উপ সম্পাদকীয়

আমাদের নজরুল

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০৫-২০১৯ ইং ০০:৩০:৩২ | সংবাদটি ১৬৩ বার পঠিত

১১ জ্যৈষ্ঠ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২০তম জন্মবার্ষিকী। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভুবনে বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ছিলেন নজরুল। তাইতো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ নজরুলের উত্থানকে এই বলে স্বাগত জানিয়েছিলেন, আয় চলে আয় রে ধূমকেতু/আঁধারে বাধ অগ্নিসেতু/দুর্দিনের এই দুর্গশিরে, উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন/জাগিয়ে দে রে চমক মেরে, আছে যাঁরা অর্ধচেতন .... ’
আর এমন উৎসাহ পেয়ে নজরুল অতিক্রম করেন কষ্টকর এক দুর্গম পথ। সেই পথ পরিক্রমায় প্রেম, দ্রোহ, সাম্য-নজরুল রচনাবলীকে করেছে যুগপৎ। অর্থাৎ, একদম রুট লেভেলের মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে নজরুল-এর নামটি। এ এক বিরল পাওয়া।
নজরুলের জন্ম বাংলা ১১ জ্যৈষ্ঠ্য ১৩০৬ বঙ্গাব্দ এবং ইংরেজি ১৮৯৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে। পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ, মায়ের নাম জাহেদা খাতুন। তাঁর নিত্যসঙ্গী ছিল দুঃখ-দারিদ্র। তাইতো তিনি বলেছেন, ‘হে দারিদ্র্য! তুমি মোরে করেছ মহান!’ আর তাঁর গ্রামের প্রায় সকলেই তাঁকে ডাকতো ‘দুখু মিয়া’ বলে। এই ‘দুখু মিয়া’ই একদিন আমাদের বিদ্রোহের বাণী শোনালেন-মহা বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত/আমি সেই দিন হব শান্ত/যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল/আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না/অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ/ভীম রণ-ভূমে রণিবে না ....
আসলে এই পঙক্তিমালার মধ্যে এত শক্তি ছিল যে, বাংলা সাহিত্যে ধূমকেতু’র মতো নজরুল-এর আবির্ভাব হয়। সা¤্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে নজরুলই সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিলেন। যে কারণে, ইংরেজ সরকার তাঁর প্রচুর বই বাজেয়াপ্ত করেছিল। এবং নজরুল ইসলামকে কারাদন্ডও দিয়েছিল। কিন্তু কারাগারেও নজরুল একটানা ৪০ দিন অনশন করে ইংরেজ সরকারের প্রতিবাদ করেন। এজন্য কারা প্রকোষ্ঠে বসে তিনি রচনা করেন-কারার ঐ লৌহ কপাট/ভেঙ্গে ফেল কর রে লোপাট/রক্ত-জমাট শিকল পূজার পাষাণ-বেদী/লাথি মার ভাঙ্গরে তালা/যত সব বন্দীশালা আগুন জ্বালা!/আগুন জ্বালা!/ফেলো উপাড়ী ......
অথবা
এই শিকল পরা ছল!/মোদের এ শিকল পরা ছল!/এই শিকল পরেই শিকল তোদের করবে। রে বিকল/এই শিকল পরা ছল ....
নজরুল ছিলেন তাঁর বাবা-মায়ের ৬ নম্বর সন্তান। নজরুল-এর জন্মের পূর্বে তাঁর চার ভাই মারা যায়। নজরুল-এর বাবা খুবই গরিব ছিলেন। তাঁদের বাড়ির কাছে ‘পীরপুকুর’ নামে বড় একটি দীঘি ছিল। আর এই পুকুর পাড়েই হাজি পালোয়ান নামে একজন পীরের মাজার ও মসজিদ ছিল বলে জনশ্রুতি আছে। এবং নজরুল-এর বাবা এই পীরের মাজারে ‘খাদেমগিরি’ করে সামান্য আয় করতেন। এক সময় নজরুল-এর বাবা পাশা খেলায় জড়িয়ে পড়েন। তারপর পঞ্চাশ বছরের ফকির আহমদ পাশা খেলেই কিভাবে যেন ফকির হয়ে গেলেন। তাঁর ঘরে তখন ৩ ছেলে ও ১ মেয়ে। বড় ছেলের নাম সাহেবজান, মেজ ছেলে নজরুল, ছোট ছেলে আলী হোসেন, মেয়ে কুলসুম। বাবার হাতেই নজরুল প্রাথমিক পাঠ শেষ করেন। অপরদিকে গাঁয়ের ছেলেদের মধ্যে দুষ্টুমিতে নজরুল সেরা ছিলেন। মাত্র ৮ বছর বয়সে এই দুষ্টু ছেলে তাঁর বাবাকে হারান। এই অবস্থায় এলাকাবাসী নজরুলকে মক্তবের কাজে লাগিয়ে দিলেন। ছেট বাচ্চাদের নজরুল অক্ষর চিনিয়ে দিতেন এবং মোয়াজ্জিনের পদও অলংকৃত করেন। পাশাপাশি বজলে করিম নামে তাঁর এক চাচা’র কাছ থেকে বাংলা গান ও উর্দু গজল লিখার স্টাইল শিখে ফেলেন এবং উর্দু, বাংলা ও ফার্সির মিশেলে গান ও গজল রচনা করতেন। আবার ইমামের অনুপস্থিতিতে ইমামতিও করতেন। কত বিচিত্র জীবনযুদ্ধ ছিল তাঁর! বেঁচে থাকার প্রয়োজনে নজরুল কিশোর বয়সে এসব করেছেন। বাঁচার প্রয়োজনই তখন ছিল তাঁর কাছে বড়। বুঝতেন না তিনি অনেক কিছু। তাইতো সময় ও জীবনের প্রয়োজনে আমাদের নজরুল পালাগানের দলনেতার হাতে লেটো গান লিখে দিতেন। নিজেও লেটো গান গেয়ে গান রচনা ও গান গাওয়া বাবদ কিছু সম্মানী পেতেন।
বোহেমিয়ান স্বভাবের নজরুল একদিন কাউকে না জানিয়ে চলে গেলেন আসানসোলে বখশ মিয়ার রুটির দোকানে। ময়দা মাখানো আর রুটি বানানো শেষ হলে রাতে বসে পুঁথি পাঠ করতেন। তারপর এক হাবিলদারের সাথে পরিচয় হলো। হাবিলদার সাহেব নজরুলের প্রতিভা আছে দেখে তাঁকে স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। শুরু হলো তাঁর নতুন জীবন। কিছুদিন স্কুলে শিক্ষা লাভ করে চলে গেলেন ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ্ প্রেথম বিশ্বযুদ্ধে করাচি ও মেসোপটিয়ামে সৈন্যদলের সাথে নজরুলও যান। ১৯২০ সালে বাঙালি পল্টন বিলুপ্ত হলে নজরুল কলকাতায় বন্ধু শৈলজানন্দের বাসায় গিয়ে থাকেন। আর এখান থেকেই তাঁর সাহিত্যিক জীবনের যাত্রা শুরু। তৎকালীন মোসলেম ভারত, সওগাত, বঙ্গনূর, প্রবাসী ইত্যাদি পত্রিকায় নিয়মিত প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা লিখতেন। সঙ্গীত চর্চাও করতেন। এক সময় কলকাতায় কমরেড মোজাফফর আহমদ-এর সাথে নজরুল পরিচিত হন। এবং কলেজ স্ট্রিটের একটি মেসে দু’জন একই সাথে থাকতেন। এই মেসেই তেইশ বছর বয়সে নজরুল সারারাত জেগে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবিতা ‘বিদ্রোহী’ রচনা করেন। খুলে যায় তাঁর ভাগ্য দুয়ার। আর নজরুলকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এই একটি কবিতা দিয়ে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে যান নজরুল। ‘লাঙল’ নামক একটি সাপ্তাহিক পত্রিকাও নিজে সম্পাদন করেন জীবনযোদ্ধা নজরুল। ‘লাঙল’-এর প্রচ্ছদে রবীন্দ্রনাথ আশীর্বচন লিখেন এভাবে-‘ধর হাল বলবাম/আন তব মরুভাঙা হল/বল দাও, ফল দাও/স্তব্দ হোক ব্যর্থ কোলাহল।’
১৯৭২ সালের ২৪ মে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নজরুলকে সপরিবারে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। সরকার নজরুলকে বাংলাদেশের নাগরিকত্বও প্রদান করে এবং জাতীয় কবি হিসেবে তাঁকে স্বীকৃতি দেয়। তাপর থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত নজরুল বাংলাদেশে ছিলেন। ৭৮ বছর বয়স পর্যন্ত নজরুল বেঁচে থাকলেও ১৯৪২ সালের জুলাই মাসে অসুস্থ হয়ে পড়েন। দীর্ঘ ৩৪ বছর তিনি নির্বাক ছিলেন। কেন তিনি কথা বলতে পারতেন না-এই রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি। তবে নজরুল গবেষকদের ধারণা ইংরেজরাই নজরুল-এর মাথায় বড় ধরনের টর্চার করেছিল। যে কারণে, হয়তো বা নজরুল এর মস্তিষ্কের ¯œায়ু কোষগুলো (নার্ভ সিস্টেম) অকেজো হয়ে গিয়েছিলো। শত চেষ্টা করেও আর নার্ভগুলোকে জাগানো যায়নি। আমাদের নজরুলও আর কথা বলেননি। কেবল, তাকিয়ে থাকতেন। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট নজরুল মারা যান। এবং এর সাথে বাংলা সাহিত্য আকাশ থেকে একটি ধূমকেতু’র পতন ঘটে।
সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ পত্রিকায় নজরুল-এর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রথম ছাপা হয়। সেদিন কিন্তু বৃষ্টি ছিল। কিন্তু তারপরও সপ্তাহিক ‘বিজলী’র চাহিদা এত বেড়ে গিয়েছিল যে, ওই সপ্তাহেই পত্রিকাটি দু’বার ছাপা হয়েছিল। মূলতঃ ‘বিদ্রোহী’-কবিতাই নজুল ইসলামকে পপুলার লেখক বানিয়ে দেয়। আর এই ‘বিদ্রোহী কবি’ই এক সময় লিখলেন-মসজিদেরও পাশে আমায়/কবর দিয়ো ভাই/যেন গুরে থেকেও মোয়াজ্জিনের/আযান শুনতে পাই/মসজিদেরও পাশে আমায় ...
আর হ্যাঁ, মৃত্যুর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশেই তাঁকে কবর দেওয়া হয়। এভাবে জীবনযোদ্ধা আমাদের ‘দুখু মিয়া’ অথবা ‘নজরুল’ সকল কোলাহলের বাইরে চলে গেলেন। বাংলা সাহিত্যের রাজপ্রাসাদে তাঁর যে যুগপৎ আসন ছিল, সেটা হয়তো আর কেউ অলংকৃত করতে পারবে না। শোনাবে না আর কেউ বিদ্রোহের বাণী-‘বল বীর/চির-উন্নত মম শির ...
বাংলা সাহিত্যের কাব্য জগতে অনেকেই আসবেন, কিন্তু নজরুল-এর হ্যাট্টিক কেউ ভাঙতে পারবে না বলে আমাদের বিশ্বাস। তিনি চিরকাল বাংলা সাহিত্যাকাশে ‘ধুমকেতু’ হয়েই রয়ে যাবেন। কাজী নজরুল ইসলাম-এমনই এক উচ্চ মার্গের কবি। তাঁর কাব্য শৈলী, কথার বুনন সম্পূর্ণ ভিন্ন। যে কারণে, নজরুলই নজরুল-এর প্রতিপক্ষ ছিলেন আর কেউ নয়। আজও তিনি সকল সাহিত্যিকের প্রেরণার উৎস। কারণ, একমাত্র তিনিই বলেছিলেন-‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী/আর হাতে রণ তূর্য .......
অর্থাৎ, প্রেম ও দ্রোহ নজরুল এর কাব্যে ফিফটি-ফিফটি ছিল। তাই নজরুল রোমান্টিক ও অনন্য!
লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মিতব্যয়িতা
  • হংকং : কেন গণআন্দোলন
  • যানজট মুক্ত মহানগরী : কিছু প্রস্তাব
  • পানি নিয়ে ভাবনা
  • ভেজাল-দূষণ দূর করা কি খুবই কঠিন?
  • সৈয়দ মহসীন আলী : ক্ষণজন্মা রাজনীতিক
  • শিশুদের বিজ্ঞান মনস্ক করে গড়ে তোলার গুরুত্ব
  • রোহিঙ্গাঁ সমস্যা : প্রয়োজন আশু সমাধান
  • মজলিশী মুজতবা আলী
  • জলবায়ু ও পৃথিবীর বিপর্যয়
  • আমরা বই পড়া কি ভুলেই গেলাম
  • সফল হওয়ার সহজ উপায়
  • ঝুঁকিপূর্ণ রেল যোগাযোগ : প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা
  • আজকের দিন আজকের দিকে তাকাও
  • বিয়ে ব্যবস্থায় পরিবর্তন
  • কারবালার ঘটনা ও কয়েকজন সাহাবীর স্বপ্ন
  • আশুরায় সিলেটে হাদা মিয়া-মাদা মিয়ার বিদ্রোহ
  • গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শিক্ষা শহীদে কারবালা
  • যাকে দেখতে নারী তার চলন বাঁকা
  • ‘শতভাগ সাক্ষরতা’ কতদূর
  • Developed by: Sparkle IT