উপ সম্পাদকীয়

ধানচাষির বঞ্চনা ও খাদ্য নিরাপত্তা

রওশন জামাল জুয়েল প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০৫-২০১৯ ইং ০০:৩৫:০২ | সংবাদটি ৮৯ বার পঠিত

ধানের ন্যায্য দাম না পেয়ে কোথাও কোথাও রাস্তায় নেমেছেন ক্ষুব্ধ ও বঞ্চিত ধানচাষি। মনের দুঃখে জ্বালিয়ে দিয়েছেন পাকা ধান। কোনো মর্যাদা-সম্মান বা স্বীকৃত নয়, শুধু উৎপাদন খরচের জন্য পল্গ্যাকার্ড হাতে রাজপথে নেমেছেন ক্ষুধার অন্ন জোগানো অসহায় কৃষক। ধানের বর্তমান বাজারমূল্যে প্রতি মণ ধানে কৃষকের লোকসান হচ্ছে ২০০-৫০০ টাকা। ধানচাষির এই বঞ্চনা ও ঠকে যাওয়ার গল্প নতুন নয়। বৈশ্বিক খাদ্য ঘাটতির কারণে ২০০৮ ও ২০০৯ সালের চাঙ্গা বাজারদর বাদ দিলে কৃষক গত ১৫ বছর ধরে লোকসানে ধান বিক্রি করছেন। কৃষকের নিজের হিসাবে যে লোকসানের অঙ্ক, বাস্তবে তা আরও বেশি। কৃষক শুধু উপকরণ ব্যয়, শ্রমিকের মজুরি ও জমি লিজের টাকা হিসাবে ধরেন। এর সঙ্গে যদি তার নিজের ও পরিবারের সদস্যদের শ্রম, বাড়ির গোবর-সার, নিজের জমি হলে তার 'অপরচুনিটি কস্ট', পেইড আউট কস্টের ইন্টারেস্ট, মুদ্রাস্টম্ফীতি, 'টাইম ভ্যালু অব মানি' এবং রিস্ক ফ্যাক্টর গণনা করা হয়, তাহলে উৎপাদন খরচ আরও বেশি হবে। অব্যাহতভাবে লোকসান হলেও কৃষক ধান চাষ বন্ধ করেননি, আবার মাঠে গেছেন, ফসলের মাঠে বঞ্চনার সঙ্গে ঘাম-শ্রম মিশিয়ে রচনা করে চলেছেন আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ভিত।
বাংলাদেশে ধান চাষের সঙ্গে শুধু অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা জড়িত নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। বাংলাদেশে ১৩ মিলিয়ন ধানচাষি পরিবারের ২৪ মিলিয়ন ধানচাষির ঘাম-শ্রম দিয়ে উৎপাদিত ৩৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন চাল বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবন-জীবিকায়নের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চালের বাজারমূল্যের প্রতি ভোক্তাসাধারণের অতিসংবেদনশীলতা পরোক্ষভাবে চাপ সৃষ্টি করে চালের মূল্য কম রাখতে। এ জন্য নির্বাচনী মেনুফেস্টোতে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার চেয়ে সস্তায় চাল খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি অধিক গুরুত্ব পায়। চালের বাজারে গিয়ে ভোক্তা চোখ বন্ধ করে কালের উজান বেয়ে চলে যায় শায়েস্তা খানের আমলে। ইতিহাসে অবশ্য কোথাও লেখা নেই শায়েস্তা খানের আমলে কৃষকের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার বঞ্চনা ছিল কি-না। ভোক্তা ৩০ টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে বাসা থেকে বাজারে এসে ১০ টাকায় এক কাপ চা খেয়ে ১০ টাকায় এক খিলি পান মুখে দিয়ে ১০ টাকার একটা সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে চালের বাজারে 'আগুন' দেখে (প্রতি কেজি চাল ৩০-৫০ টাকা) চিন্তায় পড়ে যায়। উৎকণ্ঠিত ভোক্তার খেদোক্তি শোনা যায়, 'এভাবে চালের দাম বাড়লে বাঁচব ক্যামনে।' মনে পড়ে ১৯৮৪ সালে আমি দুর্গন্ধ, মোটা ও ভেজা চাল কিনেছিলাম ১২ টাকা কেজি। নিত্যপ্রয়োজনীয় তেল-নুন-মসলা-সাবানের দাম বহুগুণ বাড়লেও ৩৬ বছরে চালের দাম কেবল ৩৬ টাকায় পৌঁছেছে (মাঝারি মোটা)। এ জন্য ধানচাষি ভাইদের একটা ধন্যবাদ দেবেন না? বর্তমান আর্থিক সক্ষমতা, ক্রয়ক্ষমতা ও উন্নয়নের মানদ-ে বাজারে চালের মূল্যই সবচেয়ে কম। পাঁচ সদস্যের সংসারে চাল লাগে মাত্র ১.৫ কেজি। যার বাজারমূল্য ৬০-৭০ টাকা। বর্তমানে কৃষক বাদে যে কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষের দৈনিক আয় অন্তত ৫০০ টাকা। মাথাপিছু আয় বেড়েছে, জিডিপি বেড়েছে, অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেড়েছে- বাড়েনি শুধু কৃষকের ধানের দাম।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে প্রতি কেজি ধানের উৎপাদন মূল্য ২৪ টাকা। সেই হিসাবে প্রতি মণ ধানের উৎপাদন খরচ দাঁড়ায় ৯৬০ টাকা। খাদ্য মন্ত্রণালয় এ বছর প্রতি কেজি ২৬ টাকা দরে কিনবে ১.৫ লাখ মেট্রিক টন ধান আর প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দরে ১১ লাখ মেট্রিক টন চাল ক্রয় করবে। মোট উৎপাদনের তুলনায় ১.৫ লাখ মেট্রিক টন খুব কম; তবুও যদি এই ধান কৃষক খাদ্য গুদামে দিতে পারত, তাহলে কথা ছিল না। মিল মালিকরা যে ১১ লাখ মেট্রিক টন চাল দেবে, সেই চালের ধান কত টাকা হারে কিনবে, কোথা থেকে কিনবে, তা কোথাও বলা নেই। অসহায় কৃষককে সার, বীজ, পেস্টিসাইড ও সেচের মূল্য পরিশোধের জন্য মাড়াইয়ের পরপরই ধান বিক্রি করতে হয়। মিল মালিকরা ৪০০-৫৫০ টাকা মণ ধান ক্রয় করে এক হাজার ৪৪০ টাকা মণ দরে খাদ্য গুদামে চাল দেবে। প্রতি কেজি চালে মুনাফা করবে ১২-১৪ টাকা।
জাতির কাছে কৃষকের মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন, 'সবকিছুর দাম বাড়ে, ধানের দাম ক্যান কমে বাহে?' ধান উৎপাদনের সার, বীজ, কীটনাশকের ব্যয় বাড়ে, শ্রমিকের মজুরি বাড়ে বহুগুণ, সেচের খরচ বাড়ে, চাষের দাম বাড়ে, জমির মূল্য বাড়ে; কিন্তু ধানের দাম ১৫ বছর আগে যেখানে ছিল, সেখানেই আটকে থাকে। রিকশা ভাড়া বাড়ে, বাস ভাড়া বাড়ে, চা-সিগারেটের দাম বাড়ে, চাকরির বেতন বাড়ে, সর্বসাধারণের আয়-রোজগার বাড়ে, বাড়ে না শুধু ধানচাষির ধানের দাম।
আসুন পাটিগণিতের একটা সরল অঙ্ক করি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর রিপোর্ট অনুযায়ী ভেতো বাঙালির বছরে মাথাপিছু চাল খাওয়ার পরিমাণ ১৩৪ কেজি (দৈনিক ৩৬৭ গ্রাম), যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। চায়নিজরা খায় ৭৭ কেজি, ইন্ডিয়ানরা খায় ৬৮ কেজি। গণিতের হিসাবে বাংলাদেশের ১৬ কোটি অবালবৃদ্ধবনিতার জন্য বছরে প্রয়োজন ২১.৪৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন চাল। ২০১৭-১৮ সালে চাল উৎপাদন হয়েছে ৩৬.২ মিলিয়ন টন (বার্ষিক রিপোর্ট ২০১৮, কৃষি মন্ত্রণালয়)। উদ্বৃত্ত ১৪.৭৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৮-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ সালে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানি করা হয়েছে ৩.৮৯২ মিলিয়ন মেট্রিক টন। তাহলে বাজারে মোট উদ্বৃত্ত চালের পরিমাণ ১৮.৬৫২ মিলিয়ন মেট্রিক টন। বিশ্ববাজারে চালের বেচাকেনা হয় বছরে ৪৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন। ১২ মিলিয়ন মেট্রিক টন চাল রফতানি করে চালের বিশ্ববাজারের প্রধান নিয়ন্ত্রক ভারত। দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রধান দেশ থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম রফতানি করে যথাক্রমে ১০ মিলিয়ন ও ৬.৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন। বাংলাদেশের ১৪.৭৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন উৎপাদন উদ্বৃত্ত হওয়ার পরও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩.৮৯ মিলিয়ন মেট্রিক টন চাল আমদানি করে চীনের পরে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চাল আমদানিকারক দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের চেয়ে ভারত অথবা থাইল্যান্ডে চালের আমদানি মূল্য কম হওয়ায় বেসরকারি আমদানিকারকদের চাল আমদানিতে ব্যাপক উৎসাহ। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে একটি খাদ্যপণ্য এত উদ্বৃত্ত থাকার পরও যদি নিরবচ্ছিন্ন আমদানি ও বিভিন্ন ট্রেড মেকানিজম চলতেই থাকে, তাহলে ধানচাষির ন্যায্যমূল্য পাওয়া সুদূরপরাহত। 'সবকিছুর দাম বাড়ে, ধানের দাম ক্যান কমে বাহে' কৃষকের সেই মিলিয়ন ডলার প্রশ্নের উত্তর হয়তো পাটিগণিতের এই হিসাবেই নিহিত থাকতে পারে।
বাংলাদেশে ধানচাষির মূল্য বঞ্চনার পেছনে আরেকটি কারণ ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খরচ। পার্শ্ববর্তী ধান উৎপাদনকারী দেশ ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের তুলনায় বাংলাদেশে প্রতি কেজি ধানের উৎপাদন খরচ ২০-৩০ শতাংশ বেশি। এর পেছনে কারণ- অদক্ষ সেচ ব্যবস্থাপনা, পেস্টিসাইডের লাগামহীন দাম ও অতিরিক্ত ব্যবহার, ধান চাষ যান্ত্রিকীকরণ না হওয়া, রাসায়নিক সারের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, কৃষি শ্রমিকের অপ্রাপ্যতা ও ক্রমবর্ধমান মজুরি এবং কম ফলন।
প্রধান চাল রফতানিকারক দেশ ভারতে ধান চাষ লাভজনক করার জন্য উপকরণ ভর্তুকি, বিনাসুদে ঋণ সহায়তা ছাড়াও মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস (এমএসপি) নিশ্চিত করা হচ্ছে। সে দেশে ধানচাষির ন্যায্যমূল্য ও ভোক্তার জন্য যৌক্তিক বাজারদর নিয়ন্ত্রণের জন্য শক্তিশালী 'এগ্রিকালচার প্রাইস কমিশন' আছে। বাংলাদেশে কৃষি খাতে ছয় হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি দিয়েও কৃষকের মুখে হাসি আনা যাচ্ছে না। কৃষক ও ভোক্তার স্বার্থ সমন্বয়ের জন্য শক্তিশালী 'প্রাইস কমিশন' গঠন করতে হবে। এই সমস্যা সমাধানে নীতিনির্ধারক, কৃষক, প্রযুক্তিবিদ, আমদানিকারক, মিলার, উপকরণ ব্যবসায়ী সবাইকে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী দেশ। সময় এসেছে চতুর্থ বৃহত্তম চাল রফতানিকারক দেশ হওয়ার। কৃষিমন্ত্রী চাল রফতানির ওপর জোর দিয়েছেন। অত্যন্ত সম্ভাবনাময় রফতানি বাজারে আমরা অন্তত ছয় মিলিয়ন টন চাল রফতানি করে তাক লাগিয়ে দিতে পারি বিশ্বকে, আয় করতে পারি দুই হাজার মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা। গার্মেন্টসের পর চাল হতে পারে দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি খাত। সম্মানিত ভোক্তাসাধারণ ভয় পাবেন না, চালের দাম সামান্য বাড়বে (যৌক্তিক ক্রয়সীমার মধ্যে), কৃষক ধানের দাম পাবেন, আরও উৎসাহিত হবেন ধান চাষে। সুসংহত হবে আমাদের আগামীর খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি অর্থনীতি ও রফতানি খাত।
আমাদের এমন ভাবার কোনো সুযোগ নেই যে, ক্রমাগতভাবে মূল্যবঞ্চিত ধানচাষি এই বঞ্চনা হাসিমুখে মেনে নিয়েই ধান চাষ চালিয়ে যাবেন বছরের পর বছর। ন্যায্যমূল্য না পেলে বিপন্ন ধানচাষি ধান চাষের বিকল্প খুঁজবেন। ইতিমধ্যে অনেক ধানচাষি তার পিতা-পিতামহের হাজার বছরের আবাদ থেকে বেরিয়ে এসেছেন। ধীরে ধীরে ধানের জমি চলে যাবে স্থায়ী ফলবাগান অথবা অন্য কোনো লাভজনক ফসল আবাদে। এদিকে ধানচাষিও জীবিকার জন্য এখন আর আগের মতো নিরুপায় নয়। তার শ্রম আর এখন 'নন-ট্রেডেবল' নয়। সেও ইচ্ছা করলে অন্য পেশায় চলে যেতে পারে।
এ দেশের ধানচাষির ঘাম-শ্রমের কাছে আমাদের ঋণ জন্ম-জন্মান্তরের। কৃষকরা এ দেশের সূর্যসন্তান, অন্নদাতা ও জাতীয় বীর। শত চ্যালেঞ্জ, বাধা-বঞ্চনা দু'পায়ে মাড়িয়ে কৃষকরা ধন-ধান্যে ভরে তুলেছেন সোনার বাংলাদেশ। বাংলার 'ল্যান্ড হিরো' ধানচাষির বঞ্চনা দূর করে তাদের সসম্মানে রাখতে হবে সোনালি ধানের ক্ষেতে; তবেই নিশ্চিত হবে আগামীর খাদ্য নিরাপত্তা।
লেখক : গবেষক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি
  • বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা
  • ভারতের জাতীয় উন্নয়ন ও ভারত মহাসাগর
  • জীবনে শৃঙ্খলাবোধের প্রয়োজনীয়তা
  • চলুক গাড়ি বিআরটিসি
  • জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবেলায় আমাদের করণীয়
  • নির্ধারিত রিক্সাভাড়া কার্যকর হোক
  • নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা
  • খাদ্যে ভেজাল রোধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে
  • মুর্তাজা তুমি জেগে রও!
  • সন্তানের জীবনে বাবার অবদান
  • এবার কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভংগ হোক
  • বন উন্নয়নে মনোযোগ বাড়ুক
  • একজন অধ্যক্ষের কিছু অবিস্মরণীয় প্রসঙ্গ
  • গ্রামাঞ্চলে বৃক্ষ রোপণ
  • শান্তির জন্য চাই মনুষ্যত্বের জাগরণ
  • উন্নয়ন ও জনপ্রত্যাশা পূরণের বাজেট চাই
  • মোদীর বিজয় : আমাদের ভাবনা
  • অধিক ফসলের স্বার্থে
  • টেকসই উন্নয়ন ও অভিবাসন সমস্যা ও সমাধানে করণীয়
  • Developed by: Sparkle IT