উপ সম্পাদকীয়

তরুণরা কেন বিদেশে পাড়ি জমায়

ফিরোজ আহমেদ প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৫-২০১৯ ইং ০০:৪৫:৪৪ | সংবাদটি ৯৬ বার পঠিত

তরুণরা কেন সস্তা শ্রমিক হতে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে অভিবাসী হয়, সে নিয়ে বিস্ময়ের অন্ত নেই বহু মানুষের। কেন তরুণরা অভিবাসী হয়? কীভাবে অভিবাসনের পুঁজি জোগাড় হয়? অভিবাসনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য বোঝাটা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। কেননা এই দেশে এই রকম ভদ্রলোক প্রচুর আছেন, যারা টিভিতে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানে বাতাবি লেবু চাষ করে কোটিপতি হওয়ার একটা সত্যি কাহিনী জেনেই লাখো লাখো রক্তশূন্য চাষির বেদনাকে মিথ্যা বলে ভাবতে শুরু করেন। তারা ভাবেন, সব বেকার তরুণ কেন বিরল কোনো শস্য, অভাবনীয় কোনো পণ্য উৎপাদন প্রকল্প গ্রহণ করে নিজের ভাগ্য ফেরায় না! কেন ৯ লাখ টাকা খরচ করে ইতালি যেতে গিয়ে দালালের ফাঁদে পড়ছে তারা, কেন ১০ লাখ টাকা খরচা করেও একটা দশ হাজার টাকার চাকরি খুঁজছে তারা।
ভদ্রলোকদের এই সমাজের দিকে তাকালে দেখবেন তাদের নিশ্চিন্ত জীবনযাপন। বলা যায়, বিচ্ছিন্ন এই ভদ্রলোকদের জীবনে কোনো সংকটই তেমন স্পর্শ করে না। কিন্তু সত্যিকারের উদ্যোক্তারা জানেন, ১০ এমনকি ১৫ লাখ টাকা খরচ করেও এই দেশে ব্যবসা দাঁড় করানো কত কঠিন।
এদেশে ফুটপাতের ক্ষুদে দোকানদারকেও ঢাকা শহরে ব্যবসা করতে ১৫ হাজার টাকার অবৈধ চাঁদা দিতে হয়। ঢাকা শহরে যেকোনো মাঝারি উদ্যোক্তা বিপুল বাড়ি ভাড়ার সামনে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন, সরকারি হয়রানি এবং ঝুঁকি তাদের সামনে মস্তবড় প্রতিরোধক। আমরা যতগুলো সফল উদ্যোগ দেখেছি, তার একটা বড় অংশই ব্যক্তিগতভাবে উচ্চ যোগাযোগসম্পন্নদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে। আর ছোট একটা অংশ দাঁড়িয়েছে চরম প্রতিকূল সময়ের মোকাবিলা করে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, উদ্যোক্তার জন্য সেই পরিবেশকেই ভালো বলা যাবে, যখন গড় যোগ্যতা ও ক্ষমতার একজন পরিশ্রমী মানুষও টিকে থাকতে পারেন। কেবল টিকে থাকার জন্যও যদি অসাধারণ দক্ষতা কিংবা যোগাযোগ ও প্রতিপত্তির দরকার হয়, সেটা কোনো ভালো লক্ষণ নয়। বরং তখন দেখা যাবে, সফলদের বিপরীতে ঝরে পড়ার সংখ্যাই বেশি। এই ব্যর্থ কিংবা ঝরে পড়াদের খোঁজখবর পত্রপত্রিকায় কম আসে বলে ভদ্রলোকরা তাদের সন্ধান তেমন পান না বটে, কিন্তু তরুণরা তাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে জানেন, বাংলাদেশে এদের সংখ্যাই বেশি।
কিছু সফল ও প্রতিভাবান উদ্যোক্তা যেমন সংকটতম মুহূর্তেও থাকেন, তেমনি দুর্ভিক্ষের সময়েও কিছু লোক বড়লোক হয়, খরা-জলোচ্ছ্বাস কিংবা আকালও কারও কারও জন্য সুযোগ বয়ে আনতে পারে। কিন্তু তাদের দিয়ে অর্থনীতির সাধারণ চিত্রটা বোঝা যাবে না, বোঝা যাবে যারা গড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় অধিকাংশ পণ্য উৎপাদন করেনÑ যেমন চাল-আলু-বেগুন চাষি কিংবা ডিম উৎপাদকদের অবস্থা দেখে। একদা বিপুল দৃষ্টি আকর্ষণ করা স্ট্রবেরি চাষেও মুনাফা থাকে না যখন তা বহু মানুষ চাষ করেন। বিরল পণ্য চাষ করে ধনী হওয়ার পরামর্শ কাউকে দেওয়াই যেতে পারে, কিন্তু সেই পরামর্শ যখনই বহু লোক গ্রহণ করে, তা তো আর বিরল থাকে না। এভাবে দেশে বাউকুল গিয়েছে, গিয়েছে আরও অনেক কিছু। গড় যোগ্যতার পরিশ্রমী উদ্যোক্তারাও যখন পণ্য নিয়ে নিশ্চিন্ত মনে বাজারে যেতে পারেন, মুনাফা করতে পারেন, তখনই উদ্যোক্তার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
মনে রাখতে হবে, এমনকি বহু উন্নত দেশেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাই নিজের ও অপরের কর্মসংস্থানের বড় অংশটা সৃষ্টি করেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের যেভাবে পিষে মারা হয়, তারই প্রতিফলন ঘটে অভিবাসনের জন্য তরুণদের এমন মরিয়াপনায়।
বাংলাদেশে কিছু অঞ্চলের সংস্কৃতির উদ্যোক্তা সুনাম আছে। প্রবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও সেখানে বেশি। যেমন বিক্রমপুর, নোয়াখালী। আবার সিলেটের অভিবাসন খ্যাতি থাকলেও উদ্যোক্তা খ্যাতি সে তুলনায় কম। অভিবাসন এসব অঞ্চলের বহু মানুষের প্রাথমিক পুঁজির উৎস। কেননা এই দেশে উদ্যোক্তা হতে হলে পণ্যের মূল খরচের চেয়ে বেশি খরচা হয় ঘুষ, ভাড়া প্রভৃতি অনুৎপাদনশীল খাতেই। এ ছাড়া হয়রানি এবং অনিরাপত্তা তো আছেই। এর ফলে আপনি অল্প কিছু টাকা নিয়ে কোনো ব্যবসা শুরু করতে পারবেন না, অথচ এমনকি উন্নত দুনিয়াতেও ছোট উদ্যোক্তার জন্য ঋণ কিংবা অন্যান্য সুবিধা বেশি, ভাড়াও এখানকার তুলনায় বহু কম। ফলে অভিবাসীদের জীবনের একটা বড় অংশ যায় বেগার শ্রমে পুঁজি জোগাড় করতে করতেই।
এত টাকা জোগাড় করে যে বিদেশে যায়; দেশে অনিশ্চয়তার কারণেই তারা যায়। নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকেই সবাই জানে, দেশে যেকোনো উদ্যোগের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। প্রবাসের অনিশ্চয়তাও আগের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। কিন্তু সংস্কৃতির ধারাবাহিকতার কারণেই এখনো দেশে কোনো উদ্যোগ গ্রহণের চাইতে বিদেশে যাওয়ার জন্যই আত্মীয়রা টাকা ধার দেন কিংবা দান করেন। ঝুঁকির পরও এক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তা বেশি মনে হয় তাদের কাছে, কারণ তিনজন মরে একজন ঠিকমতো পৌঁছুতে পারলে, সে আরও কয়েকজনকে টানবে, তাদেরও সংস্থান হবে। এভাবে ঝুঁকির পাশাপাশি আত্মীয়স্বজনদের ভবিষ্যৎ সংস্থানের হিসাবটাও তারা করেন। অত্যন্ত ভুল হিসাব সন্দেহ নেই। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি খানিকটা উপায়হীনতাও তৈরি করে। কেননা এই পরিমাণ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা দেশে ওই পুঁজিতে একটা ব্যবসাতে তৈরি হবে না। এই সামাজিক স্বার্থ বেশ কাজ করে অভিবাসী অভিযাত্রীর পেছনে বিনিয়োগে। কিংবা এমনকি, ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা জোগাড় করে একটা চাকরিও লাভজনক মনে হয়।
কিন্তু অভিবাসন ক্রমশ কঠিনতর হয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ইউরোপের জন্য প্রয়োজনীয় অভিবাসীর শ্রমের চাহিদার বহুগুণ মিটিয়ে এরই মধ্যে উদ্বৃত্ত হয়েছে। ফলে ভূমধ্যসাগর এখন মৃত্যুকূপ। মধ্যপ্রাচ্য শুকিয়ে গিয়েছে। মালয়েশিয়াতেও কমেছে। সপ্তা দুয়েক আগে নবাবগঞ্জে বেশ কয়েকজন অভিবাসীর সঙ্গে আলাপ হলোা, যারা বহু বছর বিদেশে কাটিয়ে এখন এলাকায় ইজিবাইক চালাচ্ছেন, একজন ছোট একটা মিষ্টির দোকান দিয়েছেন।
কাপড়, কাগজ প্রভৃতি ঐতিহ্যগত ব্যবসায় এখন আর আগের মতো সেই রকম ঢুকে পড়ার সুযোগ ফাঁকা নেই। দেশে ফিরে তাদের অনেকেই বেকার এবং দ্রুত সঞ্চয়ের টাকা ফুরিয়ে যাচ্ছে। সদ্য তরুণরাও আর আগের মতো প্রবাসের সুযোগ পাচ্ছেন না। যে দেশগুলো ধরে অভিবাসীরা ইউরোপ ঢুকত, সেই সীমান্তগুলোতে ডানপন্থি সরকারগুলোর উত্থান এই অবস্থাকে আরও কঠিন করে তুলবে।
ভূমধ্যসাগরে যারা নৌকাডুবিতে মারা গেলেন, বাংলাদেশের তারুণ্যের হতাশার, আরেক দিকে বেপরোয়াপনার প্রতিনিধিত্ব তাদের চেয়ে ভালো আর কারা করেন! বেকারত্ব, অস্থিরতা আর বিকাশহীন জীবন সত্ত্বেও এরা কিন্তু চিরতরে দেশ ছেড়ে ভেগে যাচ্ছিলেন না। মনে রাখবেন, বৈধ কিংবা অবৈধ পথে যাওয়া তরুণদের এই অংশ, যারা গায়ে গতরে শ্রম দেন বিদেশে, তারাই দেশের অর্থনীতির চাকাটাকে সচল রাখেন প্রবাসী আয়ের টাকাটা পাঠিয়ে। এইখানে যে উচ্চ-মধ্যবিত্ত নিরাপদ বৈধ পথে যান, তাদেরকেও টুকটাক কষ্ট করতে হয় হয়তো, কিন্তু তাদের কাছ থেকে প্রবাসী আয়ের অর্থ দেশ পায় না তেমন, কারণ তাদের বড় অংশ চিরপ্রবাসী হতে নতুন গৃহের সন্ধানে অভিবাসী হন। আর অতিধনী ব্যবসায়ী কিংবা আমলারা দেশ থেকে কামাই করা টাকা বিদেশে পাঠান, বৈধ কিংবা অবৈধ পথে। এরা এই ঝুঁকি নিয়ে দেশ ছাড়া তরুণদের আয় করা বৈদেশিক মুদ্রাগুলোর বড় অংশ আবার বিদেশেই ফেরত পাঠান।
এমনকি বাংলাদেশের সঙ্গে যেসব দেশের শ্রমিকরা আগে বিদেশে যেত, তাদের অনেকেই প্রবাস জীবনকে নিরুৎসাহিত করছে। বা অন্তত চেষ্টা করছে নিজের দেশের তরুণদের দক্ষতা ও যোগ্যতা বৃদ্ধি করে তাদের বিদেশে পাঠাতে। সেই দৌড়ে বাংলাদেশ কোনো খানে অবস্থান করছে না। কিন্তু নিয়মিতভাবে যে অল্প কয়েকটা দেশের নাগরিকদের এভাবে জাহাজডুবি হয়ে কিংবা অন্য কোনো দুর্ঘটনায় মৃত্যুর নাম আসছে, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম।
দুনিয়াটা অভিবাসীদের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের লুটেরা শাসকরা সর্বদা ধরেই নিয়েছিল, উদ্বৃত্ত তরুণদের তারা বিদেশে পাচার করে দুই সমস্যার সমাধান করবেন লুট করার মতো প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা তারা পাঠাবেন, আর দেশে কর্মসংস্থানের অভাবটাকে কমিয়ে দেখানো যাবে। প্রবাসী আয়ের ওপর একক নির্ভরশীলতা সর্বদাই একটা রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রতীক। নাগরিকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করা লুটপাটতন্ত্রের টিকে থাকার প্রতীক। অভিবাসনের রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে এই গোটা ব্যবস্থাই আরও অরাজকতা, আরও হানাহানি এবং উত্তেজনার মাঝে পতিত হতে থাকবে। এমনকি প্রবাসী আয়ের প্রবাহই, তরুণদের একটা অংশকে বাইরে রপ্তানি করে এবং দেশস্থ আত্মীয়দের জন্য টাকা পাঠিয়ে, দুইভাবেই দেশের রাজনীতির ওপরও কাক্সিক্ষত চাপটিকে অনেকখানি কমিয়ে রেখেছিল। সম্ভাবনা আছে যে, যে সংকটটাকে আমাদের শাসকরা রপ্তানি করে তার মোকাবিলাটাকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল, সামনের দিনে সেটা আর তত সহজ থাকবে না। বরং এই তরুণদের এইবার হাত লাগাতে হবে নিজের দেশটাকে গড়ে তোলার কাজে। উদ্যোক্তাদের প্রতি প্রতিকূল, কৃষকের প্রতি প্রতিকূল এই সামষ্টিক অবস্থার বদল করে গু-াতন্ত্রমুক্ত একটা রাষ্ট্র গড়া সম্ভব হলে নিজ দেশেই বাসযোগ্য নিরাপদ আর কর্মসংস্থানে ভরপুর উদ্যোগী নারী-পুরুষের জন্য একটা উৎপাদনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা যাবে।
সেই রাজনীতি নির্মাণের কথাই আজকের তরুণ-তরুণীদের ভাবতে হবে।
লেখক : রাজনীতিক ও কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভারতের জাতীয় উন্নয়ন ও ভারত মহাসাগর
  • জীবনে শৃঙ্খলাবোধের প্রয়োজনীয়তা
  • চলুক গাড়ি বিআরটিসি
  • জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবেলায় আমাদের করণীয়
  • নির্ধারিত রিক্সাভাড়া কার্যকর হোক
  • নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা
  • খাদ্যে ভেজাল রোধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে
  • মুর্তাজা তুমি জেগে রও!
  • সন্তানের জীবনে বাবার অবদান
  • এবার কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভংগ হোক
  • বন উন্নয়নে মনোযোগ বাড়ুক
  • একজন অধ্যক্ষের কিছু অবিস্মরণীয় প্রসঙ্গ
  • গ্রামাঞ্চলে বৃক্ষ রোপণ
  • শান্তির জন্য চাই মনুষ্যত্বের জাগরণ
  • উন্নয়ন ও জনপ্রত্যাশা পূরণের বাজেট চাই
  • মোদীর বিজয় : আমাদের ভাবনা
  • অধিক ফসলের স্বার্থে
  • টেকসই উন্নয়ন ও অভিবাসন সমস্যা ও সমাধানে করণীয়
  • সড়ক দুর্ঘটনা
  • চীনের বিশ্বশক্তির প্রত্যাশা ও ভারত মহাসাগর
  • Developed by: Sparkle IT