স্বাস্থ্য কুশল

রোগ প্রতিরোধে ছোলা

মো. জহিরুল আলম শাহীন প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-০৫-২০১৯ ইং ০০:৫০:৩১ | সংবাদটি ৮২ বার পঠিত

মহান আল্লাহর নিকট অশেষ শুকরিয়া তিনি বিভিন্ন ফলের মধ্যে অসংখ্য নিয়ামত লুকিয়ে রেখেছেন যা আমাদের শরীরকে সুস্থ্য রাখতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে, তারমধ্যে ছোলা একটি। স্বাস্থ্যকর খাবারের মধ্যে ছোলা একটি উল্লেখযোগ্য খাবার। পবিত্র রমজান মাসে ইফতারিতে ছোলা সকল পরিবারের একটি সমাদৃত খাবার। সারা রাত ভিজিয়ে রেখে মসলা দিয়ে ভেজে ইফতারির সময় খাওয়া আমাদের ঐতিহ্যের একটি অংশ। শুধু রমজান মাস নয় ছোলা সারা বছরই খাওয়া দরকার। সারা বছরই ছোলা বাজারে পাওয়া যায়। এটি মুখরোচক ও শরীরে প্রচুর শক্তি দেয়। ছোলা একটি গুরুত্বপূর্ণ ডাল জাতীয় শস্য। এটি কাঁচা, ভেজে ও ডাল হিসেবে রান্না করে খাওয়া যায়। বাংলাদেশে এটি বুট নামে পরিচিত। ছোলা থেকে বেসন তৈরী হয়। যা থেকে বিভিন্ন প্রকার খাবার তৈরী করা হয়। ছোলার বৈজ্ঞানিক নাম ঈরপবৎ ধৎরবঃরহঁস উদ্ভিদ জগতের চধঢ়রষরড়হধপবধব গোত্রের উদ্ভিদ।
রাসায়নিক উপাদান : পরিণত বীজের প্রধান উপাদান শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট। এতে আরো আছে ফ্ল্যাভোন, আইসোফ্ল্যাভোন, অক্সালিক, অ্যাসিটিক ও ম্যালিন এসিড। অঙ্কুরিত ভীজে থাকে এনজাইম, আলফা-গ্যালাকটোসাইডেজেস, লেসিথিন, ফাইটিন, স্যাপোনিন। বীজের লিপিডে থাকে স্টেরয়েডাল পদার্থ, মূলে থাকে সেডিকাগল এবং ১২ অক্সিমিথাইল কমেস্টেরল।
পুষ্টি উপাদান : পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে প্রতি ১০০ গ্রাম শুকনো বীজে পুষ্টি উপাদান নি¤œরূপÑ জলীয় অংশ ৯.৯ গ্রাম, প্রোটিন ২০.৪ গ্রাম, শর্করা ৬০.৯ গ্রাম, ফ্যাট বা ¯েœহ ৫.৬০ গ্রাম, খনিজ পদার্থ ৩ গ্রাম, আঁশ ৩.৯ গ্রাম, আয়রণ ১০.২ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ২০২ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ৩১২ মিলিগ্রাম, ভিটামিন এ ১২৯ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি-৩ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি-১ ০.৪৮ মিলিগ্রাম, বি-২ ০.১৮ মিলিগ্রাম, খাদ্যশক্তি ৩৮৫ কিলোক্যালরি। তাছাড়া মলিবেডনাম, ম্যাঙ্গানিজ, ফলেট, কপার, ম্যাগনেসিয়াম। যা শরীরের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
উপকারিতা : ছোলা অত্যন্ত পুষ্টিকর একটি খাবার। এতে শর্করা, আমিষ, ¯েœহ, লৌহ, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন এ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। বিশেষ করে শর্করা পরিমাণ বেশী হওয়ায় এ খাদ্য প্রচুর কর্মক্ষমতা ও শক্তি উৎপন্ন হয়। শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্যের প্রধান কাজই হলো শক্তি উৎপন্ন করা। শর্করা খাদ্য প্রোটিন ও ফ্যাট সংশ্লেষণে অংশগ্রহণ করে। এই জাতীয় খাদ্য প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করতে পারে। সে কারণেই শর্করা খাদ্যকে প্রোটিন বাঁচানো খাদ্য বলে। দেহের যকৃত পেশীতে সঞ্চিত গ্লাইকোজেন প্রয়োজনে গ্লোকোজ রূপান্তরিত হয়ে রক্তের শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে। প্রোটিন দেহের বৃদ্ধি কোষ গঠন ও ক্ষয় পূরণ করার প্রদান কাজ। তাছাড়া দেহস্ত উৎসেচক হরমোন সৃষ্টি ও অপরিহার্য অ্যামাইনো এসিডের চাহিদা পূরণ করাও প্রোটিনের অন্যতম কাজ। প্রোটিন দেহে এন্টিবডি তৈরিতে সাহায্য করে। তাছাড়া দেহে এনজাইম ভালো করে কাজ করতে সাহায্য করে। তাছাড়া ছোলাতে প্রচুর পরিমাণ ফ্যাট বা ¯েœহ পদার্থ পাওয়া যায়। ফ্যাট দেহে তাপ শক্তি উৎপন্ন করে এবং নিয়ন্ত্রণ রাখে। ফ্যাট মেদরুপে ভবিষ্যতের খাদ্যের উৎস হিসাবে সঞ্চিত থাকে। ফ্যাট অউ, ঊক ভিটামিনকে দ্রবীভূত রাখে এবং শোষণে সাহায্য করে। যকৃত হতে পিত্তরস ও অগ্ন্যাশয় থেকে অগ্ন্যাশয় রস নিঃসরণে সাহায্য করে। ¯েœহ পদার্থ মলাশয় ও পায়ু পিচ্ছিল করে মল নিঃসরণে সাহায্য করে। কোলেস্টেরল নামক ফ্যাট থেকে ভিটামিন ডি ইস্ট্রোজেন, টেস্টোস্টেরন নামক হরমোন উৎপন্ন হয়। ক্যালসিয়াম দেহের হাঁড় ও দাঁত গঠনে সহায়তা করে ও পেশীর সংকোচন, হৃদ স্পন্দন, রক্ত সঞ্চালনসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। বৃদ্ধ বয়সে ও মহিলাদের শেষ বয়সে মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ক্যালসিয়ামের অভাবে হাঁড়ের ‘অস্টিওপোরোসিস’ নামক রোগ দেখা দেয়। ফলে অতি সামান্য আঘাতে হাঁড় ভেঙে যায় এবং মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমে যায়। ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস সমন্বয়ে দেহের হাঁড় দাঁতের গঠন মজবুত থাকে। ক্যালসিয়ামের অভাবে ‘রিকেট’ রোগ দেখা দেয়। ছোলা তা প্রতিরোধ করে। সুতরাং নিয়মিত পরিমাণমত ছোলা খেয়ে এসব সমস্যা থেকে মুক্ত থাকা যায়। ছোলা খেলে খারাপ কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমে। ছোলাতে দ্রবণীয় ও অদ্রবণীয় উভয় ধরনের খাদ্য আঁশ থাকে। যা হৃদরোগের সমস্যা ও সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। ছোলাতে ফলিক এসিড আছে। তাই অল্প বয়সী নারীরা ছোলা খেলে উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতা কমে যায়। বেশী পরিমাণ ফলিক এসিড খাবারে গ্রহণ করলে কোলন ক্যান্সার ও রেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে যায়। ছোলার ফলিক এসিড রক্তের এলার্জির পরিমাণ কমিয়ে দেয়। ফলে হাঁপানী বা এজমা প্রকোপ কমে যায়। ছোলার শর্করা বা কার্বহাইড্রেট ইনডেক্স কম খাওয়ার পর খুব তাড়াতাড়ি হজম হয়ে গ্লুকোজে পরিণত হয়ে রক্তে চলে যায় না অনেক সময় লাগে। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ছোলার শর্করা ভালো খাদ্য। ছোলায় প্রচুর পরিমাণে আঁশ থাকে। ছোলার আঁশ হজম হয় না এভাবেই খাদ্য নালী অতিক্রম করতে থাকে। তাই পায়খানার পরিমাণ বাড়ে এবং পায়খানা নরম হয়, ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়। আর মনে রাখবেন যাদের নিয়মিত পায়খানা হয় তাদের খাদ্যনালীতে কোন জীবাণু থাকে ফলে খাদ্যনালীতে ক্যান্সার হওয়ার প্রবণতা কমে যায়। ছোলা হজম হতে সময় লাগে তাই দীর্ঘক্ষণ শরীরে শক্তির যোগান দেয়। তাছাড়া ছোলার আঁশ রক্তে চর্বির পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে। ছোলাতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন এ পাওয়া যায়। যা শিশুদের রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে। সকলের চোখকে স্বাস্থ্যবান রাখে। এই ভিটামিন ‘রোডপসিন’ নামক এক ধরনের দর্শন সংক্রান্ত রঞ্জক পদার্থ তৈরী করে যা অন্ধকারে দেখতে সাহায্য করে। এ ভিটামিন দেহের এন্টিবডি তৈরি করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ভিটামিন এ-এর অভাবে চামড়া শুকিয়ে যায়, খসখসে মনে হয়, মুখের উজ্জলতা কমে যায়। শারীরিক বৃদ্ধি ও সন্তান জন্মদান ক্ষমতা কমে যায়। ক্যান্সার হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। ভিটামিন-এ-এর অভাবে ‘জেরোপথেলমিয়া’ নামক রোগ দেখা দেয়। এতে চোখ শুকিয়ে যায় ফলে চোখ অন্ধ হয়ে যায়। ছোলার অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ যাদের যৌন ক্ষমতা কম বা অতি সহজে বীর্যপাত হয় তারা ভাজা ছোলা গুঁড়ো করে দুইটেবিল চামচ গুঁড়োর সাথে চিনি খেজুরের গুড় এবং সর তোলা দুধের সাথে মিশিয়ে একটি বাতাস ঢুকতে পারে না এমন পাত্রে ভরে রাখুন। প্রতিদিন প্রয়োজনমত সকাল বিকাল খান সাথে শুকনো ৪/৫ টি খেজুর খান ইনশাআল্লাহ উপকার পাবেন। তবে মনে রাখবেন শুধু রমজান মাসই নয় সারা বছরই নিয়ম করে গ্রহণ করুন দেহকে সুস্থ রাখুন।
সতর্কতা : যাদের দেহের ওজন বেশী তারা ছোলা মসলা ও তেল দিয়ে ভেজে খাবেন না। এতে দেহের ওজন আরও বাড়বে। যাদের ছোলা খেলে গ্যাসের সমস্যা হয় তারা ভরা পেটে কম পরিমাণে খাবেন। বেশী পরিমাণে ছোলা খাবেন না এতে বদ হজম হতে পারে। অতি মাত্রায় ছোলা খেলে তার উচ্চমানের অক্সালিক এসিড থাকায় মূত্রনালীতে পাথর হতে পারে।

 

শেয়ার করুন
স্বাস্থ্য কুশল এর আরো সংবাদ
  • তুলসীর গুণাগুণ
  • এ সময়ের অসুখবিসুখ
  • এন্ডোমেট্রিওসিস : মহিলাদের একটি রোগ
  • হার্টের ১২টি উপসর্গ অবহেলা করবেন না
  • ধূমপান ছাড়ার কৌশল
  • রমজানে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার
  • ঘাড় ব্যথায় বালিশ ব্যবহারের সঠিক নিয়ম
  • ডায়াবেটিস নিয়ে যে তথ্য জানা প্রয়োজন
  • রোজার স্বাস্থ্য উপকারিতা
  • রোগ প্রতিরোধে ছোলা
  •   গরম মশলার গুণাগুণ
  • ফুড সাপ্লিমেন্টের অবিশ্বাস্য কাহিনী
  • রমযানে সুস্থ থাকুন
  • রোগ নিরাময়ে লিচু
  • আগরের যত গুণ
  • উচ্চ রক্তচাপ মুক্তির উচ্চতর গবেষণা
  • নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবনে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে
  • ব্যথানাশক ওষুধ নাকি ফিজিওথেরাপি
  • রোগ প্রতিরোধে তরমুজ
  • কণ্ঠনালির সমস্যা ও প্রতিকার
  • Developed by: Sparkle IT