সাহিত্য

লেটো গানের দলে নজরুল

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৫-২০১৯ ইং ০০:২২:৪৪ | সংবাদটি ২৩৬ বার পঠিত

হাজার বছরের বাঙালির ঋদ্ধ ইতিহাসের ধারায় অন্যতম এক বাঙালির নাম কাজী নজরুল ইসলাম। একজন ¯্রষ্টা এবং কর্মযোগী মানুষের নাম নজরুল। সাহিত্য ও সংগীতের মাধ্যমে একটি জাতিকে জাগিয়ে তোলেন যিনি, তিনিই নজরুল। ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে এক প্রবল প্রাণ বিদ্রোহী নাম কাজী নজরুল ইসলাম। মানবতার তুর্যবাদক এক সেনানীর নাম নজরুল, অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক সংহত রূপের নাম নজরুল। পত্রিকার মাধ্যমে জাগাতে চান যিনি, প্রেমের অধরা মাধুরীর কথা কবিতা ও গানে শোনান যিনি, স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ান যিনি, শাস্ত্রাচার- লোকাচার সাম্প্রদায়িক শক্তির বিপক্ষে কলম ধরেন যিনি তিনিই প্রেম ও দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
তার জন্ম ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২ মে, বাংলা ১৩০৫ সনের ১১ জ্যৈষ্ঠ পরাধীন ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার জাম্বুরিয়া থানার অন্তর্গত চুরুলিয়া গ্রামে। তার পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ ও পিতামহের নাম কাজী আমিন উল্লাহ। তার মাতার নাম জাহেদা খাতুন ও মাতামহের নাম মুনশী তোফায়েল আলী। নি¤œ মধ্যবিত্ত অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা নজরুল মাত্র ৮ বছর বয়সে পিতৃহীন হন। ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে পিতার ইন্তেকালের সময়ে তিনি গ্রামের মক্তবে পড়তেন। পিতার মৃত্যুর পর আর্থিক অনটনে নজরুলের লেখাপড়া সুষ্ঠুভাবে চলেনি। অনেক কষ্ট সহ্য করে ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে নি¤œ প্রাইমারী পরীক্ষায় পাশ করে সেই মক্তবেই শিক্ষকতা শুরু করেন। পাশাপাশি হাজী পালোয়ানের মাজার ও পীর পুকুর মসজিদের খেদমতের কাজ নেন।
কাজী নজরুল ইসলামের জীবনে তার চাচা কাজী বজলে করীমের প্রভাব অপরিসীম। লোকসংস্কৃতির প্রতি কবির যে আগ্রহ সৃষ্টি হয় তার মূলে ছিলেন চাচা বজলে করীম। ছোট বেলাতেই কবি চাচার কাছে ফারসি ভাষা শিখতেন এবং তার প্রভাবেই তিনি ছোট বেলায় উর্দু-ফারসি মিশ্রিত বাঙলায় পদ্য রচনা শুরু করেন। কাজী বজলে করিম ছিলেন লেটো দলের ওস্তাদ। কবি চাচার লেটো দলের সাথে যুক্ত হয়ে নিজে লিখে গ্রামে-গ্রামে গান গেয়ে বেরিয়েছেন। মাত্র ১১-১২ বছর বয়সেই তিনি লেটো দলের জন্য শকুনিবধ, মেঘনাদ বধ, রাজপুত্র, চাষার সঙ প্রভৃতি গীতিনাট্য ও প্রহসন এবং মারফতি, পাঁচালি ও কবিগান রচনা করে ‘ছোট ওস্তাদজী’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। অত্যন্ত অল্প সময়ে লেটোর কাহিনি রচনায় তিনি এতটা পারদর্শিতা দেখান যে, আশপাশের গ্রামের লেটো দলের প্রধানরা তার কাছে পালা লেখাতে আসতেন এবং তাদের লেঠো দলে গান গাওয়াতে নিয়ে যেতেন। এ সময় তিনি বেশ কিছু দিন লেটো দলে ছিলেন।
লেটো গান চুরুলিয়া তথা বর্ধমান জেলার আঞ্চলিক লোকগীতি। শুধু বর্ধমান নয় পার্শ্ববর্তী বীরভূম, হুগলী ও নদিয়া জেলাতেও এ গানের ব্যাপক প্রচলন ছিল। নাট্য থেকে ‘লেটো’ শব্দের উদ্ভব। যে গানে নাট্যের ভাব আছে, তাই লেটো গান। অর্থাৎ এ গান অভিনয়াদি সহযোগে পরিবেশিত হয়। শুধু অভিনয় নয়, এতে নাচ ও বাদ্যের স্থান আছে। অন্য কথায় গান, নাচ, অভিনয় ও বাদ্য সমন্বয়ে লেটো গান এক মিশ্র রীতির সংগীতধারা। মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও রাজশাহী জেলায় প্রচলিত ‘আলকাপ’ একই রীতির লোকসংগীত। উভয়ই দলীয় সংগীত, উন্মুক্ত মঞ্চে রাতভর পরিবেশিত হয়। প্রধানত কৃষক সমাজ এসব গানের সমঝদার ও ভোক্তা। তারাই গানের দল গঠন করে, অবসরকালে মেলা ও নানাবিধ সামাজিক অনুষ্ঠানে লেটো গানের আয়োজন করে। গ্রামের কিশোর, তরুণ, যুবকরাই অনুষ্ঠানের মুখ্য ভূমিকা নিয়ে থাকে। লোক মনোরঞ্জনে জন্য আয়োজিত এসব লৌকিক অনুষ্ঠান সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকে। লেটো ও আলকাপ গানের গঠন প্রকৃতি ও পরিবেশরীতি বিশ্লেষণ করলে বাংলার বহুল প্রচলিত যাত্রাগান যে এর উৎস ভূমি তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
লেটো গান সাধারণত একটু বেশি রাতেই অনুষ্ঠান শুরু হয়। শুরুতেই বাদকের দল বিভিন্ন তালে বাদ্য বাজিয়ে আসর জমায়। চারজন সখি দর্শকদের ছালাম জানায় এবং নেচে বন্দনা গায়। সখিরা সাজঘরে ফিরে গেলে গায়ক এসে একক গান গায়। এরপর নারী-পুুরুষ এসে দ্বৈত গানের গান গেয়ে হাস্যরসের সৃষ্টি করেন। নাচ গানের পর শুরু হয় নাট্যাভিনয়, গদ্য ও পদ্য উভয় আকারে সংলাপ রচিত হয়। লঘুভাব ও হাস্য রসের এসব অভিনয় দেখে দর্শকরা প্রচুর আনন্দ উপভোগ করে থাকে। এসব লেটো গানের পালাতে থাকে দৈনন্দিন সংসার জীবন, দাম্পত্য জীবন থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক, পৌরানিক, কাল্পনিক নানা কাহিনি নিয়ে ছোট-বড় পালা লেখা হয়। এসবের কতক নাম এরূপ-স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া, জেলে ও জেলেনি আজব বিয়ে, অপূর্ব বিচার, দস্যু বাহরাম, মাটির কেল্লা ইত্যাদি।
লেটো গানের পুরো অনুষ্ঠানটি পরিচালক পূর্বেই ছক বেঁধে ও কুশীলবদের তালিম দিয়ে সাজিয়ে নেন, একে বাঁধা লেটো বলে। আরেক ধরনের লেটো আছে যাতে কবির লড়াইয়ের মতো দুই লেটো দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়। নজরুল ইসলাম এসব লেটো কবির লড়াইয়ে অংশ নিতেন এবং অন্যদের পরাজিত করে প্রায়ই পুরস্কার জিতে নিতেন। বর্তমানে লেটো গানের চর্চা ও জনপ্রিয়তা হ্রাস পেলেও লেটো গান বর্ধমান বীরভূম অঞ্চলে আজও টিকে আছে। কাজী নজরুল লেটো দলে যোগদানের পরে বিভিন্ন আসরে অসংখ্য গান পরিবেশন করেন। তার রচিত লেটো গান বর্ধমান ও বীরভূমে আজও প্রচলিত আছে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT