। এবার মুখ খুললেন।...জ্যামিতি আর সৌন্দর্য বুঝিনা, ছাত্র জীবনে এলজাবরা হয়তো বুঝতাম। কিন্তু অংক আর ঐ জ্যামিতি মাথায় ঢুকেনি কোনো দিন।
এতটুকু বলেই বিড়ি-ফুকতে মগ্ন হলেন কেরাণী।
দার্শনিক করুণাপূর্ণ দৃষ্টিতে কেরাণীকে একবার দেখে নিয়ে শুরু করলেন ঃ তুমি এ সবের বুঝবেটা কি? ডেস্কে বসে রেজিষ্টারে এনট্রি, ইস্যু, রিসিভ ছাইভস্ম যত সব অমার্জিত কথাবার্তা লিখবে সারাদিন। তোমাকে মানুষ বলে কে? বিড়ি ফুঁকো, রেজিষ্টার ঠিক রাখো, লগ লেখো, সন্ধ্যায় বউ ছেলে পেলে নিয়ে হাওয়া খাও-ব্যস। আদা ব্যাপারীর জাহাজের খবর নিয়ে কি লাভ। সৌন্দর্য জ্যামিতি আর অংক নিয়ে মিথ্যে মাথা ঘামিওনা।
: আরে ভাই, সারা দিনই কি রেজিষ্টারে ডুবে থাকি? মুখে বিড়ি, কানে কলম আর সামনে খোলা রেজিষ্টার নিয়েও আমি মাঝে মাঝে ওসব ভাবি। এই সৌন্দর্য আর আকর্ষণের কথাই বলনা কেন। আমি অনেক ভেবে দেখেছি। কিন্তু ..... কিন্তু .....
: কিন্তু কিন্তু করছ কেন? বলেই ফেল চটপট। তাগাদা দিলেন কবি।
: কিন্তু একটু লজ্জা লাগছে যে। বলতে গেলে একটা কাহিনীই আমাকে বলতে হবে। আর কাহিনীটা আমারই জীবনের কিনা।
এবার কবি এবং দার্শনিক উভয়েই তাড়া দিলেন কেরাণীকে, বিড়িতে দম দিয়ে শুরু করলেন কেরাণী :
এফ, এ, পরীক্ষায় ফেল করে আমি গেলাম বাড়ীতে। আর তোমরা দু’জন বি.এ পড়ার জন্য ভর্তি হলে গভর্ণমেন্ট কলেজে। জেলা বোর্ড যখন বৃত্তিটা কেড়েই নিল, গ্রাম ছাড়া তখন আর কোথায়ই বা যাই ।
: কথা বাড়াচ্ছ কেন ? বলে যাও ঝটপট। ব্যাঘ্র কণ্ঠে বলেন কবি।
: আরে ভাই, শুনোইনা। সব কথার একটা তাৎপর্য থাকে। তা যা বলছিলাম। ট্রেন থেকে নেমে দশ মাইল হেঁটে যেতে হয় গ্রামে। সময়টা ভর দুপুর। মাঠ ভরা কার্পাস ক্ষেত। মনে হচ্ছে, মাইলের পর মাইল জুড়ে বরফের সাদা আস্তরণে ঢেকে আছে মাঠ। ঘামঝরা দুপুরে কার্পাসের শুভ্রতা চোখ ঝলসে দিচ্ছে। কাঁধে বোঝা নিয়ে আলপথে ছুটছি। মাঝে মাঝে বাবলা, কিকর গাছের ছায়ায় থেমে জিরিয়ে নিচ্ছি। তৃষ্ণায় ছাতি ফাটা অবস্থা। নির্জন রাস্তার কোথাও নদীনালা নেই। চারদিকে দিগন্ত বিস্তৃত আকাশ। আর ফুটে ওঠা কার্পাস ক্ষেত। ভীষণ তৃষ্ণায় আমি কাতর। আরো পাঁচ মাইল দূরে আছে একটি ঝরণা। কিন্তু এখনই বড় কষ্ট হচ্ছে আমার।
হঠাৎ সে বিশাল মাঠে মানুষের আওয়াজ শুনে ভরসা পেলাম। ক্ষেতের মধ্যে কে যেন গান গাইতেছে। এই নির্জন তপ্ত দুপুরে যে গান গাইতে পারে নিশ্চয়ই তার কাছে পানিও রয়েছে। পথ ছেড়ে ক্ষেতের মাঝ দিয়ে এগিয়ে গেলাম, পাশে যেতেই গান বন্ধ হয়ে গেল। দেখি তিনটি গ্রাম্য মেয়ে। কার্পাসের ফুল তুলছে, পুষ্ট হাত-পা, কাজল কালো চোখ। হ্যাঁ, গ্রাম্য মেয়েরা যেমনটি হয়ে থাকে।
কিঞ্চিৎ লজ্জিত কণ্ঠে একজন জানতে চাইলে আমার প্রয়োজন। বললাম বড় তৃষ্ণার্ত আমি। পানি থাকলে দাও। এ মেয়েটিই এবার ডেকে বললো। অমৃত, এক গ্লাস লাস্সি নিয়ে আয় তো বোন। আমি লাহোর থেকে আসছি জেনে তিনজনই বিস্ময় বিস্ফোরিত চোখে আমার দিকে তাকাল। দৃষ্টিতে ছিল প্রশংসা, বিস্ময় এবং সন্দেহ। অমৃত জিজ্ঞাসা করেই বললো আপনি ঠিক লাহোর থেকেই আসছেন।
আমি পাশের গ্রামের শ্যামসিং পাটোয়ারীর ছেলে জেনে তাদের দৃষ্টিতে এবার শ্রদ্ধার ভাবও ফুটে উঠলো। বলাই বাহুল্য, গ্রামীণ জীবনে তখন পাটোয়ারীদের প্রভাব প্রতিপত্তি অপ্রতিহত।
আমি লক্ষ্য করলাম, অমৃতের চোখ দু'টিই বেশী চঞ্চল হয়ে উঠেছে। হায় অবোধ মেয়েরা। ফিটফাট, ধুপদূরস্ত ড্রেস আর ইংলিশ চালচলনে এত সহজেই মজে যাও তোমরা। আমি পাট করা চুলের দু'একটি গুচ্ছ আঙ্গুল দিয়ে মাথায় সযতেœ ছড়িয়ে দিলাম, বাড়ীতে অবসর সময় কাটানোর জন্য একটা কিছু চাই। অমৃতকে আমার ভালো লাগলো। ঠিক করলাম, পরে অমৃতের সাথে দেখা করবো।
সত্য বলতে, অমৃতকে আমি অন্তর দিয়ে ভালোবাসিনি। সুন্দরী হিসেবেও দেখিনি। সে ছিল একটা সাময়িক সম্পর্ক। এক ধরণের স্বার্থপরতা। তবে নিশ্চিত বলতে পারবোনা অমৃত আমাকে কেমন ভাবতো। হ্যাঁ, চাঁদনী রাতে মাঠে আমাদের দেখা হত। অমৃত আমার বুকে বুক রেখে দীর্ঘশ্বাস নিত। আমাকে শপথ নিতে হতো চির জীবন মনে রাখার। আজকালও সংসারে শপথ করি। কিন্তু সে স্বাদ কোথায়?
অমৃত সুন্দরী ছিলনা। কিন্তু তার সাথে কাটানো দিনগুলো বড় সুন্দর। বড়ই মধুর। তাহলে সৌন্দর্যটা কি? কেউ বলেন যৌবনের ছোঁয়ায় ভেড়ীটাও লাবণ্যবতী সুন্দরী হয়ে উঠে। অমৃতকে আমি এর সাথে তুলনা করতে চাইনে। অনেক নারী দেখেছি, উচ্ছ্বল যৌবনেও যাদের শ্রী ফুটেনা। তাই মনে করি, যৌবন এবং সৌন্দর্য অঙ্গাঙ্গি জড়িত নয়!
আমি বাড়ীতে বেকার। সেই নিঃসঙ্গ দিনগুলো মধুময় করে তুললো অমৃত। তার গোপন নিষিদ্ধ সান্নিধ্য চাঙ্গা করে রাখলো আমাকে।
এ সময়টাতে মা-বাবা আমার বিয়ে ঠিক করে বসলেন। মডেল পাস মেয়ে। শ্বশুর-জেলদার। ভাবলাম চাকরীও একটা হয়ে যেতে পারে। চাকরী এবং স্ত্রী যার আছে এ যুগে সেই তো ভাগ্যবান। অতএব রাজী হয়ে গেলাম। অমৃতকে অনর্থক কাঁদিয়ে কি লাভ। কান্নার অনেক সময় আছে। চাঁদনী রাতের সে মুহূর্তগুলো, অমৃতের কালো চোখের গভীরতায় হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ, আমি হারাতে চাইনা। তাই অমৃতকে বিয়ের কথাটা জানতে দেইনি।
এখন ভাবি, অমৃতকে আগে জানিয়ে দিলেই ভালো হত। ধীরে ধীরে সে সহ্য করে নিতে পারতো। নিজের জীবনকে সবাই সবচাইতে বেশী ভালবাসে, কিন্তু কোনো কোনো নির্বোধ আবেগের আতিশয্যে সত্যটাকে ভুলে যায়। অমৃত তাদেরই একজন।
শ্যামসিং পাটোয়ারীর ছেলের বিয়ে। আশপাশ গ্রামের ছেলে মেয়ে দল বেঁধে আসছে। গাইছে নাচছে। দিন রাত চলছে ফুর্তি আমোদ ধুম ধাম, খাওয়া দাওয়া। অমৃত শুনেই স্তম্ভিত হয়ে গেল প্রথম। ধাক্কাটা সামলে নিল সে। উৎসবে আসার প্রস্তুতি নিল এবার। চুলে সুগন্ধী তেল, হাতে মেন্দী সহ সাজ গোজ করে সে তৈরী। সঙ্গীদের অপেক্ষায় বসে আছে। সঙ্গীরা দল বেঁধে এসে ডাকাডাকি শুরু করলো! একবার-দুইবার, তিনবার, কিন্তু না, অমৃত আর জবাব দেয় নি ।
আবেগের তাড়নায় অনেকেই এমন কিছু করে বসে যার জন্যে; পরে অনুতাপ করতে হয়। কিন্তু অমৃতের সে সুযোগ মিলেনি। আত্মহত্যার পর আর অনুতাপের সুযোগ নেই।
যুবক-যুবতীর মৃত্যু সংবাদ বাতাসের সাথে দৌঁড়ায়। ঘণ্টা দুয়েক পরে গিয়ে দেখলাম, ঘাটের উপর কুজো হয়ে পড়ে আছে অমৃত। কালো চুল মুখটা ঢেকে দিয়েছে। মনে হল, গাছের ডালে যেন এক ফুটনোন্মুখ গোলাপ কুঁড়ি দেখছি। সে যেন পূজার অর্ঘ্য হিসেবে গোলাপ কুঁড়ি সাজিয়ে রেখে গেছে।
এখন আমার বউ আছে। আছে ছেলে-মেয়ে। আমি ওদের ভালোবাসি। বউকে সুন্দরী মনে করি। খাই-দাই, বাগানে বেড়াই। অফিসে কাজও করি! কিন্তু মাঝে মাঝে কেমন যেন হয়ে যাই..যাই। কোনো কোনো রাতে কার যেন কালো চোখের গভীরতা, চুলের ঘ্রাণ, মেহদী রাঙ্গা অঙ্গুলীর ছোয়া অনুভব করি। মনে হয় সে যেন এখনও আমার খুব কাছে রয়েছে। আমি উতলা হয়ে যাই। ভীষণ অস্বস্তি বোধ করি। চোখে জল এসে যায়। বউ বাচ্চার চেয়েও তাকে মনে হয় কাছে। মনে হয় সে স্মৃতিগুলোই আমার বেশী প্রিয়। --- প্রেম শুধু খেয়ালী নয়, নয় শুধু কাব্যিক উচ্ছ্বাস। আমার বিশ্বাস, সৌন্দর্য জ্যামিতির সম্পাদ্য উপপাদ্য নয়। নয় জ্যামিতিয় সূত্রে যাচাইযোগ্য কিছু।
অমৃতের মৃত্যু আমাকে দারুণ দ্বিধায়-যন্ত্রনায় নিক্ষেপ করে দিয়েছে। প্রেম আর সৌন্দর্য? সৌন্দর্য মৃত্যুর পর গোলাপ ফুলের কুড়ি হয়ে যায়। আর প্রেম মরে গেলে হয় চোখের তপ্ত জল। সম্ভবত এ দুটো একই জিনিষের ভিন্ন দুটি নাম। আমি একে অমৃত বলি। কেননা, বিষের পেয়ালা পান করেও সে জীবিত। তুমি কবি, বলতে পার- ইউসুফ অথবা লায়লী। যাই বলো, নামে কি-বা আসে যায়! আর তুমি দার্শনিক। তুমি?
দার্শনিক বললেন : এ হচ্ছে তোমার ব্যক্তিগত জীবনের বেদনাসিক্ত একটি ঘটনা। কিন্তু অমৃতের সৌন্দর্য তার প্রেমের প্রশ্নে কোনো আলোকপাত করেনি। অমৃত সুন্দরী হলে নিশ্চয়ই তোমাকে জয় করে নিত। সম্ভবতঃ তার চেহারা, গঠন আকৃতি জ্যামিতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নিখুঁত ত্রুটিমুক্ত ছিল না। এছাড়া তার সাথে তোমার ভালোবাসা থাকলে তোমার জেলদার শ্বশুর এই কেরাণীগিরির চাকরীটা জোগাড় করে দিতেন না। তাই বিষয়টা এখানেও পরিষ্কার। প্রেম একটা কাব্যিক খেয়ালীপনা, সৌন্দর্য একটা জ্যামিতিক চিত্র, আর তুমি রস-কস হীন, নির্বোধ একটা কেরাণী।
কবি ধীরে ধীরে জিজ্ঞাসা করলেন : আর অমৃত? অমৃত কি?
দার্শনিক জবাব দিতে যাচ্ছিলেন। কেরাণী চীৎকার করে উঠলেন : এই পিথাগোরাসের বাচ্চা, চুপ কর --।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT