উপ সম্পাদকীয়

এবার বোরো ধানে চাল নেই

মোঃ জহিরুল আলম-শাহীন প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৫-২০১৯ ইং ০০:৩৪:৪২ | সংবাদটি ৭০ বার পঠিত

সম্প্রতি দৈনিক পত্রিকার পাতায় বোরো ধানের ব্লাস্ট বা চিটা রোগের আক্রমণে ধানের শীষ মরা ও কৃষকের আহাজারির খবর প্রায় প্রতিদিনই প্রকাশিত হয়েছে। যে কৃষকরা দেশ ও জাতির খাবার যোগান দিচ্ছে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, তাদের করুণ দুর্দশার খবর দেখলে ব্যতিত হবারই কথা। এই দুঃখের রেশ ধরেই আমি কৃষকদের দুঃখ আর দুর্দশার কথা সরেজমিনে দেখতে গত ২৫ এপ্রিল হবিগঞ্জ জেলার কয়েকটি উপজেলা সফর করি। কৃষকদের আহাজারির কথা শুনি। প্রতিকূল আবহাওয়ায় অতিবৃষ্টি, অকাল বন্যায় পানিতে তলিয়ে যায় কৃষকের সোনালী স্বপ্নের সোনালী ফসল। আর অনুকূল আবহাওয়ায় নানা রোগবালাই আক্রমণে ধানের শীষ মরে যায়। ফলে ধানে চাল হয় না। এ কোন নিয়তির খেলা। কোন দোষে অসহায় কৃষকের কপাল পুড়ছে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে বছরে একটি মাত্র ফসল নিয়েই হাওরবাসীর জীবন-জীবিকার শক্তি। সেখানে বিপর্যয় দেখা দিলে কৃষকের হতাশার সীমা থাকে না। এককথায় বোরো ধান নষ্ট হলে কৃষকের কষ্টের শেষ নেই। আমি যখন মাঠ দেখতে গিয়েছিলাম তখন মাঠের ধান বের হয়ে চালে পূর্ণ হওয়ার সময়। কোনো কোনো ক্ষেতের ধান চালে ভরে গিয়েছিল। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত অর্থাৎ ব্রি-২৮ ধানের ক্ষেতের শীষ মরা বের হয়ে পাকা ধানের ক্ষেতের মতো দেখা গেছে। আর এখন বোরো ধান প্রায় কৃষকই নিজ নিজ ঘরে তুলেছেন। হিসাব-নিকাশ করে কৃষকরা দেখছেন নিজের শ্রম আর সার, বিষ, আর শ্রমিকের মজুরি সবই পানিতে মিশেছে। কপালে হাত পড়েছে।
মাঠে নেমে দেখলাম কোনো কোনো ক্ষেতের ধান পুরো পেকে গেছে মনে হয়। হাতে নিয়ে দেখলাম ধানের ছড়ায় ধানের ভিতর চাল নেই। আরো একটি খেয়াল করলাম ধানের শীষের গোড়ার দিকে ছোট একটি ছিদ্র আছে এখান থেকে যে ধানের থোড় বা ধানের ছড়া হয়েছে তা সাদা। কৃষকদের নিকট জানতে চেয়েছিলাম এমনটি কখন লক্ষ করা হয়েছে। তারা বলেছেন ধানের শীষ বের হবার সময় কোনো কিছু বুঝা যায় না। কয়েক দিন পর দেখ যায় ধান পুরো পেকে গেছে। হাতে নিয়ে দেখা যায় ধানে কোনো চাল নেই।
জানা যায় ধানে চাল না হওয়ার রোগটির নাম ব্লাস্ট রোগ। অসহায় কৃষকরা বুঝতে না পারায় কৃষকের গোলা এখন শূন্য। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রসরতায় বোরো উৎপাদন বিরাট ভূমিকা পালন করে। আমাদের কৃষক সমাজ যদি সুখে শান্তিতে ঘরে ফসল তুলতে পারে দেশের দারিদ্র্য এমনিতেই কমে যাবে। সমাজে মানুষ অন্তত শান্তিতে দুমুটো ভাত খেতে পারবে। সমাজে দেখা দিবে শান্তি আর দেশের হবে উন্নতি। বর্তমানে খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করছে এবং সে প্রেক্ষাপটে দেশ এখন বিদেশে চাল রপ্তানি করার চিন্তা ভাবনা করছে। এমন ঘোষণা ও প্রচারণা শুনেছি বিভিন্ন সভা, সেমিনারে ও সিম্পোজিয়ামে। বড় আনন্দ ও গর্বের বিষয়। এত আনন্দ আর গর্ব যাদের নিয়ে আমরা করছি তাদের ঘরের খবর কে রাখে। কত বাধা বিপত্তি আর সংকট পেরিয়ে, ঘরের গোয়ালের গরু বিক্রি করে, উচ্চ সুদে ধার দেনা করে কৃষকরা খেয়ে না খেয়ে অর্ধ-অনাহারে, রোদ বৃষ্টি সহ্য করে ফসল ফলিয়ে যাচ্ছে। অবশেষে কী পরিমাণ ফসল গোলায় তুলতে পারছে এর প্রকৃত হিসাব আছে বলে আমার মনে হয় না। মাত্র কয়দিন আগেও কৃষক সোনার ফসল ঘরে তোলার স্বপ্নে আনন্দে উদ্বেলিত ছিল। ফসল বাড়িতে এনে সবই শূন্য। সব ধানই মরা। ধান আছে চাল নেই। সরজমিনে দেখলাম তাদের চোখে মুখে চরম হতাশার ছাপ।
প্রতি বছর হাওরাঞ্চলসহ দেশের নানা স্থানের কৃষকরা প্রকৃতির বৈরী আবহাওয়া এবং আগাম বন্যার ঝুঁকিতে থাকেন। চলতি বছর প্রকৃতির প্রতিকূল আবহাওয়া পাহাড়ি ঢল, আগাম বন্যা না দেখা দিলেও ধানের চিটা রোগে ফসল না হওয়ায় কৃষকরা দিশেহারা, বোরো ধানে এমন রোগের আক্রমণ নতুন কিছু নয়। বিগত ২/৩ বছর যাবৎ প্রতি বোরো মৌসুমে এ রোগটি আক্রমণ করছে। কিন্তু প্রতিকারের বা ফসলকে নানা রোগবালাই থেকে বাঁচানোর উদ্যোগ গ্রাম পর্যায়ে পৌঁছেনি। মাঠ পর্যায়ে উপজেলার কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঝে মধ্যে পরামর্শ দিলেও তেমন উন্নতি হয়নি। এ ব্যাপারে হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার তুলশীপুর বাজারের অতি পরিচিত কৃষকের অতি আপনজন ও পরামর্শক, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত (ফসলের রোগ বালাই) সার ও কীটনাশক বিক্রেতা জনাব সেলিম মিয়ার নিকট জানতে চেয়েছিলাম বোরো ফসলের এ অবস্থা কেন? তিনি বলেন, ধানের ব্লাস্ট বা চিটা রোগটি ধানের শীষ বের হবার সময় দেখা দেয়। আমাদের দেশের কৃষকরা বেশিরভাগ শিক্ষিত নয়। তারা ততটা বোঝে না। ফলে উপযুক্ত সময়ে বা কী পরিমাণ সার, বিষ প্রয়োগ করতে হবে তা বোঝে না তাই ফসলকে রোগ বালাই থেকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অপরদিকে অনেক কৃষক আমাদের পরামর্শ মতে চলে না। তাছাড়া উপজেলা পর্যায়ের কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শ দিতে খুব কমই আসেন। তাই কৃষকরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে না। তাই কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি আরো বলেন, অনেক কৃষক ফসলের খরচ বেশি হওয়ায় তা সামলাতে না পারায় শেষ পর্যায়ে বিষ ও সার প্রয়োগ করে না। তাই কৃষকের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
* ব্লাস্ট রোগ কি, কী করে : ব্লাস্ট একটি মারাত্মক ছত্রাকজনিত রোগ। আমাদের দেশে প্রতি বছর বোরো মৌসুমে এ রোগের আক্রমণ হয় বেশি। বিশেষ করে ব্রি ধান ২৮ জাতে এ রোগটি ছড়ায় বেশি। দিনে গরম রাতে ঠান্ডা, শিশির ভেজা দীর্ঘ সকাল, অধিক আর্দ্রতা, মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, ঝড়ো হাওয়া, গুড়িগুড়ি বৃষ্টি এমন পরিবেশ এ রোগটি আক্রমণের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। এমন পরিবেশে এ রোগটি বাতাসের সাহায্যে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। পুরো ফসল নষ্ট করে ফেলে। আমাদের দেশে ধান ক্ষেতে পাতা ব্লাস্ট, গিঁট ব্লাস্ট ও নেক ব্লাস্টের আক্রমণ ব্যাপক হয়ে থাকে। তবে নেক ব্লাস্ট ধানের বেশি ক্ষতি করে। পুরো ধান ক্ষেতের ধান শীষ মরে হলুদ হয়ে যায়। ঘন কুয়াশায় বা গুড়িগুড়ি বৃষ্টির সময় ধানের ভিজা পাতা ও শীষের গোড়ার সংযোগ স্তরে পানি জমে। এই পানি জমা স্থানে ব্লাস্ট রোগের জীবাণু ছত্রাক আক্রমণ করে কালচে বাদামি দাগ তৈরি করে। কয়েকদিনের মধ্যেই আক্রান্ত ধানের শীষের গোড়া পচে যায়। ফলে গাছের গোড়া দিয়ে যে খাবার মাটি থেকে তুলে আনে তা ধানের শীষে বা ছড়ায় পৌঁছতে পারে না। ”ফলে শীষ শুকিয়ে যায়। ধানে কোনো চাল তৈরী হয় না। ধান চিটা হয়ে যায়। পুরো ক্ষেত হলুদ বর্ণ ধারণ করে। দেখতে মনে হয় ধান ক্ষেত পেঁকে গেছে। ধান পাকা হলুদ বর্ণ ধারণ করে ঠিকই কিন্তু ধানের ভিতরে কোনো চাল থাকে না। তাই কৃষকের ক্ষেতে ধান আছে, চাল নেই। বিগত দুই/তিন বছর যাবৎ এ সময়ের বোরো মৌসুমে সংবাদপত্রের পাতায় প্রায় একই রকম খবর দেখছি। আর তার সাথে কৃষি কর্মকর্তারা পরামর্শের ঝাঁপি খুলে বসেছেন। কীটনাশক ব্যবহার করতে বলছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, বোকা কৃষক বোঝে না। মাত্রা ঠিক করে বিষ দিলে কি আর ছত্রাক থাকে? আবার কেউ বলছেন বোকার ফসল পোকায় খায়। প্রায় এসব খবরে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এবারও প্রায় একই রকম বক্তব্য দিচ্ছেন সংবাদ মাধ্যমে। তবে এমন সর্বনাশ ঠেকানোর পথ এখন আর খোলা নেই। কিন্তু করার ছিল অনেক কিছু। ইউনিয়ন পর্যায়ে উপজেলা কৃষি বিভাগের মানুষজন সঠিক সময় ধানের রোগ দমনে পরামর্শ দিলে বা সরেজমিনে ব্যবস্থা নিলে ঠিকই কৃষক সমাজ ফসল রক্ষার্থে বেশ উপকৃত হতো। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মাঠগুলো পরিদর্শন করলে ছত্রাক অনেক আগেই নিয়ন্ত্রণ করা যেত। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কর্মরত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের কাজই হচ্ছে নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করা। কৃষকদের তথ্য, পরামর্শ দেওয়া এবং মাঠ পর্যায়ের অবস্থার তথ্য সংগ্রহ করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট জানানো। এই ব্যবস্থাগুলো চলতি বছর মাঠ পর্যায়ে হয়নি বলে কৃষকরা জানিয়েছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে কৃষকরা জানান আমাদের দেখার কী কেউ আছেন। কৃষি বিভাগের মানুষজন তো উপজেলায় বসে আছেন। এমন বক্তব্যই আমি পেয়েছি মাধবপুর উপজেলার দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের ১নং, ২নং, ৩নং ইউনিয়নের কৃষকদের নিকট।
প্রতিকার : কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষি বিশেষজ্ঞ এবং কৃষিবিদদের নিকট থেকে পাওয়া তথ্য মতে বোরো মৌসুমে যাদের ব্রি ধান ২৮, ব্রি ধান ৫৮, বি ২৯, ব্রি ধান ৪৮ বা অন্য জাতের হাইব্রিড ধানে দু’একটি শীষ বের হয়েছে বা সম্পূর্ণ বের হয়েছে কিন্তু পাকা শুরু হয়নি এমন সব ক্ষেতে রোগ দেখা দেয় বা না দেখা দেয়, প্রতি ৫ শতক জমিতে ৮ গ্রাম ট্রুপার ৭৫ ডব্লিউপি/দিফা ৭৫ ডব্লিউপি অথবা ৬ গ্রাম ন্যাটিভো অথবা ১০ মিলিলিটার অ্যামিস্টার টপ, ৩২৫ এসসি ১০ লিটার পানিতে ভালো করে মিশিয়ে বিকালে ৫ থেকে ৭ দিন পর পর দু’বার স্প্রে করতে হবে। এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সম্প্রতি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড: মুহাম্মদ আশিক, উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. হীরেন্দ্রনাথ বর্মন, উদ্ভিদ রোগ তত্ত্ব বিভাগের ড. তুহিনা খাতুন নেত্রকোণা জেলার হাওর এলাকার ধানি জমির মাঠ সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন এবং তারা কৃষকদের সাথে কথা বলেছেন। এ সময় তারা বলেন, ২৯ থেকে ৩১ জানুয়ারি ২০১৯ পর্যন্ত দিনের তাপমাত্রা ২৫ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাতের তাপমাত্রা ১২ ডিগ্রিতে নেমে আসায় এসব এলাকার বোরো ধানের গাছ কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়। নির্ধারিত সময়ের আগে বীজতলা তৈরী ও চারা রোপনের কারণে এ সমস্যার সৃষ্টি হয়। জমিতে বোরনের অভাবেও চিটা রোগ হতে পারে। তাই ধানের ব্লাস্ট বা চিটা রোগের বিস্তারিত তথ্য উদঘাটনের জন্য এ ব্যাপারে হাওরাঞ্চলসহ ফসলি অঞ্চল নিয়ে নিবিড় গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন। সেই সাথে ব্রি ২৮ ধান এর বিকল্প ব্রি ৮৮ ধান এর সম্প্রসারণ করা বলে পরিদর্শন দল মনে করেন।
* কোন জাত বেশি আক্রান্ত হয়েছে : গত দুই বছরের ন্যায় এবারও দেশের বিভিন্ন উপজেলায় ব্রি ২৮ ধান নেকব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়েছে বেশি বলে পত্র-পত্রিকার খবরে জানা গেছে। তবে অন্য জাতের ধানের শীষের মাথায় কিছু ধান মরা হয়েছে। ১৯৯৪ সালে ব্রি ২৮ বোরো মৌসুমের আগাম জাত হিসেবে চাষাবাদের জন্য সরকারিভাবে অনুমোদিত হয়। চার মাসের মধ্যে ব্রি ২৮ ধানটি পুরোপুরিভাবে পেকে যায় এবং ঘরে তোলা যায়। এ ধানটি অন্য ধানের চেয়ে চিকন ও সাদা। খেতেও ভালো। তাই কৃষকরা এ ধান নিজের খোরাকীর জন্য বেছে নেয় ও পছন্দ বেশি করে। এজন্য চাষও বেশি করে। অল্প দিনের মধ্যে ব্রি ২৮ এ কারণে সারাদেশের কৃষকের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তার পাল্লা দিয়ে আরেকটি জাত ব্রি ২৯ জাতও কৃষকের মন জয় করে নেয়। তবে এ জাতটি ব্রি ২৮ এর চেয়ে তিন চার সপ্তাহ পরে কাটার উপযোগী হয়। দেরিতে কাটতে হয় বিধায় এ জাতের ধানটি প্রাকৃতিক নানা দুর্যোগে বা বন্যায় নষ্ট করে নেয়। গত ২০১৭ সালে আগাম বন্যায় কৃষকের স্বপ্নের ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। বন্যার হাত থেকে ফসল রক্ষা করার জন্যই কৃষকরা ব্রি ২৮ ধান চাষ করে বেশি। কিন্তু এ জাতটি চিটা রোগ বেশি হওয়ায় কপাল পুড়েছে কৃষকের। ২০১৮ সালের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী বোরো মৌসুমে দেশের মোট আবাদি জমির ৪১ শতাংশ জমিতে ব্রি ২৮ চাষ হয়েছিল। এর আগের বছরগুলোতে ব্রি ২৮ ও ব্রি ২৯ এই দুই জাত মিলে ৬৫ থেকে ৬৭ শতাংশ জমিতে বোরো চাষ হতো। তবে ২০১৮ সালে সারাদেশে ব্রি ২৮ জাতের বোরো জমিতে ব্যাপক হারে ব্লাস্ট রোগের আক্রমণের কারণে চলতি বছর এর চাষ অনেক কম হয়েছে। আমি চলতি বোরো মৌসুমে হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলা ঘুরে দেখলাম ব্রি ২৮, ব্রি ২৯, ব্রি ৪৮, ব্রি ৫৮, ব্রি ৪৯ এর জাতের ধান বেশি ব্লাস্ট রোগে ক্ষতি হয়েছে। তবে সম্পূর্ণ মরে গেছে ব্রি ২৮ জাত। একই দৃশ্য মাঠ পর্যায় পেয়েছি বাহুবল, চুনারুঘাট ও নবীগঞ্জে। আর সংবাদ মাধ্যমে একই ক্ষতির কথা জানলাম মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও দেশের অন্যান্য জেলায়।
বাঁচার উপায় কী? কৃষি আর কৃষকের দেশ বাংলাদেশ। এ দেশের শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষই কৃষির উপর নির্ভরশীল। কৃষকরাই সোনার বাংলাদেশের সোনার মানুষ। কৃষকরাই দেশের মানুষের খাদ্য উৎপাদনের মূল কারিগর। তাদের গাঁয়ের ঘামের গন্ধে মেশানো আর হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রমের ফলানো ফসল সোনার বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে সবল ও সচল করে তুলছে। তাই কৃষির শক্তি কৃষকের শক্তি। যে শক্তি এ দেশের মানুষের মূলশক্তি। তাই কৃষিবান্ধব সরকারকে কৃষকদের ফসলাদি যাতে নানা প্রকার রোগ বালাই হতে সুষ্ঠু সুন্দরভাবে ফলাতে পারে তার জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশের কৃষি বিজ্ঞানী ও সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ মহলদের নিয়ে প্রয়োজনীয় ও বাস্তবমুখী ব্যবস্থা গ্রহণ করাই হবে সমউপযোগি কাজ। আর এতে কৃষক সমাজের জীবনের চলার পথ যেমন সুন্দর হবে তেমনি দেশ ও জাতির উন্নতির পথও বলিষ্ট হবে। যেহেতু গত কয়েক বছর যাবৎ কৃষকের ব্রি ২৮ জাতের ধান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সুতরাং এ জাতের বিকল্প ধান চাষ গ্রহণ করা এবং তা সারাদেশ জুড়ে কৃষকের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া। এ ব্যাপারে যতটুকু জানা যায়, ২০১৮ সালে দেশব্যাপি ব্রি ২৮ এ ব্লাস্ট রোগের আক্রমণে বোরো ধান চিটা হওয়ায় দেশব্যাপি হাহাকার উঠেছিল। তখন মাঠ পর্যায়ে রোগের প্রকৃতি, জীবাণু ধরণ ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণের জন্য বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি যৌথ তদন্ত দল গঠন করা হয়। কৃষি বিজ্ঞানী জনাব তোফাজ্জেল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত এই দল দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সাতটি জেলা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে তদন্ত গবেষণার কাজ শেষ করে। অভিজ্ঞ ও বিশেষ দলটি মত প্রকাশ করেন যে, ব্রি ২৮ জাতটি এক নাগাড়ে কয়েক বছর যাবৎ ব্যাপক হারে চাষাবাদের জন্য তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে। তাই বিকল্প জাতের ধান চাষ করা উচিত। (প্রথম আলো ১২/৫/২০১৮)। কৃষি বিজ্ঞানী জনাব তোফাজ্জেল ইসলামের কমিটির সুপারিশ গ্রহণ করা খুবই প্রয়োজন বলে সচেতন মহল মনে করেন। বর্তমানে সারাদেশে বোরো ধান কাটা ও ঘরে তোলার কাজ প্রায় শেষ। এখন চলছে কৃষকদের মাঝে হিসাব-নিকাশ। লাভ আর ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ের সময়। কৃষকরা দেখছেন ২৮ জাতের ধানে চাল নেই আছে শুধু তুষ। ক্ষতির পরিমাণ মারাত্মক। তাই জাতটি কৃষকদের নিকট থেকে বাদ দেওয়ার প্রচারণা চালানো উচিত। ইতিমধ্যে উদ্ভাবিত ও মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষিত নতুন জাত ব্রি ৫৮ এবং ব্রি ৬৩ কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত। তার সাথে নতুন জাতের সফল ধান ব্রি ৮১ ও ব্রি ৮৪ দ্রুত কৃষকের মাঝে পৌঁছে দেওয়া উচিত। পরিশেষে বলবো, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সংঘটিত কৃষক দল ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার আদর্শ কৃষকদের নিয়ে প্রত্যায়িত বীজ আগামী বোরো মৌসুমের আগেই কৃষকদের মাঝে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করুন। আর সরকারের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানাই দেশের উপজেলা পর্যায়ের কৃষি বিভাগের লোকজনের মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শন নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করুন।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভারতের জাতীয় উন্নয়ন ও ভারত মহাসাগর
  • জীবনে শৃঙ্খলাবোধের প্রয়োজনীয়তা
  • চলুক গাড়ি বিআরটিসি
  • জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবেলায় আমাদের করণীয়
  • নির্ধারিত রিক্সাভাড়া কার্যকর হোক
  • নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা
  • খাদ্যে ভেজাল রোধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে
  • মুর্তাজা তুমি জেগে রও!
  • সন্তানের জীবনে বাবার অবদান
  • এবার কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভংগ হোক
  • বন উন্নয়নে মনোযোগ বাড়ুক
  • একজন অধ্যক্ষের কিছু অবিস্মরণীয় প্রসঙ্গ
  • গ্রামাঞ্চলে বৃক্ষ রোপণ
  • শান্তির জন্য চাই মনুষ্যত্বের জাগরণ
  • উন্নয়ন ও জনপ্রত্যাশা পূরণের বাজেট চাই
  • মোদীর বিজয় : আমাদের ভাবনা
  • অধিক ফসলের স্বার্থে
  • টেকসই উন্নয়ন ও অভিবাসন সমস্যা ও সমাধানে করণীয়
  • সড়ক দুর্ঘটনা
  • চীনের বিশ্বশক্তির প্রত্যাশা ও ভারত মহাসাগর
  • Developed by: Sparkle IT