উপ সম্পাদকীয়

পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষ রোপণ

মো. লোকমান হেকিম প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৫-২০১৯ ইং ০১:৫৫:৫৯ | সংবাদটি ১৫৮ বার পঠিত

আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে বৃক্ষের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং পরিবেশকে দূষণমুক্ত করায় বৃক্ষ অতিব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও পরিবেশ অসচেতন লোভাতুর কিছু মানুষের দ্বারা অপরিকল্পিতভাবে বৃক্ষ নিধনের ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ব্যাহত হচ্ছে। ঊনিশ শতকে শিল্প বিপ¬বের ফলে মানবজাতি অগ্রযাত্রার পাশাপাশি ভূপৃষ্ঠের প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে বিঘিœত করায় পরিবেশের বিপর্যয় ঘটতে শুরু করে। বিশ্বে গড়ে প্রতি মিনিটে ৩৫ হাজার টন পেট্টোলিয়াম পোড়ানো হচ্ছে। বাতাসে মিশে যাচেছ ১২ হাজার টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড এবং ৫০ হাজার টন অন্যান্য দূষিত গ্যাস।
এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় বলা হয়, ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের আশংকা রয়েছে। জলবায়ূ আমূল পরিবর্তনের কারণে বন্যা ও খরার প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে। উত্তাপ বাড়ার কারণে হিমবাহের গলন বেড়ে যাবে। সমুদ্রের পানি আয়তন বৃদ্ধি এবং পানি জমে সমুদ্রের তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে। ইতোমধ্যে বঙ্গোপসাগরের পানি উচ্চতা প্রতি বছর ৩ মি.মি. করে বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি লক্ষ করা গেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার বেড়ে গেলে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মোট আয়তনের ১৫.৮ শতাংশ স্থলভাগ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া বিচিত্র্য নয়। বর্তমানে মেরু অঞ্চলের বরফ যেভাবে গলছে তাতে আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১৭ ভাগ ভূমি সাগরের পানিতে তলিয়ে যাওয়া সম্ভব। ইতোমধ্যে সমুদ্রের অতলে হারিয়ে গেছে ভোলায় ৩ হাজার কিলোমিটার জায়গা।
অব্যাহত হয়েছে বরিশালে ফসল উৎপাদন। অন্যদিকে অতিরিক্ত জোয়ার এবং জলোচ্ছ্বাসে লবণাক্ত পানি ভূখন্ডে ঢুকে ভুমির উৎপাদন ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে সুস্বাদু পানির প্রাপ্যতা হ্রাস পাচেছ, বাড়ছে লবণাক্ততা, ঋতুচক্র পরিবর্তনের কারণে বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে বৃক্ষরাজি, পশুপাখি, জীববৈচিত্র্যে পড়ছে এর নেতিবাচক প্রভাব। বাংলাদেশের অহংকার তথা বিশ্বের প্রধান ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন হয়তো একদিন চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশংকাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। ক্রমাগত বৃক্ষ নিধনের কারণে বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে। সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার এবং চিত্রা হরিণ আজ বিলুপ্ত প্রায়। বাংলার হাজারও প্রজাতির পশুপাখি ও জলজ প্রাণী হারিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ৫ হাজার প্রজাতির গাছের মধ্যে ১০৬ টির অস্তিত্ব প্রায় বিলুপ্ত। ৬৩২টি প্রজাতির পাখির মধ্যে ১২টি প্রজাতি ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে; ৩০টি প্রজাতির বিলুপ্তির পথে। ১১০টি পশু প্রজাতির ৪০টির অস্তিত্ব নেই। ৭৮০টি প্রজাতির মাছের মধ্যে ৫৪টির অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। শুকিয়ে গেছে হাওর, বিল, খাল।
নিকট অতীতে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়, সিডর ও ফণি সুন্দরবনসহ উপকূলীয় বিশাল এলাকার বনজ ও প্রাণিসম্পদ নষ্ট করে দিয়েছে। জলবায়ূ পরিবর্তনের ফলে গত ৫০ বা ১০০ বছরের পরিসংখ্যান বিবেচনায় আগামীতে বাংলাদেশে ব্যাপক অতিবৃষ্টি, অসময়ে প্রবল বন্যা, মরুময়তা, ঘূর্ণিঝড়, নিম্নচাপ ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশংকা রয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন ৩০ ভাগ কমে যাবে। এ কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় ২২ শতাংশ কৃষি জমি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। ফলে দেশে খাদ্যাভাবসহ নানা অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়ার আশংকা রয়েছে। জার্মানির ওয়াচ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাপল ক্রফট নামক প্রতিষ্ঠানের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দুর্বিপাক এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ।
গত ৩০ বছরে বাংলাদেশ ১ লাখ ৯১ হাজার ৬৩৭ জন মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারা গেছেন। বিশ্ব উষ্ণতা বা গে¬াবার ওয়ার্মিংয়ের ফলে মাটি, পানি, সূর্যের আলো, বাতাস দুষিত হয়ে যাওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার বিষয়টি প্রশ্নবোধক হয়ে দেখা দিয়েছে। ক্ষতিকর ধোঁয়ায় যেমন- বাতাস দূষিত হচ্ছে ঠিক তেমনি রাসায়নিক শিল্প কারখানার বর্জ্য শুধু নদীর পানি নয়, সমুদ্রকেও বিষাক্ত করে তুলছে। আমাদের ভূপৃষ্ঠের মাটি, পানি, উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতকে যে ক্ষতিকর প্রভাবের মধ্যে ফেলে দেয়া হচ্ছে তাতে পৃথিবীর জীবম-লে হয়তো একদিন কোন পানি থাকবে না, বন জঙ্গলে কোন গাছ থাকবে না।
সাম্প্রতিক সময়ের তথ্য মতে, পৃথিবীর বুক থেকে গড়ে প্রতি মিনিটে ২১ হেক্টর পরিমাণ বনভূমি উজাড় হচ্ছে। অথচ বৃক্ষ আমাদের পরম বন্ধু ও সুপ্রতিবেশী। একটি পরিণত গাছ বছরে ১৩-১৪ কেজি কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ বা শোষণ করে নেয় এবং ৭-৮ কেজি অক্সিজেন বাতাসে ছেড়ে দিয়ে পরিবেশ নির্মল রাখে যা বেঁচে থাকার জন্য আমাদের বিশেষ প্রয়োজন। একটি এলাকায় যদি ৫ হেক্টর পরিমাণ বন থাকে তাহলে ৩-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা হ্রাস করে এবং ভূমিক্ষয় রোধে সাহায্য করে। সে সাথে বাতাসে আর্দ্রতা বাড়িয়ে বৃষ্টিপাতের অনুকূলে পরিবেশ সৃষ্টি করে।
এতদভিন্ন বৃক্ষরাজি ৮৫%-৯০% শব্দ শোষণ করে, শব্দ দুষণ থেকে আমাদের রক্ষা করে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার্থে বৃক্ষ ও বনের প্রতি আমাদের মমত্ববোধ বাড়াতে হবে। বৃক্ষই আমাদের জীবন। তাই গাছ লাগানোর এখনই সময়। আজই একটি গাছ রোপণ করে ভবিষ্যতের জন্য অক্সিজেন, ফলমূল ও নিরাময়ের ওষুধ প্রাপ্তি নিশ্চিত করুন।
লেখক : চিকিৎসক-কলামিস্ট

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মিতব্যয়িতা
  • হংকং : কেন গণআন্দোলন
  • যানজট মুক্ত মহানগরী : কিছু প্রস্তাব
  • পানি নিয়ে ভাবনা
  • ভেজাল-দূষণ দূর করা কি খুবই কঠিন?
  • সৈয়দ মহসীন আলী : ক্ষণজন্মা রাজনীতিক
  • শিশুদের বিজ্ঞান মনস্ক করে গড়ে তোলার গুরুত্ব
  • রোহিঙ্গাঁ সমস্যা : প্রয়োজন আশু সমাধান
  • মজলিশী মুজতবা আলী
  • জলবায়ু ও পৃথিবীর বিপর্যয়
  • আমরা বই পড়া কি ভুলেই গেলাম
  • সফল হওয়ার সহজ উপায়
  • ঝুঁকিপূর্ণ রেল যোগাযোগ : প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা
  • আজকের দিন আজকের দিকে তাকাও
  • বিয়ে ব্যবস্থায় পরিবর্তন
  • কারবালার ঘটনা ও কয়েকজন সাহাবীর স্বপ্ন
  • আশুরায় সিলেটে হাদা মিয়া-মাদা মিয়ার বিদ্রোহ
  • গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শিক্ষা শহীদে কারবালা
  • যাকে দেখতে নারী তার চলন বাঁকা
  • ‘শতভাগ সাক্ষরতা’ কতদূর
  • Developed by: Sparkle IT