সাহিত্য

চাঁদহীন আকাশ

আবদুস সবুর মাখন প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৫-২০১৯ ইং ০০:২২:০৭ | সংবাদটি ২০০ বার পঠিত

মোবাইল ফোনে রিং বেজে উঠতেই ঘুম ভেঙে যায় নয়নের। একা ঘরে দিন আর রাতের পার্থক্য ভুলে গেছে সে। ঠাহর করতে পারে না সে রাতে ঘুমিয়েছিলো না দিনের বেলা। চোখ মেলে তাকায়। কাঁচের জানালা ভেদ করে দিনের আলোক রশ্মি পর্দার ফাঁক দিয়ে এসে পড়ছে ছোট্ট ঘরে। তখনই তার মনে পড়লো সময়টা দিনের বেলা; আর দিনের মধ্যভাগেই ঘুমিয়েছিলো সে। সর্যটা পশ্চিমে হেলান দিয়েছে। তাই সূর্যের মিষ্টি আলো নয়নের ছোট্ট ঘরটিতে ঢুকে লুটোপুটি খাচ্ছে। সে এ-ও উপলব্ধি করলো যে, এখন বিকেল হয়ে গেছে। ঘন্টা কয়েক ঘুমানোর পর যে যন্ত্রটির শব্দে ঘুম ভাংলো সেই মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে কল রিসিভ করে নয়ন। অপর প্রান্তে নারীকন্ঠ ‘হ্যালো’ চেনা অচেনার দ্বন্দ্ব। এক মুহূর্ত ভেবে নেয়ার সময়টুকুও দেয়নি মেয়েটি। সে নিজেই পরিচয় দিয়ে বলে,
-একটা খবর দিতে ফোন করেছি। এই বলে যে খবরটি জানালো, সেটা সাধারণ কোন সংবাদ নয় যে, শুনে কেউ বিচলিত হবে না। রীতিমতো একটা ভয়াবহ দুঃসংবাদ। ফোন করে অঞ্জনার ছোট বোন। বলে-
-আপার মারাত্মক অসুখ হয়েছে।
-কী হয়েছে?
-আপার তো ক্যান্সার হয়েছে। শয্যাশায়ী দীর্ঘদিন ধরে। - নয়ন খবরটির সত্যতা যাছাই করতে চাইলো। বললো-
-তোমার আপাকে দাও।
-আপা ঘুমে। - নয়ন ভাবলো নিজের মেয়ের সঙ্গে আলাপ করলে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে যাবে। বললো-
-আমার মেয়েকে দাও। - কিন্তু কী এক অজুহাতে তার মেয়ের সঙ্গেও আলাপ করতে দেয়া হয়নি। নয়নের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। ভাবে তাকে একটা মিথ্যা সংবাদ দিয়ে বিচলিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মোবাইল ফোনটা বন্ধ করে রেখে দেয় বিছানায়। বাইরে তাকায়। বিকেলের রোদেলা আকাশে অকস্মাৎ জমে গেছে মেঘের ছায়া। বিলেতের আকাশে এমনই। এই রোদ, এই বৃষ্টি; এই শীতল, এই উত্তাপ। এসবের কোন কিছুই আন্দোলিত করে না নয়নকে। খুলে যায় তার ভাবনার দোয়ার। নিমেষেই চলে যায় সে প্রিয় জন্মভূমি- শ্যামল সবুজ বাংলাদেশে। মনে পড়ে যায় দেড় যুগ আগের স্বপ্নতাড়িত রোমাঞ্চিত দিনগুলোর কথা। যখন তার চোখ দু’টি জুড়ে শুধুই অঞ্জনা। অঞ্জনাময় রাজ্যে সারা দিন মান বিচরণ ছিলো তার। অপরূপা-অপ্সরা নয় সে। ঘন কালো চুল, পটলচেরা চোখ, একহারা গড়নের শাড়ি পরিহিত শ্যামলা বরণ আটপৌরে বাঙালি ললনা। প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ার ঘটনা ঘটে যায় নয়নের জীবনে।
ব্যস্ত ঈদের বাজার। ব্যস্ততম মার্কেটের সিঁড়ি বেয়ে উঠার মুহূর্তে মুখোমুখি হয় মেয়েটি। চোখে চোখ পড়ে। কিছু না বলে নয়নের পাশ কেটে চলে যায় মেয়েটি ফুটপাত ধরে; হারিয়ে যায় জনারণ্যে। নয়ন চোখ ফেরায়। সিঁড়ি মাড়িয়ে ওপরে ওঠে, আর ভাবে মেয়েটির কথা। তার মনে হয়- এই মেয়েটিকেই সে খুঁজে বেড়াচ্ছে এতোদিন। সেদিন আর কেনাকাটায় মন বসে না নয়নের। দুয়েকটা দোকান ঘুরেই রওয়ানা দেয় বাসার উদ্দেশ্যে। চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড়ায় রিকশার জন্য। এমনিতেই এই জায়গাটিতে জনসমাগম থাকে বেশি, তার ওপরে ঈদের বাজার; আর ইফতারেরও বেশি দেরী নেই। তাই এই চৌরাস্তার মোড়ে তখন মানুষে গিজ গিজ করছে। হাত তুলে একটি খালি রিকশা দাঁড় করাতে যাবে, এমন সময় সে অনুভব করলো পেছনে কারও সঙ্গে ধাক্কা লেগেছে তার। এ-ও মনে হলো যে, যার সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে, তিনি সম্ভবত একজন মহিলা। পেছন ফিরে তাকাতেই সে চমকে ওঠে। দেখে মার্কেটের সিঁড়িতে দেখা ওই মেয়েটিই দাঁড়িয়ে আছে। কিছুটা লাজুক কিছুটা ভয়ার্ত চাহনি তার। যথাসম্ভব ন¤্র ভদ্র স্বভাবের নয়ন মুহূর্তেই নিজের দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে দু’হাত জোর করে বলে-
-সরি, আপনাকে দেখতে পাইনি।
-সরি বলার কোন দরকার নেই। বরং আমারই ক্ষমা চাওয়া উচিত। আমি একটু অন্যমনস্ক ছিলাম, তাই এই ঘটনাটি ঘটেছে।
-সেটা আপনার বিনয়। তা ঠিক আছে। দোষ হলে দু’জনেরই। - হেসে ওঠে নয়ন। বলে-
-এবার না হয় আপনাকে একটা রিকশা ডেকে দিয়ে আমার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করি।
-আর আমার? - বলেই মনে হয় মেয়েটি একটু হাসলো; অবশ্য সেটা খুব একটা বোঝা যায়নি।
-আপনার প্রায়শ্চিত্ত হবে পরে একদিন।
-কীভাবে?- রিকশায় উঠতে উঠতে বলে মেয়েটি।
-হয়ে যাবে দেখা একদিন এভাবেই। আমরা তো এক শহরেই থাকি। - পকেট থেকে নয়ন তার একটি ভিজিটিং কার্ড বের করে দিলো মেয়েটির হাতে।
সময় যায়। নয়ন অপেক্ষায় থাকে। কখন বুঝি ফোন দিয়ে বসবে মেয়েটি। কখনও ভাবে, যদি মেয়েটির ফোন নাম্বারটি রেখে দিতো তাহলে সে নিজেই ফোন দিয়ে ফেলতো এতোদিনে। অবশেষে প্রতীক্ষার অবসান ঘটে। ঈদের ছুটির পর প্রথম খোলার দিনেই অফিসের ফোন নাম্বারে আসে কল। দু’টি রিং বাজতেই রিসিভার তুলে নয়ন।
-হ্যালো। এটা কি.... নাম্বার?-
কাঁপা কাঁপা কন্ঠ মেয়েটির।
-হ্যাঁ ঠিক আছে। - নয়ন যদিও চিনে ফেলেছে মেয়েটিকে, তারপরেও কনফার্ম হতে চাইলো। বললো-
-কে আপনি?
-আমার নাম অঞ্জনা। সেদিন আপনার সঙ্গে শহরের চার রাস্তার মোড়ে দেখা হয়েছিলো...। এই থেকে শুরু কথার বিনিময়, দূরালাপনীতে। এভাবে দু’জন কাছে আসে কথায় কথায়, গল্পে গল্পে।
অথচ বড্ড হেয়ালী স্বভাবের মেয়েটি যদিও একটু কাছে আসে, পরক্ষণে চলে যায় দূরে, আরও দূরে। নয়নের হা-হুতাশ বাড়ে, অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হয়। কর্মস্থল, ঘরদোর, বন্ধু, আত্মীয় স্বজন সবই বিস্বাদ মনে হয় তার কাছে। কখনও ছোট্ট শহরের ফুটপাত- পিচঢালা পথ হয় তার একাকীত্বের সঙ্গী। কখনও নদীর তীরে বসে ঢেউ গোনা, আর ঢেউয়ে ঢেউয়ে একটি মুখচ্ছবি এঁকে নেয়া। কতো রাত যে তার নির্ঘুম কেটেছে সেই হিসাব রাখেনি সে। জোসনা ধোয়া পূর্ণিমা রাতে ছাদের ওপর একা একা রেলিংয়ে হেলান দিয়ে কল্পনায় আঁকে তার মানবীকে। শোনায় তাকে কবিতা-গান। অকস্মাৎ ঘোর কাটে তার। ভরা চাঁদ মধ্য আকাশে জানান দেয় রাতের আর বেশি বাকী নেই। ধীরে ধীরে চাঁদ পশ্চিমে ঢলে পড়বে; মুয়াজ্জিনের কন্ঠে ভেসে আসবে মধুর ধ্বনি। তারপর দিনের যাত্রা ঘোষণা করবে পূবের সূর্যটা।
নয়নের মধ্যে অস্থিরতার মাত্রা বাড়তে থাকলেও সে হাল ছাড়ার পাত্র নয়। লেগে থাকে সে। সময় অসময় ছুটে যায় অঞ্জনাদের বাড়িতে। কথা হয়, গল্প হয়। হাসি-ঠাট্টা, খুনসুটি। চোখে চোখে কথাও হয়। কিন্তু কথা হয় না মনে মনে। অঞ্জনার কাজল কালো অঞ্জনে নিজের ছবি দেখতে চায় নয়ন। প্রবেশ করতে চায় অঞ্জনার হৃদ-গহ্বরে। পারে না। রুদ্ধ দ্বারে মাথা ঠুকে বারবার। অবশ্য সে এও জানে যে, মানুষের সাধ্যের অতীত কিছুই নেই। মানুষের শ্রমেই তো উষর মরুতে সবুজের সমারোহ ঘটে। একটা প্রবল আত্মবিশ্বাস থেকে সে মরা নদীর বুকে পাল তোলা নৌকার ছুটে চলার দৃশ্য অবলোকন করার আশায় বসে থাকে তীরে।
যথারীতি সেই দিনও রিকশা করে ছুটে চলেছে নয়ন অঞ্জনাদের বাসার পথ ধরে। ওই পথে কতো আসা যাওয়া! বিরক্তি এসে গেছে তার। এই পথ চলার শেষ কোথায়? এ কথা ভেবে একটু বিমর্ষ হয়ে পড়ে সে। বাসার গেইটটি অঞ্জনা আজ নিজেই খুলে দিলো। সম্ভবত বাসায় আর কেউ নেই এখন। ঘরে বিদ্যুৎ নেই। লোডশেডিং। ড্রইং রুমের লাগোয়া বারান্দায় চেয়ারে বসে পড়ে নয়ন। পাশে আরেকটি চেয়ার এনে বসে অঞ্জনাও। নয়নের চেহারায় মলিনতার ছাপ দেখে প্রথম কথা বলে অজ্ঞনাই-
-কী হলো আজ? -কিছুই বলে না নয়ন; তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে আকাশের দিকে। শরতের আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছিল। সূর্যের ডুবে যাওয়ার মুহূর্তে রক্তিম আভা মেঘের টুকরোগুলোর ঔজ্জ্বল্য বাড়িয়ে দিয়েছে। ভাবে নয়ন- এই মেঘের টুকরোগুলোরে একে অন্যের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটে, বজ্রপাত হয়, বৃষ্টি হয়; দর্পচূর্ণ হয় মেঘের। কিন্তু আমার আকাশতো মেঘশূন্য, বৃষ্টি হবে কী করে? আত্মমগ্ন নয়নের কাঁধে ডানহাত রাখে অঞ্জনা আলতো করে। শিহরিত হয় নয়ন, শিরায় শিরায় রক্ত সঞ্চালনের মাত্রা বেড়ে যায়। অঞ্জনার এই কোমল হাতের ছোঁয়ার জন্যই সে প্রতীক্ষায় ছিলো এতোদিন। মাথা ঘুরিয়ে তাকায় অঞ্জনার দিকে। মুহূর্তেই পাল্টে যায় দৃশ্যপট। মলিন চেহারা হয়ে যায় উজ্জ্বল। নয়ন তার ডান হাতটি বা কাঁধে অঞ্জনার হাতের উপর রাখলো। হাত সরিয়ে নিলো না অঞ্জনা। বরং হাতটি তার যেন অবশ হয়ে গেলো। নয়নের হাতের মুঠোয় অঞ্জনার হাত। সে অঞ্জনার চোখে চোখ রাখে। মদিরতা মাখানো চোখ দুটি তার। চার চোখের মিলনের অপূর্ব সন্ধিক্ষণ। কেউ কিছু মুখে বলে না। চোখও পলকহীন। ততোক্ষণে আকাশে শরতের চাঁদ উঁকি দিয়েছে। নয়নের হাতের মুঠো থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে অঞ্জনা চাঁদের দিকে হাত তুলে বলে-
-ওই দেখো চাঁদটা কেমন পূর্ণ হয়ে উঠছে; হয়তো কালই শরতের আকাশের চাঁদটি পূর্ণতা পাবে। ওরা ভরা পূর্ণিমায় ভেসে যাবে। শহর-গ্রাম সবকিছু।... ‘এই মধুচাঁদ আর এই জোসনা- তুমি আমি পাশাপাশি দুজনা...’ গলা ছেড়ে গান ধরে অঞ্জনা, লুটিয়ে পড়ে নয়নের কাঁধের ওপর। নয়ন আলতো করে জড়িয়ে ধরে; কিছুই বলে না অঞ্জনা। যেন শর্তহীন আত্মসমর্পণ। এমনি করেই একদিন পাথর গলে; একটু একটু করে দুর্বল হয়ে পড়ে নয়নের প্রতি অঞ্জনা। তার বুকের গহীনে ছোট্ট ঘরে ঠাঁই পেয়ে যায় নয়ন। দু’টি পাখীর একটি ছোট্ট সুখের নীড় গড়ে তোলার আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তারা। স্বপ্ন রূপ নেয় বাস্তবে। ঘটা করেই বিয়ে হয়ে যায় নয়ন-অঞ্জনার। বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই তারা পাড়ি জমায় সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে।
নতুন দেশ। ভিন্ন আবহাওয়া আর ভিন্ন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে খুব একটা সময় লাগেনি নয়নের। নিবিষ্ট চিত্তে নেমে পড়ে জীবনযুদ্ধে। ঘর সংসার আর কর্মস্থল এগুলোই হয়ে ওঠে তার যাপিত জীবনের প্রথম এবং শেষ অনুসঙ্গ। বাউন্ডুলে জীবনটা বুঝি একটু থিতু হলো; এমনই একটা আত্মতৃপ্তি পেয়ে বসে নয়নকে। দিন যায় রাত যায়। জাগতিক নিয়মেই সবকিছু চলতে থাকে আপন গতিতে। এই রোদ এই বৃষ্টির খেলা যেমন বিলেতের আকাশের চিরাচরিত ধর্ম, তেমনি সেখানকার মানুষগুলোও যখন তখন রং বদলের খেলায় মত্ত। নয়ন লক্ষ করে ধীরে ধীরে যেন বদলে যাচ্ছে মনের মানুষটি। যেন তার কাছ থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। অঞ্জনার এই পরিবর্তন যতোটুকু ভাবায় নয়নকে, তার চেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে তাকে অঞ্জনার প্রতি। কিন্তু বিনিময়ে আকর্ষণ নয়, বরং বিকর্ষণই দেখতে পায় সে অঞ্জনার মধ্যে। এক ঘরে থেকেও দু’জন ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা। বাড়তে থাকে দূরত্ব। নিজ ঘরে পরবাসী নয়নের অন্তরে দিবানিশি কষ্টের দহন।
অঞ্জনার সঙ্গে পরিচয়, মন দেয়া নেয়ার খেলা-আর দাম্পত্য জীবন-সব মিলিয়ে এক দশক। এই দীর্ঘ সময়টুকু কীভাবে জীবন খাতা থেকে মুছে ফেলা যায়, কীভাবে ভুলে থাকা যায় বুকের মানিক সন্তানদের? এই সব প্রশ্নের জবাব খুঁজে পায় না নয়ন। তবে জবাব জানে অঞ্জনা। আর তাই সে বলেই ফেললো-
-আমার আর সহ্য হচ্ছে না।
-কী?
-এই সংসার, সন্তান লালন পালন সবকিছু।
-নয়ন ব্যাপারটিকে হালকাভাবে নিতে চাইলো-
-তবে কি সংসার ত্যাগ করে বৈরাগী হতে চাও? - একটু হাসে নয়ন। কিন্তু অঞ্জনার ঠোঁটে হাসির চিহ্নমাত্র নেই। বরং চোখে অবজ্ঞা ঘৃণা ফুটে ওঠে-
-ছাড়ো তোমার ইয়ার্কি। বৈরাগী হলে তুমি হও।
-কিন্তু কীসে তোমার অরুচি? কীসে তোমার শান্তি? - অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করে নয়ন।
-আমার অরুচি কী, তুমি বুঝো না? - বুঝে নয়ন; তবে নিজের পরাজয়ের কথাটি ঘটা করে বলতে সংকোচবোধ করছে। তবে কতোক্ষণ চুপ থেকে নিজের ব্যক্তি সত্তাকে বাঁচিয়ে রাখবে।
-অরুচি যদি আমাকে নিয়ে হয়, তবে খোলাখুলি বলো। আমি তোমার সম্মুখ থেকে চলে যাবো; দেখবে তখন তোমার সর্বাঙ্গে শান্তির বাতাস পরশ বুলিয়ে যাবে। কিছুই বলে না অঞ্জনা। তার মৌনতাকে সম্মতি হিসেবেই মনে করে নয়ন। আর তাই স্বাভাবিকভাবেই অঞ্জনার কাছে, ছেলে মেয়েদের কাছে নিজেকে অপাংক্তেয় মনে হতে থাকে। নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করে। জগৎ সংসারের মায়া-মমতা, রক্তের বাঁধন, সবই মিথ্যে, এমনটি ভাবতে চায় না সে। ভাবতে পারে না। কিন্তু ভাবনার অতীত যা, তা-ই ঘটে চলেছে তার জীবনে।
নয়নের প্রিয় একটি গানের কলি ‘দুই ভুবনে দুই বাসিন্দা বন্ধু চিরকাল, রেল লাইন বহে সমান্তরাল’ অনেকটা তার জীবনে বাস্তব হয়ে গেলো। দুই মেরু দুই বিপরীত মুখে ধাবিত হতে থাকলো। ঝড়ে তছনছ হয়ে গেলো একটি সাজানো বাগান। আবারও যাযাবর জীবনকে বেছে নিতে হয় নয়নকে। এ জন্যে দায়ী করতে চায় না কাউকে সে। তবে এটা তার ‘নিয়তি’ বলেও মেনে নিতে পারে না। যুদ্ধ হয় নিজের সঙ্গেই। অতীতকে পেছনে ফেলে নতুন করে পথচলা শুরু করতে পারে না। ফেলে আসা দিনগুলোর সুখ-স্মৃতি তাকে আড়ষ্ট করে সারাক্ষণ। জীবন খাতার পুরনো পাতাগুলো ছিঁড়ে ফেলতে পারে না সে। বরং সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হারানো দিনগুলো আরও উজ্জ্বল হয়ে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ভেসে ওঠে সন্তানদের মুখচ্ছবি। কাতর হয়ে পড়ে পিতৃ¯েœহে। কিন্তু মনের ক্যানভাসে সন্তানদের ছবি এঁকে নেয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না নয়ন। আর এভাবেই সান্তনা খুঁজতে চায় সে। সময় সবকিছুর নিয়ামক। সময়ের পরিক্রমায় এক পর্যায়ে পাথরে বুক বাঁধে। বছরের পর বছর একাকীত্বের যন্ত্রণায় ভুগতে ভুগতে সবকিছু সহনীয় হয়ে যায়। বুক পিঞ্জরে যে ক্ষুদ্র একটি স্থান দখল করেছিলো অঞ্জনা, তা-ও উধাও হয়ে যায়। কিন্তু থেকে যায় সেখানে সন্তানদের দেখতে না পারার কষ্ট-হাহাকার!
যাপিত জীবনের প্রতিটি দিন-সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা-রাত কাটছে তার স্বাভাবিক নিয়মেই। সেখানে নেই কোন বৈচিত্র্য, নেই কোন নতুনত্ব। যথারীতি সকালে ঘুম থেকে ওঠে নিজের হাতে কিছু তৈরি করে খেয়ে নিয়ে অফিসে যাওয়া, আর বিকেলে ফিরে আসা। মাঝে মধ্যে বন্ধু স্বজনদের সঙ্গে ফোনে আলাপ। নয়নের আটপৌরে জীবনের এই হলো বর্তমান দৈনন্দিন কার্যতালিকা। এর মধ্যেই একদিন পরিচিত একজনের ফোন-
-খবর জানেন কিছু?
-কোন খবর?
-অঞ্জানার?
-নাহ। -খুব একটা জানারও ইচ্ছে হয় না তার। অপর প্রান্তের লোকটি বলে-
-অঞ্জনা তো মারা গেছে। গত সপ্তাহে। আপনি জানেন না? বলেনি কেউ?
-না। আর কোন শব্দ বের হয় না নয়নের মুখে। পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় ও সবচেয়ে অপরাধী হিসেবেই নিজেকে মনে হয়। এক সময় যার জন্যে নিজের জীবনটাই বাজি রাখতে পিছপা হতো না সে। অথচ এখন তার অসুস্থতার খবরটিও সে বিশ্বাস করছে না। শেষ পর্যন্ত সেই মানুষটির পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার খবরটিও কি বিশ্বাস করবে না। মৃত্যু সংবাদ নিয়ে তো আর কেউ মিথ্যে বলে না। চাঁদহীন, কনকনে শীত আর বৃষ্টি মুখর ছিলো বিলেতের সেই রাতটিও। এর চেয়ে কষ্টের রাত আর কখনও আসেনি নয়নের জীবনে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT