ধর্ম ও জীবন

তারাবীহ নামাজে তিলাওয়াত প্রসঙ্গে

মাজহারুল ইসলাম জয়নাল প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৫-২০১৯ ইং ০২:০১:০৬ | সংবাদটি ১৪৩ বার পঠিত

আল্লাহ তায়ালা মানব জাতিকে যত নিয়ামত দান করেছেন, তার মধ্যে শ্রেষ্ঠতম নিয়ামত হচ্ছে শাহরু রামাযান। রহমত, মাগফিরাত, নাজাতের মাস হিসেবে রামাযান এর মর্যাদা ও ফজিলত অপরিসীম। পবিত্র এ মাস এলেই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহী ওয়াসাল্লাম নফল ইবাদত বন্দেগী, সালাত, জিকির আযকার, তাসবীহ, তাহলীল, কুরআন তিলাওয়াতের মাত্রা বাড়িয়ে দিতেন। এ মাসের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হচ্ছে সালাতুত তারাবীহ।
সালাতুত তারাবীহ শব্দটি আরবী। যার বাংলা অর্থ হলো তারাবীহ এর নামাজ। তারাবীহ শব্দটি বহুবচন। যার একবচন হলো তারাবীহাতুন। তারবীহাতুন এর বাংলা অর্থ হলো বিশ্রাম করা, বিরতী নেয়া, আরাম করা ইত্যাদি। পরিভাষায় পবিত্র রামাযান মাসে ইশার নামাজ আদায়ের পর অতিরিক্ত বিশ রাকাত সুন্নাত নামাজকে তারাবীহ নামাজ বলে। তারাবীহ নামাজে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহী ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কিরাম কুরআন শরীফ খতম করতেন। কেননা রামাযান মাস হচ্ছে নুজুলে কুরআন বা কুরআন নাজিলের মাস। সেই হিসেবে তারাবীহ নামাজে কুরআন শরীফ খতম করা সুন্নাত।
এবার আসি মূল বিষয়ে। কুরআন তিলাওয়াতের কিছু মৌলিক নীতি রয়েছে। যে নীতিগুলোকে আরবীতে বলা তাজবীদ অর্থ্যাৎ মাখরাজ, সিফাত, ইজহার, ইখফা, ইদগাম, ইকলাব, মাদ্দ, গুন্নাহ ইত্যাদি। তাজবীদ অনুযায়ী কুরআন তিলাওয়াত করা ফরজ। নামাজ বিশুদ্ধ হওয়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে সহীহ তিলাওয়াত। সহীহ তিলাওয়াত ছাড়া নামাজ আদায় করলে তা মহান আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না।
মহান আল্লাহ তায়ালা কুরআন তিলাওয়াতের হক সম্পকে ঘোষণা করেছেন ‘যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে তাদের মাঝে এমন কতগুলো লোকও আছে যারা এ কুরআনকে সহীহ্ শুদ্ধ উচ্চারণসহ সকল হক আদায় করে যেভাবে কুরআন তিলাওয়াত করা দরকার সেইভাবে কারে। (সুরা বাকারা ১২১) অন্য আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে ‘আর তোমরা স্পষ্টভাবে ধীরে ধীরে তারতীলের সাথে কুরআন আবৃত্তি কর।’ (সুরা মুজাম্মিল-৪)
আলোচ্য আয়াতে কারিমা হতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে কুরআন তিলাওয়াত ধীরে ধীরে স্পষ্টভাবে পড়া ফরজ এটা স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর নির্দেশনা। আমরা অনেকেই হয়ত মনে করি, শুধুমাত্র ফরজ নামাজে তিলাওতের হক আদায় করলেই হয়। আর তারাবীহ নামাজে যেকোনভাবে দ্রুত তিলাওয়াত করলেই হলো এটি প্রচলিত একটি মারাত্মক ভুল ধারণা। কারণ, নামাজ তো নামাজই সেটা ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত আর নফল যাই হউক। সকল নামাজেই তিলাওয়াত তারতীলের সঙ্গে সঠিকভাবে পাঠ করা জরুরি ও কাম্য, হউক সেটা ফরজ নামাজ কিংবা তারাবীহ এর নামাজ। তিলাওয়াতের হক আদায়ের ব্যাপারে প্রিয় নবী সা. ইরশাদ করেছেন, ”তোমরা সুকন্ঠি আওয়াজ দ্বারা কুরআনকে সুসজ্জিত করো। (সুনানু ইবনে মাজাহ-১৩৪২)
আমাদের দেশে তারাবীহ এর নামাজ অধিকাংশ মসজিদেই খতমে তারাবীহ হয় অর্থাৎ তারাবীহ এর নামাজে কুরআন খতম করা হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য তারাবীহ এর নামাজে তিলাওয়াত এতো দ্রুত ও তাড়াহুড়ো করে পড়া হয় যে, কী পড়া হচ্ছে তা অনেক ক্ষেত্রেই বুঝা যায় না। কম সময়ে নামাজ শেষ করার জন্য রীতিমত একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়। রুকু, সিজদা, তাসবীহ এতো দ্রুতভাবে আদায় করা হয় যা চরম নিন্দনীয় এবং মাকরুহ। দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের দেশের অধিকাংশ মসজিদ কমিটির দায়িত্বশীলরা হাফিজ সাহেবদেরকে সময় বেঁধে দেন, যে নামাজ এক ঘন্টাসময়ের ভিতরেই শেষ করতে হবে। ফলে হাফিজ সাহেবও এটাকে নিছক চাকরী মনে করে এমনভাবে কুরআন তিলাওয়াত করেন যে কিভাবে পড়া হচ্ছে শুদ্ধ না অশুদ্ধ তা বিবেচ্য নয় বরং বিবেচ্য হলো নির্ধারিত সময়ের ভিতরে শেষ করা যাচ্ছে কিনা। মসজিদ কমিটি কিংবা আম মুসল্লীদের অনুরোধ রক্ষার্থে তাড়াহুড়ো ও দ্রুততার সহিত এভাবে তিলাওয়াত করলে কুরআন তিলাওয়াতের হক আদায় হবে কিনা তা সম্মানিত ইমান সাহেব ও হাফিজরাই ভালো বলতে পারবেন। প্রিয় নবী সা. আজ হতে ১৪০০ বছর আগে উম্মতের বর্তমান এই অবস্থার আশংকা প্রকাশ করেছিলেন। যা আজ বাস্তবেই প্রতিফলিত হচ্ছে। ‘হাদীস শরীফে এসেছে জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ রাদি; এর সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমরা কিরাত পড়ছিলাম, এমন সময় সেখানে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহী ওয়াসাল্লাম আসলেন। তখন আমাদের মধ্যে আরব বেদুঈন ও অনারব লোকজন ছিলো। তিনি বললেন, তোমরা কুরআন পড়, প্রত্যেকেই উত্তম। কেননা অচিরেই এমন সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে, যারা কুরআনকে তীরের ন্যায় ঠিক করবে (তাজবীদ নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে) তারা কুরআন পাঠে তাড়াহুরো করবে, ধীরস্থিরভাবে পড়বে না। (সুনানু আবু-দাউদ ৮৩০)
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহী ওয়াসাল্লাম এর হাদীস আজকে বাস্তবে প্রমাণিত হচ্ছে। কারণ এখন অনেকেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নয় বরং টাকা পয়সা, সম্মান, যশ, খ্যাতি লাভ করার উদ্দেশ্যেই কুরআন তিলাওয়াত করে থাকেন। তাইতো জেনেশুনে তিলাওতের হক নষ্ট করছেন অথ্যাৎ অতি দ্রুততার সহিত কুরআন তিলাওয়াত করছেন যার ফলে কি পড়া হচ্ছে তা স্পষ্ট বুঝা যায় না। আলহামদুলিল্লাহ, বর্তমানে আমাদের দেশেও অনেক মসজিদে বিশুদ্ধ ও সহীহ ভাবে সময় নিয়ে তারাবীহ নামাজ পড়ানো হচ্ছে। এতে মুসল্লীরা বিরক্ত নয়, বরং আনন্দ পান তিলাওয়াতের সুমধুর আওয়াজে। সেখানে হয়ত সব্বোর্চ ২০/২৫ মিনিট সময় বেশি লাগে তাতে কী? আল্লাহর কালামতো বিশুদ্ধভাবে পড়া হলো। আমাদের মনে রাখা উচিত, অশুদ্ধ ও তাড়াহুড়ো করে খতমে তারবীহ পড়ার চেয়ে বিশুদ্ধভাবে সুরা তারাবীহ-ই পড়া অনেক উত্তম।
আসুন! রহমত, মাগফিরাত, নাজাতের এ পবিত্র মাসে মহান আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের জন্য সালাতুত তারাবীহতে কুরআন তিলাওয়াত তার হকসহ আদায় করার চেষ্টা করি। সম্মানিত আলেম, উলামা, ইমাম, খতিব ও হাফিজে কুরআনের প্রতি সবিনয় অনুরোধ, তারাবীহ নামাজে কুরআন তিলাওয়াতের ব্যাপারে আমরা সচেতন হই, যাতে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে তিলাওয়াতের মৌলিক হক নষ্ট না হয়। সাধারণ মুসল্লীদের বুঝাতে হবে ধীরস্থিরভাবে কুরআন তিলাওয়াত করা ফরজ। ২০ রাকাত তারাবীহ নামাজ আদায় করতে একজন মুসল্লীর কষ্ট হলে তিনি তার সাধ্যমত রাকাত সংখ্যা নামাজ আদায় করতে পারেন সমস্যা নেই। উল্লেখ্য ওজর ব্যতীত ২০ রাকাতের কম নামাজ পড়া কাম্য নয়। অশুদ্ধ ও ভুল তিলাওয়াত দিয়ে তাড়াহুড়ো করে দ্রুততার সহিত বিশ রাকাত নামাজ পড়ার কোনো মূল্য নেই মহান আল্লাহর নিকট। কেননা আল্লাহর কাছে ইবাদত গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্ত কোয়ানটিটি নয় বরং কোয়ালিটিই আসল। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT