উপ সম্পাদকীয়

শিশুর অপরাধ প্রবণতা

ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৫-২০১৯ ইং ০০:৪০:১১ | সংবাদটি ১৪৩ বার পঠিত

কোনো শিশুই অপরাধী হিসেবে জন্মায় না। বরং সে নিষ্পাপ হয়ে জন্মায়। পরিবেশ, পরিস্থিতি, পারিপার্শ্বিকতা, পিতা-মাতার আচরণ ইত্যাদি অনেক কারণে তার মধ্যে অপরাধ প্রবণতা দেখা দেয়। শিশুর অপরাধী হওয়ার প্রাথমিক কারণগুলো শৈশবেই সৃষ্টি হয়। অজ্ঞানতার কারণে কিংবা সজ্ঞানে এই অপরাধ প্রবণতা শিশুদের মধ্যে বেড়েই চলে। এক পর্যায়ে সে অপরাধী হয়ে ওঠে। শিশু অপরাধীরা সাধারণত প্রাথমিক অপরাধী। তবে এদের অনেকেই অপরাধ জীবন বয়স্ককাল পর্যন্ত অব্যাহত রাখে।
শিশুরা যখন অপরাধ করে তখন তাদেরকে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়। পুলিশ ও র‌্যাবে দীর্ঘ চাকরি জীবনে বিভিন্ন অপরাধ সংঘটনের কারণে অনেক শিশুকে বিচারের সম্মুখীন হতে দেখেছি। শিশু-কিশোররা ছোটবেলায় যা দেখবে তাই শিখবে। সন্তান যদি পিতা-মাতাকে সবসময় খিটখিটে মেজাজে দেখে তবে তার মধ্যেও বড় হলে এ ধরনের আচরণ গড়ে উঠবে। সন্তানেরা এই খিটখিটে মেজাজেরর জন্য অপরাধবোধে ভোগেন। শিশুকে বকাবকি, মারধর না করা এবং ভয়ভীতি না দেখানো। অবহেলিত উদ্বাস্তু সমাজ এবং ভাঙা সংসার কিশোর অপরাধী সৃষ্টির সহায়ক। বিবাহ-বিচ্ছেদ, মাতা-পিতার পৃথক অবস্থান, মাতা-পিতার পৃথক সংসার ও বসবাস কিশোর অপরাধী সৃষ্টির অন্যতম কারণ। মাতা-পিতার পুনর্বিবাহ বেশির ভাগ শিশুই পছন্দ করেন না। ঘর ভাঙা সংসারে শিশুদের সত্ থাকা কঠিন। কিশোররা সাধারণত অপরাধী পিতার অনুগামী হয় ও তার কাজকর্ম অনুসরণ করে। অবৈধ সন্তানেরা বা পিতৃ নামহীন সন্তানরা প্রায়ই নিজেদের ঘৃণিত মনে করে অপরাধী হয়ে ওঠে। শিশুদের বিস্ময়, ক্রোধ, উত্তেজনা, আগ্রহ বা নির্লিপ্ততা, ভাবুকতা, প্রতিকার স্পৃহা, লোভ ইত্যাদি লক্ষ্য রাখতে হবে। দারিদ্র্যের মতো প্রাচুর্যও ক্ষতিকর। প্রাচুর্য মানুষকে অলস করে। এই অবস্থায় তারা অপরাধমুখী হয়।
শিশু অপরাধীর বিচার শিশু আদালতেই হবে এবং এরা শাস্তির পরিবর্তে সংশোধনের সুযোগ পাবে। শিশু আইন অনুয়ায়ী দেশের অপরাধপ্রবণ ও উচ্ছৃঙ্খল শিশুদের দোষ-ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ দিলে তারা আগামীদিনে সম্ভাবনাময়, চরিত্রবান ও উত্পাদনশীল সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠব। আর এটাই দেশবাসীর একান্ত কাম্য এবং একমাত্র প্রত্যাশা। তাই শিশু অপরাধীর বিচারে শাস্তির পরিবর্তে সংশোধনই লক্ষ্য।
সুনির্দিষ্ট অপরাধের যে-কোনো মামলায় কোনো শিশু গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই তার জন্য শিশু আইন ২০১৩ প্রযোজ্য হবে। শিশু আইনের ৪৪ ধারানুয়ায়ী কোনো শিশুকে গ্রেফতারের পর কোনো অবস্থাতেই হাতকড়া বা কোমরে দড়ি লাগানো যাবে না। হাতকড়া নিয়ে পুলিশ প্রবিধানের ৩৩০-এ বলা হয়েছে, গ্রেফতারকৃত এবং বিচারাধীন ব্যক্তিকে তাদের পলায়ন বন্ধ করার জন্য যা প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি কড়াকড়ি করা উচিত নয়।
আমি বাস্তব জীবনে দেখেছি, একজন শিশু অপরাধী বয়স্ক আসামির সাহচর্যে থাকার কারণে কিংবা মেলামেশার সুযোগে অথবা একত্রে আটক থাকার ফলে সংশোধিত না হয়ে ক্রমশ অপরাধীতে পরিণত হয়েছে। আবার এটাও দেখেছি, অপরাধী পরিবার থেকে আগত শিশু অপরাধী ভালো এবং উপযুক্ত পরিবেশ পেয়ে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠেছে। তাই সংশ্লিষ্ট সবাইর এ বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি অবশ্যই রাখা উচিত।
পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রতিটি পুলিশ স্টেশনে শিশু আইনের আলোকে শিশুবান্ধব পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং শিশুবান্ধব কর্মকর্তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। পুলিশের অধীন ৮টি ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার আছে। সেই ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারগুলোতে শিশুদের সাময়িক আশ্রয়ের ব্যবস্থা, আইনী ও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া এবং কাউন্সেলিং করা হয়। এছাড়া প্রতিটি জেলায় এবং পুলিশ সদর দপ্তরে আছে মনিটরিং সেল। যেখানে নারী ও শিশু সংক্রান্ত মামলাগুলো বিশেষভাবে গুরুত্ব সহকারে মনিটরিং করা হয়। শিশু প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৭, ১৮, ২৭, ২৮ এবং ৩৪ এ সুনির্দিষ্টভাবে বিধান প্রবর্তিত রয়েছে।
পরিশেষে, সমাজে শিশুরা যাতে অপরাধবোধে উৎসাহিত হয়ে অপরাধী হিসেবে গড়ে না ওঠে সেদিকে প্রত্যেকেরই নজর দেওয়া উচিত। আসুন শিশুদের কাছে নিজেদেরকে শিশুবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণকে শিশুবান্ধব হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করি। এই উদ্দেশ্যে, কোনো শিশুই যেন কখনো কোনো অপরাধ সংঘটন করে গ্রেফতার না হয়, সেটাই একমাত্র প্রত্যাশা। সমাজে যাতে শিশু অপরাধীর সৃষ্টি না হয়, আসুন সে বিষয়ে সচেতন হয়ে জনমত ও জনপ্রতিরোধ গড়ে তুলি। এ ব্যাপারে পরিবারের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের সর্বস্তরের বিশেষ করে শিক্ষক, সমাজকর্মী, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ সবাইকে দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ আজকের শিশু ও কিশোররাই আগামীদিনের ভবিষ্যত্। তাদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার নৈতিক দায়িত্ব প্রত্যেকের উপর বর্তায়।
লেখক : সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মিতব্যয়িতা
  • হংকং : কেন গণআন্দোলন
  • যানজট মুক্ত মহানগরী : কিছু প্রস্তাব
  • পানি নিয়ে ভাবনা
  • ভেজাল-দূষণ দূর করা কি খুবই কঠিন?
  • সৈয়দ মহসীন আলী : ক্ষণজন্মা রাজনীতিক
  • শিশুদের বিজ্ঞান মনস্ক করে গড়ে তোলার গুরুত্ব
  • রোহিঙ্গাঁ সমস্যা : প্রয়োজন আশু সমাধান
  • মজলিশী মুজতবা আলী
  • জলবায়ু ও পৃথিবীর বিপর্যয়
  • আমরা বই পড়া কি ভুলেই গেলাম
  • সফল হওয়ার সহজ উপায়
  • ঝুঁকিপূর্ণ রেল যোগাযোগ : প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা
  • আজকের দিন আজকের দিকে তাকাও
  • বিয়ে ব্যবস্থায় পরিবর্তন
  • কারবালার ঘটনা ও কয়েকজন সাহাবীর স্বপ্ন
  • আশুরায় সিলেটে হাদা মিয়া-মাদা মিয়ার বিদ্রোহ
  • গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শিক্ষা শহীদে কারবালা
  • যাকে দেখতে নারী তার চলন বাঁকা
  • ‘শতভাগ সাক্ষরতা’ কতদূর
  • Developed by: Sparkle IT