ইতিহাস ও ঐতিহ্য

জল-পাহাড়ের ’কাঁঠালবাড়ি’

আব্দুল হাই আল-হাদী প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০৫-২০১৯ ইং ০১:২০:৫২ | সংবাদটি ১২৪ বার পঠিত


বড়হাওর। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী বড় হাওরগুলোর একটি। শুধু নামে নয়, সত্যিকার অর্থেই হাওরটি অত্যন্ত বড়। সে বিশালত্ব আর জীববৈচিত্র্যের প্রাচুর্য হাওরটির নামকরণ যেন সার্থক করেছে। প্রাচীনকালের কোন এক সময়ে প্রকৃতি যেভাবে এটিকে গঠন করেছিল, আজও এটি সেভাবে আছে। নিজের অফুরন্ত সম্পদ দিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি মানুষের প্রয়োজন মিটিয়েছে, যোগসূত্র স্থাপন করেছে এক জনপদকে আরেক জনপদের সাথে। সে হাওরের ঠিক মাঝখানে ঘন অরণ্যে আচ্ছাদিত পরপর সংলগ্ন কয়েকটি টিলা দাঁড়িয়ে আছে। অনন্ত দরিয়ার মাঝখানে জেগে ওঠা এ যেন এক ছোট দ্বীপপুঞ্জ! স্থানীয় মানুষের কাছে জায়গাটি ’কাঁঠালবাড়ি’ নামেই পরিচিত। অনেকেই আবার এটাকে ’সিলেটের ছেড়া দ্বীপ’ বলে থাকেন। নিসর্গের অপরূপ দান সে ’কাঁঠালবাড়ি’ পর্যটনের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে।
প্রদীপের নীচে অন্ধকারের মতো বড়হাওর নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। সিলেট সদর, গোলাপগঞ্জ, কানাইঘাট ও জৈন্তাপুরের প্রান্তসীমায় বড়হাওরের অবস্থান। সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের আগে এসব এলাকার মানুষ সহজ যোগাযোগের জন্য বড়হাওরকেই ব্যবহার করতো। সময়ের পরিক্রমায় স্থল যোগাযোগের উন্নয়নের ফলে হাওরটির ব্যবহার মানুষের কাছে খানিকটা কমে আসলেও এটির গুরুত্ব কিন্তু একটুও ম্লান হয়ে যায়নি। এখনও এখানে মানুষ মহিষ চরায়, মাছ ধরে, শিকার করে। বর্ষার ভরা যৌবনে এখানেই অনুষ্ঠিত হয় বাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। জীবন সংগ্রামে বেঁচে থাকার অন্যতম উৎস হিসেবে এখনও এ হাওর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
সে হাওরের বুক চিরে জেগে উঠেছে কয়েকটি অনুচ্চ টিলা। একত্রিতভাবে সেগুলো কাঁঠালবাড়ি নামেই পরিচিত। ভূপ্রকৃতির এক অনুপম সৃষ্টি এটি। অফিসিয়াল নথিপত্রে জায়গাটি লুন্থিয়া পাহাড় ও কুচিয়া নামে স্বীকৃত। সে পাহাড়গুলোতে আছে প্রচুর কাঁঠাল গাছ । মূলত: কাঁঠালগাছের আধিক্যের কারণেই জায়গাটির নামকরণ হয়েছে ’কাঁঠালবাড়ি’। কাঁঠালগাছ ছাড়াও এখানে আছে আম, জাম, লিচু, আনারস, তেজপাতা, লট্কন, পিঠাখারা, চাপালিশ, সেগুনসহ পাহাড়ের নানা প্রজাতির গাছ। একই সাথে পাহাড়ের নীচে পানির মধ্যে দেখা যায় হিজল, করচ, কদম, রাতা, মূর্তাসহ নানা প্রজাতির গাছ ও গুল্ম। হিজল আর করচের সারি দেখে মনে হয় যে, একদল প্রহরী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জায়গাটির সুরক্ষার জন্য। শুকনো মৌসুমে হাওরের ভেসে উঠা অংশের পুরোটাই ভরে যায় শন আর ইকড়বনে। এখানে আছে সমভূমির গাছ-পালাও। প্রাচীনকালের উঁচু-লম্বা গাছগুলো পুরো পাহাড়-টিলাতে এক অন্ধকার ভৌতিক পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। এখানে ভরদুপুরে নেমে আসে সন্ধ্যার মৌনতা, সন্ধ্যার আগেই নেমে আসে রাত্রির নিস্তব্ধতা। বন্যপ্রাণি আর পাখ-পাখালীর কলরব সত্যিই এক অসাধারণ অনুভূতির সৃষ্টি করে।
আগেই বলা হয়েছে, বড়হাওর সিলেট সদর, কানাইঘাট, গোলাপগঞ্জ ও জৈন্তাপুরের খানিকটা অংশ নিয়ে। কিন্তু কাঁঠালবাড়িটি পড়েছে কানাইঘাট অংশে। কানাইঘাট উপজেলার রাজাগঞ্জ ইউনিয়নে লুন্তিয়া ও কুচিয়া নামের দু’টি মৌজা নিয়ে কাঁঠালবাড়ির অবস্থান। সেখানে পাশাপাশি কিন্তু সামান্য দূরে দূরে প্রায় ৩০ টির মতো টিলা রয়েছে। এরমধ্যে ১৫/২০ টি টিলায় রয়েছে মানুষের বসতবাড়ি। প্রায় ২৫ টি পরিবারের ২০০ জন মানুষ এখানে বসবাস করে। মানুষদের প্রায় সবাই-ই হাওরের মাছ ধরার সাথে জড়িত। অল্প কিছু মানুষ মহিষ,গরু ও হাস-মুরগীর চাষাবাদের উপর নির্ভরশীল। ভৌগলিকভাবে প্রায় বিচ্ছিন্ন সভ্যতার ছোঁয়া বহির্ভূত ’প্রাকৃতিক মানুষগুলো’ যেন এক সম্পূর্ণ আলাদা পৃথিবীর বাসিন্দা । সেথায় নেই কোন বাজার কিংবা পাঠশালা। মানুষগুলো নিত্যপ্রয়োজনীয় ২/৪ জিনিস ছাড়া বাকি সব দিক থেকেই স্বনির্ভর।
কাঁঠালবাড়িতে বাঙালিদের বসতি স্থাপনের ইতিহাস খুব পুরনো নয়। বীরদল ও তালবাড়ি গ্রামের কিছু বাসিন্দা প্রায় ৫০/৬০ বছর আগে সেখানে বসতি স্থাপন করে। নামকরণ ও ঐতিহাসিক সূত্রে জায়গাটির গুরুত্ব ও প্রাচীনত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। বাঙালিদের বসতিস্থাপনের আগে সম্ভবত: আদিবাসী এক বা একাধিক জনগোষ্ঠী বসবাস করতো। রাজনৈতিক বাস্তবতা কিংবা কোন মহামারীর কারণে তাঁরা অনেক আগেই সেখান থেকে চলে গেছে। যাইহোক, স্থানীয়দের সাথে কথা বলে এখানে সাম্প্রতিক বসতিস্থাপন সম্পর্কে জানা যায়, বীরদল গ্রামের ছইল মিয়া সেখানে বাড়ি-ঘর বানানোর পর মূলত সেখানে অনেক মানুষ বসতি স্থাপন করে। বীরদল, তালবাড়ির লোকজনের জমি-জমা কাঁঠালবাড়ি থাকায় তাদেরকে সেখানে যেতে হতো। হাওরের মাঝখানের টিলায় ফল-মূল সহ অনেক গাছ-গাছালি থাকায় দেখা গেছে বীরদল, তালবাড়ির অনেক যৌথ পরিবারের এক বা দুই সদস্যকে সেখানে বাড়ি-ঘর বানিযে পাঠিয়ে দেওয়া হতো এই জমি-জমা ও ফল-ফসল দেখাশুনা, আহরণ ও উপভোগ করার জন্য। খুব আগের বসতি না হওয়ায় এই গ্রাম অনেকের কাছেই অজানা। অন্যদিকে, গ্রামটি এতটাই বিচ্ছিন্ন যে, সেখানে মূল জনপদের মানুষজনের সাধাণত: যাতায়াত নেই বললেই চলে। সাম্প্রতিক ইতিহাস অজানা হলেও স্থানটি ঐতিহাসিভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। লুন্তিয়া, কুচিয়া ইত্যাদি নামকরণ থেকে জায়গাটির সাথে অতীতের জৈন্তিয়া রাজ্যের শাসকদের সাথে সম্পর্কেরও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এছাড়া রাজাগঞ্জ নামটি যে রাজাদের কোন কর্মকান্ডের ফসল, তা সহজেই অনুমেয়।
কাঁঠালবাড়ি কেবল নৈসর্গিক সৌন্দর্যেরও জন্যেই আকর্ষণীয় তা কিন্তু নয় । বরং স্থানটির রয়েছে একটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব। সিলেটের গৌড়ের শেষ রাজা গৌড়গোবিন্দের পূজিত দেবতার নাম ছিল ’হাটকেশ্বর’। ১৩০৩ সালে হজরত শাহজালালের (রহ.) কাছে পরাজিত হলে তাঁর অমাত্যগণ সে দেবতাকে রাজ্য থেকে সরিয়ে নিরাপদ এক জায়গায় লুকিয়ে রাখেন। ঐতিহাসিকদের মতে, রাজার পূজিত দেবতা ’হাটকেশ্বর’ দেবতাকে জৈন্তিয়ার বড়হাওরে লুকিয়ে রাখা হয়। গৌড় মুসলমানদের দ্বারা বিজিত হলেও জৈন্তিয়া কিন্তু ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্বাধীন ছিল এবং বড়হাওর জৈন্তিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। গৌড়গোবিন্দের পূজিত দেবতা হাটকেশ্বর-কে বড়হাওরে লুকিয়ে রাখা অস্বাভাবিক নয় বরং নিরাপত্তার দিক দিয়ে এটি ছিল একটি উপযুক্ত স্থান। এ ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কোন দ্বিমত নেই। কিন্তু প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, বড়হাওরের কোন জায়গায় এটিকে রাখা হয়েছিল। জলের রাজ্যে তো কাঁঠালবাড়ির টিলাগুলো ছাড়া আর রাখার মতো কোন জায়গা দেখা যায়না। সুতরাং বড়হাওরের কাঁঠালবাড়ির এ টিলাগুলোর কোন একটিতে যে হাটকেশ্বর দেবতাকে রাখা হয়েছিল সে ব্যাপারে নি:সন্দেহ হওয়া যায়। পরবর্তীতে জৈন্তিয়ার রাজা জয়নারায়ণের সময় এ দেবতাকে উদ্ধার করা হয় বলে ঐতিহাসিক অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্বনিধি মতপ্রকাশ করেন। রাজা জয়নারায়ণের শাসনকাল হচ্ছে ১৭০৮ থেকে ১৭৩১ খ্রিস্টাব্দ। এ সময় সেনগ্রামের আগমবাগীশ পদবীধারী একজন ব্রাহ্মণের কপিলা নামক গাভী হারিয়ে গেলে তিনি খুঁজতে খুঁজতে জৈন্তিয়ার বড়হাওরে উপস্থিত হন । সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন যে, তার গাভীটি দাঁড়িয়ে এক শিবের উপর দুধ বর্ষণ করছে। কিছুক্ষণ পর তিনি গাভীকে নিয়ে নিজ গ্রামে ফিরে এলেন এবং পুরো ঘটনা গ্রামবাসীকে জানালেন । গ্রামবাসী খুব আগ্রহের সাথে তার সাথে সেখানে গেল এবং শিবকে দেখতে পেল । আগমবাগীসের ভাই কমল নারায়ণ ভট্টাচার্য সেটি দেখেই জোর করে উত্তোলন করলেন এবং নিজ গ্রামে নিয়ে এসে এক উত্তম স্থানে অধিষ্ঠিত করেন।
এ ঘটনার সংবাদ রাজা জয়নারায়ণের কাছে পৌঁছলে তিনি অত্যন্ত ক্ষুদ্ধ হয়ে সসৈন্যে সেনগ্রামে আগমন করেন। রাজার আগমণ সংবাদে আগমবাগীশ অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। সাহস সঞ্চয় করে তিনি রাজার সাথে দেখা করেন এবং পুরো ঘটনা খুলে বলেন। রাজা চাইলে শিবকে নিয়ে যেতে পারেন বলেও রাজাকে তিনি আশ্বস্থ করেন। রাজা যখনই শিবকে উত্তোলনের কাজে লোক নিয়োজিত করেন, তখনই শিব ভূলগ্ন হয়ে অনেক ভেতরে চলে যান। সবাই আশ্চর্য হলেন। রাজা এরপর শিব মূর্তিকে উত্তোলনের জন্য হাতি নিয়োগ করলেন । কিন্তু ক্ছিুতেই কিছু হলোনা। সর্বশেষ রাজার প্রধান সেনাপতি হুংকার দিয়ে সেখানে নেমে শাবল দিয়ে প্রচন্ড আঘাত করেন। এতে মূর্তির সামান্য অংশ ভেঙ্গে যায় এবং সেনাপতি সাথে সাথেই মৃত্যুবরণ করেন। সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর রাজা মূর্তিকে স্থানান্তরের সংকল্প ত্যাগ করে আগমবাগীশকে সেখানকার সেবায়েত নিয়োগ করেন। তিনি বিভিন্ন পরগণা থেকে অনেক জমিও সেবায়েতকে উপহার দেন। এসব ঘটনা থেকে সুস্পষ্ট যে, কাঁঠালবাড়ি একসময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে সেন্টমার্টিন থেকে বিচ্ছিন্ন ১০০ থেকে ১৫০ বর্গমিটার আয়তন বিশিষ্ট কয়েকটি দ্বীপপুঞ্জ আছে যেগুলোকে একত্রিতভাবে ’ছেড়া দ্বীপ’বলা হয়। সমুদ্রের অথৈ জলরাশির মধ্যে জেগে উঠা সে ’ছেড়াদ্বীপের’ ই যেন এক সিলেটী সংস্করণ ’কাঁঠালবাড়ি’। প্রায় ৪শতাধিক বছর পূর্বের ঐতিহাসিক অনেক ঘটনার সাক্ষী, প্রকৃতির অকৃপণ হাতে সজ্জিত এ ’ছেড়া দ্বীপ’ হতে পারে এক আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র। তবে সে পর্যটন হতে হবে প্রকৃতি-বান্ধব। প্রাণ ও প্রকৃতির যাতে কোন ক্ষতি না হয় সেদিকে পর্যটকদের সচেতন হতে হবে। সিলেট-তামাবিল সড়ক হয়ে হরিপুর বাজার নেমে কাপনা নদী দিয়ে পূর্বদিকে যেয়ে একনজর কাঠালবাড়িকে আপনিও দেখে আসতে পারেন।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT