শেষের পাতা সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ শিক্ষার্থীরা দুর্ভোগে

শাবিতে আবাসিক হল বন্ধ

আরাফ আহমদ, শাবি প্রতিনিধি প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৫-২০১৯ ইং ০২:৩১:০৩ | সংবাদটি ৮০ বার পঠিত

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল আবাসিক হল গতকাল শুক্রবার বিকেলে বন্ধ করে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। হল থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বের করে দেওয়ায় বিপাকে পড়েছে অনেক শিক্ষার্থী। ঈদের ছুটিতে সনাতন ধর্মসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের থাকার কোনো ব্যবস্থা না করায় অসন্তোষ এবং ক্ষোভ দেখা দিয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে। হল বন্ধ থাকায় মেয়েদেরকে সব চেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। বিকল্প কোনো থাকার ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই ক্যাম্পাস ছাড়তে হয়েছে তাদের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়- ‘গ্রীষ্মকালীন ও পবিত্র ঈদ উল ফিতরের ছুটি উপলক্ষে ২৪ মে শুক্রবার বিকেল ৫টার মধ্যে শিক্ষার্থীদেরকে হল ছেড়ে দিতে হবে এবং ১৩ জুন সকাল ৯টার পর তারা হলে প্রবেশ করতে পারবে।’ এছাড়া রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, একই ছুটি উপলক্ষে ১৫ মে থেকে ১৩ জুন পর্যন্ত বিশ^বিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।
হল বন্ধের এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য দীর্ঘদিন থেকে দাবি জানিয়ে আসছেন শিক্ষার্থীরা। ছুটির দিনে হল খোলা রাখার দাবিতে বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্যের সাথে সাক্ষাৎও করেছেন একদল শিক্ষার্থী। উপাচার্যের পক্ষ থেকে সন্তোষজনক কোনো আশ^াস পাননি বলে জানান আবাসিক শিক্ষার্থী মো. তৌহিদুজ্জামান।
এদিকে, শিক্ষার্থীদের দাবিকে উপেক্ষা করে হল বন্ধের বিষয়ে অটল রয়েছে শাবিপ্রবি প্রশাসন। শিক্ষার্থীদেরকে হল থেকে বের করে দেওয়ার জন্য বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট এবং পানির লাইন বন্ধ করে দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থী জানান, শিক্ষার্থীদের হল ছাড়া করতে গত শুক্রবার সন্ধ্যার পরপরই হলের দু’তলা থেকে পাঁচ তলা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ও পানির লাইন বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে হল কর্তৃপক্ষের দাবি পানি ও বিদ্যুৎ সংস্কারের কারণে এসব লাইন বন্ধ করে রাখা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. এসএম হাসান জাকিরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘২৪ মে’র পর থেকে হলে হলে পানির পাম্প স্থাপন, লাইন পরিষ্কার ও ইলেক্ট্রিক এর সংস্কার কাজ করা হবে এবং কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসবের সংযোগ বন্ধ থাকবে।’
ক্যাম্পাস সূত্রে জানা যায়, শাবিপ্রবি’র হল বন্ধের কোনো নিয়ম না থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ‘বিতর্কিত’ উপাচার্য অধ্যাপক ড. আমিনুল হক ভূইয়ার মেয়াদের শেষ সময়ে আবাসিক হল বন্ধের রীতি চালু হয়। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বন্ধ করার জন্য এবং সংঘর্ষের আশংকা থেকে বেশ কয়েকবার হল বন্ধ করা হয়। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে ছাত্রলীগের সংঘর্ষের ঘটনায় তৎকালীন উপাচার্য হল বন্ধ করে দিলে শিক্ষার্থীরা দিনভর আন্দোলন করে এবং হল ও ক্যাম্পাস খুলে দেওয়ার দাবিতে উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরবর্তীতে আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হল খুলে দিতে বাধ্য হয়েছিল। এর পরবর্তীতে প্রতি বছরই ছাত্রলীগের সংঘর্ষের অযুহাত দেখিয়ে হল বন্ধ করে আসছে শাবিপ্রবি প্রশাসন।
এদিকে, বেশ কয়েকজন আবাসিক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এই বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক পরিবেশ অনেকটাই শান্ত। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বন্ধের রীতি না থাকলেও শিক্ষার্থীদের সাথে কোনো ধরনের কথা না বলে হল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সাবেক উপাচার্যের একটি বিতর্কিত অনিয়মকে নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে বলে আবাসিক শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘মাসের শেষের দিকে হঠাৎ করে হল বন্ধ করে দেওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়েছে। আমাদের টিউশনি রয়েছে। টিউশনির টাকা দিয়ে অনেকে পড়ালেখা চালায়। তাছাড়া, আমার মাস্টার্স পরীক্ষা চলছে এবং আমি চাকরির জন্যও প্রস্তুতি নিচ্ছি। এভাবে লম্বা ছুটিতে হল বন্ধ করে দিলে আমাদের পড়ালেখায় সমস্যা হবে। আর আবাসিক শিক্ষার্থীদেরকে হঠাৎ করে বের করে দিলে তারা থাকার জায়গা কোথায় পাবে?’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মেয়েদের হলের এক শিক্ষার্থী জানান, ‘আমার টিউশনি রয়েছে এবং চাকরির জন্য পড়াশোনা করছি। ৩০ মে’র পর বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। এখন অনেকটা বাধ্য হয়েই আমাকে ক্যাম্পাস ছাড়তে হয়েছে।’
কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে জানা যায়, বিগত বছরগুলোতে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকা সত্ত্বের যে সকল শিক্ষার্থী হলে রয়ে যেতো, হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঈদের দিন তাদের জন্য বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করা হতো।
আরেক শিক্ষার্থী নিখিলেশ কর বলেন, ‘আমি হলে ভর্তি এবং হলের নিয়মিত একজন শিক্ষার্থী। এই ছুটিতে সনাতন ধর্মাবলম্বী এবং মুসলিম বাদে অন্য ধর্মের শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য কোনো ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। বাধ্য করে অন্যান্য ধর্মের লোকদের বাড়িতে পাঠানো হচ্ছে। আমাদের তো ঈদ নেই আমরা কোথায় যাবো? অন্যান্য ধর্মের যাদের বাড়ি সিলেট থেকে দূরে তারাই বা কি কারণে এখন বাড়ি যাবে? তাছাড়া সবাই তো আর উচ্চবিত্ত পরিবারের নয়, মধ্যবিত্ত এবং নি¤œ মধ্যবিত্ত ও গরিব পরিবারের সন্তানরাও এখানে থেকে পড়ালেখা করে। তাদেরকে নিজেদের টাকা ইনকাম করে পড়ালেখা চালাতে হয়। তাদের বিষয়টি প্রশাসনের বিবেচনায় রাখা উচিৎ ছিল। এছাড়া আমাদের ক্লাসের ছেলে-মেয়ে সবারই ৩০ মে পর্যন্ত ইন্টার্নশিপ রয়েছে। আমাদের থাকার কোনো ধরনের ব্যবস্থা না করে হল বন্ধ করে দেওয়ায় আমরা বিপাকে পড়েছি। স্বপ্নীল দাশ রাজন বলেন, ‘হলে থাকা আমাদের অধিকার। এখানে বন্ধ পরবর্তী পরীক্ষা, ব্যক্তিগত পড়ালেখা ও টিউশনির চাপ তো রয়েছেই। আমাদের অনেকেরই এতো বড় সময় বাড়িতে থাকার কোনো বাস্তবতা নেই।’
বিদ্যুৎ ও পানির লাইন বন্ধের বিষয়ে আবাসিক শিক্ষার্থী মো. তৌহিদুজ্জামান ও দ্বীন বন্ধু সরকার বলেন, ‘ছাত্ররা তাদের অধিকার বলে বার বার হলে থাকার দাবি জানালেও প্রশাসনের অনড় সিদ্ধান্ত খুবই অগণতান্ত্রিক এবং সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে যেভাবে বিদ্যুৎ বন্ধ করেছে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যতের জন্য অশনি সংকেত।’
সাধারণ শিক্ষার্থীরা যখন হল বন্ধে অসন্তুষ্ট তখন রাজনৈতিক চাপের কারণে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হল খোলা রাখার দাবি জানাতে পারছে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ছাত্রলীগের নেতাকর্মী জানান, হল খোলা রাখার জন্য আমরা হল প্রশাসনের সাথে কথা বলতে গেলে গ্রুপের নেতারা হল থেকে নেমে যাওয়ার জন্য চাপ দেন। অনেকটা বাধ্য হয়েই আমরা হল বন্ধের প্রতিবাদ করতে পারি না।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করলে রাজনৈতিক চাপের কথা অস্বীকার করে বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রুহুল আমিন বলেন, ‘ছাত্রলীগের সকল নেতাকর্মী সমান। যেকোনো বিষয়ে তারা সবাই হল প্রভোস্ট, প্রক্টরের সাথে কথা বলতে পারে।’
কোন পরিস্থিতির কারণে এই বছর হল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে তা জানতে বেশ কয়েকজন হল প্রভোস্টের সাথে যোগাযোগ করে এই প্রতিবেদক। পরিস্থিতির বিষয়টি খোলাসা করতে রাজি নন হল প্রভোস্টরা। যোগাযোগ করলে সৈয়দ মুজতবা আলী হলের প্রভোস্ট সহযোগী অধ্যাপক ড. আসিফ ইকবাল হল বন্ধের বিষয়ে কোনো ধরনের মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এবিষয়ে শাহপরান হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান খান বলেন, ‘আমার একার পক্ষে হল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্তের সময় উপাচার্য, প্রক্টর, ছাত্র উপদেষ্টা, হলের প্রভোস্টবৃন্দসহ প্রশাসনের অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এর আগেও আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে দায়িত্ব পালন করেছি তখন হল খোলা রাখা হত। ঐসময়েও সবার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হল খোলা রাখা হয়েছিল।’
হল বন্ধের বিষয়ে একই কথা বলেছেন মেয়েদের বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রভোস্ট সহযোগী অধ্যাপক শরীফা ইয়াসমিন।

 

শেয়ার করুন
শেষের পাতা এর আরো সংবাদ
  • ইউপি চেয়ারম্যানদের গ্রাম আদালত বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ প্রয়োজন
  • জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ বিশ্বে অনন্য উদাহারণ : শেখ হাসিনা
  • আগামী দিনে ভারত ও বাংলাদেশের আইসিটি সেক্টর একযোগে কাজ করবে
  • জঙ্গিবাদ নিরসনে বাংলাদেশকে রোড মডেল হিসেবে গণ্য করা হয়
  • কমলগঞ্জে ডোবায় পড়ে শিশুর মৃত্যু
  • বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ আ.ন.ম শফিককে প্রধানমন্ত্রীর ৫ লক্ষ টাকা অনুদান প্রদান
  • মনু ও ধলাই নদী ড্রেজিং না হওয়ায় হুমকিতে মৌলভীবাজারবাসী
  • হবিগঞ্জ পৌরসভার ২০১৯-২০ অর্থবছরের সোয়া ৮৫ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা
  • হবিগঞ্জে মানবাধিকার সুরক্ষায় সচেতনতা ও আইনগত সহায়তা বিষয়ক মতবিনিময় সভা
  • সিলেটে আজ তাপমাত্রা হ্রাস ও বৃষ্টি হতে পারে
  • ‘কর্পোরেট লিডারস টক’ সেমিনারে ভিসি প্রতিনিয়ত কারিকুলাম আপডেট করে লিডিং ইউনিভার্সিটি
  • জামালগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল
  • মোহাম্মদ মকন মিয়ার ২৬তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত
  • মোহাম্মদ মকন মিয়ার ২৬তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত
  • জেলার মাসুদ পারভেজ মঈনের ইন্তেকাল
  • গোলাপগঞ্জে প্রতিপক্ষের হামলায় সাংবাদিকসহ আহত ২ ॥ শাস্তির দাবীতে সাংবাদিকদের সভা
  • নগর উন্নয়নে সিটি কাউন্সিলরদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে
  • শাবি’র ৩টি বার্ষিক প্রতিবেদনের মোড়ক উন্মোচন
  • ৮০৫৩ কোটি টাকার ১১ প্রকল্প একনেকে অনুমোদন
  •   মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ধ্বংসে একমাস সময় দিল
  • Developed by: Sparkle IT