পাঁচ মিশালী

ডি.এম. হাইস্কুলের শিক্ষা সফর

মোঃ রফিকুল ইসলাম প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০৫-২০১৯ ইং ০০:৩২:৪০ | সংবাদটি ১৯১ বার পঠিত

সুসাহিত্যিক ‘সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছেন, দু’ভাবে জ্ঞান অর্জন করা যায়- বই পড়ে এবং দেশ ভ্রমণ করে। সুতরাং বই পড়ার পাশাপাশি দেশ-বিদেশে ভ্রমণ করেও জ্ঞান অর্জন করা যায়। এ কারণে বিশ্বের উন্নত দেশের লোকেরা অবসর সময়ে দেশ-বিদেশে ভ্রমণে বের হন। দেশ ভ্রমণ করে যেমন জ্ঞান অর্জন করা যায় তেমনি চিত্ত বিনোদনও করা যায়। দেশ ভ্রমণ বিনোদনেরই অংশ। তাই আমাদের দেশের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকেরা মাঝে মাঝে শিক্ষা সফরে বের হন। এতে শিক্ষার্থীরা দেশের প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শন, বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার সুযোগ পায়। তাছাড়াও সারা বছর বইয়ের পাতায় মগ্ন শিক্ষার্থীরা অন্তত একদিন কিছুটা আনন্দ উপভোগ করতে পারে এবং বাহিরের জগৎ সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারে, শিখতে পারে। কাজেই পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষা সফরের গুরুত্বও কম নয়। তাই আমরা সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ঢাকা উত্তর মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয় (ডি.এম. হাইস্কুল) এর শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্যরা গত ১৮ এপ্রিল ২০১৯ইং শিক্ষা সফরে প্রকৃতির লীলা নিকেতন জাফলং গিয়েছিলাম। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, স্কুল পরিচালনা কমিটির সদস্য এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সব মিলে আমাদের সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে তিনশ’। সাতটি বাসের বিরাট বহর নিয়ে আমরা সেদিন জাফলং গিয়েছিলাম। প্রতিটি বাসে ২-৩ জন করে স্যার-মেডাম শৃঙ্খলার দায়িত্বে ছিলেন। সকাল সাড়ে আটটায় স্কুল ক্যাম্পাস থেকে শিক্ষা সফরের গাড়ির বহর জাফলং-এর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। আমি যেহেতু সিলেট শহরে থাকি তাই আমি দক্ষিণ সুরমার শ্রীরামপুর বাইপাস সড়কে এসে শিক্ষা সফরের গাড়িতে উঠলাম। আমাদের গাড়ির বহর বাইপাস সড়ক দিয়ে শাহপরান সেতু পার হয়ে সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের দিকে এগিয়ে চলল। শাহপরান সেতু পার হয়ে কিছু সামনে অগ্রসর হয়ে আমাদের গাড়ির বহর রাস্তার পাশে থামল। এখানে আমাদেরকে নাস্তা খেতে দেওয়া হল। ১০ মিনিট বিরতির পর আবার আমাদের যাত্রা শুরু হল। কিছুক্ষণ পর আমাদের গাড়ির বহর পীরের বাজার নামক স্থানে এসে সিলেট-তামাবিল মহাসড়কে পৌঁছল। তারপর গাড়িগুলো সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক ধরে জাফলং-এর দিকে এগিয়ে চলল। আমি যে গাড়িতে ছিলাম সেই গাড়িতে ছিলেন স্কুল পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান সাহেব ও সদস্যবৃন্দ, প্রধান শিক্ষক সাহেব, সহকারী প্রধান শিক্ষক সাহেব এবং আম্বিয়া স্যার, মামুন স্যার প্রমুখ। আমাদের গাড়ি থেকেই সকল গাড়িগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হত। আমাদের মামুন স্যার একজন সংস্কৃতিমনা এবং রসিক মানুষ। তিনি হ্যান্ড মাইক হাতে নিয়ে মজার মজার কথা বলে এবং নানা প্রকার কৌতুক করে সবাইকে হাসিয়ে মাতিয়ে চাঙ্গা করে রেখেছিলেন। বেলা সাড়ে ১২ টায় আমাদের গাড়ির বহর জাফলং পিকনিক স্পটে গিয়ে থামল।
পিকনিক স্পটে এসে ছাত্র-ছাত্রীরা উচ্চাসে ফেটে পড়ল এবং আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠল। তাদের অনেকেই জীবনের প্রথম জাফলং এসেছে, তাই তাদের আনন্দের সীমা নেই। গাড়ি থেকে নেমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এক স্থানে সমবেত হলেন। শিক্ষার্থীদের হ্যান্ড মাইকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হল এবং একঘন্টা ঘুরাফেরা করে আবার সকলকে নির্দিষ্ট স্থানে ফিরে আসতে বলা হল। ছাত্র ছাত্রীরা পৃথক দু’দলে বিভক্ত হয়ে ঘুরতে গেল। সাথে ছিলেন স্যার ও মেডামরা। শিক্ষার্থীরা জাফলং এর প্রধান আকর্ষণ পিয়াইন নদীর দিকে ছুটল এবং সিঁড়ি বেয়ে নদীতে নামতে লাগল। আমি দোকান থেকে এক বোতল পানি কিনলাম এবং এককাপ চা পান করলাম। তারপর শিক্ষার্থীদের সাথে মিলিত হয়ে পিয়াইন নদীতে নামতে লাগলাম। সিঁড়িতে মাহবুব স্যারের সাথে দেখা হল এবং আমরা দুজন কথা বলতে বলতে সিঁড়ি বেয়ে নদীতে নেমে পড়লাম। আগে নদীতে উঠা নামার জন্য কোন সিঁড়ি ছিল না, তখন নদীতে উঠানামা করতে অনেক কষ্ট হত। এখন নদীতে উঠা নামার জন্য সিঁড়ি তৈরি করে দেওয়ায় সেই কষ্ট দূর হয়েছে এবং পর্যটকদের অনেক সুবিধা হয়েছে। পিয়াইন নদীতে নেমে দেখলাম নদী একেবারে শুকিয়ে গেছে। নদীর মাঝখানে সামান্য পানি আছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা পিয়াইন নদীর চরে দল বেঁধে হাটছিল। তারা কখনো দল বেঁধে, কখনো পৃথকভাবে ছবি তুলছিল। ছাত্রদের কেউ কেউ নদীর পানিতে ভেজার চেষ্টা করছিল। শিক্ষার্থীরা জাফলং-এর নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করছিল এবং মোবাইল ফোনে স্মৃতি সংরক্ষণ করছিল। আমি এবং মাহবুব স্যার একেবারে ভারতের সীমান্তের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে সবুজে ঘেরা খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভারতের ডাউকি থানা ইত্যাদি অনেকক্ষণ ধরে অবলোকন করছিলাম। ইতিমধ্যেই দুপুর গড়িয়ে গেছে। এমদাদুল হক তরুণ স্যার হ্যান্ড মাইকে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সকলকে গাড়িতে চলে আসার জন্য বললেন। আমরা সবাই গাড়ির দিকে চলে আসলাম এবং স্ব স্ব গাড়িতে আরোহণ করলাম। এবার আমাদের ফেরার পালা। আমাদের গাড়িগুলো জাফলং ছেড়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। বেশ কিছু সামনে এগিয়ে ঘন সবুজ বৃক্ষ ঘেরা একটি ছায়াময় স্থানে আমাদের গাড়িগুলো থামানো হল। এবার ক্ষণ পিপাসা নিবারণের পালা। দীর্ঘ সফরে ক্ষুধায়-পিপাসায় অনেকেই কাতর। সবাই গাড়ি থেকে নামলেন। খাদ্য পরিবেশনের প্রস্তুতি চলল। ছাত্র-ছাত্রীদের পৃথকভাবে দুই স্থানে বসানো হল এবং খাদ্য পরিবেশন করা হল। শিক্ষার্থীদের খাওয়ার পর শিক্ষক, গাড়ির ড্রাইভার এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা খেলেন। তারপর এখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মিলে গ্রুপ ছবি তুললেন। পর্যটকরা এটা-সেটা ফেলে এই স্থানটিকে নোংরা করে ফেলেছিল। এমদাদুল হক তরুণ স্যার শিক্ষার্থীদের স্থানটি পরিষ্কার করার নির্দেশ দিলেন। শিক্ষার্থীরা আবর্জনা কুড়িয়ে এক জায়গায় স্তূপীকৃত করে রাখল। স্থানটি হয়ে গেল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। এখানে প্রায় ঘন্টা খানেক বিরতির পর আমরা সবাই গাড়িতে উঠে পড়লাম এবং আমাদের গাড়ির বহর স্কুলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হল। ফেরার পথে আমরা হরিপুর বাজার পার হয়ে আমরা যাত্রা বিরতি করলাম। রাস্তার পাশে গাড়িগুলো রাখা হল। গাড়ি থেকে নেমে আমরা সকলেই উথলা নামক পুকুর দেখার জন্য গ্রামের কাঁচা রাস্তা দিয়ে পায়ে হেঁটে রওয়ানা দিলাম। উথলা হচ্ছে হরিপুরের পরিত্যক্ত গ্যাসফিল্ড। এখানে একটি পুকুরের পানির নীচে থেকে গ্যাস বুদবুদের ন্যায় উপরে উঠছে। বুদবুদের উপর আগুন দিলে পানির উপর আগুন জ্বলে উঠে। আবার গ্যাস জ্বলে নিঃশেষ হলে আগুন নিভে যায়। উথলা নামক পুকুরে যাওয়ার সময় আমরা গ্রামের একটি ছোট মাঠে সমবেত হলাম। এখানে শিক্ষা সফর উপলক্ষে র‌্যাফেল ড্র-এর আয়োজন করা হল। ঐদিন ঘটনাক্রমে সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সম্ভবত হরিপুরে বেড়াতে এসেছিলেন। তিনি আমাদের সমাবেশের নিকটে আসলেন। আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক মাহফুর রহমান মোল্লা স্যার মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে স্বাগত জানালেন এবং র‌্যাফেল ড্র-এর উদ্বোধন করার জন্য অনুরোধ করলেন। মেয়র সাহেব র‌্যাফেল ড্র-এর উদ্বোধন করে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ যাবৎ এখানে র‌্যাফেল ড্র অনুষ্ঠিত হল এবং বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হল। এখানে বেশ মজা করা হল। তারপর আমরা শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই উথলা নামক পুকুরটি দেখার জন্য রওয়ানা হলাম। তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল। তাই আমরা খুব দ্রুত হেঁটে প্রায় মিনিট দশেকের মধ্যে উথলা নামক পুকুরে পৌঁছে গেলাম। পুকুরের একদিকে পাকা ঘাটের মত তৈরি করে রাখা হয়েছে। আমরা এই পাকা ঘাটের উপর উঠে পুকুরের দৃশ্য দেখতে লাগলাম। সত্যিই বুদবুদের মত পানির নীচ থেকে গ্যাস উপরে উঠছে। কেউ কেউ দিয়াশলাইয়ের কাটিতে আগুন ধরিয়ে বুদবুদের উপর ছুড়ে মারলেন। সাথে সাথেই পানির উপর আগুন ধরল এবং গ্যাস জ্বলে যাওয়ার সাথে সাথেই আগুন নিভে গেল। ব্যাপারটি আমার নিকট ম্যাজিকের মত মনে হল। প্রায় দশ মিনিটের মত এই অদ্ভুত দৃশ্যটি অবলোকন করে আমরা সকলে আবার আমাদের গাড়ির দিকে রওয়ানা হলাম। ইতিমধ্যেই সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে। আমরা খুব তাড়াতাড়ি হেঁটে গাড়ির নিকট আসলাম এবং স্ব স্ব গাড়িতে উঠে পড়লাম। আমাদের গাড়ির বহর আবার স্কুলের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করল। আমি সিলেট থাকি বিধায় পীরের বাজারে আসার পর গাড়ি থেকে নেমে গেলাম এবং আর সবাই স্কুলে চলে গেলেন। আমি পীরের বাজার থেকে সিএনজি অটোরিকশায় সিলেট শহরে চলে আসলাম।
শেষ হল আমাদের আনন্দের শিক্ষা সফর। এই শিক্ষা সফরে আমরা অনেক কিছু দেখেছি এবং অনেক আনন্দ উপভোগ করেছি। শিক্ষা সফরে অনেক কিছু দেখার এবং শেখার আছে। বছরে একদিন হলেও আমরা কিছুটা আনন্দ উপভোগ করার এবং বিনোদনের সুযোগ পেলাম। এই দিনের মধুর স্মৃতি আমাদের সকলের জীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT