উপ সম্পাদকীয়

মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ফারুক আহমদ চেয়ারম্যান

মো. রফিকুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৫-২০১৯ ইং ০১:৫১:১১ | সংবাদটি ১৩৮ বার পঠিত

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের ভোলাগঞ্জ গ্রামের ফারুক আহমদ ছিলেন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। ভোলাগঞ্জ সাব সেক্টরের প্রথম কাজকর্ম উনার বাড়িতেই শুরু হয়েছিল। এখানে তৎকালীন সময়ে ২৮টি গ্রাম ছিল। ২৮টি গ্রাম থেকে ২৮ জন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন। যারা মহান মুক্তিযুদ্ধে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তারা প্রতি গ্রাম থেকে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য শ্রমিক, যুবক সহ নানা শ্রেণী-পেশার মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন মরহুম ফারুক আহমদ। ১৯৪৬ সালের কোনো এক শুভক্ষণে তিনি জন্মগ্রহণ করেন উক্ত গ্রামে। তাঁর পিতা ইদ্রিছ আলী এলাকার একজন ব্যবসায়ী ও সচেতন মানুষ ছিলেন। ২০০০ সালে ২৪শে মে ফারুক আহমদ ইহলোক ত্যাগ করেন। ২৪ মে ২০১৯ ইং তাঁর বিশতম মৃত্যুবার্ষিকী।
ফারুক আহমদ অবিভক্ত ইসলামপুর ইউনিয়নের দুইবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৮৪-১৯৯২ ইং ধারাবাহিকভাবে। নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত চৌকস। নিজ জ্ঞান বুদ্ধি মোতাবেক ইউনিয়ন পরিষদের কার্য চালাতেন। ফলে অবিভক্ত ইসলামপুর ইউনিয়নের উন্নয়ন সমহারে করতেন। স্থানীয় ধলাই নদী দ্বারা ইসলামপুর ইউনিয়ন দুভাগে বিভক্ত। এতে পূর্ব ও পশ্চিম পারের মানুষ স্থানীয় চেয়ারম্যানের প্রতি খুবই শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তিনি যেসব এলাকায় উন্নয়নের কাজ করতেন, সেই এলাকার লোকজনের সাথে বসতেন। কিভাবে কাজ করলে উন্নয়ন টেকসই ও জনগণ উপকৃত হয় সেই মোতাবেক উন্নয়নের কাজ চালাতেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কাছে উন্নয়নের বিশেষ বরাদ্দ আনার জন্য সব ধরনের চেষ্টা চালাতেন। অত্যন্ত অমায়িক ও সহজ সরল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তাঁর কাছে যেকোন সময় লোকজন যেতে পারত। এতে তিনি বিরক্ত না হয়ে, দুঃখী মানুষের কথা মন দিয়ে শুনতেন এবং যথাসাধ্য সমস্যার সমাধান দিতেন। ফলে ইউনিয়নবাসী-তাঁর কর্মে অনুপ্রাণিত হয়ে বারবার নির্বাচিত করতেন। জনকল্যাণ, জনসেবা একটা ইবাদত মনে করতেন বিধায় তিনি উপজেলার জনগণের কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ও বরণীয় মানুষ ছিলেন। প্রচার বিমুখ মানুষটির কর্মময় জীবন ছিল অত্যন্ত বর্ণাঢ্যের। তৎকালীন সময়ে তার পরিবার ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছল। পিতৃহারা ভাইবোনদের নিয়ে এবং তাদের লেখাপড়া করাতে গিয়ে বিভিন্ন প্রতিকূলতা অতিক্রম করে নিজের অবস্থান তৈরী করতে সক্ষম হন। তিনি তৎকালীন ছাতক থানার বাগবাড়ী এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি সেখানে বসবাস করতেন। ছাতক এলাকায়ও তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন সেখানে থাকায় সেখানকার সামাজিক, রাজনৈতিক কৃষ্টি কালচারের প্রতি অতি পরিচিত হয়ে উঠেন।
১৯৮৪ সালে যখন অবিভক্ত ইসলামপুর ইউপির নির্বাচন আসে, তখন অত্র ইউনিয়নের প্রায় সকল গ্রামের মুরব্বী নওজোয়ান মিলে চেয়ারম্যান হিসেবে উনার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। সবাই মিলে ছাতকে গিয়ে ফারুক আহমদকে বুঝিয়ে শুনিয়ে নির্বাচন করতে রাজি করান। ফলে ইউপি ইলেকশনে বিরাট ভোটের ব্যবধানে বিজয় অর্জন করেন। দীর্ঘ মেয়াদে তাঁর কাজ-কর্মে এলাকাবাসী দারুণ খুশী। ফলে ১৯৮৮ সালে আবার তাঁকে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেন। ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তিনি তাঁর দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন। দীর্ঘ আট বৎসরে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন এলাকায় স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে। রাস্তাঘাট উন্নয়নে যোগাযোগের বিশেষ অবদান রাখেন। কর্মবীর মানুষটির ৫৬ বৎসরের বর্ণাঢ্য জীবনের অবসান ঘটিয়ে পরপারে চলে যান।
ফারুক আহমদ শিক্ষার উন্নতিকল্পে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে পাড়–য়া আনোয়ারা হাইস্কুল এবং পরবর্তীতে স্কুল এন্ড কলেজ প্রতিষ্ঠায় নোয়াগাঁও দাখিল মাদ্রাসা ও ভোলাগঞ্জ হাফিজিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় বিশেষ অবদান রাখেন। তাঁর নিজগ্রামে ভোলাগঞ্জ ‘জামে মসজিদ’ নির্মাণে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত নিরলস পরিশ্রম করেছেন। তাঁর সৃষ্টিগুলো কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মানুষদের কাছে চিরদিন বাঁচিয়ে রাখবে। তাছাড়া ভাটরাই হাইস্কুল, টুকেরবাজার হাইস্কুল এমনকি থানা সদর হাইস্কুল প্রতিষ্ঠায় উনার অবদান খাটো করে দেখা যাবে না। তিনি তার অবস্থান থেকে সাধ্যানুযায়ী সাহায্যের হাত প্রসারিত রেখেছিলেন।
ফারুক আহমদের উত্তরসুরীরা তাঁর স্মৃতিকে অমর ও অমলিন রাখতে উনার নামে ‘মরহুম ফারুক আহমদ স্মৃতি পরিষদ’ গঠন করেছেন। ২০০০ সালের ১৬ই নভেম্বর পরিষদটি গঠন করে এবং বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠান করে ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে তা ছড়িয়ে দেন। এর ধারাবাহিকতায় ৩০শে মার্চ ২০১৯ ইং ১৯তম বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। উক্ত অনুষ্ঠানে মান্যবর ব্যক্তিবর্গের সাথে আমি নিজেও উপস্থিত ছিলাম। তাদের বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত চমকপ্রদ-ফলপ্রসূ মনে হয়েছে। মরহুম ফারুক আহমদের প্রতি আমাদেরও শ্রদ্ধা বহুগুণ বেড়ে যায়।
কালের বিবর্তনে আমি-আপনি-আমরা কেউই থাকব না। কিন্তু আমাদের না থাকাটা আমাদের কর্মের মধ্যে যাতে থাকে সবাইকে সেই মন দিয়ে কাজ করতে হবে। নিজের কর্ম এবং সৃষ্টি এগুলোই আগামী প্রজন্মের কাছে বাঁচিয়ে রাখবে। মরহুম ফারুক আহমদের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। আল্লাহতায়ালা ওনাকে যেন জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে আসীন করেন।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মিতব্যয়িতা
  • হংকং : কেন গণআন্দোলন
  • যানজট মুক্ত মহানগরী : কিছু প্রস্তাব
  • পানি নিয়ে ভাবনা
  • ভেজাল-দূষণ দূর করা কি খুবই কঠিন?
  • সৈয়দ মহসীন আলী : ক্ষণজন্মা রাজনীতিক
  • শিশুদের বিজ্ঞান মনস্ক করে গড়ে তোলার গুরুত্ব
  • রোহিঙ্গাঁ সমস্যা : প্রয়োজন আশু সমাধান
  • মজলিশী মুজতবা আলী
  • জলবায়ু ও পৃথিবীর বিপর্যয়
  • আমরা বই পড়া কি ভুলেই গেলাম
  • সফল হওয়ার সহজ উপায়
  • ঝুঁকিপূর্ণ রেল যোগাযোগ : প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা
  • আজকের দিন আজকের দিকে তাকাও
  • বিয়ে ব্যবস্থায় পরিবর্তন
  • কারবালার ঘটনা ও কয়েকজন সাহাবীর স্বপ্ন
  • আশুরায় সিলেটে হাদা মিয়া-মাদা মিয়ার বিদ্রোহ
  • গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শিক্ষা শহীদে কারবালা
  • যাকে দেখতে নারী তার চলন বাঁকা
  • ‘শতভাগ সাক্ষরতা’ কতদূর
  • Developed by: Sparkle IT