উপ সম্পাদকীয়

চিকিৎসা অবহেলায় আইনি সুরক্ষা

ড. মো. নায়ীম আলীমুল হায়দার প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৫-২০১৯ ইং ০০:৪৬:৪৩ | সংবাদটি ২৫৭ বার পঠিত

সাধারণত ডাক্তারদের ভুল ও অবহেলার প্রশ্ন ওঠে যখন কোনো রোগীর চিকিৎসার কোনও এক পর্যায়ে জটিলতা বা বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। সম্প্রতি অল্প সময়ের ব্যবধানে চিকিৎসায় ‘অবহেলা’ বা ভুলজনিত কারণে রোগীর মৃত্যুর বেশ কিছু অভিযোগ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে। বরাবরের মতো এ নিয়ে রোগীর লোকদের সাথে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে, থানা পুলিশ জড়িত হয়েছে এবং হাসপাতালের চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও নার্সদের গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে চিকিৎসায় অবহেলা একটি নিয়মিত বিষয় হয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে চিকিৎসায় অবহেলার জন্য নানা ধরণের সুরক্ষা দেয়া হয়েছে। এ দিকগুলো নিয়ে আজকের আলোচনা।
সংবিধান হচ্ছে আইনের মূল উৎস। বাংলাদেশের জনগণের অধিকার রক্ষায় মূল আইন হচ্ছে এই সংবিধান। সংবিধানে চিকিৎসায় অবহেলার প্রতিকার সরাসরি দেয়া না থাকলেও পরোক্ষভাবে নানা দিকনির্দেশনা দিয়েছে। সংবিধান চিকিৎসাসেবাকে একটি মৌলিক চাহিদা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সংবিধানের কিছু অনুচ্ছেদে চিকিৎসাসেবা যে একটি মৌলিক চাহিদা, তা তুলে ধরা হয়েছে, যেমন অনুচ্ছেদ ১৫ তে জনগণের মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা সম্পর্কে বলা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ১৫ (ক)-এ বলা হয়েছে রাষ্ট্র জনগণের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করবে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮-তে জনগণের জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতা সম্পর্কে বলা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ১৮(১) এ বলা হয়েছে, জনগণের পুষ্টির স্তর-উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবেন এবং বিশেষতঃ আরোগ্যের প্রয়োজন কিংবা আইনের দ্বারা নির্দিষ্ট অন্যবিধ প্রয়োজন ব্যতীত মদ্য ও অন্যান্য মাদক পানীয় এবং স্বাস্থ্যহানিকর ভেষজের ব্যবহার নিষিদ্ধকরণের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন। সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে নাগরিক ও সরকারী কর্মচারীদের কর্তব্য সম্পর্কে বলা হয়েছে। অনচ্ছেদ ২১ (১)-এ বলা হয়েছে, সংবিধান ও আইন মান্য করা, শৃঙ্খলা রক্ষা করা, নাগরিকদায়িত্ব পালন করা এবং জাতীয় সম্পত্তি রক্ষা করা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য।
২১ (২)-এ বলা হয়েছে, সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।
বলা যেতে পারে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫, ১৮ ও ২১ এ চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে কিছু দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া মৌলিক অধিকার হিসেবে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২ এ যদিও সরাসরি চিকিৎসাসেবাকে স্বীকৃতি দেয়া হয় নি, তারপরও অনুচ্ছেদ ৩২ যদি ব্যাপকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে দেখা যাবে চিকিৎসাসেবার সাথে জীবন রক্ষা বা জীবন ধারনের একটি শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। অনুচ্ছেদ ৩২-এ বলে হয়েছে, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার রক্ষণ নিয়ে। তাহলে বলা যেতে পারে চিকিৎসাসেবাকেও আমরা মৌলিক অধিকার এর একটি বিষয় হিসেবে সুরক্ষা দিতে পারি। সেক্ষেত্রে, চিকিৎসা অবহেলা হলে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০২ অনুযায়ী উচ্চ আদালতে রিট অথবা জনস্বার্থে মোকদ্দমা করা যেতে পারে।
বাংলাদেশে ফৌজদারি আইনের কোথাও নির্দিষ্ট করে চিকিৎসায় অবহেলার কথা উল্লেখ নেই। কিন্তু দ-বিধি ১৮৬০এ কিছু শাস্তির কথা বলা হয়েছে যেখানে চিকিৎসায় অবহেলার বিষয়গুলো আসতে পারে। দ-বিধির ধারা ২৭৪ এ ঔষধে ভেজাল মিশ্রণ এর শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে। যেখানে সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদ- অথবা অর্থদ- ১,০০০ টাকা অথবা উভয় দ-ে দ-িত হবার কথা বলা হয়েছে। ধারা ২৭৬ এ কোন ঔষধকে ভিন্ন ঔষধ বলে বিক্রয় করা হলে তার শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে। যেখানে সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদ- অথবা অর্থদ- ১,০০০ টাকা অথবা উভয় দ-ে দ-িত হবার কথা বলা হয়েছে।
ধারা ২৮৪-তে বিষাক্ত বস্তু নিয়ে অবহেলামূলক আচরণ এর শাস্তির কথা বলা হয়েছে। যেখানে সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদ- অথবা অর্থ দ- ১,০০০ টাকা অথবা উভয় দ-ে দ-িত হবার কথা বলা হয়েছে। ধারা ৩০৪ ‘ক’-তে অবহেলার দ্বারা মৃত্যু সংঘটন সম্পর্কে বলা হয়েছে। যেখানে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদ- অথবা অর্থদ- বা উভয় দ-ের কথা বলা হয়েছে। ধারা ৩১২-তে গর্ভপাত ঘটানোর শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে। যেখানে সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদ- বা অর্থদ- বা উভয় দ-ের কথা বলা হয়েছে। ধারা ৩২৩-এ ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করার শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে। যেখানে সর্বোচ্চ ১ বছরের কারাদ- অথবা ১ হাজার টাকা অর্থ দ- অথবা উভয় দ-ের কথা বলা হয়েছে। ধারা ৩২৫-এ ইচ্ছাকৃতভাবে গুরুতর আঘাত করার শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে। যেখানে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদ- বা অর্থদ- বা উভয় দ-ের কথা বলা হয়েছে। ধারা ৩৩৬-এ অন্যান্য ব্যক্তির জীবনের নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক কাজ করার শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে। যেখানে সর্বোচ্চ ৩ মাসের কারাদ- বা অর্থদ- বা উভয় দ-ের কথা বলা হয়েছে। ধারা ৪১৬ এবং ধারা ৪১৮-তে প্রতারণার শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে। যেখানে সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদ- বা অর্থদ- বা উভয় দ-ের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া দ-বিধির ৮৮ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, রোগীর সম্মতি নিয়ে কোন চিকিৎসা করার পর রোগীর ক্ষতি বা মৃত্যুর জন্য চিকিৎসককে দায়ী করা যাবে না। আবার ধারা ৯২ তে বলা হয়েছে চিকিৎসক সহজ সরল মনে চিকিৎসা করার পড় রোগীর ক্ষতি হলে চিকিৎসক দায়ী থাকবেনা।
দেওয়ানী আইনে মাধ্যমেও চিকিৎসায় অবহেলার প্রতিকার পাওয়া যেতে পারে। দেওয়ানী কার্যবিধি ১৯০৮-এ কিছু দিক নির্দেশনা দেয়া আছে। যেমন ধারা ৯-এ বলা আছে, ‘নিষেধ না থাকিলে আদালত সকল প্রকার দেওয়ানী মোকদ্দমার বিচার করিবেন’। অর্থাৎ চিকিৎসা অবহেলার মোকদ্দমা বাংলাদেশের দেওয়ানী আদালতেও বিচারের জন্য আসতে পারে। ধারা ১৯-এ বলা হয়েছে কোন ব্যাক্তির যদি অন্য কোন ব্যাক্তির কারণে ক্ষতি হয়, তাহলে উক্ত ক্ষতিপুরণের জন্য এখতিয়ারভুক্ত আদালতে যেতে পারবে। এছাড়া টর্ট আইনেও চিকিৎসা অবহেলার প্রতিকার পাওয়া যেতে পারে। টর্ট কারও কর্তব্যবিচ্যুতির কারণে ঘটিত অপরের ক্ষতিজনিত দেওয়ানী অপরাধ। আইনি কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে অবহেলা বা কর্তব্যবিচ্যুতির কারণে এ ধরনের ক্ষতি ঘটে থাকে। অপরাধীকে অপরাধে নিরুৎসাহিত করা এবং ব্যক্তিগত ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ আদায় হলো টর্ট আইনের উদ্দেশ্য। এ প্রতিকার কেবল কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধেই নয়, আইনগতভাবে গঠিত যেকোন সংস্থার বিরুদ্ধেও প্রযোজ্য। কোনো ব্যক্তি দৈহিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সে ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারে এবং দেওয়ানী আদালত আর্থিক ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে পরে। অবহেলা, উপদ্রব, স্বেচ্ছায় মিথ্যা বিবরণ প্রদান, অবৈধ প্রবেশ, ভুল কারাবন্দিকরণ, প্রবঞ্চনা বা মানহানি ইত্যাদির জন্যও এসব মামলা হতে পারে। আইনসঙ্গত কাজ হিসেবে শহরের আবর্জনা ও বর্জ্য অপসারণে সিটি করপোরেশনের অবহেলা টর্ট জাতীয় অন্যায়। অনুরূপভাবে কোনো চিকিৎসক রোগীর চিকিৎসায় অবহেলা করলে এবং সেজন্য রোগীর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলে কিংবা কোনো উকিলের অবহেলার দরুণ মক্কেলের সম্পত্তির ক্ষতি হলে এগুলোও টর্ট বলে গণ্য হবে।
এছাড়া ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর মাধ্যমেও আইনি প্রতিকার পাওয়া যেতে পারে। উক্ত আইনের ধারা ২ (২২) অনুযায়ী টাকার বিনিময়ে কোন রোগী যদি চিকিৎসাসেবা নেয় তাহলে সেই রোগী উক্ত আইন অনুযায়ী ভোক্তা হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন। উক্ত আইনের ৪৫ ধারায় বলা হয়েছে, যে ধরণের সেবা দেবার ওয়াদা করা হয়েছিল যদি ঠিক সেইরকম সেবা ভোক্তাকে প্রদান করা না হয় সে ক্ষেত্রে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদ- বা ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদ- বা উভয় দ-ে দ-িত হবেন। উক্ত আইনের ৫২ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে কেউ যদি ভোক্তার জীবন বা নিরাপত্তার জন্য হুমকির পরিবেশ তৈরি করে তাহলে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ১ বছরের কারাদ- বা ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদ- বা উভয় দ-ে দ-িত হবেন। অপরদিকে ৫৩ ধারায় বলা হয়েছে, অবহেলার কারনে ভোক্তার টাকা, স্বাস্থ্য ও জীবনের ক্ষতি হলে দায়ী ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদ- বা ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদ- বা উভয় দ-ে দ-িত হবেন।
মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০ এর মাধ্যমেও চিকিৎসা অবহেলার প্রতিকার পাওয়া যেতে পারে। যদি উক্ত কাউন্সিল কোন চিকিৎসা অবহেলার প্রমাণ পায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক এর নিবন্ধন বাতিল করতে পারে। উক্ত আইনের ২৩ ধারায় চিকিৎসক এর নিবন্ধন বাতিলের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। উপরোক্ত আইনগুলো ছাড়াও আরো কিছু আইন আছে যেগুলো স্বাস্থ্যসেবার বা চিকিৎসা সেবার সাথে সম্পর্কযুক্ত। যেমন; ভ্যাকসিনেশন আইন ১৮৮০, ঔষধ (ড্রাগস) আইন, ১৯৪০, মেডিকেল প্রাকটিস এন্ড প্রাইভেট ক্লিনিক এবং ল্যাবাটরিস অধ্যাদেশ ১৯৮২, ফার্মেসি অধ্যাদেশ ১৯৭৬, ঔষধ (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৮২, বাংলাদেশ. ইউনানী অ্যান্ড আয়ুর্বেদিক প্র্যাকটিশনার্স অধ্যাদেশ ১৯৮৩, মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন, ১৯৯৯, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন আইন ২০০২ ইত্যাদি। এছাড়া 'চিকিৎসা সেবা ও সুরক্ষা আইন-২০১৮' নামে একটি আইন কার্যকর হবার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। উক্ত আইনটি কার্যকর হলে চিকিৎসা অবহেলার বিষয়টি কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, আইন ও বিচার বিভাগ, নর্থ ইস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মিতব্যয়িতা
  • হংকং : কেন গণআন্দোলন
  • যানজট মুক্ত মহানগরী : কিছু প্রস্তাব
  • পানি নিয়ে ভাবনা
  • ভেজাল-দূষণ দূর করা কি খুবই কঠিন?
  • সৈয়দ মহসীন আলী : ক্ষণজন্মা রাজনীতিক
  • শিশুদের বিজ্ঞান মনস্ক করে গড়ে তোলার গুরুত্ব
  • রোহিঙ্গাঁ সমস্যা : প্রয়োজন আশু সমাধান
  • মজলিশী মুজতবা আলী
  • জলবায়ু ও পৃথিবীর বিপর্যয়
  • আমরা বই পড়া কি ভুলেই গেলাম
  • সফল হওয়ার সহজ উপায়
  • ঝুঁকিপূর্ণ রেল যোগাযোগ : প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা
  • আজকের দিন আজকের দিকে তাকাও
  • বিয়ে ব্যবস্থায় পরিবর্তন
  • কারবালার ঘটনা ও কয়েকজন সাহাবীর স্বপ্ন
  • আশুরায় সিলেটে হাদা মিয়া-মাদা মিয়ার বিদ্রোহ
  • গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শিক্ষা শহীদে কারবালা
  • যাকে দেখতে নারী তার চলন বাঁকা
  • ‘শতভাগ সাক্ষরতা’ কতদূর
  • Developed by: Sparkle IT