সাহিত্য

আনন্দরসে ভরে উঠুক পাঠকমন

মামুন সুলতান প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০৫-২০১৯ ইং ০০:৩৪:৩১ | সংবাদটি ২৭০ বার পঠিত

মিনহাজ ফয়সল গল্পকার। গল্প-নির্মাণে তাঁর সাবলীল ¯িœগ্ধতা, আন্তরিক মনোযোগ, ভাবনার গভীরতা, সমাজ বাস্তবতা ইত্যাদি গাল্পিক সুন্দর সত্যগুলো তিনি রপ্ত করতে পেরেছেন বলে ‘এই শহরের সুখ’ গ্রন্থে প্রমাণ পাওয়া যায়। এটি একটি গল্পগ্রন্থ।
যুগে যুগে মানব জীবনের মতো ছোটগল্পেরও বাঁক পরিবর্তন হয়েছে। তবুও রবীন্দ্রনাথের সেই ‘ শেষ হয়েও হইলো না শেষ’ কে কেউ ছাড়িয়ে যেতে পারেননি। ছোটপ্রাণ ছোটকথা ছোট ছোট দুঃখ কথা’ থেকে কেউ বেরিয়ে আসতে পারেননি। বনফুল অন্যভাবে লেখার চেষ্টা করেছেন। সেগুলোকে ঠিক গল্প না বলে অনুগল্প বলা যায়। হাল আমলে হাসান আজিজুল হক গল্পের ভাষা ও কাহিনিতে নতুনত্ব এনেছেন। তবুও সবাই ঐক্যস্বরে বলছেন- রবীন্দ্রনাথই মহাগুরু। এখানে মিনহাজ ফয়সল পূর্বসূরী গল্পকারদের মহাসড়কে হাঁটতে এসেছেন। শওকত ওসমানের মতো কিংবা মাহমুদুল হকের মতো গল্পের গভীরে ডুব দিতে না পারলেও একজন তরুণ তার সমস্ত সাহস সঞ্চারিত করে ঘটনা বন্ধন জীবন অংকন করতে পেরেছেন। পেরেছেন হাসাতে, পেরেছেন কাঁদাতে।
‘এই শহরের সুখ’ - মিনহাজ ফয়সলের চতুর্থ গল্পগ্রন্থ। যতিহীন ভালোবাসা, মানুষ হাসতে জানে, ম্যাজিক স্যার এই তিনটি গ্রন্থ ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। বরাবরই পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছেন। আলোচ্যগ্রন্থে বারোটি গল্প আছে। প্রতিটি গল্পের মেজাজ আলাদা। মানুষের নানান সম্পর্ক, নানান ভাবনা, নানান ঘটনাকে কাহিনিরূপ দিয়েছেন।
‘কবি’ গল্পে মুজাদ্দিদ বইমেলায় যায়। দেখা হয় এক কবির সঙ্গে। কবি নিজের কবিতা নিজের হাতে লিখে মলাটবন্দি করে একশ’ টাকায় সেই বই বিক্রি করেন। হেঁটে হেঁটে। ফেরিওয়ালার মতোন। মুজাদ্দিদ সেই বই কেনেন। বাড়িতে আসে। বইটি পাঠ করেন। তার ভালো লাগে। তারপর মুজাদ্দিদ সেই কবির সন্ধানে ঠিকানা ধরে বের হয়ে যান। কবির সাথে দেখা হয়। কথা হয়। বউ ছেড়ে যাওয়ার গল্প শোনে, মেয়ে মরে যাওয়ার কষ্ট শোনে। তারপর দীর্ঘশ^াস। তারপর মুজাদ্দিদের চোখ কখন ভিজে এসেছে তিনি টের পাননি। বুকের ভেতর থেকে অনন্ত হাহাকার বেরিয়ে আসে। সে কবির নাম লেখক প্রকাশ করেননি। অন্তরালে বাংলাদেশে কতো কবি, কতো গীতিকার, কতো লেখক এভাবে অবহেলায় অনাদরে অযত্মে বিনষ্ট হচ্ছে তার খবর কেউ রাখেনা। এক্ষেত্রে মিনহাজ ফয়সল একজন দায়িত্বশীল লেখকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
বাল্যবিবাহ বাংলাদেশের গ্রামীণ সামাজিক জীবনে এক বিরাট অভিশাপ। অভিশপ্ত এই জীবন নিয়ে চলছে গল্পকথা। মেয়েটি তখনও ¯কুলের ড্রেস ছাড়েনি। কিন্তু বাপের বাড়ি ছেড়েছে। হয়েছে পাত্রস্থ। বেনারসি পরে ‘আরশি’ আরশির সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। বিয়ের দুইবছর পর ‘আশা’র জন্ম হয়। তারপর নানান ঘাতপ্রতিঘাত আছে। এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় পড়ে আরশির স্বামী মারা যান। আরশি হারায় স্বামীকে আর আশা হারায় তার বাবাকে। আরশি আর আশা নিমজ্জিত হয় অথই সাগরে...
‘বাবা’ গল্পে মিনহাজ ফয়সল একজন আদর্শ বাবার চরিত্রচিত্রণ করেছেন। বাবা ছিলেন নামকরা উকিল। সেই উকিল মারা গেলে- ‘বাবার সমান উকিল বা তার জুনিয়রদেরও অঢেল সম্পত্তি। বাবা এতো মক্কেলের মামলা সমাধান করতেন। অথচ মৃত্যুর পর বাবার ব্যাংক একাউন্ট যৎসামান্য অর্থ পাওয়া গেলো। অথচ বাবার সততার কারণে ছেলে বাবার প্রতি খুবই অসন্তুষ্ট। আবার সেই ছেলে যখন বুঝতে পারেন- সততার অনেক মূল্য। সততা অমূল্য সম্পদ। সমাজের সবাই বাবার প্রশংসা করেন। তখন ছেলে লেখকের ভাষায়- ‘আমি বাবার কবরের পাশে এসে দাঁড়ালাম ...বাবা এই অদম তোমাকে চিনতে দেরি করেছে। আমাকে ক্ষমা করো বাবা।” গল্পকার বাবার জন্য চমৎকার একটি গল্প রচনা করে পাঠকের কাছে ছেড়ে দিয়েছেন। বিশ^াস করতে কষ্ট হয় না- এসব গল্প পড়ে ঘরে ঘরে ভালো সন্তানের আবির্ভাব ঘটবে। পিতৃপ্রেমে সন্তানেরা আকণ্ঠ পান করবে স্বর্গসুধা।
সোহেল প্রতিবন্ধী। রাবেয়া আপু - খুলনার মানুষ। প্রেমের টানে ছুটে আসে অন্য শহরে। যার টানে ঘর ছাড়লো- এসে দেখে সে স্বাভাবিক কোন পুরুষ নয়। একজন প্রতিবন্ধী। তবুও রাবেয়া সেই সোহেলের জীবনে থেকে গেলেন। প্রকৃত প্রেমের এক আশ্চর্য গল্পের নাম ‘উপহার’।
পরীক্ষায় ভালো করতে না পারার কারণে আরিফ হবে। বাবার সম্মান বাঁচবে না বলে সে আত্মহত্যা করে। অন্যদিকে তার বন্ধু আরিফের আত্মহত্যায় খুব আহত হয়। রণি সিদ্ধান্ত নেয় ‘ আর যেন কোন বন্ধু এ প্লাসের জন্য আত্মহত্যা না করে। তাই অভিভাবকদের সচেতন করতে একটি সামাজিক সংগঠন করে ‘আপনালয়’। তারা প্রচার করে - এ প্লাস বড় কথা নয়- মানুষের মতো মানুষ হওয়ায় বড় কথা। অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে চমৎকার একটি লিপলেট ছাপে। তাদের বিশ^াস একদিন পরিবর্তন আসবে। আলো আসবেই।
‘মায়া’ অসাধারণ একটি গল্প। ব্যারিস্টারের মেয়ে মায়া। খুব আদরের মেয়ে। বড়ই সুন্দরী। একটি ফটো ইমরান। তাতেই তার ভালো লেগে যায়। ইমরান ব্যারিস্টার সাহেবের ড্রাইভারের ছেলে। তাই মায়ার সাথে দেখা করা, কথা বলা অসম্ভব। তাই সান্টুর দোকানে বসে থাকে মায়াকে দেখার জন্য। অন্যদিকে মায়ার বড় অসুখ। সে আর বাঁচবে না। একদিন মায়া মারা যায়। সান্টুর কাছ থেকে ইমরান জানতে পারে। ট্রাজিডিক্যাল এই গল্পটি অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন গল্পকার।
এই শহরের সুখ’ একটি পারিবারিক গল্প। এখানেও বাবাকে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই গল্পেও চোখের জল গোপনে ফেলতে হবে পাঠককে। একজন উদার প্রকৃতির বাবা আপন ভাইয়ের কাছে মামলায় পরাজিত হয়ে সমুদয় সম্পত্তি খুইয়েছেন। সুখী পরিবারের সন্তান নিজের শহর ছেড়ে, দেশ ছেড়ে রোজগারের জন্য বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন। সেই বাবা আবার বলছেন- তোমার চাচ্চুর সাথে বিয়াদবি করো না। গল্পকার অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পারিবারিক এই শিক্ষাকে চমৎকারভাবে গল্পে উপস্থাপন করেছেন।
‘এই শহরের সুখ’ আদ্যপ্রান্ত পাঠ করলে যেকোন পাঠকের মন আনন্দরসে ভরে উঠবে। পাঠশেষে কোনভাবেই মনে হবে না অনর্থক সময় নষ্ট হলো। বরং জীবনের অত্যাশ্চর্য অভিজ্ঞতা নিয়ে পাঠক তৃপ্তি পাবেন। গল্পকার মিনহাজ ফয়সল পাঠক কাননে এক নন্দিত গল্পকার হিসেবে পাঠকপ্রিয়তা পাক, এই আমাদের প্রত্যাশা।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT