প্রথম পাতা ওপার থেকে নেমে আসা বালিতে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের ৮শ’ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত

বালির দূষণে ধুঁকছে জীবন

মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, তাহিরপুর থেকে ফিরে প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০৫-২০১৯ ইং ০১:৪৪:০৬ | সংবাদটি ২২২ বার পঠিত

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার চানপুর গ্রামের পশ্চিমে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত শহীদ সিরাজ লেক-এর অবস্থান। এর চার দিকে যতদূর দৃষ্টি যায় বালি আর বালি। বালুর নিচে চাপা পড়ে আছে ফসলের মাঠ, বাড়িঘর আর পচাশোল বিল। সেখানকার চাঁনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির এক তলা ভবনের মেঝে ও আঙিনা বালির নিচে চলে গেছে। এরই মধ্যে এ প্রতিষ্ঠানের মূল ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এখন শিক্ষাদান চলে পাশের টিনশেডের একটি ঘরে।
যাদুকাটা নদীর পশ্চিম তীর থেকে টেকেরঘাট পয়েন্ট পর্যন্ত পথটির স্থানে স্থানে বালির আস্তরণ পড়ে থাকতে দেখা গেলো। রজনী লাইন গ্রামের কাছে যে একসময় একটি বড় খাল ছিল তার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে বড়ছড়া সড়কের উপরের পরিত্যক্ত সেতুটি দেখে। পাশের পঁচাশোল বিলের পানির অন্যতম উৎস ছিল এ ছড়া। ছড়া দিয়ে পানির বদলে নামছে বালি, যা সরাসরি পচাশোল বিলে গিয়ে পড়ছে। সেটিও ভরাট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
সুনামগঞ্জের কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বালির আস্তরণ পড়ে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী তিনটি গ্রাম ও একটি বিলের ৩৫০ হেক্টর ভূমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বেসরকারি হিসেবে ক্ষতির শিকার হওয়া জমির পরিমাণ প্রায় ৫০০ হেক্টর। ওই জলাশয়ের হরেক রকমের মাছ, সাপসহ অন্য প্রাণী হয় মরে গেছে, বা অন্যত্র চলে গেছে। আর স্থানীয়রা জানায়, সেখানকার ১৪টি আদিবাসী পরিবার বালুর নিচে সব হারিয়ে অন্যত্র চলে গেছে।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও কৃষি অনুষদের ডীন অধ্যাপক ড. মো: আবুল কাশেম একটি সূত্র তুলে ধরে বলেন, ওপার থেকে প্রতি বছর সারাদেশের নদ-নদী-হাওরে ৮০ কোটি টন বালু পড়ে জমি ও জলাশয় ভরাট হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বালু সুনামগঞ্জ ও সিলেটের সীমান্ত নদী ও ছড়া দিয়ে আসছে। তিনি জানান, বালুর প্রভাবে নদ-নদী-হাওর ভরাট হয়ে যাওয়ায় আগে দেশে ৫ থেকে ৭ বছর পর পর বন্যা হতো, এখন প্রায় প্রতি বছরই বন্যা হচ্ছে।
তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুস সালাম জানান, তাহিরপুরের প্রতিটি ছড়া দিয়ে সীমান্তের ওপারে ভারতের মেঘালয় থেকে বালি আসছে। তবে, বর্ষাকালে বালি আসার পরিমাণ বেড়ে যায়। এর মধ্যে লাকমা পয়েন্ট দিয়ে বেশি বালি আসে। সরকারি ওই সংস্থাটির হিসেবে, এ পর্যন্ত তিন গ্রামে প্রায় ৩৫০ হেক্টর জমি বালিতে ভরাট হয়ে গেছে। এ কারণে ওই তিন গ্রামের প্রায় ৮শ’ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ তিন গ্রামের দক্ষিণ পাশের পঁচাশোল হাওরের প্রায় ৪০ হেক্টর জমিতেও বালির আস্তরণ পড়েছে।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো: আব্দুল আহাদ জানান, সেখানকার কয়েকটি ছড়া দিয়ে বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢলের সাথে আসা বালিতে অনেক সময় চাষের জমি ঢেকে যায়। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক কারণেই এসব ছড়া দিয়ে বালি আসছে। বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বলা হয়েছে বলে জানান তিনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের সদ্য প্রাক্তন নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম বলেন, উজানের পাহাড় ধ্বস ও গাছ উপড়ে পড়ার কারণে বিপুল পরিমাণে মাটি পানিতে মিশে তা ভেসে ভেসে বাংলাদেশে আসছে।
মাছ-ফসল মরছে, স্থানীয়রা অন্যত্র চলে যাচ্ছেঃ
চানপুর গ্রামের বাসিন্দারা জানান, মেঘালয়ের পাহাড়গুলো থেকে নিয়মিত কয়লা ও পাথর তোলা হয়। যে কারণে সেখানে গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ২০০৮ সালে বর্ষা মৌসুমে হঠাৎ পাহাড় ধসে এলাকার বিপুল পরিমাণ ভূমি বালির নিচে চাপা পড়েছে। এখনো ছড়া দিয়ে সেই বালি ও নুড়ি পাথর আসা অব্যাহত আছে। ফলে ওই এলাকার কোনো জমিতে আর ফসল হয় না।
চানপুর এলাকার বাসিন্দা সুলাই সাংমা জানান, গত ৫৪ বছর ধরে ওই এলাকায় তার বাস। বালু উঠার আগে কৃষিকাজ করেই তারা জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখন দিন মজুরি করে তার পরিবার চলে। পঞ্চাশোর্ধ্ব সুলাই সাংমা জানান, চানপুর ও রাজাই গ্রামে প্রায় ৫৭টি আদিবাসী পরিবারের বসবাস। এর মধ্যে ১৪টি পরিবার সিলেটের বিভিন্ন স্থানে এবং ৮টি পরিবার ময়মনসিংহে স্থানান্তর হয়ে গেছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, অন্যত্র চলে যাওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে রয়েছে-মনেন্দ্র ¤্রং, নিরেশ ¤্রং, অনিমেষ ¤্রং, নন্দ আযম, শোকেস সাংমা এবং ওয়াশতিং সাংমা, নিরেশ সাংমা, চৌহাদ মারাক এবং সুজানা ¤্রং।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী রজনীলাইন গ্রামের বাসিন্দা এন্ড্রু সলোমন (৫৫) জানান, মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা বালি ও নুড়ি পাথরে এরই মধ্যে তার ৩০ একর ফসলি জমি ভরাট হয়ে গেছে। তিনি জানান, ‘বালুর প্রভাব পড়েছে সেখানকার জীববৈচিত্র্যেও। সেখানে কাঁকড়া নেই, মাছ নেই, সাপও চলে যাচ্ছে, থাকতে পারছে না অন্য কোনো প্রাণীও। শীতকালে পুরো এলাকা শুষ্ক হয়ে যায়। আর বর্ষাকালে কিছু ছড়া ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে।’
সেখানে বালু আগ্রাসনে প্রায় ৭-৮শ’ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত বলে জানিয়েছেন তাহিরপুর উপজেলার উত্তর বড় দল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম। তিনি জানান, ওই তিন গ্রামে প্রায় ১২শ’ পরিবারের বসবাস। এর মধ্যে আদিবাসী পরিবার রয়েছে প্রায় একশ’টি। বালুর প্রভাবে সেখানকার অর্ধশতাধিক আদিবাসী পরিবারও প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ক্ষতির সম্মুখীন। তিনি জানান, নয়াছড়া, বুরুঙ্গা,পাগলাঘাট, রজনী লাইন, পুরানঘাট ও রাজাই ছড়া দিয়ে মূলত মেঘালয় থেকে বালি ও নুড়ি পাথর আসে। এসব ছড়া দিয়ে লালচে পানি প্রবাহিত হয়। এ পানি কোনো কাজে ব্যবহার করা যায় না। এ পানি দিয়ে গোসল করলে শরীর চুলকায় বলেও জানান এ চেয়ারম্যান।
দুই দেশ মিলে সমাধান করতে হবেঃ
হাওর এলাকার পরিবেশ নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠনগুলো থেকে বহুবার বালু সমস্যার সমাধানের জন্য নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে এ নিয়ে চিঠি দিয়ে সমাধানের জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে। কিন্তু সমস্যার সমাধান হয় না , বরং দিনকে দিন তা আরও বাড়ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়কারী এডভোকেট শাহ শাহেদা আক্তার জানান, ‘এটা আন্ত:দেশীয় সমস্যা। দুই দেশের মধ্যে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতেই বিষয়টি সমাধান করতে হবে।’
হাওর গবেষক, পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কবি কাসমির রেজা বলেন, বালু আগ্রাসনের কারণে স্থানীয় কৃষকদের ফসলি জমি ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে স্থানীয় লোকজন খুবই উদ্বিগ্ন। এটা বন্ধে দুই দেশের সরকারকেই কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে।
একটি সূত্র জানায়, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ২০০৮ সালের ২৪ নভেম্বর ‘মেঘালয়ের পাহাড় ধসের ফলে নির্গত বালি ও পাথর দ্বারা আবাদি জমি নষ্ট এবং পরিবেশ বিপর্যয় রোধে কূটনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করে। এ প্রেক্ষিতেই ২০০৯ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনে চিঠি দেয়। কিন্তু, এ ব্যাপারে আর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। এছাড়া, ২০০৮ সালের নভেম্বর মাসে তৎকালীন সুনামগঞ্জ ১৭ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন ও ভারতের শিলং ৮৩ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রদানকৃত স্মারক লিপিতে-মেঘালয় পাহাড়ে অপরিকল্পিতভাবে ভারতের ফরেস্ট এ্যাক্ট অনুযায়ী পাহাড় খুঁড়া বন্ধের জন্য বলা হয়।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ডা. আবদুল মতিন বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশেই এ ধরণের আন্তঃসীমান্ত পরিবেশ সমস্যা ও দূষণ আছে। কিন্তু ভারত থেকে আসা ওই বালু দূষণ ও বিপর্যয়ের সমস্যা দূর করার কোনো কার্যকর উদ্যোগ এখন পর্যন্ত আমরা দেখিনি। কিন্তু, ওই বালির কারণে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের মানুষের জীবন ও জীবিকা ধ্বংস হওয়ার পথে। আর পরিবেশ বিপর্যয়ের সমস্যা তো রয়েছেই। এই সমস্যার সমাধান করতে হলে দুই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।

 

শেয়ার করুন
প্রথম পাতা এর আরো সংবাদ
  • ছাত্রলীগের নেতৃত্বে জয়-লেখক
  • সিলেট বিভাগে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ম্যুরাল নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে
  • জনগণের আস্থা সমুন্নত রাখুন
  • আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন ডিসেম্বরে
  • নবম ওয়েজ বোর্ডের গেজেট প্রকাশ
  • বরমচাল রেল দুর্ঘটনায় হাইকোর্টের রুল জারি
  • সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হবে বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান -----------উপাচার্য ডা. মোর্শেদ আহমেদ
  • মৌলভীবাজারে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সৈয়দ মহসিন আলীকে স্মরণ
  • সিলেটে মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করলেন সাদ এরশাদ
  • ষড়যন্ত্রকারীদের রুখতে স্বেচ্ছাসেবক লীগকে সোচ্চার হতে হবে: নির্মল চন্দ্র গুহ
  • কোম্পানীগঞ্জের উৎমা সীমান্তে খাসিয়ার গুলিতে বাংলাদেশির মৃত্যু
  • তালতলায় নির্মাণাধীন ভবনের ইট পড়ে শ্রমিকের মৃত্যুর অভিযোগ
  • আফিফের ব্যাটে হারের বৃত্ত ভাঙল বাংলাদেশ
  • ঢাকা-সিলেট মহাসড়কসহ বিভিন্ন উন্নয়নে সহায়তা দেবে এডিবি
  • ড্রিমলাইনার ‘রাজহংস’ আজ আসছে
  • একমাস ধরে সবজিসহ নিত্যপণ্যের দাম চড়া
  • সৈয়দ মহসিন আলীর ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকী আজ
  • আগামী তিনদিন থাকতে পারে বৃষ্টিপাত
  • স্লোভাকিয়ার জঙ্গল থেকে উদ্ধার বিশ্বনাথের ফরিদের লাশ
  • বিএনপি নয়, ছাত্রদলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারেক: ফখরুল
  • Developed by: Sparkle IT