সাহিত্য

লোকসাধকদের আত্মানুসন্ধানের গল্প

দেবাশীষ রনি প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৫-২০১৯ ইং ০০:২১:১০ | সংবাদটি ৭৯ বার পঠিত

বইটি প্রকাশ করেছে : প্রথমা প্রকাশন।
মূল্য রাখা হয়েছে ২৪০ টাকা।
লোকসংস্কৃতির প্রতি আমার ছোটবেলা থেকেই টান রয়েছে। তাই সুফিবাদে সম্পৃক্ত বাউল-ফকির সম্পর্কে জানার আগ্রহটা একটু বেশিই কাজ করে। প্রথমা থেকে প্রকাশিত লোকসংস্কৃতি গবেষক সুমন কুমার দাশের ‘বাউলের আখড়ায় ফকিরের ডেরায়’ বইটির নামসহ প্রচ্ছদ যখন ফেসবুকে দেখি তখন থেকেই বইটি হাতে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কয়েকবার সিলেটের বইয়ের দোকান বাতিঘর, বইপত্র এবং নিউনেশন লাইব্রেরিতে গিয়েও খোঁজ নিয়েছিলাম বইটি এসেছে কি না জানার জন্য। বইটির লেখক সুমনদার কাছেও খোঁজ নিয়েছিলাম বই সম্পর্কে। শেষমেশ বইটি হাতে পেয়ে যখন পড়া শুরু করি তখন বইয়ের নেশায় ডুবে একরাতেই শেষ করি ১১৯ পৃষ্ঠার বইটি। জেনে নেই বাউল-ফকিরদের অচেনা ভুবন সম্পর্কে। বইয়ের শুরুটা হয়েছে আমার নিজ জেলা সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার শাহ আরেফিনের ওরসের গল্প দিয়ে। তাহিরপুরের জাদুকাটা নদী তীরে শাহ আরেফিনের ওরস প্রায় ৭০০ বছর ধরে হয়ে আসছে। প্রতিবছর দোল উৎসবের ১৩ দিন পর শাহ আরেফিন স্মরণে আস্তানা বসিয়ে উৎসব হয়। তখন শত শত ফকিরের ডেরা, হাজার হাজার সাধু-ফকিরের ঘোরাফেরায় মুখর থাকে ওরস প্রাঙ্গণ। সেই ওরসে আসা ফকিরদের টুকরো টুকরো গল্প দিয়ে বইয়ের শুরু।
‘রাত ততটা গভীর নয়। বড়জোর আটটা বা নয়টা হবে। তারপরও মনে হচ্ছে যেন গভীর রাত। সামান্য দূরে, হাত দশেকের দূরত্ব হবে হয়তো, জ্বলছে নো-ম্যানস ল্যান্ডে সারি সারি সড়কবাতি। সেই বাতির আলোয় ভারতের ওপাশের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশের উঁচু সব টিল ঘন অন্ধকারেও আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে। আর ওপাশে, বাংলাদেশ সীমান্তের জিরো পয়েন্টের যেখানটায় আমি দাঁড়িয়ে, তার একটু পেছনে স্থানে স্থানে ফকির-ফকিরানি-সাধু-তান্ত্রিক-অলি-দরবেশদের অস্থায়ী আস্তানা। তাঁদের ভাষায় যা কাফেলা হিসেবেই অভিহিত।’ বইয়ের শুরুর দিকের হুবহু লাইন এগুলো। যেখান থেকে লোকসাধকদের অচেনা ভুবনের আশ্চর্য ও কৌতূহলোদ্দীপক গল্পে প্রবেশ। এরপর লেখক একটির পর একটি কাফেলায় যাচ্ছিলেন। একেকজন ফকিরের সঙ্গে গল্প করছিলেন। অসংখ্য ফকিরের টুকরো টুকরো গল্পগুলো এতোটা সুন্দরভাবে বইয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন যেন পড়ার সময় মনে হচ্ছিল, আমি নিজে শাহ আরেফিনের ওরসে উপস্থিত থেকে তা উপভোগ করছিলাম। ওরসের জায়গাটি আমার নিজের চেনা হওয়ায় কি না গল্পগুলো যেন একটু বেশিই আকৃষ্ট করেছিল আমাকে। বইয়ের পাতায় তুলে ধরা ফকিরদের কথাগুলো অনেক মুগ্ধ হয়ে পড়েছি। নতুন করে তাদের সম্পর্কে অনেক তথ্য জেনেছি। মেঘালয়ের পাহাড়ের গুহা এবং তাহিরপুরের আস্তানা ঘিরে প্রায় ৭০০ বছর ধরে ওরস হয়ে আসছে। এতো বছর ধরে ওরস হয়ে আসছে সেটি আমার এতোদিন জানাই ছিল না। যেখানে গানের মাধ্যমে, জিকিরের মাধ্যমে, ধ্যানের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার প্রেমে মশগুল থেকে সাধনা করেন সাধকেরা। করেন সৃষ্টিকর্তার সন্ধান। জানার চেষ্টা করেন নিজেকে। এই যে, সর্বপ্রথম নিজেকে জানা কিংবা আত্মানুসন্ধান করা, সেটি আমার কাছে সবচেয়ে দরকারি মনে হয়েছে। প্রত্যেক মানুষের আগে নিজেকে জানাটা জরুরি। অথচ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমাদের হেলায় হেলায় দিন ফুরায়। ভাবি না, আর কি হবে এমন আমাদের এই মানবজনম?
একটি বিচিত্র ঘটনার কথা উল্লেখ করি। ওরসের কাফেলায় আল্লার নৈকট্যলাভের প্রত্যাশায় মগ্ন ফকিরেরা বৈষ্ণব সহজিয়া সাধকের গানও কণ্ঠে তুলেন। এমনই এক দৃশ্যের কথা বইয়ে উল্লেখ রয়েছে। যেখানে সুফিবাদে সম্পৃক্ত ফকিরেরা বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্তের গান গাইছেন। সুফিবাদ আর চৈতন্যবাদ মিলেমিশে যেন একাকার। নেই কোনো সাম্প্রদায়িক মনমানসিকতা। তাঁদের কাছে জাতপাত বড় বিষয় নয়। লৌকিক ধর্মের আসল প্রাচুর্য এখানে। আসলেই কত বিচিত্র আমাদের এই লোকবাংলার লোকভুবন।
বাউল-ফকির সম্পর্কে জানার পাশাপাশি আরেকটি বিষয় আমাকে অনেক মুগ্ধ করেছে। সেটি হচ্ছে শক্তিসাধক কিংবা তন্ত্রসাধক সম্পর্কে জানা। আমি যে এলাকায় বড় হয়েছি সেখানে সাধু-সন্ন্যাসী-শক্তিসাধকের বিচরণ ছিল। আমাদের ভাটি অঞ্চলে তাঁদের দেখা পাওয়া যায়। অন্য অঞ্চলের খবর আমি জানি না। এইসকল সাধকেরা বিস্ময়ে হতবাক হওয়ার মতো অনেক ক্রীড়া প্রদর্শন করে থাকেন। বইয়ের শেষদিকে এমন এক সন্ন্যাসী-তন্ত্রসাধকের সম্পর্কে বলা হয়েছে। তাঁর নাম উজ্জ্বল চন্দ্র ভদ্র। যিনি জাদুকাটা নদীতে অনুষ্ঠিত পণাতীর্থে আসা দর্শনার্থী-পুণ্যার্থীদের সামনে বিস্ময়কর সব ক্রীড়া প্রদর্শন করছিলেন। একটি ক্রীড়া এমন যে, এই তান্ত্রিক ধারালো রামদা অনবরত চক্রাকারে ঘোরাচ্ছেন আর কিচ্ছুক্ষণ পরপর খানিক দূরত্বে অর্ধ-উদলা গায়ে দাঁড়ানো এক যুবকের পেটে কোপানোর ভঙ্গিতে আঘাত করছেন। এই দায়ের আঘাতে যুবকটির রক্তক্ষরণ তো দূরের কথা, সামান্য দাগরেখাও অঙ্কিত হচ্ছিল না। এমন কাজ তান্ত্রিকদের পক্ষেই সম্ভব। আর আমাদের মতো সাধারণ লোকজনের এসব দেখলেই গায়ের লোম খাঁড়া হয়ে যাওয়ার কথা। ধারালো দায়ে স্টান হয়ে শুয়ে পড়া কিংবা জিহ্বায় লোহার লম্বা সুই ফুটানো কিংবা বড়শি পিটের চামড়ায় গেঁথে শূন্যে ঝুলিয়ে ঘোরানোর মতো দৃশ্যগুলো ছোটবেলা থেকেই আমি দেখে আসছি। তাই অনেকটা জানতাম সাধু-তান্ত্রিকদের সম্পর্কে। আগে প্রতিবছর চড়কপূজা দেখা হতো। মূলত এই চড়কপূজা আয়োজন করেন সন্ন্যাসীরা। আমার নিজ গ্রামেও এমন একজন সন্ন্যাসী ছিলেন। বাড়িও মোটামুটি আমাদের বাড়ির পাশাপাশিই ছিল। যিনি প্রতিবছর চড়কপূজার আয়োজন করত। প্রতিবছর এমন বিস্ময়কর ক্রীড়া দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠায় খুব একটা বিস্ময় কিংবা ভয় জাগত না মনে। বরং নির্ভয়ে উপভোগ করতাম। বইটি পড়ে জীবনকৃষ্ণ দাস নামে এক সাধক সম্পর্কে জেনেছি। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এই তন্ত্রসাধক ব্রাহ্মণ না হয়েও নিজ হাতে পূজা দেন। অথচ আমাদের ব্রাহ্মণ ছাড়া পূজা হয় না। সে ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘গভীর শ্রদ্ধায় মায়ের পূজা যে কেউ করতে পারেন। ঠিকমতো মন্ত্র আওড়ালেই হলো, সেটা ব্রাহ্মণ হোক আর শূদ্রই হোক। সাধনপথের পথিক হলেই হলো, মাকে ডাকার মতো ডাকতে পারলেই হলো।’
বাংলার গ্রামে-গঞ্জে যেসব সাধক-বাউল-ফকির-তান্ত্রিক রয়েছেন, তাদের প্রায় সবাই আমাদের কাছে অনেকটা অপরিচিত। তাঁদের সাংস্কৃতিক জীবনধারা আমরা জানি না। তাদের আলাদা মরমিজগত সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। তাঁদের জীবনযাপন, সংগীতচর্চা আর সাধনার কথা খুব কমই আলোচিত হয়েছে কিংবা আমরা জানতে পেরেছি। লেখকের মেলা-উৎসব-উরস, মাজার-মন্দির-শ্মশান, ডেরা-আখড়া ঘুরে এইসব অচেনা ভুবনের আশ্চর্য ও কৌতূহলোদ্দীপক গল্প এতোটাই সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন বইটিতে, যেন পড়ার সময় লেখকের স্থানটিতে নিজেকে স্থাপন করে নিয়েছিলাম। ছোট ছোট গল্পগুলো পড়ে মনে হচ্ছিল, স্বয়ং নিজে উপস্থিত থেকে এইসব দেখছি, জানছি। অসংখ্য সাধকের জীবনের টুকরো টুকরো গল্পগুলো পড়ে প্রবেশ পেয়েছি তাদের আলো-আঁধারের রহস্যময় জগতে। বইটি না পড়লে হয়তো এইসব সাধকদের ভেতরের খবর কখনই জানা হতো না। এতো এতো মানুষের ভিড়ে আমরা অন্যকে চেনার চেষ্টা যতটুকু করি, নিজেকে চেনার চেষ্টা হয়তো ততটুকু করি না। আর বাউল-ফকিরেরা আগে নিজেকে চেনার চেষ্টা করেন। আমরা যখন গান শুনি তখন হয়তো গানের কথাগুলোর মাহাত্ম্য বুঝার চেষ্টা কমই করি। অথচ গান কান পেতে শুনতে হয় না, মন দিয়ে শুনতে হয়।
বাউল-সাধকেরা মানুষকে ভালোবাসার মন্ত্রে বিশ্বাসী। শুরুর দিকে জাদুকাটা নদী তীরের ফকিরদের নিয়ে আর শেষের দিকে একই জায়গায় তান্ত্রিকদের নিয়ে গল্পগুলো ছিল মনোমুগ্ধকর। প্রান্তিক লোকসাধকেরা একেকজন তথ্যের ভা-ার। সেসব ভা-ার থেকে লোকসাধকদের আলো-আঁধারের রহস্যময় জগতের বিষয়-আশয় লেখক যেন আপন মনে ঢেলে দিয়েছেন বইটিতে। আর সেগুলো প্রবেশ করেছে আমার মস্তিষ্কে। প্রয়াত বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম বলেছিলেন, ‘একদিন এই পৃথিবী বাউলের হবে’। আমার ধারণা, পৃথিবীটা বাউল-ফকিরদের হলে আরও সুন্দর হতো। এই পৃথিবী লোকসাধকের হোক, বাউল-ফকিরের হোক। এমন একটি মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ বইটির বহুল পাঠকপ্রিয়তা কামনা করছি।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT