প্রথম পাতা সুনামগঞ্জে সরকারি সংগ্রহ অপ্রতুল

বোরো ধান যেনো কৃষকের গলার কাঁটা

সাঈদ নোমান প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৫-২০১৯ ইং ০৪:২১:৪৭ | সংবাদটি ১৪২ বার পঠিত

ঋণ পরিশোধের জন্য পাওনাদারের তাগিদ, রমজানের খরচ ও আসন্ন ঈদে কিছু কেনাকাটার জন্য সাড়ে ৫শ’ টাকা করে স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর কাছে ৪০ মন ধান বিক্রি করেছেন সুনামগঞ্জের দেখার হাওর পাড়ের কৃষক কবির উদ্দন। ‘যে সময়ে সরকার প্রতি মণ ধানের মূল্য নির্ধারণ করছে ১ হাজার ৪০ টাকা। সেখানে তিনি সাড়ে ৫শ’ টাকা করে কেনো বিক্রি করছেন’-এ কথার উত্তরে কবির উদ্দিন বলেন-‘প্রতিবছরই শুনি সরকার ধান কিনে, কিন্তু কার কাছ থেকে কিনে, কিভাবে কিনে এটা জানি না, সরকারের লোকরাই ভালো জানে।’
গত ২৫ এপ্রিল থেকে সারা দেশে সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে। আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এ সংগ্রহ চলবে। সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর-এবার জেলায় ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ১৩ লাখ ১২ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন। আর সরকার ধান সংগ্রহ করবে ৬ হাজার ৫০৮ মেট্রিক টন। গত ১৬ মে বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জের সদর উপজেলাধীন মল্লিকপুর এলএসডিতে অভ্যন্তরীণ বোরো সংগ্রহ-২০১৯ এর আওতায় ধান/চাল সংগ্রহের উদ্বোধন করেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী।
কিন্তু, জেলার ১১ উপজেলায় এখনও সংগ্রহ শুরু হয়নি। গতকাল রোববার কয়েকটি উপজেলায় খোঁজ নিয়ে ও কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এসব উপজেলায় এখনও ধান কেনার জন্য উপজেলা কমিটির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন চলছে। গতকাল রোববার ছাতক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান সিলেটের ডাককে জানান, ছাতকে এখনও সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়নি। কমিটির মাধ্যমে কৃষক যাচাই-বাচাই চলছে।
হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাচাঁও আন্দোলনের আহবায়ক মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট বজলুল মজিদ খসরু বলেন, ধানের দাম নিয়ে এমনিতেই কৃষকরা মাঠে মরা। প্রান্তিক কৃষকের কাছ থেকে আরো আগে দ্রুত সময়ে সরকার ধান সংগ্রহ করলে তাদের ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা লাঘব হতো।
তিনি বলেন,মজুর সঙ্কট, মজুরের শ্রম, সার, কীটনাশকসহ আনুষঙ্গিক খরচের পর জমিতে যে ধান উৎপাদন হয়েছে কৃষকের খরচের চেয়ে প্রাপ্ত ধানের বাজার মূল্য অনেক কম। সরকার এবার প্রতি কেজি ধান ২৬ টাকা দরে কেনার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু পরিমাণ এতো কম জেলার সিকি ভাগ কৃষকের সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করার সুযোগ নেই।
বাস্তবে কৃষকরা পাচ্ছেন ১৮.৫৯ টাকা করে। তাছাড়া সরকার প্রতিমণ ধান ১০৪০ টাকা নির্ধারণ করলেও প্রকৃতপক্ষে তা বিক্রি করতে হচ্ছে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকায়। সরকার যদি ধান সংগ্রহের পরিমাণ বাড়াতো এবং আরো আগে ধান কিনতো তাহলে কৃষকরা কিছুটা ক্ষতি পোষাতে পারতো।
হাওর পাড়ের কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বোরো ধান দেশের সব স্থানে প্রায় একই সময়ে কাটা শুরু হয়। তাই ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। যা-ও পাওয়া যায় তার জন্য আবার অধিক মূল্য পরিশোধ করতে হয়। সেজন্য জমির ভাড়া, সার ও শ্রমের মূল্য এবং আবাদ বাবদ খরচ মিলে মণপ্রতি ধান উৎপাদনে খরচ হয় ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা। কিন্তু এই ধান এখন বিক্রি করলে পাওয়া যাচ্ছে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা। এতে কৃষকের লোকসান গুণতে হচ্ছে মণপ্রতি প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা ।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জের কৃষক মিসবাহ আহমদ জানান, একই জমিতে ১৫/২০ বছর আগে যে পরিমাণ ধান হতো, সেটা দিয়ে পরিবারের সারা বছরের খানি-খরচ, সন্তানের লেখাপড়া, চিকিৎসা ও সামাজিক অনুষ্ঠানের খরচাদি চলতো। কিন্তু এখন এই জমি চাষ করতে গিয়ে ঋণ করা লাগে। ঋণের টাকা পরিশোধ করে সারা বছর ভাত খাওয়ার জন্যই ধান থাকে না। ধান বিক্রি করে খরচ করা দূরে থাক। সামনে একটা ঈদ আসছে চিন্তায় আছি কি করবো। তিনি বলেন, ‘সরকারিভাবে ধান বিক্রি করা আমাদের জন্য না, যাদের লাইন-ঘাট আছে তারা বিক্রি করতে পারছে। আমরা গেলে বলে দিচ্ছে-চাহিদা পূরণ হয়ে গেছে। আর কেনা যাবে না।’
দিরাই উপজেলার সাবেক কৃষি কর্মকর্তা আজমান মিয়া বলেন, সুনামগঞ্জের মতো কৃষি প্রধান জেলায় সরকারিভাবে সংগ্রহের পরিমাণ খুবই সামান্য। তিনি বলেন, বোরো ধানের উৎপাদনে খরচ বেড়েছে। তাই হাওরের কৃষকে ঋণ গ্রস্ত হয়ে ধান উৎপাদন করতে হয়। মহাজন-দাদন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে তারা টাকা আনে। ফলে মৌসুম শেষে কৃষক ঋণের ভারে দিশেহারা হয়ে পড়ে। যেকোনো মূল্যে ধান বিক্রি করে নগদ টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে করে। এ সুযোগ কাজে লাগায় ফড়িয়া, দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। তাদের কাছেই কৃষক কম মূল্যে তার উৎপাদিত ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়।
হাওর পাড়ের সাবেক এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, সরকারিভাবে ধান ক্রয় শুরু হয় যখন তার আগেই ঋণগ্রস্ত কৃষক লোকসান দিয়ে ধান বিক্রি করে ঋণের বোঝা থেকে রেহাই পায়। তাছাড়া সরকার সরাসরি ধান কৃষকের কাছ থেকে না কিনে স্থানীয় চাতাল ব্যবসায়ী বা মিল মালিকদের কাছ থেকে কিনে। সেজন্য মিল মালিকরাও সেই সুযোগে কৃষকের আর্থিক অনটনকে পূঁজি করে কম মূল্যে সেই ধান কৃষকের কাছ থেকে আগে-ভাগেই কিনে নেয়। আর সরকার শুকনো ধান কিনে থাকে। গুদামজাত করতে হলে যেভাবে শুকিয়ে ধান বিক্রি করতে হয় সেখানে কৃষকরা তাদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য এত সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে না। কাজেই সদ্য সংগৃহীত কাঁচা ধান সরাসরি মাঠ থেকেই তা কম দামে বিক্রি করে দিচ্ছে কৃষকরা।
তার মতে কৃষি ও কৃষককে বাঁচাতে হলে সরকারকে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রান্তিক কৃষকের কাছ থেকে তার প্রয়োজনের সময়েই ধান সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে হবে।
এদিকে, গত ১৮ মে রাজধানীর ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে ‘জলবায়ু পরিবর্তন: কৃষি খাতের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে কৃষি মন্ত্রী বলেন, ‘এ মুহূর্তে সরকারিভাবে ধান কিনে দাম বাড়ানোর সুযোগ সরকারের হাতে নেই। যদি রপ্তানিতে যাই তাহলে ধান কাটা হয়ে গেলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। তবে রপ্তানির চিন্তা করলেও সে বাজারে প্রবেশ করা কঠিন হবে। গত মৌসুমে আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। ফলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা মজুদ করে রেখেছেন। আবার সরকারের মজুদ ক্ষমতা কম। এখন ১২-১৩ লাখ টন মজুদ রয়েছে। সক্ষমতা হলো ২০-২২ লাখ টন। সামনের দিনে ১০ লাখ টন চালও কিনতে পারব না। তার ওপর গত অর্থবছরের ব্যাপক হারে চাল আমদানি বিপদ বাড়িয়েছে। হাওড়ে বন্যার কারণে ক্ষতি হয়েছে ১০-১২ লাখ টন। কিন্তু আমদানি হয়েছে ৩৯ লাখ টন। এ চাল মজুদ থাকার কারণে বাজারে চাহিদা কমে গেছে।’
এ বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট বজলুল মজিদ খসরু বলেন, সমস্যা সৃষ্টি হলে তার সমাধান আছে। কৃষিমন্ত্রীর কথায় কৃষকরা আরো হতাশ হবেন। কৃষির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। সারা দেশে থেকে ১২ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন ধান সরকারিভাবে ক্রয় করা হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। সরকার থেকে যেটা বলা হচ্ছে যে সংগ্রহের পরিমাণ বাড়াতে ধান-চাল সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় গুদাম নেই। কিন্তু বর্তমান সরকারের আর্থিক সক্ষমতা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অগ্রসরমান। কাজেই সরকার চাইলে দেশের স্বার্থে এবং দেশের কৃষকের স্বার্থে ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার পরিমাণ বর্তমানের তুলনায় বহুগুণে বৃদ্ধি করতে পারে, এর জন্য সারা দেশে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সংরক্ষণাগার বৃদ্ধি করতে পারে।
সুনামগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. জাকারিয়া মুস্তফা জানান, জেলায় ধান-চাল সংগ্রহ শুরু হয়েছে। ধান কেনার জন্য উপজেলা কমিটির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন করা হয়েছে।
প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকেই ধান ক্রয় করা হচ্ছে। কোনো কোনো উপজেলায় কৃষক নির্বাচন শেষ হয়েছে। দু এক দিনের মসধ্যেই ধান কেনা শুরু হবে।

শেয়ার করুন
প্রথম পাতা এর আরো সংবাদ
  • ছাত্রলীগের নেতৃত্বে জয়-লেখক
  • সিলেট বিভাগে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ম্যুরাল নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে
  • জনগণের আস্থা সমুন্নত রাখুন
  • আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন ডিসেম্বরে
  • নবম ওয়েজ বোর্ডের গেজেট প্রকাশ
  • বরমচাল রেল দুর্ঘটনায় হাইকোর্টের রুল জারি
  • সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হবে বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান -----------উপাচার্য ডা. মোর্শেদ আহমেদ
  • মৌলভীবাজারে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সৈয়দ মহসিন আলীকে স্মরণ
  • সিলেটে মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করলেন সাদ এরশাদ
  • ষড়যন্ত্রকারীদের রুখতে স্বেচ্ছাসেবক লীগকে সোচ্চার হতে হবে: নির্মল চন্দ্র গুহ
  • কোম্পানীগঞ্জের উৎমা সীমান্তে খাসিয়ার গুলিতে বাংলাদেশির মৃত্যু
  • তালতলায় নির্মাণাধীন ভবনের ইট পড়ে শ্রমিকের মৃত্যুর অভিযোগ
  • আফিফের ব্যাটে হারের বৃত্ত ভাঙল বাংলাদেশ
  • ঢাকা-সিলেট মহাসড়কসহ বিভিন্ন উন্নয়নে সহায়তা দেবে এডিবি
  • ড্রিমলাইনার ‘রাজহংস’ আজ আসছে
  • একমাস ধরে সবজিসহ নিত্যপণ্যের দাম চড়া
  • সৈয়দ মহসিন আলীর ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকী আজ
  • আগামী তিনদিন থাকতে পারে বৃষ্টিপাত
  • স্লোভাকিয়ার জঙ্গল থেকে উদ্ধার বিশ্বনাথের ফরিদের লাশ
  • বিএনপি নয়, ছাত্রদলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারেক: ফখরুল
  • Developed by: Sparkle IT