ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বাঙালির আম-কাঁঠাল

আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ২২-০৫-২০১৯ ইং ০০:০৯:৫৩ | সংবাদটি ২৯৪ বার পঠিত

আবহমান বাংলার ফল-ফসলের তালিকায় আম অতি পরিচিত সহজলভ্য একটি ফল। বাংলার উর্বর জমিন এবং উষ্ণ-আর্দ্র আবহাওয়া ফল-ফসল উৎপাদনের উপযোগী বলেই বিচিত্র স্বাদ, রঙ ও আকারের ফল-ফসল এখানে ফলে। ষড়ঋতুর এই দেশে বারোমাসই বলতে গেলে ফল পাওয়া যায়। কথায় আছে-বারো মাসে বারো ফল না-খাইলে যায় রসাতল। বাইরে থেকে দামি ফল-ফসল আসে-লোকজন সমাদরও করে। কিন্তু দেশি ফলের স্বাদ এবং আবেদন আলাদা। আঙুর বিদেশি, স্বাদও আছে। কিন্তু আমের সঙ্গে শুধু রসনারই সম্পর্ক নয়-স্মৃতিরও আস্বাদন রয়েছে। তাই দেশি ফল-ফসলের সঙ্গে আমরা নাড়ির বন্ধন অনুভব করি।
শাশ্বত বাংলার ফল-ফসলের সংখ্যা অন্য কোনো দেশের চেয়ে কম নয়। ছড়ার ছন্দে শোনা যাক কয়েকটি ফলের নামÑ
আম, জাম, আতা, লেবু, নারিকেল, কলা
লিচু, বেল, আনারস, কাঁঠাল, কমলা।
ভাষান্তরেÑ
আম জাম আতা লেবু জাম্বুরা
কাঁঠাল কমলা লিচু বেল আনারস
তাল ফুটি খিরাই আমড়া।
তালিকায়, আমই প্রথম। বর্ণ শিক্ষায় আ-তে আম উচ্চারণ করে এ দেশের শিশুর প্রথম পরিচয় ঘটে আমের সঙ্গে। হয়তো তারও আগে পাড়ার শিশুদের অথবা ঘরের ভাই-বোনদের সঙ্গে বাঙালি শিশুটি বৈশাখি বাতাসে যায় আম কুড়াতে। ‘ঝড়ের দিনে মামার দেশে আম কুড়াতে সুখ’ এই সুখ শুধু পদ্যবন্ধে নয় বরং বাস্তবেও আছে। গ্রাম বাংলার প্রতিটি বাড়িতে থাকে অনেকগুলো আম-কাঁঠালের গাছ। এ যুগে বৃক্ষ নিধনের পরও বাংলার গ্রামে গ্রামে যে ফলের গাছটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে সেটি হচ্ছে আমগাছ। আমের বোল আসে, গুটি হয়, বাতাসে ঝরে পড়ে কাঁচা আম। শিশুরা ঝড়ের দিনে ঝড় থামতেই হই হই করে নেমে পড়ে আম কুড়াতে। সে কী উল্লাস এবং উত্তেজনা। এই যে আম কুড়ানোর সুখস্মৃতি-তা বর্তমান শহরবাসী যেকোনো প্রৌঢ় বা বৃদ্ধকে মুহূর্তে নিয়ে যায় শৈশবের উঠোনে।
আম, আনারস, কাঁঠাল। এই তিনটি ফল বাংলার গ্রীষ্মকালীন একান্ত এবং অত্যন্ত সমাদৃত ফল। সামাজিক অনেক রসুম ও রেওয়াজ এই ফলগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। গ্রীষ্মকালে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে পাঠানো হয় আম-কাঁঠাল। মেয়ের জামাইকে দাওয়াত দেয়া হয় আম-কাঁঠাল খাওয়ার। বর্তমান যুগেও এ রেওয়াজ টিকে আছে। এদেশে স্কুল কলেজগুলোতে গ্রীষ্মকালীন ছুটিকে বলা হয় আম-কাঁঠালি বন্ধ। বুঝতে কষ্ট হয় না, আম-কাঁঠাল আমাদের সমাজ-জীবনে কতটা স্থান জুড়ে আছে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিতেও আম আমাদের জড়িয়ে আছে। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশির আমবাগানে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হলো। ‘বণিকের মানদ- দেখা দিল রাজদ- রূপে’। আবার ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের আমবাগানে গঠিত হলো বাংলাদেশের প্রথম সরকার। শুধু তাই না, জাতীয় সংগীতেও দেখুনÑ
ওমা ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে...
হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে আম গুরুত্বপূর্ণ বৃক্ষ। এমন হিন্দুবাড়ি পাওয়া কঠিন, যে বাড়িতে দু’চারটি আমগাছ নেই। শুধু ফলের জন্য নয়; মৃত্যুর পরও আম গাছের প্রয়োজন বলেই হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে এর গুরুত্ব অপরিসীম। মৃতের সৎকার বা দাহ করতে আমকাঠ নিদেনপক্ষে আমের ডালপালা আবশ্যক। অন্য কাঠে দাহ করলেও আমকাঠ লাগবে। সরস্বতি পূজার প্রধান উপচার আমের মুকুল। চৈত্রসংক্রান্তির আগে কাঁচা পাকা কোনো আমই হিন্দুরা খান না। এটি বহু প্রাচীন প্রথা রূপে প্রচলিত।
আমের সঙ্গে স্মৃতি আছে। সেই সঙ্গে সংস্কারও কম নয়। শৈশবে অনেকেই হয়তো পোকায় খাওয়া আম খেয়েছেন। লোকবিশ্বাস ছিল, পোকড়া আম খেলে তাড়াতাড়ি সাঁতার শেখা যায়। পাকা আম, কী সুন্দর রঙ। কোনটা হলুদাভ, কোনটা টকটকে লাল, কোনটা আবার সিঁদুরে। বাইরের দিকটা ঝকঝকে অক্ষত কিন্তু আমটা ছুরি অথবা বটি দা’য় কাটতেই বের হয়ে গেল আস্ত জীবন্ত কালচে রঙের ছোট পোকা। এ নিয়ে শিশু বয়সে বিস্ময়ের ঘোর লাগেনি-এমন লোক পাওয়া যাবে না।
আমের বোল এলে চোখে পড়ে সকলেরই। লোকবিশ্বাস হচ্ছে, আমের ফসল ভালো হলে ঝড় তুফান বেশি হবে। লোকশাস্ত্রে বলে- আমে বান, তেঁতুলে ধান। হ্যাঁ, গান, ছড়া, কবিতা, সাহিত্যেও আমের স্থান রয়েছে। আমের মৌসুমে বিরহী গৃহবধূর মনের আকুতি ফুটে উঠছে এ দেশের লোকসাহিত্য গীতিকায়Ñ
জ্যৈষ্ঠ না মাসেরে বন্ধু গাছে পাকা আম
আমার বন্ধু নাইরে দেশে কারে খাওয়াইতাম।
আম খাইত কাঁঠাল খাইত খাইত গাইর দুধ
সামনে বসাইয়া সাধুর দেখতাম চাঁদমুখ।
জ্যৈষ্ঠ মাসেই মূলত আম-জামের ধুম পড়ে। এ মাসেই তাই বিরহিনীর বুকের যন্ত্রণা মোচড় দিয়ে ওঠে!
আম পাকিল জাম পাকিল, পাকিল কাঁঠাল
আমার দেশের বন্ধু বিদেশ রইল বুকে দিয়া শাল।
একটি লোককথায় আম এসেছে এভাবেÑ
পৌষে কুশি মাঘে বোল, ফাল্গুনে গুটি চোতে আঁটি
বোশেখে কাটিকুটি জ্যৈষ্ঠে দুধের বাটি।
আষাঢ়ে পুতে রাখি শ্রাবণে বাজাই বাঁশি।
আমের একটি পৃথক ব্যঞ্জনা আছে। কবি ফররুখ আহমদের (১৯১৮-১৯৭৪) ছড়ায় সেই ব্যঞ্জনার আভাস পাওয়া যায়Ñ
ঝড় এলো এলো ঝড়
আম পড় আম পড়
কাঁচা আম ঢাসা আম
টক টক মিষ্টি
এই যা এলো বুঝি বৃষ্টি।
আমের সঙ্গে প্রত্যেকের স্মৃতিময় শৈশব জড়ানো। যেমন কবি জসীমউদদীনের (১৯০৩-১৯৭৬) কবিতায়Ñ
ঝড়ের দিনে মামার দেশে আম কুড়াতে সুখ।
পাকা জামের মধুর রসে রঙিন করি মুখ।
শৈশবে গুরুজনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কচি টক আম পেড়ে নুন লঙ্কা দিয়ে খাবার স্বাদ হয়তো এখনো অনেকের মুখে লেগে আছে। রসুন, শুকনো ভাজা মরিচ সহযোগে পাতলা করে কাটা আমের চাটনি রসনায় লালা আনে। বাতাসে ঝরে পড়া কচি আম অথবা বোলের সঙ্গে ছোট গুঁড়া মাছের ঝোল মহিলাদের অতি প্রিয়। কচি আম কেটে শুকিয়ে আমশি করা হয়। গ্রীষ্মের দুপুরে জলে ভিজিয়ে হয় সুপেয় শরবত। আমের আচার এখন বাজারেও সুলভ মূল্যে পাওয়া যায়। গ্রামের সবচেয়ে মজাদার খাবার আমসত্ত্ব। পাকা মিষ্টি আম গুলিয়ে চেপ্টা ডালায় লেপ্টে দেওয়া হয় স্তরের পর স্তর। রোদে শুকিয়ে নিলে পুরু জাজিমের মতো বিশাল আমসত্ত্ব সারা বছর সংরক্ষণ করা যায়। এর স্বাদ ভাষা দিয়ে বোঝানো দায়। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) কবিতায় হাত পাকাতে গিয়ে আমসত্ত্বের স্বাদ কী চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেনÑ
আমসত্ত্ব দুধে ফেলি
তাহাতে কদলী দলি
সন্দেশ মাখিয়া দিয়া তাতে
Ñহাপুস হুপুস শব্দ
চারিদিক নিস্তব্ধ
পিঁপড়া কাঁদিয়া যায় পাতে।
আমের বৈদিক নাম মাকন্দ! মূলত আম ভারতীয় একটি ফল। বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলের আমের মান অত্যন্ত উঁচু। বাংলাদেশে আমের বিচিত্র স্বাদ, আকার ও রঙ ভেদে আমও আলাদা। রাজশাহী অঞ্চলের আমের কয়েকটি নাম হচ্ছে-গোপালভোগ, মালভোগ, লেংড়া, কইতরি, বউভোলানী, বিবিপছন্দ, সুন্দরী, কালুয়া, সিঁদুরকাটা প্রভৃতি। সুনীতি কুমার ম-লের তৈরি একটি নাম তালিকা থেকে কয়েকটি নাম উল্লেখ করা যাক-বৈশাখি, পাঞ্জাছন্দ, সরঙ্গাম, ফজলি, হিমসাগর, দাউদিয়া, চম্পা, সুরম্পা, ভবানী, কলাবতী প্রভৃতি।
আমের স্বাদ যেমন আছে তেমন খাদ্যমূল্যও আছে। বাংলার জনগণের অতি প্রিয় সুস্বাদু ফল আম এখনো সর্বত্র প্রচুর জন্মায় তবে আমগাছের সংখ্যা কমে আসছে।
কাঁঠাল
আমের পরেই কাঁঠাল ঘরে ঘরে প্রিয় ফল। এখন জাতীয় ফল। কাঁঠালের আকার, কাটার মতো দানাভরা শরীর আর পাকা কাঁঠালের ঘ্রাণ শিশু বুড়ো সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কাঁঠালের কোষ খাওয়া হয় ফল হিসেবে। কিন্তু এর বিচি বা বীজটিও উপাদেয়। মাছ, শুটকি, গোশত বা ডিম সহযোগে তরকারি হিসেবে সুস্বাদু। নালি (পাট) শাকে কাঁঠাল বিচি কেটে দেয়া হয়। আর আগুনে পুড়ে অথবা ভেজে গুঁড়ো করে শুটকি মিশিয়ে চাটনির মজা বাঙালি মাত্রেই জানেন। চুলার কাঠের অঙ্গার বা তুষের মধ্যে কাঁঠালবিচি রেখে শিশু-কিশোরদের সেকি প্রতীক্ষা। হঠাৎ ঠুস শব্দে ফেটে গেলেই তুলে এনে মজা করে খাওয়ার আনন্দ আজকাল গ্যাসের চুলায় কি আর আছে? রসাল কাঁঠালের ছোবড়া গরুর খুব প্রিয় খাদ্য। কাঁঠালের আঁঠা আছে। কোষ বের করতে হয় কায়দা করে । বিদেশিদের কাছে এটি বিস্ময়কর এক ফল। কাবুলির কাঠাল ভক্ষণ আর দাড়ি গোঁফে আঁঠার কেচ্ছা অনেকেই জানেন। বাংলাদেশের সর্বত্র এই ফলটি কমবেশি আছে। পাকা কাঁঠালের মধ্যে কোষ কড়চা, টান কড়চা আর নরমও হয়। জ্যৈষ্ঠ আষাঢ়ে বাংলাদেশের যেকোনো হাটবাজারে কাঁঠালের স্তুপ চোখে পড়ে। এটি বাংলার একান্ত ফল। এজন্যই এটিকে জাতীয় ফলের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। কাঠাল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফল। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য প্রযুক্তি ও গ্রামীণ শিল্প বিভাগের মতে কাঁঠালের বিচি থেকে বিস্কুট, কেক, পাউরুটি এবং কোষ ও মোথা থেকে জ্যাম, জেলি, আচার তৈরি হতে পারে। আমসত্ত্বের মতো কাঁঠালসত্ত্বও মুখরোচক। বিচি শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যায়। কাঠাল শ্রীলঙ্কায় সমাদৃত ফল। কাঁচা ও পাকা কাঁঠাল খাওয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি শ্রীলঙ্কায় চালু আছে। কোষ ও বিচির সঙ্গে নারকেল দিয়ে তরকারি রান্না করা হয়। কাঁঠাল নিয়ে জীবনানন্দ দাশের (১৮৯৯-১৯৫৪) একটি চমৎকার কবিতা আছেÑ
দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে
ভোরের বাতাসে
যেখানে গাছের নাম কাঁঠাল অশ্বত্থ
বট জারুল হিজল;
এইখানে জাম লিচু কাঁঠালের বন
অজস্র চুলের চুমা হিজলে কাঁঠালে
জামে, ঝরে অবিরত।
বারবার রোদ আর সুচিক্কণ চুল
নিঙড়ায় কাঁঠাল জামের বুকে,
যখন মৃত্যুর ঘুমে শুয়ে রব
অন্ধকারে নক্ষত্রের নিচে
কাঁঠালগাছের তলে।
এই কার্তিকের নবান্নের দেশে
কুয়াশার বুকে ভেসে
একদিন আসিব এ কাঁঠালতলায়।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বাঙালির ইতিহাসে দুঃখের দিন
  • ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা
  • সাংবাদিকদের কল্যাণে সিলেট প্রেসক্লাব
  • প্রাকৃতিক মমিতে নির্মমতার ইতিহাস
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় ও সুফি-সাধকদের কথা
  • ঐতিহ্যের তাঁত শিল্প
  • সিলেট প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে ভাবনা
  • খাপড়া ওয়ার্ড ট্রাজেডি
  • জাদুঘরে হরফের ফোয়ারা
  • ইতিহাস গড়া সাত শক্তিমান
  • ভেজাল খাবার প্রতিরোধের ইতিহাস
  • বর্ষাযাপন : শহর বনাম গ্রামগঞ্জ
  • বর্ষা এলো বর্ষা
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • নবীদের স্মৃতিচিহ্নে ধন্য যে জাদুঘর
  • দর্শনীয় স্থান ও পর্যটন কেন্দ্র
  • ঐতিহ্যে অম্লান গোবিন্দগঞ্জ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়
  • বিলুপ্তির পথে গরীবের ‘শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত’ মাটির ঘর
  • হারিয়ে যাচ্ছে হিজল গাছ
  • তালের পাখা প্রাণের সখা
  • Developed by: Sparkle IT