উপ সম্পাদকীয়

ভেজালের বিরুদ্ধে চাই আইনি যুদ্ধ

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৫-২০১৯ ইং ০০:৪৫:৪২ | সংবাদটি ২০৮ বার পঠিত

পঞ্চাশের দশকের শেষভাগে জেলা স্কুলে যখন নবম শ্রেণীতে উঠি তখন একটি ঐচ্ছিক বিষয় হিসাবে ‘স্বাস্থ্য’- কে বেছে নিই। আমার শিক্ষক বাবা বলেছিলেন, উচ্চতর ক্লাসে ‘বিজ্ঞান’ পড়ার যথেষ্ঠ সুযোগ পাবে। দৈনন্দিন জীবনে স্বাস্থ্যসম্পর্কিত জ্ঞানলাভের জন্য নবম ও দশম শ্রেণীর স্বাস্থ্যবিষয় পাঠ আগামী দিনে তোমার কাজে লাগবে। যে কথা সেই কাজ। স্বাস্থ্যবিষয়ক পাঠ্যসূচিতে বেশ বড় একটি অধ্যায় ছিল ‘দুধ’-এর ওপর। বিষয় শিক্ষক এ অধ্যায়টি খুব নিখুঁতভাবে পড়াতেন। পরীক্ষায় তিনি প্রায়ই প্রশ্ন করতেন ‘দুধকে কেন আদর্শ খাদ্য বলা হয়’? প্রায় প্রতিটি শিক্ষার্থীই এ প্রশ্নটির জবাব খুব ভালো করে লিখতে পারত। জীবনের এই প্রথমপাঠ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে দেশ-বিদেশে যখন যেখানে গেছি, পর্যাপ্ত দুধ খেতে চেষ্টা করেছি। তবে এই দুধ নামক অতি প্রয়োজনীয় পানীয়টিকে নির্ভেজাল পেয়েছি সর্বত্র। হোক তা মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরাক, সুদূর পশ্চিম আফ্রিকার অনগ্রসর দেশ নাইজেরিয়া, ঘরের কাছের দেশ মালয়েশিয়া এমনকি উন্নত বিশে^র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। আর সেই দুধ নিয়ে নিজের দেশে এত কারসাজি, ভাবতে সত্যি বিস্ময় লাগে, নিজেকে বড্ড ছোট বলে মনে হয়। অথচ আমরাই নাকি দ্রুত সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছি। পৌঁছুতে চাচ্ছি উন্নতির চরম সোপানে!
সম্প্রতি কাঁচা তরল দুধের ৯৬টি নমুনার মধ্যে ৯৩টিতেই ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেছে বলে হাইকোর্টে জমা দেয়া এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। এ সব নমুনার অণুজৈবিক বিশ্লেষণে সবগুলোতেই টিপিসি, কলিফর্মের মতো ক্ষতিকর উপাদানের মাত্রা অধিক। ৯৩টির মধ্যে ১টিতে সালমোনেলা পাওয়া যায়। এছাড়া তরল দুধের নমুনায় রয়েছে সীসা, আফলাটক্সিন, টেট্রাসাইক্লিন, সিপ্রোফ্লক্সাসিন ও পেস্টিসাইড। দইয়ে আফলাটক্সিন, টেট্রাসাইক্লিন, ইস্ট/মোল্ড, সীসার মতো ক্ষতিকর পদার্থের সন্ধান মেলে। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিইটের গবেষণা মতে, গরুর খোলা দুধে অণুজীবের সহনীয় মাত্রা সর্বোচ্চ ৪ হলেও এসব দুধে পাওয়া যায় ৭.৬৬ পর্যন্ত। এসব উপাদান মিশ্রিত ‘আদর্শ খাদ্য’ হিসাবে পরিচিত দুধ পান করলে মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষার বদলে জীবনই বিপন্ন হতে পারে।
খাদ্য মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে অন্যতম প্রধান। খাদ্য গ্রহণ ছাড়া মানুষসহ কোনো প্রাণীই বেঁচে থাকতে পারে না। তবে সে খাবার অবশ্যই হতে হয় বিশুদ্ধ। দূষিত বা ভেজালমিশ্রিত খাদ্য মানুষের জন্য স্বাস্থ্যহানি এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। অথচ আজকের বাংলাদেশে সেই বিশুদ্ধ খাবার খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। বাজার থেকে কেনা কোন খাদ্যই যেন আর বিশুদ্ধ নেই। পরিবেশ বাঁচাও অন্দোলনের (পবা) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে প্রতি বছর দেশে ৩ লাখ লোক ক্যানসার নামক মরণব্যাধিতে, ২ লাখ লোক কিডনি রোগে, দেড় লাখ লোক ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়া গর্ভবতী মায়ের শারীরিক জটিলতাসহ ১৫ লাখ গর্ভজাত বিকলাঙ্গ শিশুর জন্মদান করেন। ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে দেশে হেপাটাইটিস, কিডনি, লিভার ও ফুসফুস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও দিনদিন বেড়ে চলেছে। খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর বিষ মেশানোর প্রক্রিয়া আজ নতুন নয়। ২০১৪ সালে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহকৃত ৪৩ ধরনের খাদ্যপণ্যের মোট ৫ হাজার ৩৯৬টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়, যার মধ্যে ২ হাজার ১৪৭টি নমুনাতেই মাত্রাতিরিক্ত ভেজালের উপস্থিতি ধরা পড়ে। মহাখালিস্থ পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউটের খাদ্য পরীক্ষাগারে দেশের শতকরা ৫৪ ভাগ খাদ্যপণ্য ভেজাল ও দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করা হয়।
এবারের রমজানকে সামনে রেখে বিএসটিআই বাজার থেকে ২৭ ধরনের খাদ্যপণ্যের ৪০৬টি নমুনা সংগ্রহের পর ৩১৩টির মান পরীক্ষা করে যে প্রতিবেদন পেশ করে তাতে ৫২ প্রতিষ্ঠানের পণ্যের নমুনা নিম্নমানের বলে তথ্য মেলে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সরিষার তেল, পানি, নুডলস, সেমাই, সফট ড্রিংক, বিভিন্ন প্রকার মসলার গুঁড়া, লবণ, ময়দা, সুজি, চানাচুর, বিস্কুট, মধু। বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় প্রমাণিত এসব নিম্নমানের পণ্য অনতিবিলম্বে বাজার থেকে সরাতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে পুনরায় পরীক্ষায় পণ্যের মান উন্নীত না হওয়া পর্যন্ত নতুন করে ওইসব পণ্য উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
দেশের ও আন্তর্জাতিক গবেষণায় বাংলাদেশের খাবারের বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে। পোলট্রি ফার্মের ডিমে ট্যানারি বর্জ্যরে বিষাক্ত ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে। আটায় মেশানো হচ্ছে চক পাউডার বা ক্যালসিয়াম কার্বোনেট। আনারসে হরমোন প্রয়োগ করে দ্রুত বৃদ্ধির প্রক্রিয়া চলে আসছে বহু কাল ধরে। আম গাছে মুকুল ধরা থেকে শুরু করে আম পাকা পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে রাসায়নিক ব্যবহার এখন ওপেনসিক্রেট। মিষ্টি জাতীয় খাবারে ব্যবহার করা হয় বিষাক্ত রং, সোডা, সেকারিন, মোম। কাপড়ের বিষাক্ত রং, ইট ও কাঠের গুঁড়ো মেশানো হয় খাবারের মসলায়। তেল, আটা, চিনি, কেক, বিস্কুট কিছুই আজ ভেজালমুক্ত নয়। বাজারের ৮৫ শতাংশ মাছে ফরমালিন মিশিয়ে মাছের পচন রোধ করা হয়। শাকসবজিতে বিষাক্ত স্প্রে, ফলমূল দ্রুত পাকিয়ে রঙিন বানাতে কার্বাইড, ইথোফেন প্রয়োগ করা হচ্ছে। নকল ও ভেজাল ওধুধ বাজারজাত করে চলেছে ভেজালচক্র। জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য পানিও আজ দূষিত। জারের পানির মধ্যে প্রায় ৯৮ শতাংশই জীবাণুপূর্ণ। রাজধানীতে সরবরাহকৃত ওয়াসার পানিও দূষিত, পানযোগ্য নয়। রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের রেস্তোরাঁয় ভেজালমিশ্রিত খাদ্যের ছড়াছড়ি। অত্যন্ত নোংরা পরিবেশে ভোক্তাদের অখাদ্য-কুখাদ্য পরিবেশন করা হয়ে থাকে। খাবার রান্নার জন্য ব্যবহার করা হয় পুরান পোড়া নিম্নমানের তেল। খাদ্য প্রস্তুতের উপাদান মসলায়ও থাকে বিষাক্ত রংসহ নানা ধরনের ভেজাল। বারডেম পরিচালিত এক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছেÑ খাদ্যে ভেজাল ও রাসায়নিক বিষের কারণে প্রতি বছর দেশে অন্তত ২ লাখ ৫০ হাজার ক্যানসার, ২ লাখ ২০ হাজার ডায়াবেটিস, ২ লাখ কিডনি রোগ, ৩ লাখ মানুষ ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
২০১৫ সালে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঝে মধ্যে ভেজালবিরোধী অভিযান চালালেও ভেজালকারী চক্রকে দমন করা যাচ্ছে না। খাদ্যপণ্যে ভেজাল প্রতিরোধের মূল দায়িত্ব বিএসটিআই-এর। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, স্বাস্থ্য অধিদফতর, জেলা প্রশাসন, র‌্যাব, পুলিশসহ ৬টি মন্ত্রণালয়ের ১০টি বিভাগ ভেজাল বন্ধের দায়িত্বে নিয়োজিত। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার স্বাস্থ্য বিভাগেরও এ ব্যাপারে ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এসব সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের অভাবে ভেজাল প্রতিরোধ কার্যক্রম সফল হচ্ছে না। ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম সামান্য জেল, জরিমানার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভেজাল পণ্য উদ্ধার ও পরীক্ষা-সংক্রান্ত জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতায় ভেজাল প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা আজ থমকে গেছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কঠোর বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা শুধু র‌্যাব, পুলিশ দিয়ে ভেজাল বন্ধ করা যাবে না। বন্দুক যুদ্ধ দিয়ে মাদক বন্ধ করা যায়নি, ভেজালও বন্ধ করা যাবে না। অব্যাহতভাবে চালিয়ে যেতে হবে কঠিন আইনি যুদ্ধ।
খাদ্যে ভেজাল দেশের এক নম্বর সমস্যায় রূপ নিয়েছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত আপামর জনগণ এ ভেজাল খাদ্য গ্রহণের নির্মম শিকার। ভেজাল খাদ্যের বিস্তৃতির ভয়াবহতা মাদকের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। দেশের মানুষের জন্য ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে আইনি লড়াই চালিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের দমন অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। দেশে ভেজালের বিরুদ্ধে আইন রয়েছে কিন্তু এর বাস্তব প্রয়োগ নেই। ভেজাল রোধে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে প্রভাবশালী কাউকে ছাড় দেয়া যাবে না। বড় বড় শপিংমলকে ভেজালের জন্য দু-চার লাখ টাকা জরিমানা করে ছেড়ে দিলে চলবে না। বিএসটিআইয়ের সক্ষমতা বাড়িয়ে খাদ্যপণ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি স্তরে জোর মনিটরিং চালাতে হবে। অতি মুনাফালোভী, অসাধু খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী ও বাজারজাতকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তবে তাদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ ও সৎমানসিকতা সৃষ্টি করতে প্রথমে কাউন্সেলিং, ওয়ার্কশপ, সভা, সেমিনার করে দেখা যেতে পারে। জনসচেতনতা গড়ে তুলে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভেজাল পণ্য বর্জন ভেজালের বিস্তার রোধে ইতিবাচক ফল দিতে পারে। খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আদালত যে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তার সফল বাস্তবায়নে দেশের সর্বস্তরের নাগরিককে স্ব স্ব অবস্থান থেকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মিতব্যয়িতা
  • হংকং : কেন গণআন্দোলন
  • যানজট মুক্ত মহানগরী : কিছু প্রস্তাব
  • পানি নিয়ে ভাবনা
  • ভেজাল-দূষণ দূর করা কি খুবই কঠিন?
  • সৈয়দ মহসীন আলী : ক্ষণজন্মা রাজনীতিক
  • শিশুদের বিজ্ঞান মনস্ক করে গড়ে তোলার গুরুত্ব
  • রোহিঙ্গাঁ সমস্যা : প্রয়োজন আশু সমাধান
  • মজলিশী মুজতবা আলী
  • জলবায়ু ও পৃথিবীর বিপর্যয়
  • আমরা বই পড়া কি ভুলেই গেলাম
  • সফল হওয়ার সহজ উপায়
  • ঝুঁকিপূর্ণ রেল যোগাযোগ : প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা
  • আজকের দিন আজকের দিকে তাকাও
  • বিয়ে ব্যবস্থায় পরিবর্তন
  • কারবালার ঘটনা ও কয়েকজন সাহাবীর স্বপ্ন
  • আশুরায় সিলেটে হাদা মিয়া-মাদা মিয়ার বিদ্রোহ
  • গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শিক্ষা শহীদে কারবালা
  • যাকে দেখতে নারী তার চলন বাঁকা
  • ‘শতভাগ সাক্ষরতা’ কতদূর
  • Developed by: Sparkle IT