সাহিত্য

সৈয়দ শাহনুরের গান

কাউসার চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৫-২০১৯ ইং ০০:২৩:১৯ | সংবাদটি ২২০ বার পঠিত

মরমীবাদের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা ছিলেন আবু সুলায়মান আদ-দারানী। সুফীবাদের সংজ্ঞা প্রদান করে মারুফ আল-কারখী ‘সুফীবাদ’ কে খোদায়ী স্বত্তার উপলব্ধি বলে অভিহিত করেছেন। ভারতীয় সুফীবাদের মধ্যে হযরত খাজা মঈন উদ্দিন চিশতী (রহ:) সবার অগ্রভাগে। ঐ সময়কার শকরগঞ্জ (রহ:) ও হযরত নিজাম উদ্দিন আউলিয়া (রহ:)। সুফী সাধক হযরত সৈয়দ শাহনুর (রহ:) তাদেরই এক উত্তরসূরী।
মরমীবাদের মূলকথা হচ্ছে, আল্লাহ ছাড়া আর কিছুর বাস্তব সত্ত্বা নেই। আল্লাহ অনন্ত সৌন্দর্যের প্রতীক এবং আল্লাহকে পাওয়ার প্রধান পথই হচ্ছে প্রেম। সুতরাং প্রেমই মরমীবাদের মূল ভিত্তি। দুনিয়া ও আখেরাত সম্পর্কে নবী (সা:) যে বার্তা দিয়েছেন তার উপর ঈমান আনা এবং তা মেনে চলার মধ্য দিয়েই বান্দার পূর্ণতা লাভ করে। এ কারণেই সুফীসাধকরা ঈমানের বিষয়কে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন রূপে বর্ণনা করেছেন। সুফী সাধক সৈয়দ শাহনুর এর ভাষায় :
‘নুরে কাঁন্দে, কাঁন্দে নুরে ঈমানের লাগিয়া,/ হেলায় হারিলু ঈমান পাইমুনি খুজিয়া,/ হায় হায় রতন ধন হারিলু বিফলে,/ কি জুয়াব দিমু আমি হাশরের কালে।/ হুব লোভ খিদা নিদরা সংগে আইল বৈরী,/ লুভ ডাকাইত অবশেষে ঈমান কৈল চুরি।/ ষোল্ল আনা লইয়া আইলু এক আনা নাই,/ ঈমান ছাড়াইয়া দেয় তিরিপুত্র ভাই।/ ভবের ধনের কিম্মত আছে ঈমানের নাই,/ ঈমান দুর্লভ ধন বিফলে গোয়াই।/ সৈয়দ শাহনুরে কইন ঈমান বড় ধন,/ হেলায় হারিলু ঈমান অমূল্য রতন।’
সুফী সাধক ও অমর স্বভাব কবি সৈয়দ শাহনুর কত সালে এবং কোথায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন তা আজো নিশ্চিত করে কোন গবেষকই বলতে পারেননি। তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত কোনো গ্রন্থেই এ বিষয়ে সঠিক কোন তথ্যও পাওয়া যায়নি। তবে অনেক লেখক ও গবেষক সৈয়দ শাহনুরের জন্ম ১৭৩০ ইংরেজি সনে এবং ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত তিনি জীবিত ছিলেন বলে একাধিক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। সেই হিসেবে সৈয়দ শাহনুরের বয়স ছিল ১২৬ বছর। তবে চৌধুরী গোলাম আকবর সাহিত্যভূষণের মতে সৈয়দ শাহনুর দীর্ঘজীবী পুরুষ ছিলেন এবং তিনি ৩০০ বছর জীবিত ছিলেন। যদি ১৮৫৬ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন তাহলে তাঁর চলে যাওয়ার ইতোমধ্যে ১৬৬ বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে। হযরত সৈয়দ শাহনুর (রহ:) বর্তমান হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার জালালসাফ গ্রামে শায়িত আছেন। এই গ্রামকে জালালাপ বলে অনেকেই চিনেন।
গবেষক আশরাফ হোসেন সাহিত্যভূষণ যিনি সর্বপ্রথম সৈয়দ শাহনুর সম্পর্কে লিখেছিলেন। আশরাফ হোসেন সাহিত্যভূষণ তাঁর জন্মস্থান সম্পর্কে লিখেন, ‘সৈয়দ শাহনুর মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার কদমহাটায় জন্মগ্রহণ করেন’। কদমহাটা গ্রামটি মৌলভীবাজারের ইটা পরগনায় ছিল। অপর গবেষক দেওয়ান নুরুল আনোয়ার চৌধুরী লিখেন, ‘সৈয়দ শাহনুর হবিগঞ্জ জেলার দিনারপুর পরগনার (নবীগঞ্জ উপজেলা) জালালহাফ (জালালসাফ) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন’।
গবেষক আসদ্দর আলী লিখেন, ‘সৈয়দ শাহনুর জন্মেছিলেন মৌলভীবাজার মহকুমার (বর্তমান জেলা) মাজার আছে জালালসাফ গ্রামে’।
লেখক ফজলুর রহমান লিখেন, ‘সৈয়দ শাহনুরের জন্ম অষ্টাদশ শতকে লংলা পরগনার ঘড়গাও গ্রামে’।
লেখক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম লিখেন, ‘সৈয়দ শাহনুর মৌলভীবাজার জেলার অন্তর্গত ঘড়গাও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন’।
দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ লিখেছেন, ‘সৈয়দ শাহনুরের জন্মস্থান হবিগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে জেলা) জালালপুর গ্রামে’।
প্রাচীনতম সাহিত্য পত্রিকা আল ইসলাহ সম্পাদক মুহাম্মদ নুরুল হক লিখেন, ‘সৈয়দ শাহনুর উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে হবিগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে জেলা) জালালসাফ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
লোক সাহিত্যের গবেষক মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিন লিখেন, ‘শাহনুর শ্রীহট্ট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমার জালালসাফ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন’।
অধ্যাপক নৃপেন্দ্র লাল দাস লিখেন, ‘সিলেট জেলার মৌলভীবাজার মহকুমার এক গ্রামে সৈয়দ শাহনুরের জন্ম হয়েছিল’।
লেখক সৈয়দ আব্দুল্লাহ লিখেন, ‘মৌলভীবাজার জেলার কোন গ্রামে কবির জন্ম হয়েছিল তা সঠিকভাবে কেউ বলতে পারে না। কেহ কেহ মনে করেন কবি সৈয়দ শাহনুরের জন্ম হয়েছিল উক্ত জেলার ঘড়গাঁও গ্রামে’।
জালালসাফের ‘শাহনুর সাহিত্য সংসদের’ সম্পাদক আব্দুল মান্নান লিখেছেন, ‘উনবিংশ শতাব্দীর কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক ও দরবেশ হযরত সৈয়দ শাহনুরের জন্ম মৌলভীবাজার মহকুমার ঘড়গাঁও গ্রামে’।
লেখক তরফদার মোঃ ইসমাইল লিখেন, ‘সৈয়দ শাহনুর মৌলভীবাজার জেলার ইটা পরগনার রাজনগর থানার অন্তর্গত মনসুর নগর ইউনিয়নের কদমহাটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন’।
লেখক আব্দুল জব্বার লিখেছেন, ‘সৈয়দ শাহনুর মৌলভীবাজার মহকুমার রাজনগর থানার অন্তর্গত কদমহাটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন’।
উপরোক্ত লেখক ও গবেষকদের লেখায় সৈয়দ শাহনুরের জন্মস্থান হিসেবে তিনটি জায়গার নাম পাওয়া যায়।
১. সৈয়দ শাহনুর হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার জালালসাফ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিল এমন তথ্য ৫ জন লেখকের লেখায় পাওয়া যায়।
২. সৈয়দ শাহনুর মৌলভীবাজারের কদমহাটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এমন তথ্য ৩ জন লেখকের লেখায় উঠে এসেছে।
৩. সৈয়দ শাহনুর মৌলভীবাজারের ঘড়গাঁও গ্রামে জন্মেছিলেন বলে ৪ জন লেখক তাদের লেখায় উল্লেখ করেন।
তবে সৈয়দ শাহনুর মৌলভীবাজার জেলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে অধিকাংশ লেখক তাদের লেখায় উল্লেখ করেছেন।
সৈয়দ শাহনুর তাঁর একটি গানে কদমহাটার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি গানের একটি অংশে বলেন-
‘কদমহাটা বিনেছিরি/ শানুরে বানাইলা বাড়ী/ শানুর থাখইন চাড়াল পাড়ার মাঝে।
আবার তিনি বলেন-
‘কদমহাটা বিনেছিরি/ শানুরে না পাইলা বাড়ী/ শানুর থাখইন চাড়াল পাড়ার মাঝে।
গান দুটি ব্যাখ্যা করলে তিনি কদমহাটায় জন্মেছিলেন তা বুঝায় না। সৈয়দ শাহনুর তাঁর লেখনীতে নিজের জন্মস্থান সম্পর্কে কিছু না লিখলেও তিনি সৈয়দ বংশে জন্মেছেন সেটি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছেন।
সৈয়দ শাহনুর তাঁর কবিতায় উল্লেখ করেন-
‘জদ আমার নূর নবী’/ আমি সৈয়দ নছল’/ ‘জন্মদাতা ভজিয়া কহি/সৈয়দ নবু নাম।/ কলসী বিবি তনু বেহেস্তের ঘর’।
উল্লেখিত কবিতা পর্যালোচনা করলে বুঝা যায় যে সৈয়দ শাহনুরের পিতার নাম সৈয়দ নবু এবং মায়ের নাম কলসী বিবি। তিনি সৈয়দ বংশে জন্মগ্রহণ করেন।
সৈয়দ শাহনুরের পূর্ব পুরুষ সৈয়দ শাহ আলা উদ্দিন (রহ:) বাগদাদের বাসিন্দা ছিলেন। কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার পর হযরত ইমাম হোসেন (রা:) এর বংশে রইলেন হযরত ইমাম সৈয়দ জয়নাল আবেদীন (রহ:)। তাঁর থেকেই হোসেনী বংশ বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃতি লাভ করে। হোসেনী বংশেরই এক রতœ ছিলেন সৈয়দ শাহ আলা উদ্দিন (রহ:)। তিনি হযরত ইমাম জয়নাল আবেদীন (রহ:) হতে ষষ্টদশ পুরুষ ছিলেন। সৈয়দ শাহ আলা উদ্দিন (রহ:) এর চার পুত্র ছিলেন। তারা হলেন সৈয়দ শাহ বাহা উদ্দিন, সৈয়দ শাহ তাজ উদ্দিন, সৈয়দ শাহ রুকুন উদ্দিন ও সৈয়দ শাহ শামছুদ্দিন। সৈয়দ শাহনুর হলেন সৈয়দ শাহ রুকুন উদ্দিনের বংশধর। শাহ রুকুন উদ্দিন হলেন হযরত শাহজালাল (রহ:) এর সঙ্গী ৩৬০ আউলিয়ার একজন।
সৈয়দ শাহ নুরের বংশ বৃক্ষ বা নছবনামা হল-
সৈয়দ শাহ আলা উদ্দিন (রহ:)

সৈয়দ শাহ রুকুন উদ্দিন

সৈয়দ শাহ জায়ফর আলী

সৈয়দ শাহ আকবর আলী

সৈয়দ শাহ বাহাউদ্দিন

সৈয়দ শাহ নবু

সৈয়দ শাহ নুর।
বালক সৈয়দ শাহনুর শৈশবেই অন্যান্য বালকের চেয়ে ভিন্ন স্বভাবের ছিলেন। তিনি নিরিবিলি থাকতে পছন্দ করতেন। শৈশবে তিনি মাকে হারান। এর ফলে তিনি ভাবুক প্রকৃতির হয়ে ওঠেন। সিলেটে ফকিরি ধারার এক অসাধারণ কিংবদন্তির নাম সৈয়দ শাহনুর। অর্ধশতাধিক বছর পূর্বে শ্রীহট্ট সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকায় সৈয়দ শাহনুর সম্পর্কে লেখা হয়েছিল, যে যে ফকীরের কণ্ঠ-বাণীর সুরতরঙ্গে শ্রীহট্টের নিজস্ব কথায় অধ্যাত্মবাদ ফুটিয়া উঠিয়াছে, যাঁদের কথায় শ্রীহট্টের পল্লী ভাব-সাগরে সাঁতার দেয়, যাঁদের কাছে শ্রীহট্টের হিন্দুমুসলমান সমভাবে মাথা নোয়ায়, তাঁদের মাঝে সৈয়দ শাহনুর শীর্ষস্থানীয়’।
সৈয়দ শাহনুর বাল্যকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকায় ঘুরাঘুরি করতেন। এক সময় তাঁকে কেউ খুঁজেও পাননি। পরে সিলেটের গোলাপগঞ্জে ঢাকাউত্তর পরগনার রাণাপিং মৌজার পাশের পাহাড়ি মৌজা ঘুগায় বসবাসরত সাধক ফকির শাহ মঞ্জুুর আস্তানায় সৈয়দ শাহনুরকে পাওয়া গেল। অল্প সময় ও অল্প বয়সে সৈয়দ শাহনুর আধ্যাত্মিক ধারায় নিজেকে বিলিয়ে দিলেন। লেখক ও গবেষকদের অনেকে শাহ মঞ্জুর আলীকে সৈয়দ শাহনুরের মুর্শিদ বলে উল্লেখ করেছেন। অবশ্য কেউ কেউ শাহ চান্দ বা শেখ চান্দকে সৈয়দ শাহনুরের মুর্শিদ বলে উল্লেখ করেন। সৈয়দ শাহনুর তাঁর মুর্শিদের ব্যাপারে একটি গানে উল্লেখ করেছেন। সৈয়দ শাহনুর বলেন-
‘সৈয়দ শাহনুরের মুর্শিদ শাহ মঞ্জুর আলী/ নুরের তো শেষ নাই, নুর নাম খালী।/ পীরের পীর ভজিয়া কহি শাহ চান্দের চরণ/ মুর্শিদ শাহ মঞ্জুর আলী পীর শাহ চান্দ/ আমার গলে দেখিলাম প্রেম রসের ফান্দ’ ॥
ঘুগার পাহাড়ি পরিবেশে মুর্শিদের তত্ত্বাবধানে যুবক সৈয়দ শাহনুর নিজেকে আল্লাহর রাস্তায় উজাড় করে দিয়ে ইবাদাত-বন্দেগী শুরু করলেন। আল্লাহর প্রেমে বিভোর সৈয়দ শাহনুর গান গাইলেন। গানে সৈয়দ শাহনুর বললেন-
বন্ধুরে প্রেমের পিয়াসী বন্ধুরে/ বন্ধুরে তোর সনে পিরিতি করি/ ঘরে মুই না রইতে পারি। ধুয়া ॥/ দিবানিশি ঝুরিয়া মরি, তুই বন্ধের লাগিয়া ॥/ রাইতে দিনে চাইয়া থাকি পথ নিরিখিয়া।/ বন্ধুরে সইতে না পারি দুখে সদা জ্বলে হিয়া/ স্বপনে দেখিলু বন্ধু, না পাই জাগিয়া।/ বন্ধুরে সৈয়দ শাহনুরে কয় উদাসিনী হইয়া।/ কি দোষে পরানের বন্ধু না চাও ফিরিয়া ॥
(অসমাপ্ত)

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT