ধর্ম ও জীবন

ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার শিক্ষা

মোহাম্মদ এহসান উদ্দিন প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৫-২০১৯ ইং ০১:৫৮:২৩ | সংবাদটি ৭১ বার পঠিত

মানুষকে সকল প্রকার মানবীয় গুণাবলী দিয়ে আদর্শ মানুষ হিসাবে গড়ে তুলার জন্য ইসলামে সচ্চরিত্রের অনুপম বিশেষণগুলি বিশেষ গুরুত্বের সাথে বর্ণিত হয়েছে। মানুষ এসব গুণাবলী ধারণ করে নিজেদের চরিত্রকে গঠন করতে পারে। ইসলামী জীবনাদর্শের প্রশংসিত চারিত্রিক গুণাবলীর অন্যতম হচ্ছে ‘ছবর’ বা ধৈর্য।
মানুষ সামাজিক জীব। একটি সমাজের মানুষ সবাই একমতের হবে তা কিন্তু নয়। নানা মতের নানা পথের নানা চিন্তা চেতনার অধিকারী হয়ে থাকে। চিন্তার স্বাধীনতা ও বৈচিত্র দিয়ে আল্লাহ তায়ালা মানব সমাজকে করেছেন অধিকতর বৈচিত্রময় ও নান্দনিক। পরমত সহিষ্ণুতা অন্য মতের, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতাকে ইসলাম জোর তাকিদ দিয়েছে। শান্তি, সবর, সহনশীলতা ও পরমতের প্রতি সহানুভূতি ও শ্রদ্ধাশীলতার ধর্ম ইসলাম শুধুমাত্র আদেশ দিয়ে বসে থাকেনি-বরং এ মহৎ গুণ অর্জনের জন্য নিরাপদ পরিবেশ ও তৈরী করে দেয়। প্রতিটি মুমিন নারী-পুরুষ যাতে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার গুণে গুণান্বিত হয়ে একটি শান্তিময় ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজ গঠনের লক্ষ্যে পূর্ণ একমাসের সিয়াম সাধনাকে বাধ্যতামূলক করেছে।
আল কোরআনে বলা হয়েছে ‘হে বিশ্বাসীগণ তোমাদের জন্য সিয়াম সাধনাকে ফরজ করা হয়েছে যাতে তোমরা তাকওয়ার গুণ হাসিল করতে পার। হাদীসে শরীফে এসেছে ‘এটি ধৈর্যের মাস, আর ধৈর্য্যরে ফল হলো জান্নাত লাভ’। সহীহ মুসলিমের এক হাদীসে এসেছে, হযরত আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মহান আল্লাহপাক বলেন আদম সন্তানের যাবতীয় আমল তার নিজের জন্য। কিন্তু সিয়াম সাধনা বিশেষ করে আমার জন্যেই রাখা হয়। আর আমি নিজেই ইহার প্রতিদান দিব। সুতরাং যখন তোমাদের কারো সাওমের দিন আসে, সে যেন ঐ দিন অশ্লীল কথাবার্তা না বলে এবং অনর্থক শোরগোল না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সাথে বিবাদ (ঝগড়া) করতে চায়, সে যেন বলে ‘আমি রোজাদার বা সিয়াম পালনকারী’।
মানুষ স্বভাবত ক্ষীপ্রতাপ্রবণ। তাড়াহুড়া করে যেকোন কাজ করে ফেলে। পরে যখন ফল প্রত্যাশার বিপরীত আসে, তখন বুঝতে পারে তাড়াহুড়া বা ক্ষীপ্রতার কারণে এ ফলাফল। দুনিয়ার সাফল্য হাসিল ও আখিরাতে পরিত্রাণ লাভ করতে পার্থিব জীবনে সবর বা ধৈর্য ধারণ করতে হবে। আশা-আকাংখা ও প্রত্যাশা পূরণে, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হাসিল করাতে ধৈর্য ধারণ অপরিহার্য। অধৈর্য, অস্থির, চঞ্চল প্রকৃতির মানুষের জীবনে সাফল্য আসেনা। সাফল্য চাই পার্থিব হোক বা অপার্থিব সকল ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ পূর্ব শর্ত। এজন্য মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ১০৪ স্থানে সবর ও ধৈর্র্যের কথা আলোচনা করেছেন। নবী-রাসূলগণ সকলেই ছিলেন সবর ও ধৈর্যের অবিচল পর্বতসম। ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই লাভ করেছেন নবুওয়াত ও রেসালতের মত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ। তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং ধৈর্যের প্রতিযোগিতা কর, সর্বদা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাক। আর আল্লাহকে ভয়কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। (আলে ইমরান : ৩/২০০) ।
‘তোমরা ধৈর্য ধারণ কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে থাকেন’। (আন ফাল/৮/৪৬)।
‘তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। আবশ্যই তা যথেষ্ট কঠিন কেবল বিনয়ী লোকেরা ব্যতীত’। (বাকারা : ২/৪৫)। ‘আর তুমি সবর কর, দৃঢ়চিত্ত রাসূলগণ সবর করেছেন এবং ওদের বিষয়ে (বদদোয়ায়) তড়ি ঘড়ি করবে না’। (আহক্বাফ:৪৬/৩৫)।
হাদীস শরীফে মানবতার মুক্তির দিশারী মহানবী (সা.) ধৈর্যকে জ্যোতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আলো যেমন অন্ধকারের অমানিশা দূর করে পথচারীকে নির্বিঘেœ গন্তব্যে পৌঁছাতে সাহায্য করে। তেমনি ধৈর্য মানুষের জীবনকে আলোময় ও জ্যোতির্ময় করে সাফল্যের চূড়ায় পৌছে দেয়। মহানবী (সা.) বলেছেন ‘মুমিনের ব্যাপারটি বড়ই চমৎকার! তার সকল বিষয়ই তার জন্য কল্যাণকর। আনন্দের কিছু হলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। যা তার জন্য মঙ্গলজনক হয়। বিপদে পতিত হলে সে সবর করে। তাও তার জন্যে কল্যাণকর হয়। (মুসলিম হা : ২৯৯৯)।
তিনি আরো বলেছেন ‘জেনে রাখ, ধৈর্যের সাথেই রয়েছে বিজয়, আর কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি’। (আহমাদ ২৮০৪) ।
যারা সংকটে ও বিপদে ধৈর্যধারণ করে আল্লাহ পবিত্র কোরআনে তাদের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আর যারা অভাবে, রোগে-শোকে ও যুদ্ধের সময় ধৈর্য ধারণ করে, তারাই হলো সত্যাশ্রয়ী এবং তারাই পরহেযগার’ (বাকার-২/১৭৭)
‘আর তুমি সুসংবাদ দাও ধৈর্য ধারণকারীদের’ (বাকারাহ-২/১৫৫)
ধৈর্যশীলরা নেতৃত্ব লাভ করে : আল্লাহ তায়ালা বলেন এবং আমরা তাদের মধ্য হতে কিছু নেতা মনোনীত করেছিলাম, যারা আমার নির্দেশ অনুসারে পথ প্রদর্শন করত, যেহেতু তারা (আল্লাহর বিধান সমূহের উপর) ধৈর্যধারণ করেছিল। আর তারা ছিল আমার আয়াত সমূহে দৃঢ় বিশ্বাসী’ (সাজদাহ ৩২/২৪)। সহিষ্ণুতা ও সহনশীলতা এবং ধৈর্য্যশীলতা, ক্ষমাশীলতা, রাগ, নিয়ন্ত্রণ, ক্ষোভ দমন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ তথা ঝবষভ ঈড়হঃৎড়ষ বা আত্ম দমন এ গুণ অর্জন করার জন্যই সিয়াম সাধনা অত্যন্ত উপযুক্ত ও যথার্থ পন্থা।
আল্লাহ তা’য়ালা দুটি গুণ বৈশিষ্ট্যকে খুবই পছন্দ করেন, আর তা হলো ধীরস্থীরতা ও সহনশীলতা। মহানবী (সা.) বলেছেন, বীর পুরুষ সে নয়, যে যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে জয় লাভ করে বরং সে হল প্রকৃত বীর পুরুষ যে রাগের সময় বা ক্ষোভের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে (বোখারী ও মুসলিম)
ইসলামের শিক্ষা হলো উদারতা, সহনশীলতা, শত্রুকে ক্ষমা করে ক্ষমার মাধ্যমে হৃদয় জয় করা। তাই তো ধর্ম গ্রহণে কাউকে বাধ্য করতে বারণ করা হয়েছে “আল কোরআনে বলা হয়েছে” ধর্মের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি বা বাধ্য বাধকতা নেই। নিঃসন্দেহে হেদায়াত গোমরাহী থেকে পৃথক হয়ে গেছে। (বাকারা : ২৫৬) অন্যত্র রাসুলুল্লাহ (সা.) কে উপদেশ দেয়া হয়েছে এ বলে যে, “তুমি তো শুধুমাত্র একজন উপদেশক, এদের উপর বল প্রয়োগকারী নও”। (আল গাশিয়া ২১-২২)
অন্য ধর্ম, বিশ্বাস কিংবা তারা যাদের উপাসনা করে তাদেরকে গালি বা ভৎর্সনা না করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। “(আর হে ইমানদারগণ) এরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে ডাকে তোমরা তাদের গালি দিয়োনা। হয়তো অসচেতন অবস্থায় তারা আল্লাহকে গালি দিয়ে বসবে। (সূরা আনআম ১০৮)
সবরের সাথে সিয়ামের সম্পর্ক খুবই নিবিড়। কারণ সবর ৩ প্রকার।
(১) আল্লাহর আনুগত্য ও এবাদতের কষ্ট স্বীকারের ধৈর্য, (২) আল্লাহর নিষিদ্ধ ও হারাম কাজ থেকে বেঁচে থাকার জন্য যে কষ্ট হয় সে ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করা (৩) তাকদীর বা ভাগ্যের কষ্টদায়ক জিনিসের মোকাবিলায় ও ধৈর্য ধারণ করা। সিয়ামের মধ্যে এ তিন প্রকারই উপস্থিত রয়েছে।
ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক জীবনকে সুস্থ ও উত্তেজনামুক্ত রাখার জন্য ধৈর্যের প্রয়োজন, এ ধৈর্যের প্রয়োজন। আল রামাযান এ ধৈর্যের সাওগাত নিয়েই বছরে একবার আমাদের দুয়ারে এসে হাজিরা দেয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে সবর ও সহনশীলতার গুণ দ্বারা গুণান্বিত করুন। আমীন!

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT