শিশু মেলা

সাবিহা

মির্জা মুহাম্মদ নূরুন্নবী নূর প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৫-২০১৯ ইং ০০:৩৫:৫৯ | সংবাদটি ৯৫ বার পঠিত

মায়ের কোলে থাকতেই বাবার আদর সোহাগ থেকে বঞ্চিত হয় সাবিহা। বাবা মারা যাবার সময় সাবিহা ছিল তিন মাস বয়সী ফুলপরী। প্রজাপতির ডানার মতো ওড়াউড়ি করে সাবিহার কচি দুটি হাত। ধীরে ধীরে ওর আধো আধো কথায় যেন খই ফোটে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে সাবিহার পরিবর্তন আসে শারীরিক গঠনে। ভাইদের আদরের সোহাগী সাবিহা এখন অনেক বড় হয়েছে। বয়সে নয় শুধু, চেহারাতেও পরিবর্তন এসেছে তার। পনের বছর বয়সী কিশোরী এখন অনেকেরই নজর কাড়ে! অনেকেই সাবিহাকে একনজর দেখতে উঁকি মারে। এখন দুনিয়ার স্বাভাবিক অনেক কিছুই বুঝতে পারে সাবিহা। বাবার আদর সোহাগ না পেলেও ভাইদের পরম স্নেহ মমতায় বেড়ে ওঠে সে। গ্রাম্য মেয়ে সাবিহাকে সবাই পছন্দ করেন। ওর মায়াবী ব্যবহার সবাইকে কাছে টানে। আপনার করে পাশে বসতে সহযোগিতা করে।
নবম শ্রেণির ছাত্রী সাবিহা এখন বেশ চঞ্চল হয়ে উঠেছে। নিয়মিত স্কুলে যাওয়া ওর রুটিন ওয়ার্ক। পড়াশোনায় অনেক ভালো সে। ক্লাসের পড়া ঠিক না করে স্কুলে যায় না কোনদিন। গ্রামের মেঠোপথে হেঁটে চলছে সাবিহা। গন্তব্যস্থল ওর প্রিয় স্কুল আঙিনা। একটু এগিয়ে যেতেই পথে দেখা পায় জমিলার। গ্রামের অসহায় এক অশিক্ষিত বালিকা সে। অনাদরে অনাহারে কাটে ওদের পারিবারিক জীবন। উপার্জনক্ষম বাবা থাকলেও অভাবের সংসারে নেই একটু শান্তির ছোঁয়া। একটু সুখের আশায় ওরা ঘুরে বেড়ায় অনেক জায়গায়। অনেক কর্ম এখন ওদের নিয়মিত পেশায় পরিণত হয়েছে। বড়জোর দশ বছর বয়সী জমিলা অন্যের বাড়ি কাজ করে প্রতিদিন। তাও আবার ঝিয়ের কাজ। সাবিহা দাঁড়াতে বলে জমিলাকে। জমিলা সাবিহার পাশে দাঁড়ায়। তোমার নাম কী?
জমিলা।
কী কর তুমি?
মাইসের বাইত্তে কাম করি।
তোমার বাবা নাই?
আছে তো।
তাহলে তুমি অন্যের বাড়ি কাজ কর কেন?
আংগেরে যে অভাবের সংসার।
তোমার বাবা কী করেন?
মাইনসের বাইত্তে কামলা দ্যান।
তোমার মা?
মায়ে মাইনসের বাইত্তে ঝিয়ের কাম করে।
তোমার ভাই নাই?
আছে।
কী করে ও।
মাইনসের গরু-বরকি রাহে।
ওর বয়স কত?
আট বছর অইবো।
তুমি পড়তে যাবে?
না।
কেন?
আংগেরে আবার পড়ার ভাইগ্য আছে!
যদি পড়ার সুযোগ করে দেয়া হয়।
অইবোনা বুইন।
কেন?
আংগেরে আব্বা পড়বার দিব না যে!
ঠিক আছে। তোমার সাথে অন্য দিন কথা হবে।
আইচ্ছা।
আর কথা বাড়ায় না সাবিহা। স্কুলে চলে যায় সে। ক্লাসের পড়ায় মন দেয় সাবিহা। আজকে ওদের স্কুলের প্রথম দিন। বৈশাখি মেলার ছুটির পর আজকেই স্কুল খুলেছে।

দুই.
পাখিদের কূজনে ঘুম ভাঙে সাবিহার। প্রাতকার্য সেরে নেয় সে। প্রতিদিনের ন্যায় আজকেও হাঁটতে বেরোয় সাবিহা। সকালবেলা মর্নিংওয়ার্ক ওর নিয়মিত কাজ। স্বাভাবিক সুস্থ থাকতে হলে হাঁটাহাঁটি করা দরকার। তাই এ কাজে ব্যত্যয় হয় না ওর। একটু হাঁটতেই আবারো দেখা হয় জমিলার সাথে। ওকে কাছে ডেকে নেয় সাবিহা। আদরের পরশ বুলিয়ে জানতে চায়-
কেমন আছ জমিলা?
ভালোই আছি।
এখান থেকে তোমাদের বাড়ি কতদূর?
ঐইতো এইহানে।
কোথায় যাচ্ছ?
যাগত্তে কাম করি।
এতো সকালে যেতে হয়?
হ।
কেন?
ঐ বাড়ির দুয়ার হুড়তে অয়। গরুর গোয়াল ছাপ করতে অয়। থালি বাসুন মাজতে অয়। এছাড়াও আরো মেলা কাম আছে যে!
কষ্ট হয় না তোমার?
কষ্ট অয়তো।
তবুও এসব কর যে?
এইন্ন্যা না কইরলে খাইমু কি?
খাবার জোগাড় করার দায়িত্ব তো তোমার না।
ঠিক কইছেন। কিন্তু বাবায় যে একা পারে না।
বুঝলাম।
তয় আমাহে ছাইড়া দ্যান। আমি যাই।
দেব। তবে আর দুটি কথা শোন।
কন।
তুমি পড়তে চাইলে আমি পড়ার ব্যবস্থা করে দেই। পড়ালেখা করলে জীবনে অনেক সুখী হবে তুমি। সুন্দর একটা জীবন গড়ে উঠবে তোমার।
আমি তা কইবার পামু না।
কে পারবে?
আব্বাহে কইয়েন।
ঠিক আছে। তোমার আব্বার নাম কী?
জাহিদ। পুরো নাম বল?
জাহিদুল ইসলাম।
আচ্ছা। তুমি যাও তাহলে।
এবার জমিলা চলে যায় ওর কাজের উদ্যেশ্যে। বাসায় পৌঁছতে দেরি হয় জমিলার। এতে রেগে যায় বাড়ির মালিকের স্ত্রী জয়নব বিবি। খুব রাগারাগি শুরু করে দেয় জমিলার সাথে। বকাবকিও দেয় আচ্ছা করে। কিছুটা খারাপ ব্যবহারও করেন তিনি। কিন্তু কী আর করা। নীরবে সহ্য করে কাজে মন দেয় জমিলা। এতোদিন তেমন কিছু ভাবেনি জমিলা। কিন্তু আজকে বাড়ির মালিকের বউয়ের খারাপ ব্যবহারে অনেক কষ্ট পায় সে। ছোট্ট মানুসি মনে অনেক দুঃখ পায় ও। করার কিচ্ছু নেই। কপাল বলে কথা! কাজ যে করতেই হবে। বকাও শুনতে হবে, নতুবা আয় রোজগার হবে কেমনে! মনের মাঝে এক সাগর কষ্ট নিয়েই কাজ করে যায় জমিলা। দেরি করে আসার জন্য খাবারও দেয় দেরিতে। পাতিলের পোড়া ছেছড়া খাবার খেতে দেয় ওকে। অন্যান্য দিনের মতো আজকে তেমন একটা আদর পায়নি জমিলা। এসব আচরণে জমিলার মন খারাপ হয় সাবিহার প্রতি। জমিলা ভাবে সাবিহা যদি পথে না আটকাতো তাহলে ঠিক সময়ে ও বাড়ি পৌঁছত। কাজগুলো আগের মতোই যথাসময়ে করতে পারত। এজন্য ওকে বকা খেতে হত না। ওর মনে রাগ ধরে সাবিহার প্রতি। সাবিহার প্রতি আরো বেশি করে মন খারাপ হয় জমিলার। দিন শেষে কাজ সেরে বাড়ি ফিরে আসে জমিলা।

তিন.
সাবিহা জমিলার সাথে কথা বলেই ওদের বাড়িতে যায়। বাড়ি গিয়ে জমিলার বাবার সাথে দেখা করে সাবিহা। ততক্ষণে জমিলার বাবা কাজের জন্য বাইরে যায়নি। জাহিদ সাবিহাকে পিড়ায় বসতে দেয়। তিনি গরীব মানুষ। তাই চেয়ার টেবিলের ব্যবস্থা নেই তার বাড়িতে। কাঠের পিড়ায় বসে জাহিদের সাথে কথা বলে সাবিহা। সাবিহা জাহিদকে উদ্যেশ্য করে জানতে চায়-
কেমন আছেন চাচা?
ভালো আছি। তুমি কেডা মা?
আমি সাবিহা।
তোমার বাড়ি কোনে?
দিঘলকান্দির উত্তর পাড়ায়।
তোমার বাপ কেডা?
আবুল বাশার।
তোমার বাবা মারা গেছেন না?
জ্বী।
কী কর মা?
পড়াশোনা করি।
তো এতো সকালবেলা আমার বাইত্তে যে!
বেড়াতে এলাম। আসতে দেবেন না বুঝি!
ক্যানো আসপার দিমুনা মা!
তোমার বাপেতো খুব ভালো মানুষ আছিলো। আমাহেও খুব ভালোবাসতো। আগে তোমাদের বাইত্তে অনেক কামলা দিছি আমি। তোমার মায়েও খুব ভালো আছিলো। আমাদের কষ্টে অনেক সাহায্য সহযোগিতা করতেন তিনি। তোমার মায়ে বাঁইচা আছেন কি?
জ্বী। আম্মু জীবিত আছেন।
তোমার চাচির হাতে কথা কও মা। আমি কামলা দিবার যামু। সময় অইছে তো তাই। তয় খাইয়া দাইয়া যাইও কিন্তু!
না চাচা। আমি বেশি দেরি করতে পারব না। আমি এসেছিলাম একটা বিষয় নিয়ে। আপনার সাথে কথা বলার জন্য।
তয় কও মা। কী তোমার কথা?
জমিলা নামের আপনার কোন মেয়ে আছে কি?
হ মা। আছে তো!
কী করে ও?
কী কইমু আর দুক্কের কথা! আমরা গরীব মানুষ। আয় রোজগার নেই। জমি জমাও নেই তেমন একটা। তাই জমিলা অন্যের বাইত্তে একটু আধটু ঝিয়ের কাম করে। তুমি ওকে চেন মা?
জ্বী। চিনি।
ক্যামন কইরা চেন মা?
জমিলার সাথে সাবিহার যেসব কথা হয়েছে তার সবকিছুই খুলে বলে জাহিদকে। জাহিদ সে সব কথা মনোযোগের সাথে শোনেন। একান্ত দিলের কানে। জাহিদ এসব শুনে ভাবতে থাকেন। আপনার করে বুঝতে চেষ্টা করেন। ভাবনার গহীন অরণ্যে হারিয়ে যান তিনি। জাহিদ ভাবেন সাবিহা কেন এমন করে বলছে। ওর মনে কোন খারাপ চিন্তা নেই তো! এখন বড়লোকেরা শিশুদের পাচার করে বাইরের দেশে বিক্রি করে অনেক টাকা কামাই করেন। সাবিহা এমন কিছু করবে না তো আবার! মানুষ গরীব হলেও জাহিদ তার ছেলেমেয়েদেরকে যারপর নেই ভালোবাসেন। জীবনে তেমন একটা সুখ দিতে না পারলেও ছেলেমেয়েদের সাথে সর্বোচ্চ ভালো আচরণ করেন জাহিদ। আদরের চাদরে জড়িয়ে পাশে রাখতে চেষ্টা করেন তিনি। সরাসরি কোন জবাব দেন না জাহিদ। কৌশলী জবাব দিয়ে বলেন, আরেকদিন এসো মা। আমি তোমার সাথে বিস্তারিত কথা বলে জানাব। আজকে আর হাতে সময় নেই। কাজ করতে যাব যে।
ঠিক আছে চাচা। আপনি যান। আমি আসছি তাহলে। সময় করে আরেকদিন এসে কথা বলব খন। সাবিহাকে নাস্তা খাওয়ার জন্য বেশ জোড়াজোড়ি করলেন জাহিদুল ইসলাম। কিন্তু দেরি করল না সাবিহা। আবারও আসবে বলে সময় চেয়ে নিয়ে বাড়ির উদ্যেশ্যে রওনা করল সাবিহা। সাথে জাহিদও কামলা দেয়ার জন্য বেরিয়ে এলেন।

চার.
তিনদিন পরে সাবিহা আবারো জমিলাদের বাড়ি এলো। জমিলার আব্বাকে সব বুঝালে এবার কিছুটা বুঝতে পারলেন জাহিদ। দ্বিমত পোষণ করলেন না সাবিহার সাথে। জমিলাকে সাবিহার সাথে পাঠাতে সম্মত হলেন তিনি। সাবিহা জমিলাকে সাথে করে বাড়ি ফিরে এলেন। জমিলা এখন সাবিহাদের বাড়ি থেকে পড়াশোনা করছে। পড়াশোনায় বেশ ভালো জমিলা। ভালো ফলাফল করে এইচএসসি পাশ করল সে। পরে অনার্স পাশ করে মেধাবী জমিলা এখন মাস্টার্সের ছাত্রী। পড়াশোনা শেষ করেছেন জমিলা খাতুন। জমিলা চাকরি নিয়ে জর্জকোর্টের বিচারক এখন। ছোট ভাই কবির পুলিশ অফিসার। সময়ের পালাবদলে কবির পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সিনিয়র কর্মকর্তা হন। ওদের দিন চলছে এখন রাজার হালে। সুখী পরিবারের সদস্য এখন জমিলারা। জমিলার বাবা এখন পুলিশ অফিসারের জনক। এক সময়ের কামলা বিক্রেতা জাহিদ এখন বিচারক মেয়ের গর্বিত পিতা। ভাগ্য বলে কথা!

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT