উপ সম্পাদকীয়

আমাদের জীববৈচিত্র্য, খাদ্য ও স্বাস্থ্য

বিধান চন্দ্র দাস প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৫-২০১৯ ইং ০১:৫০:০২ | সংবাদটি ১৫২ বার পঠিত

পৃথিবীতে জীববৈচিত্র্য কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের খাদ্যের মূল উৎসের বৈচিত্র্যও কমে আসছে। ইউরোপ-আমেরিকাসহ উন্নত দেশের সবচেয়ে চালু রেস্তোরাঁগুলোর (ম্যাকডোনালডস্, বার্গার কিং, কেএফসি, সাবওয়ে, পিৎজা ইত্যাদি) খাবারের তালিকা দেখলেই তা বোঝা যায়। হাতে গোনা কয়েকটি উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি হচ্ছে এসব রেস্তোরাঁর খাবারের মূল উৎস। এসব দেশের সুপারস্টোরগুলোতেও খাদ্যদ্রব্য হিসেবে বিক্রি হওয়া উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতির বৈচিত্র্যও কম। এতেই বোঝা যায় যে সেখানকার মানুষজনের খাদ্যতালিকায় উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতির খুব কমসংখ্যক সদস্যই অন্তর্ভুক্ত থাকছে। সত্যি কথা বলতে কী, এখন গোটা পৃথিবীতেই মানুষের খাদ্যতালিকায় খুব কমসংখ্যক উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে এটি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। আর সে কারণেই এবারের বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবসের প্রতিপাদ্য করা হয়েছে, ‘আমাদের জীববৈচিত্র্য, আমাদের খাদ্য, আমাদের স্বাস্থ্য’ (আওয়ার বায়োডাইভার্সিটি, আওয়ার ফুড, আওয়ার হেলথ)।
প্রথিবীব্যাপী জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও তাদের টেকসই ব্যবহার সম্পর্কিত জাতিসংঘ গঠিত সিবিডির (কনভেনশন অন বায়োলজিক্যাল বায়োডাইভার্সিটি) সচিবালয় থেকে বলা হয়েছে যে আমাদের খাদ্য ও স্বাস্থ্যের ভিত্তি হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। মানুষের স্বাস্থ্যের উন্নতি ও খাদ্যপদ্ধতির রূপান্তরে জীববৈচিত্র্য মূল অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে। আমাদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের জন্য এবং স্বাস্থ্যসম্মত বাস্তুতন্ত্রের জন্য জীববৈচিত্র্য যে অপরিহার্য সে সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে এবার এই প্রতিপাদ্য গ্রহণ করা হয়েছে বলে সিবিডির বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। জীববৈচিত্র্য মানুষের অস্তিত্বের জন্য প্রয়োজন, পৃথিবীর জন্য কল্যাণকর। বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়নের জন্য জাতিসংঘ নির্ধারিত অভীষ্টগুলোর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অবস্থার প্রশমন ও অভিযোজন, বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার, পরিষ্কার পানি ও সর্বোপরি ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়ার জন্য জীববৈচিত্র্যের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে, আমাদের বেঁচে থাকার সেই জিয়নকাঠি জীববৈচিত্র্য আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। ক্রমাগতভাবে ছোট হয়ে আসছে আমাদের একসময়ের দীর্ঘ খাদ্যতালিকা। ফলে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ হচ্ছে রুগ্ন।
গত শতকের গোড়ার দিকেও মানুষের খাওয়ার জন্য নানা ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণী সহজলভ্য ছিল। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেসব উদ্ভিদ ও প্রাণী চাষবাস ছাড়াই আমাদের চারপাশে পাওয়া যেত। কিন্তু এখন তা আর সেভাবে পাওয়া যায় না। উদ্ভিদ ও প্রাণীর বাসস্থান ধ্বংস, অতি আহরণ, পরক প্রজাতির (ইনভেসিভ স্পেসিস) অনুপ্রবেশ, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বন্য প্রাণের অবৈধ ব্যবসাসহ নানা কারণে অনেক প্রজাতি স্থানীয় কিংবা বৈশ্বিক স্তরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ফলে আমাদের খাদ্যতালিকায় উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতির সংখ্যা হয়েছে সীমিত। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ব্যাপারে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ার জন্যই অনেক জীব আমাদের চারপাশ থেকে হারিয়ে গেছে।
জাতিসংঘ থেকে জানানো হয়েছে যে বিগত ১০০ বছরে নব্বই শতাংশের বেশি শস্যের জাত কৃষকের মাঠ থেকে হারিয়ে গেছে। গৃহপালিত অনেক প্রাণীর প্রায় অর্ধেক জাত আজ বিলুপ্ত। পৃথিবীর ১৭টি প্রধান মৎস্যক্ষেত্র থেকে মৎস্য আহরণ টেকসই সীমার কাছাকাছি কিংবা টেকসই সীমার ওপরে পৌঁছে গেছে। খাদ্য উৎপাদনের স্থানীয় পদ্ধতি ও এই বিষয়ে চিরায়ত কিংবা সহজাত জ্ঞান আজ হুমকির সম্মুখীন। শস্যবৈচিত্র্য অদৃশ্য হচ্ছে। চিরায়ত ওষুধ ও স্থানীয় খাবার সম্পর্কিত জ্ঞান হারিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘ বলছে যে খাদ্যতালিকায় জীববৈচিত্র্য হ্রাসের সঙ্গে রোগব্যাধির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। ডায়াবেটিস, স্থূলতা, অপুষ্টিসহ নানা ধরনের রোগব্যাধি খাদ্যে উদ্ভিদ ও প্রাণিবৈচিত্র্য কম হওয়ার জন্যই হচ্ছে। আর সে জন্য সিবিডি অন্যদের (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, ইউনিসেফ, ইউনেসকো, ইএটি ফাউন্ডেশন ও ফুড অ্যান্ড ল্যান্ড ইউজ কোয়ালিশন) সঙ্গে নিয়ে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য নানা ধরনের কাজ করছে।
বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা থেকে ১৫২টি দেশের ৪৮ বছরের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রধান ফসলের মধ্যে শুধু গম, ধান ও ভুট্টা পৃথিবীতে এখন সবচেয়ে বেশি উৎপন্ন হচ্ছে। অন্যান্য প্রধান ফসল যেমন-জোয়ার, যব, সরঘাম, ইয়াম, ক্যাসাভা ও মিষ্টি আলু উৎপাদনের পরিমাণ ক্রমাগতভাবে কমে আসছে। পাশ্চাত্য ধরনের খাবার যেমন-অত্যধিক মাংস, অত্যধিক দুগ্ধজাত খাবার, শীতপ্রধান এলাকার শাকসবজি ও ফল, চিনি মিশ্রিত পানীয় (কোকা-কোলা, পেপসি) ইত্যাদি ছড়িয়ে পড়ছে গোটা পৃথিবীতে। অঞ্চলভিত্তিক চিরায়ত খাবারগুলো ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
এ বছরের জানুয়ারিতে বিভিন্ন বিষয়ের ৩৭ জন বিজ্ঞানী (হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথসহ) পৃথিবীর প্রথম তিনটি প্রভাবশালী বিজ্ঞান সাময়িকীর একটিতে (দ্য ল্যানসেট) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে একই ধরনের শস্যের পরিবর্তে বহু ধরনের শস্য থেকে প্রয়োজন মেটানোর জন্য বলা হয়েছে। ফসফরাস পুনরাবর্তন, নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের বৈশ্বিক স্তরে পুনর্বণ্টন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনকে অন্তর্ভুক্ত করে এক নতুন ধরনের কৃষি বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে কৃষিক্ষেত্রে জীববৈচিত্র্যের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে ও বৈশ্বিক ক্ষতিকর গ্যাসের নির্গমনও কমে আসবে বলে আশা করা হয়েছে।
আমাদের দেশের খাদ্যতালিকা এককালে উদ্ভিদ ও প্রাণিবৈচিত্র্যে ভরপুর ছিল। পুরনো গ্রন্থগুলোতে এর প্রমাণ মেলে। ‘চৈতন্যভাগবত’, ‘চ-ীমঙ্গল’, ‘অন্নদামঙ্গল’ ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থে আমিষ ও নিরামিষ খাবারের মধ্যে বহু ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণী খাওয়ার কথা পাওয়া যায়। শাস্ত্রে চৌদ্দ ধরনের শাক : ওল, কেঁউ, বেথো, কালকাসুন্দা, সরষে, নিম, জয়ন্তী, শালিঞ্চা, হিংচে, পলতা, শুলকা, গুলঞ্চ, ঘেঁটু ও শুষনি একসঙ্গে বছরে এক দিন রান্না করে খাওয়ার কথা বলা হয়েছে। উল্লিখিত এই শাকগুলোর কোনো কোনোটিসহ আমাদের দেশে এখনো বিভিন্ন এলাকায় অন্য অনেক রকম শাক কমবেশি পাওয়া যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-নলিতা, শান্তি, গিমা, পুনকো, নটে, থানকুনি, আমরুল, ইছা, দুধলি, পিপুল, দুরমা, চরগাদা, শিয়ালমুতি, কানাই, কস্তুরি, নুনিয়া, নিলিচি, মুনসি, গন্ধভাদালি, হুটকা, খারকোন, বনঝুড়ি ইত্যাদি। বর্তমানে এসব শাক খাওয়ার প্রচলন প্রায় উঠে গেছে। অথচ স্বাস্থ্যের জন্য এগুলো খাওয়া যে কত প্রয়োজনীয়, বর্তমানে তা বিজ্ঞান পরীক্ষাগারে প্রমাণিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি ও ঔষধি গুণ বিচারে এগুলোর মূল্য অপরিসীম। এগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
বলা হয়ে থাকে যে মাছে-ভাতে বাঙালি। একসময় আমাদের দেশে ছোট-বড় নানা ধরনের মাছ বাড়ির পাশেই পুকুর, খাল, বিল, নদী, হাওর-বাঁওড় ইত্যাদিতে ছিপ কিংবা জাল ফেললেই পাওয়া যেত। বাঙালির খাবারে সেই সময় নানা ধরনের মাছ যুক্ত থাকত। সেই সব মাছের অনেক প্রজাতি এরই মধ্যে হারিয়ে গেছে। অনেক প্রজাতি আবার হারিয়ে যাওয়ার পথে। বালিতোরা, নান্দিনা, তিলা খোকসা, নিপাতি, দারকিনা, মাইটাভাঙ্গা, খুইটা পুঁটি, ভোল, কাজুলি, গাঙ টেংরা, পিপলা শোল ইত্যাদি মাছ এখন আর পাওয়া যায় না বললেই চলে। বাংলাদেশে বর্তমানে আড়াই শ মিঠা পানির মাছের মধ্যে শতাধিক প্রজাতির মাছ সংকটাপন্ন। খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির জন্য আমাদের মাছের প্রজাতিগুলোও সংরক্ষণ করা জরুরি।
আমাদের দেশে খাদ্যসংশ্লিষ্ট জীববৈচিত্র্যের তালিকা বৃদ্ধি ও সেসব সংরক্ষণের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেটি করা প্রয়োজন তা হচ্ছে, দেশের সব জীব প্রজাতি সঠিকভাবে নথিভুক্ত করা। তাদের চেনা ও জানা। দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমরা আমাদের দেশের মেরুদ-ী প্রাণী ও বড় বড় কিছু গাছপালা ছাড়া অন্যান্য প্রাণী (অমেরুদ-ী) তথা জীব প্রজাতি সঠিকভাবে নথিভুক্ত করতে পারিনি। ফলে দেশের ৮০ শতাংশেরও বেশি জীব প্রজাতি আমাদের অজানা রয়ে গেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের খাদ্য উেসর সঙ্গে জড়িত জীববৈচিত্র্যের তালিকা বৃদ্ধি ও তাদের সংরক্ষণ সম্পর্কিত গবেষণা করা এখন সময়ের দাবি। শস্য বহুমুখীকরণ প্রক্রিয়ায় অনেক বেশি প্রজাতি বা জাতকে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। সেই সঙ্গে আমাদের খাদ্যাভ্যাসে পাশ্চাত্য ও চিরায়ত পদ্ধতির ভারসাম্য তৈরি করা প্রয়োজন।
লেখক : অধ্যাপক

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মিতব্যয়িতা
  • হংকং : কেন গণআন্দোলন
  • যানজট মুক্ত মহানগরী : কিছু প্রস্তাব
  • পানি নিয়ে ভাবনা
  • ভেজাল-দূষণ দূর করা কি খুবই কঠিন?
  • সৈয়দ মহসীন আলী : ক্ষণজন্মা রাজনীতিক
  • শিশুদের বিজ্ঞান মনস্ক করে গড়ে তোলার গুরুত্ব
  • রোহিঙ্গাঁ সমস্যা : প্রয়োজন আশু সমাধান
  • মজলিশী মুজতবা আলী
  • জলবায়ু ও পৃথিবীর বিপর্যয়
  • আমরা বই পড়া কি ভুলেই গেলাম
  • সফল হওয়ার সহজ উপায়
  • ঝুঁকিপূর্ণ রেল যোগাযোগ : প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা
  • আজকের দিন আজকের দিকে তাকাও
  • বিয়ে ব্যবস্থায় পরিবর্তন
  • কারবালার ঘটনা ও কয়েকজন সাহাবীর স্বপ্ন
  • আশুরায় সিলেটে হাদা মিয়া-মাদা মিয়ার বিদ্রোহ
  • গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শিক্ষা শহীদে কারবালা
  • যাকে দেখতে নারী তার চলন বাঁকা
  • ‘শতভাগ সাক্ষরতা’ কতদূর
  • Developed by: Sparkle IT