ধর্ম ও জীবন

এতেকাফ : গুরুত্ব ও বিধিবিধান

শামসুল ইসলাম ইকবাল প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৫-২০১৯ ইং ০২:০৩:০১ | সংবাদটি ১৬২ বার পঠিত

এতেকাফের শাব্দিক অর্থ অবস্থান করা, আটকিয়ে রাখা, নিজেকে বন্দী রাখা। শরীয়তের পরিভাষায় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষে পুরুষের জন্য নিয়তসহ এমন মসজিদে অবস্থান করা যেখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জামাআত অনুষ্ঠিত হয়। আর মহিলাদের জন্য এতেকাফ হলো, নিয়তসহ ঘরের ভিতর নামাজের জন্য নির্দিষ্ট কোন স্থানে অবস্থান করা।
এতেকাফ তিন প্রকার।
১. ওয়াজিব এতেকাফ : কেউ যদি এতেকাফের মানত করে তার উপর এতেকাফ করা ওয়াজিব। সকল আলেম ও ফুকাহার ঐক্যমতে ওয়াজিব এতেকাফের জন্য যে কয়দিন মানত করা হয়, সে কয়দিনই পালন করতে হয়।
২. সুন্নাত এতেকাফ : মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় রামাযানের শেষ দশ দিন অর্থাৎ রামাযানের ২০ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্ব থেকে রামাযানের শেষ দিন সূর্যাস্তের পর পর্যন্ত যে এতেকাফ করা হয় তাকে সুন্নাত এতেকাফ বলে।
৩. মুস্তাহাব এতেকাফ : মুস্তাহাব এতেকাফের বর্ণনায় ইমাম আজম আবু হানিফা (রহ.) বলেন, মুস্তাহাব এতেকাফের জন্য নির্দিষ্ট কোন সময় নেই। তা স্বল্প সময় তথা এক ঘন্টার জন্যও হতে পারে, চাই তা দিনে হোক বা রাতে হোক।
এতেকাফের কিছু শর্ত রয়েছে। তা হলো, এতেকাফকারী মুসলমান হওয়া, ভালোমন্দ পার্থক্যকারী জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া। এমন মসজিদে এতেকাফ করা যেখানে নামাজের জামাআত হয়। এতেকাফের জন্য সর্বোচ্চ স্থান হলো মসজিদুল হারাম অতঃপর মসজিদে নববী (সা.), এরপর বায়তুল মুকাদ্দাস, তারপর জামে মসজিদ যে মসজিদের মুসল্লি সংখ্যা বেশী। মহিলা তার নিজ গৃহে নামাজের স্থানে এতেকাফ করবে। মানতের এতেকাফের জন্য রোজা শর্ত। নফল এতেকাফের জন্য রোজা শর্ত নয়। এতেকাফকারী জানাবাত, হায়েজ ও নেফাস থেকে পবিত্র হওয়া। বালিগ হওয়া এতেকাফ সহীহ হওয়ার জন্য কোন শর্ত নয়। তাই জ্ঞানবান নাবালিগের জন্যও এতেকাফ সহীহ হবে।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে রামাযানের শেষ দশ দিন এতেকাফ করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা কেফায়া। আর মসজিদের মহল্লার এক ব্যক্তি এতেকাফ করলে সকলের দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে। সবার জন্য এতেকাফ করা খুবই সওয়াবের কাজ। এতেকাফের গুরুত্ব অনেক। অন্তরকে আল্লাহর মনোনিবেশের প্রশিক্ষণ, সুন্নাত নিয়মে দুনিয়া বিমুখ হওয়ার এবং লাইলাতুল কদর তালাশ করার ক্ষেত্রে এতেকাফের বিকল্প নেই। মহানবী (সা.) বলেন তোমরা রামাযানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ কর। হযরত আয়শা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রামাযানের শেষ দশ দিন আরম্ব হলে রাসুল (সা.) নিজে সমগ্ররাত্রী ইবাদতে কাটাতেন এবং পরিবারের লোকদেরকেও অধিক পরিমাণ ইবাদত বন্দেগী করার জন্য ঘুম থেকে জাগিয়ে দিতেন (মুসলিম)। রামাযানের শেষ দশকের মাগফিরাত ও অন্য হাজার মাসের থেকেও উত্তম লাইলাতুল কদর পাওয়ার মহান উদ্দেশ্যে মহানবী (সা.) রামাযানের শেষ দশককে এতেকাফের জন্য মনোনয়ন করেছেন। এতেকাফের ফজিলত সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি রামাযানের দশ দিন এতেকাফ করবে তার জন্য দুই হজ্জ্ব ও দুই ওমরার সওয়াব হবে (বায়হাকী)। বিশ্বনবী (সা.) প্রতি বছর রামাযান মাসে এতেকাফ করতেন। একবছর ছুটে গেলে তিনি শাওয়াল মাসে কাযা করে নেন। তাঁর ইন্তেকালের পর উম্মুল মুমিনীনগণ এতেকাফ করতেন। মহানবী (সা.) আরও বলেন যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির লক্ষে একদিন এতেকাফ করবে তার ও জাহান্নামের মাঝে তিন খন্দক দূরত্ব সৃষ্টি করবেন, যা আসমান-জমিনের দূরত্ব অপেক্ষা বেশী (তাবরানী)।
এতেকাফের আদব হলো নেকের কথা ছাড়া অপ্রয়োজনীয় কথা না বলা। শ্রেষ্ঠ মসজিদকে এতকাফের জন্য নির্বাচন করা, যেমন; মসজিদুল হারাম, জামে মসজিদ ইত্যাদি। সর্বোপরি এতেকাফকারী ব্যক্তি আল্লাহর নৈকট্য লাভের নিমিত্তে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে তার ইবাদতে নিয়োজিত রাখবে এবং দুনিয়াবী কাজকর্ম থেকে দূরে থাকবে।
বিভিন্ন কারণে এতেকাফ ভঙ্গ হয়ে থাকে। বিনা ওজরে দিনে বা রাতে সামান্য সময়ের জন্য মসজিদ হতে বের হলেও এতেকাফ ফাসিদ হয়ে যায়, ইচ্ছা করে বের হোক বা ভুলক্রমে। অনুরূপভাবে মহিলা তার ঘরের নির্ধারিত স্থান হতে বের হবে না। পেশাব, পায়খানা ও জমুআর নামায আদায় ইত্যাদি ওযরের কারণে মসজিদ হতে বের হওয়া জায়িজ। এতেকাফের স্থানেই ঘুমাবে ও পানাহার করবে। এর জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়ার প্রয়োজন নাই। মসজিদ ভেঙ্গে যাওয়ার কারণে বা জোরপূর্বক বের করে দেওয়ার কারণে এতেকাফকারী ব্যক্তি যদি মসজিদ হতে বের হয়ে সঙ্গে সঙ্গে অন্য মসজিদে চলে যায়, তবে এতে এতেকাফ ফাসিদ হবে না। জান বা মালের ক্ষতির আশঙ্কা হলেও উক্ত হুকুম প্রযোজ্য হবে। অসুস্থ্য ব্যক্তির সেবা করার জন্য, মৃত ব্যক্তিকে দেখার উদ্দেশ্যে বা তার জানাযা আদায়ের জন্য এতেকাফ হতে বের হলে এতেকাফ ফাসিদ হয়ে যাবে। পানিতে ডুবন্ত বা আগুনে পড়া কোন মানুষকে রক্ষা করার জন্য মসজিদ থেকে বের হলেও এতেকাফ ফাসিদ হবে। অনুরুপভাবে নিজের অসুস্থ্যতার কারণে সামান্য সময়ের জন্য মসজিদ থেকে বের হলে এতেকাফ ফাসিদ হবে। অবশ্যই ইতিকাফের মানতের সময় যদি রোগীর সেবা, জানাযার নামায ও ইলমের মজলিশে যাওয়ার শর্ত করে তাহলে এসব তার জন্য জায়িজ। এতেকাফকারী মুয়াজ্জিন হোক বা অন্য কেউ হোক মিনারায় আরোহণ করলে এতেকাফ ফাসিদ হবে না, মিনারা মসজিদের বাইরে হলেও। এতেকাফ ফাসিদের আরেকটি কারণ হলো সহবাস বা সহবাসের দিকে আকৃষ্টকারী কাজ, তা দিনে হোক বা রাতেই হোক। স্বপ্নদোষে এতেকাফ ফাসিদ হয় না। কয়েকদিন পাগল বা বেহুশ থাকার ফলে লাগাদার এতেকাফ করতে না পারলে এতেকাফ ফাসিদ হয়ে যায়। চুপ থাকাকে ইবাদত মনে করে চুপ থাকলে এতেকাফ মাকরূহ হয়। অন্যতায় মুখের গুণাহসমূহ হতে চুপ থাকা বড় ইবাদত। এতেকাফকারী দিনের বেলা ভুলক্রমে পানাহার করলে কোন ক্ষতি নেই। এতেকাফের স্থানকে ব্যবসাস্থল বানানো মাকরুহ। ওয়জিব এতেকাফ ফাসিদ হয়ে গেলে তার কাযা ওয়াজিব। ফাসিদ সে নিজে করুক বা হায়েজ নিফাস ইত্যাদির কারণে ফাসিদ হোক।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT